যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনও মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি সই করেছেন।
সমর্থকদের কাছে এটি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো কাছে এটি উদ্বেগের কারণ হয়েছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন ওই সমঝোতা চুক্তি সই করেন। এর মধ্য দিয়ে তিন মাসের ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটে।
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়, যাকে সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক সইয়ের ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত অর্থ অবমুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে।
ইরান বছরের পর বছরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখে থাকার পর, এই চুক্তি দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও আঞ্চলিক আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এতে ইরান লাভবানই হচ্ছে।
তবে ইসরায়েল থেকে শুরু করে উপসাগরীয় দেশ এবং লেবাননের বিভিন্ন গোষ্ঠী, অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়াজুড়ে তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা
এই চুক্তিকে 'শতাব্দীর অভিশাপ' বলেই মনে করছে। কারণ, এর ফলে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হবে, আরও বৈধতা পাবে এবং দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
ইরানকে একঘরে করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে উল্টো তেহরানের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পথ সুগম হওয়ায় ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি দেখছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও পশ্চিম এশিয়ায় এই নতুন সমীকরণ নিয়ে শঙ্কিত। তারা মনে করছে, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড় আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
১৪ দফা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এর লক্ষ্য, একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার সুযোগ তৈরি করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমাধান খোঁজা।
লেবানিজ রাজনৈতিক ভাষ্যকার সারকিস নাউম বলেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের জন্য এটি একটি বড় পারষ্পরিক চুক্তি- শতাব্দীর সেরা চুক্তি, যেখান থেকে আর ফেরার উপায় নেই।
তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির চেয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ইরান নিষেধাজ্ঞা কবলিত হয়ে আর কোনও অর্থনৈতিক ধকল সহ্য করার অবস্থায় নেই আর ট্রাম্পেরও নতুন কোনও যুদ্ধ শুরু করার তাড়না নেই।
ইসরায়েলের জন্য ধাক্কা
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ সমঝোতা চুক্তিটিকে একটি কৌশলগত 'মহাবিপর্যয়' বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, শুরুতে ইরানকে দুর্বল করা বা এমনকি দেশটির শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছিল। সেই অভিযানই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে মোড় নিয়েছে।
ইসরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ এর জ্যেষ্ঠ গবেষক সিট্রিনোভিচ বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরান সরকারকে উৎখাত করতে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র উল্টো সেই ইরান সরকারকেই বৈধতা দিচ্ছে এবং শক্তিশালী করছে যাদের পতন আমরা চেয়েছিলাম।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধান দাবিগুলোর কোনোটিই চুক্তিতে পূরণ হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ হয়নি। এমনকি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলারও সুস্পষ্ট কোনও নির্দেশনা এতে রাখা হয়নি।
তাছাড়া, ইরানের দাবির মুখে লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানও এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি কাঠামোর কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই। এই চুক্তি ইরান নিয়ে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের প্রচারকে দুর্বল করে দিয়েছে। সেইসঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও এতে স্পষ্ট হয়েছে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক সিট্রিনোভিজের মতে, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। এই চুক্তি ইরানের অবস্থান আরও শক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং ইসরায়েলকে আরও কোণঠাসা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনি বলেন, সবকিছুই খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং এটি কেবল আরও খারাপের দিকেই যাবে।
চুক্তিটি টিকে থাকলে ইরানই সবচেয়ে সুবিধাজনক ফল পাবে বলেই প্রতীয়মান হয়। আর তা হল যুদ্ধের অবসান, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, পুনরায় তেল রপ্তানির সুযোগ এবং পুনর্গঠনের জন্য বিশাল তহবিল প্রাপ্তির সম্ভাবনা। পাশাপাশি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি পাচ্ছে।
এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অভিন্ন যেসব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে- সেগুলো হল: ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা বা এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমানো। ইরানের অবস্থান রূপান্তরের বদলে এই চুক্তি মূলত তাদেরকে আগের অবস্থানেই ফিরিয়ে আনছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং প্রথমেই নিহত হয় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা।
পরে এই যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে ইরান ও লেবাননসহ সব মিলিয়ে ৭,০০০’এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান। যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।
লেবাননে ইরানের প্রভাব আরও শক্তিশালী
লেবাননের ক্ষেত্রে এই চুক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। চুক্তিটি ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ শক্তি হিজবুল্লাহর ভূমিকা যেমন আরও শক্তিশালী করছে, তেমনি বৈরুত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে একপাশে সরিয়ে লেবাননকে একটি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কর্মকাঠামোভুক্ত করছে।
এই চুক্তি লেবাননকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আওতায় এনেছে, সেখানে সব পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের মতো লেবাননের অভ্যন্তরীন বিষয়ে ইরান বৈরুতের হয়ে দরকষাকষি করতে পারে না।
তবে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এর উল্টো যুক্তি দিয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি মূলত লেবাননের অবস্থানকেই শক্তিশালী করেছে, কারণ, বিষয়টি এখন অনেক উচ্চপর্যায়ের আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের নিজ নিজ মিত্র হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলকে চাপ প্রয়োগ করে একটি সমাধান এনে দিতে পারে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইরানের হামলার কারণে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। ইরান যুদ্ধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের সময় তারা ছিল দর্শক। আর এখন এর নেতিবাচক প্রভাব তাদেরকেই বহন করতে হচ্ছে।
উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ইতোমধ্যেই তাদের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর তাদের আস্থা কমছে, অঞ্চলজুড়ে ইরানকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং সংঘাতের বদলে সমঝোতার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে।
তবে ওয়াশিংটনের পশ্চিম এশিয়া ইনস্টিটিউট- এর জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা অবশ্য মনে করেন, বহু বছরের চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর এই চুক্তি ‘সবচেয়ে কম খারাপ’ বা বাস্তবসম্মত সমাধান বয়ে এনেছে। তার মতে, বৃহত্তর যুদ্ধ হলে উপসাগরীয় অঞ্চল কয়েক দশকের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারত।
ভাতানকা মনে করেন, আসল পরীক্ষা এখনও সামনে আছে। যেমন: চুক্তির বাস্তবায়ন, অমীমাংসিত পারমাণবিক আলোচনা এবং এর ফলে সৃষ্ট আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে চুক্তির প্রকৃত সাফল্য। তিনি বলেন, “এটি অনেক বড় বিষয়, কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়। এটি কেবল শুরু।
চুক্তির পথে বাধা হতে পারে ইসরায়েল
কিছু বিশ্লেষক ইসরায়েলকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তির পথে প্রধান 'ওয়াইল্ড কার্ড' হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়া ভন্ডুল করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব না হলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঝুঁকি এখনও আছে, বিশেষ করে লেবানন নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল- দুইপক্ষের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কথা বললেও ইসরায়েলের কট্টর-ডানপন্থিরা এখনও গোটা লেবাননকে পুড়িয়ে দেওয়ারই দাবি জানাচ্ছেন।
ফলে ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা চুক্তির টিকে থাকা নির্ভর করছে দুই পক্ষেরই কট্টরপন্থিদের রাশ টেনে ধরা এবং সংযম দেখানোর ওপর। কিন্তু এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে খুব কমই।
ওদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান যুদ্ধের পর ইসরায়েল আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই একঘরে হয়ে পড়েছে।
অন্য এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান যা চেয়েছিল সেটিই পেয়েছে। আমরা হিজবুল্লাহর মতো মিত্রদের পরিত্যাগ করিনি, বরং তাদের জন্য আমরা আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া এমনকি আবার যুদ্ধে ফিরতেও প্রস্তুত ছিলাম।
সূত্র: রয়টার্স
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সমালোচকদের কড়া সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাদের কোনোকিছু অবশিষ্ট নেই। শুক্রবার (১৯ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ স্যোশালে এক পোস্টে তিনি কথা বলেন। পোস্টে চুক্তির পক্ষে শুক্রবার ট্রাম্প পুনরায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। এর মাত্র একদিন আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডে পূর্বনির্ধারিত একটি আলোচনা সফর বাতিল করেছেন। এ সফরে চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার কথা ছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র একদিন পরই এই ভ্যান্সের সফর বিলম্বের কারণে এটির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরমধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এই কূটনৈতিক সাফল্যকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শুক্রবার ট্রুথ স্যোশালে পোস্টে ট্রাম্প এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের হাত শক্তিশালী করার দাবি করেছেন। ডেমোক্র্যাট এবং হাতেগোনা কয়েকজন রিপাবলিকান নেতার সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, এই সমঝোতা স্মারক কেবল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধান করছে এমন দাবি সঠিক নয়। ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধ ইরানকে সংকুচিত করে ফেলেছে! তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী এবং সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ডেমোক্রেটরা বলছে ইরান নাকি চার মাস আগের চেয়ে এখন ভালো অবস্থানে আছে। তাদের এমন অবস্থা কল্পনা করা যায়! মানুষ কতটা বোকা হতে পারে? আরেক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং ইরান আলোচনায় বসতে মরিয়ে হয়ে উঠেছিল। তারা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ওরা (ইরান) শেষ! আমরা তাদের সঙ্গে এই ৬০ দিন ধরে খেলব। তারা কোনো টাকাই পাবে না, এমনকি দশ পয়সাও না। সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের আলোচনা মেয়াদের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, আমরা এই ৬০ দিন দেখব। চুক্তিতে এই সময়ের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরান পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। এসব বিষয় আলোচনার মধ্যে দিয়ে চূড়ান্ত সমাধানে আসবে উভয় পক্ষ। সূত্র: আল জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনও মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি সই করেছেন। সমর্থকদের কাছে এটি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো কাছে এটি উদ্বেগের কারণ হয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন ওই সমঝোতা চুক্তি সই করেন। এর মধ্য দিয়ে তিন মাসের ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়, যাকে সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক সইয়ের ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত অর্থ অবমুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে। ইরান বছরের পর বছরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখে থাকার পর, এই চুক্তি দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও আঞ্চলিক আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এতে ইরান লাভবানই হচ্ছে। তবে ইসরায়েল থেকে শুরু করে উপসাগরীয় দেশ এবং লেবাননের বিভিন্ন গোষ্ঠী, অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়াজুড়ে তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই চুক্তিকে 'শতাব্দীর অভিশাপ' বলেই মনে করছে। কারণ, এর ফলে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হবে, আরও বৈধতা পাবে এবং দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের। ইরানকে একঘরে করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে উল্টো তেহরানের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পথ সুগম হওয়ায় ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি দেখছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও পশ্চিম এশিয়ায় এই নতুন সমীকরণ নিয়ে শঙ্কিত। তারা মনে করছে, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড় আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ১৪ দফা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এর লক্ষ্য, একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার সুযোগ তৈরি করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমাধান খোঁজা। লেবানিজ রাজনৈতিক ভাষ্যকার সারকিস নাউম বলেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের জন্য এটি একটি বড় পারষ্পরিক চুক্তি- শতাব্দীর সেরা চুক্তি, যেখান থেকে আর ফেরার উপায় নেই। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির চেয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ইরান নিষেধাজ্ঞা কবলিত হয়ে আর কোনও অর্থনৈতিক ধকল সহ্য করার অবস্থায় নেই আর ট্রাম্পেরও নতুন কোনও যুদ্ধ শুরু করার তাড়না নেই। ইসরায়েলের জন্য ধাক্কা ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ সমঝোতা চুক্তিটিকে একটি কৌশলগত 'মহাবিপর্যয়' বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, শুরুতে ইরানকে দুর্বল করা বা এমনকি দেশটির শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছিল। সেই অভিযানই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে মোড় নিয়েছে। ইসরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ এর জ্যেষ্ঠ গবেষক সিট্রিনোভিচ বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরান সরকারকে উৎখাত করতে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র উল্টো সেই ইরান সরকারকেই বৈধতা দিচ্ছে এবং শক্তিশালী করছে যাদের পতন আমরা চেয়েছিলাম। তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধান দাবিগুলোর কোনোটিই চুক্তিতে পূরণ হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ হয়নি। এমনকি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলারও সুস্পষ্ট কোনও নির্দেশনা এতে রাখা হয়নি। তাছাড়া, ইরানের দাবির মুখে লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানও এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি কাঠামোর কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই। এই চুক্তি ইরান নিয়ে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের প্রচারকে দুর্বল করে দিয়েছে। সেইসঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও এতে স্পষ্ট হয়েছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষক সিট্রিনোভিজের মতে, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। এই চুক্তি ইরানের অবস্থান আরও শক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং ইসরায়েলকে আরও কোণঠাসা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনি বলেন, সবকিছুই খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং এটি কেবল আরও খারাপের দিকেই যাবে। চুক্তিটি টিকে থাকলে ইরানই সবচেয়ে সুবিধাজনক ফল পাবে বলেই প্রতীয়মান হয়। আর তা হল যুদ্ধের অবসান, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, পুনরায় তেল রপ্তানির সুযোগ এবং পুনর্গঠনের জন্য বিশাল তহবিল প্রাপ্তির সম্ভাবনা। পাশাপাশি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি পাচ্ছে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অভিন্ন যেসব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে- সেগুলো হল: ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা বা এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমানো। ইরানের অবস্থান রূপান্তরের বদলে এই চুক্তি মূলত তাদেরকে আগের অবস্থানেই ফিরিয়ে আনছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং প্রথমেই নিহত হয় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। পরে এই যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে ইরান ও লেবাননসহ সব মিলিয়ে ৭,০০০’এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান। যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। লেবাননে ইরানের প্রভাব আরও শক্তিশালী লেবাননের ক্ষেত্রে এই চুক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। চুক্তিটি ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ শক্তি হিজবুল্লাহর ভূমিকা যেমন আরও শক্তিশালী করছে, তেমনি বৈরুত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে একপাশে সরিয়ে লেবাননকে একটি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কর্মকাঠামোভুক্ত করছে। এই চুক্তি লেবাননকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আওতায় এনেছে, সেখানে সব পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের মতো লেবাননের অভ্যন্তরীন বিষয়ে ইরান বৈরুতের হয়ে দরকষাকষি করতে পারে না। তবে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এর উল্টো যুক্তি দিয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি মূলত লেবাননের অবস্থানকেই শক্তিশালী করেছে, কারণ, বিষয়টি এখন অনেক উচ্চপর্যায়ের আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের নিজ নিজ মিত্র হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলকে চাপ প্রয়োগ করে একটি সমাধান এনে দিতে পারে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইরানের হামলার কারণে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। ইরান যুদ্ধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের সময় তারা ছিল দর্শক। আর এখন এর নেতিবাচক প্রভাব তাদেরকেই বহন করতে হচ্ছে। উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ইতোমধ্যেই তাদের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর তাদের আস্থা কমছে, অঞ্চলজুড়ে ইরানকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং সংঘাতের বদলে সমঝোতার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে। তবে ওয়াশিংটনের পশ্চিম এশিয়া ইনস্টিটিউট- এর জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা অবশ্য মনে করেন, বহু বছরের চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর এই চুক্তি ‘সবচেয়ে কম খারাপ’ বা বাস্তবসম্মত সমাধান বয়ে এনেছে। তার মতে, বৃহত্তর যুদ্ধ হলে উপসাগরীয় অঞ্চল কয়েক দশকের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারত। ভাতানকা মনে করেন, আসল পরীক্ষা এখনও সামনে আছে। যেমন: চুক্তির বাস্তবায়ন, অমীমাংসিত পারমাণবিক আলোচনা এবং এর ফলে সৃষ্ট আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে চুক্তির প্রকৃত সাফল্য। তিনি বলেন, “এটি অনেক বড় বিষয়, কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়। এটি কেবল শুরু। চুক্তির পথে বাধা হতে পারে ইসরায়েল কিছু বিশ্লেষক ইসরায়েলকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তির পথে প্রধান 'ওয়াইল্ড কার্ড' হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়া ভন্ডুল করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব না হলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঝুঁকি এখনও আছে, বিশেষ করে লেবানন নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র এখন লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল- দুইপক্ষের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কথা বললেও ইসরায়েলের কট্টর-ডানপন্থিরা এখনও গোটা লেবাননকে পুড়িয়ে দেওয়ারই দাবি জানাচ্ছেন। ফলে ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা চুক্তির টিকে থাকা নির্ভর করছে দুই পক্ষেরই কট্টরপন্থিদের রাশ টেনে ধরা এবং সংযম দেখানোর ওপর। কিন্তু এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে খুব কমই। ওদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান যুদ্ধের পর ইসরায়েল আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই একঘরে হয়ে পড়েছে। অন্য এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান যা চেয়েছিল সেটিই পেয়েছে। আমরা হিজবুল্লাহর মতো মিত্রদের পরিত্যাগ করিনি, বরং তাদের জন্য আমরা আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া এমনকি আবার যুদ্ধে ফিরতেও প্রস্তুত ছিলাম। সূত্র: রয়টার্স
ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ ও ছেড়ে যাওয়া সব ধরনের নৌযানের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড সেন্টকম (সেন্ট্রাল কমান্ড)। লাইভ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের চলাচলে মার্কিন বাহিনী আর কোনো বাধা দিচ্ছে না। তবে অবরোধ তুলে নেয়া হলেও অঞ্চলটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সেন্টকম। সংস্থাটির ভাষ্য, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার ‘সব দিক’ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ওই এলাকায় মোতায়েন থাকবে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সমঝোতার বিস্তারিত শর্ত সম্পর্কে সেন্টকমের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো তথ্য জানানো হয়নি। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজিটালভাবে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে কার্যকর হয় চুক্তিটি। সমঝোতায় যুদ্ধ বন্ধ করা, লেবানন পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উভয় পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: আলজাজিরা