বিশ্ব

যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম নিল এক ‘বিষফোড়া’

জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি মে ১৪, ২০২৬

ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূমিতে সন্ত্রাস, হত্যা–নির্যাতন, উচ্ছেদ–দখলের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন জায়নবাদী নেতা ডেভিড বেন গুরিয়ন। কীভাবে অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে ১৯৪৮ সালের এই দিনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে আজকের আয়োজন।

‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ যাকে বলে। ফিলিস্তিন ভূমিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘটেছে তেমনটাই।

না, বাংলা ভাষার এই সরল বাগধারায় আসল পরিস্থিতির চিত্র পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। তাহলে কী সেই আসল পরিস্থিতি?

হুট করে ফিলিস্তিনের বুকে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উগ্র ইহুদিবাদীদের দীর্ঘদিনের সুনিপুণ পরিকল্পনা, গভীর ষড়যন্ত্রের সফল বাস্তবায়ন ‘ইসরায়েল’।

এই পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধর্মগ্রন্থ–আশ্রিত এক কল্পকাহিনি সামনে এনে তা বিশ্বাসযোগ্য, প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে নামে জায়নবাদীরা। এই মিথ প্রতিষ্ঠায় অন্যায়ভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় ব্রিটিশরা। অপরাধের হলো শুরু, আর ফিলিস্তিনিদের সারার সূচনা।

পরের ইতিহাস পাপে–অপরাধে পূর্ণ। কী হয়নি? অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন, জোর-জুলুম, সন্ত্রাস, জবরদখল, ধ্বংসযজ্ঞ, উচ্ছেদ-বিতাড়ন, ধর্ষণ-লুটতরাজ, হত্যা-গণহত্যা।

এসবের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এখানেই শেষ নয়। ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ বিনাশ। এ লক্ষ্য অর্জনে দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনি জাতিহত্যার মিশন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

অস্ট্রীয় লেখক নাথান বারনবুম ১৮৯৫ সালে ‘জায়নিজম’ বা জায়নবাদ শব্দটি প্রবর্তন করেন। ‘নিজভূমিতে’ ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জাতীয় আন্দোলনই হলো ‘জায়নবাদ’(ইহুদি জাতীয়তাবাদ)।

এরপর ১৮৯৭ সালের আগস্টে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলে প্রথম বিশ্ব জায়নবাদী সম্মেলন হয়। সম্মেলনের উদ্যোক্তা অস্ট্রিয়ার ইহুদি সাংবাদিক, নাট্যকার ও রাজনীতিক থিওডর হারজেল।

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে গঠিত হয় জায়নবাদী সংস্থা। পরে যার নাম হয় বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা। একই সম্মেলনে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রূপরেখা গ্রহণ করা হয়।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি কল্পকাহিনি নির্মাণ করেন জায়নবাদীরা। এর জন্য তাঁরা ইহুদি ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেলের (তানাখ) আশ্রয় নেন। এই ধর্মগ্রন্থ–আশ্রিত কল্পকাহিনিকে প্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁরা নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিন বয়ান
জায়নবাদীদের কল্পকাহিনির মূল বয়ান মূলত তিনটি। এগুলো হলো—‘প্রতিশ্রুত ভূমি’, ‘মনোনীত সম্প্রদায়’ ও ‘ভূমিহীন মানুষের জন্য মনুষ্যহীন ভূমি।’

তানাখ অনুসারে, নবী আব্রাহামকে (মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে যিনি ইব্রাহিম (আ.) নামে পরিচিত) তাঁর বংশধরদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঈশ্বর। এই ভূখণ্ড পুণ্যভূমি হিসেবে বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত থাকবে।

ভৌগোলিকভাবে এই ভূমি সেখানেই, যেখানে আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের অবস্থান। তবে তানাখের অন্য বিবরণে মিসর থেকে ফোরাত নদীর তীর পর্যন্ত এই ভূমির সীমা।

ইহুদিদের বিশ্বাস, তাঁরা ঈশ্বরের মনোনীত জাতি। সেই হিসেবে তাঁরা ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতেই বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু তাঁরা এই ভূমি থেকে বিতাড়িত হন। দুই হাজার বছরের বেশি সময় আগে ৭০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁদের উৎখাত করে রোমানরা। তাঁরা উৎখাত হওয়ার পর যাঁরা সেখানে থেকেছেন, অর্থাৎ ফিলিস্তিনিরা, তাঁরা এই ভূমির মানুষ নন। উগ্র ইহুদিদের চিন্তাধারা কতটা অসুস্থ তার একটি নমুনা হচ্ছে, তারা ফিলিস্তিনিদের কোনো মানব সম্প্রদায় মনে করে না। এই হিসেবে তারা এই ভূমিকে ‘মনুষ্যহীন ভূমি’ মনে করে।

সুতরাং এই ‘মনুষ্যহীন ভূমির’ আসল মালিক ইহুদিরা। তাই এখান থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে ভূমির মালিকানা ফিরিয়ে নেওয়াই যথাযথ।

ইহুদিদের ‘নিজভূমিতে’ ফেরা, ‘নিজভূমির’ ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জায়নবাদীরা জাতীয় আন্দোলন শুরু করে। তারা দাবি তোলে, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ভূমিতেই ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র গড়তে হবে।

বেলফোর ঘোষণা
১৫১৬ থেকে ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অটোমানরা অক্ষশক্তির পক্ষে যোগ দেয়।

১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর মিত্রশক্তিভুক্ত ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন বাহিনী অটোমানদের কাছ থেকে বীরশেবা দখল করে নেয়। এর মধ্য দিয়ে সিনাই–ফিলিস্তিন অঞ্চলের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে তারা। ক্রমে অটোমান প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে পড়ে। ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন বাহিনী ধাপে ধাপে পুরো অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর জায়নবাদী নেতা ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে একটি চিঠি দেন।

ইংরেজিতে লেখা সংক্ষিপ্ত চিঠিটির মূল কথা ছিল মাত্র ৬৭ শব্দে। চিঠিতে লেখা হয়েছিল—‘মহামান্য (ব্রিটিশ) সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। আর এ লক্ষ্য অর্জনে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার, এমন কিছু করা হবে না, যা ফিলিস্তিনে অবস্থানরত অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার কিংবা অন্য কোনো দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের বিদ্যমান অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে।’

অর্থাৎ এই চিঠির মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়, ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাসভূমি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সবকিছুই করবে ব্রিটিশ সরকার।

এই চিঠি ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিতি পায়। বেলফোরের ঘোষণাটি ছিল জায়নবাদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের খোলামেলা স্বীকৃতি। তাঁর এই ঘোষণা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার করে দেয়। ঘোষণাটি জায়নবাদীদের কাছে হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম ভিত্তি।

তখনকার ফিলিস্তিনে ৯০ শতাংশ বা তার বেশি ছিল আরব অধিবাসী। আরবদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম। এ ছাড়া সেখানে কিছু খ্রিষ্টান ও ইহুদি অধিবাসীর বসবাস ছিল। এই বাস্তবতায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেলফোর অন্যায়-অবিচার-অপরাধ করেছিলেন। তাঁর ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, ভূরাজনীতিকে চিরতরে বদলের সূত্রপাত ঘটায়।

ব্রিটিশ শাসকের মদদ, সমর্থনের ধারাবাহিকতায় ইউরোপসহ অন্যান্য দেশ থেকে ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনে আসতে শুরু করে।

১৯২০ সালে ইতালির সান রেমো বৈঠকে বেলফোর ঘোষণা কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। আর তা কার্যকরের দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারকেই দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনে আসা অভিবাসী ইহুদিরা নিজেদের অবস্থান শক্তপোক্ত করতে, দখলদারি জোরালো করতে, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ-বাস্তুচ্যুত করতে একই বছর গঠন করে ‘হাগানাহ’ নামের একটি আধা সামরিক বাহিনী।

১৯২২ সালে লিগ অব নেশনসের কাছ থেকে অখণ্ড ফিলিস্তিনের ওপর ‘ম্যান্ডেট’ লাভ করে ব্রিটিশরাজ।

ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ব্যাপক আগমনে স্থানীয় ফিলিস্তিনি-আরবদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। শুরু হয় সংঘাত। ত্রিশের দশকে বড় ধরনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-বিদ্রোহ করেন ফিলিস্তিনিরা। অবশ্য ব্রিটিশ সরকার তা কঠোরভাবে দমন করে।

ফিলিস্তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যকার সংঘাতের কারণ অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। তারা লর্ড রবার্ট পিলের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে।

ফিলিস্তিনকে দুভাগে বিভক্ত করার এক অন্যায্য-অন্যায় সুপারিশ করে পিল কমিশন। সুপারিশ অনুযায়ী, বণ্টনটা হবে এভাবে—৭৫ শতাংশ আরবদের জন্য, বাকিটা ইহুদিদের। ফিলিস্তিনি আরবরা এই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ভূমি বিভাজনের এই নীতি সমর্থন করে ইহুদিরা।

হলোকাস্টকে হাতিয়ার
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে জার্মান নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ইউরোপে ইহুদি নিধনযজ্ঞ চলে, যা ইতিহাসে ‘হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ও গবেষকের তথ্যমতে, নাৎসি বাহিনীর হাতে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হন। এই ইহুদি নিধনযজ্ঞ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। সে সময় অনেক ইহুদি পালিয়ে ফিলিস্তিনে যান।

১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত হয় জায়নবাদী সম্মেলন। এই সম্মেলনে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা গৃহীত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধে পরাজিত হয় জার্মানি-জাপান-ইতালি অক্ষশক্তি। যুদ্ধ শেষে বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতি তুঙ্গে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে হলোকাস্টকে সামনে আনেন জায়নবাদী নেতারা, তাঁদের আন্তর্জাতিক সমর্থকেরা। তাঁরা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জোর যুক্তি দেন।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। হিটলারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ ইহুদিকে অতিদ্রুত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে স্থান দেওয়া হোক, এমনটা তিনি তখনই চেয়েছিলেন।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা
ব্রিটিশ সরকার একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তারা আর ফিলিস্তিন শাসন করবে না। বিষয়টি জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয় তারা। জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। একটি ইহুদিদের রাষ্ট্র (৫৫ শতাংশ)। অপরটি ফিলিস্তিনি আরবদের (৪৫ শতাংশ)। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত এই পরিকল্পনায় জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নগরের মর্যাদা দেওয়া হয়। পরিকল্পনাটি মেনে নেন ইহুদিরা। তবে তা প্রত্যাখ্যান করেন আরবরা।

নিজভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়ানোর ছক তৈরি করেন জায়নবাদীরা। তাঁরা ‘প্ল্যান ডি’ নামের পরিকল্পনা নেন। এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন জায়নবাদী নেতা ডেভিড বেন গুরিয়েন। তিনি পরে ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন।

পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল—হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি আরবদের নিজভূমি থেকে বিতাড়িত করা। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হয়। তখন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাগানাহ, স্টার্ন গ্যাংসহ ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলো।

ইহুদিদের হামলা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হতে থাকেন স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা। তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে মধ্যরাতে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট (শাসন) শেষ হওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে সেদিন বিকেলে তেল আবিবে বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে মহাবিপর্যয় নেমে আসে।

১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে অন্তত সাত লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হন। তাঁরা আশপাশের আরব দেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে, এই ফিলিস্তিনিদের নিজভূমিতে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা আর কখনোই ফিরতে পারেননি। অন্যদিকে যাঁরা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে রয়ে যান, তাঁরা হয়ে পড়েন ‘নিজভূমে পরবাসী’।

প্যালেস্টাইন সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে এখন ফিলিস্তিনিদের মোট সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮১ লাখ প্রবাসে বসবাস করছেন। আর প্রায় ৭৪ লাখ বসবাস করছেন ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে।

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে থাকা ফিলিস্তিনিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইসরায়েলি দখলদারি, উচ্ছেদ, জেল-জুলুম, হামলা-নির্যাতন, সন্ত্রাস, হত্যাযজ্ঞসহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এক ভয়াবহ জীবন পার করছেন।

বিগত ৭৮ বছরে চারটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়। প্রতিটি যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হন। আর ফলাফল হিসেবে ফিলিস্তিনিরা ক্রমেই নিজভূমিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অন্যদিকে এই সময়কালে ইসরায়েলের রাজনৈতিক-সামরিক শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। সম্প্রসারিত হয়েছে দখলদারি ও সামরিক আগ্রাসন। সর্বোপরি ফিলিস্তিনি জাতি হত্যার পরিধি, কৌশল ও ভয়াবহতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নির্বিচারে নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজায় এই ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত ১ লাখ ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সব ধরনের প্রায় ৮১ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার ৫০ শতাংশের বেশি হাসপাতাল অকার্যকর।

উপত্যকার প্রায় সব স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত। সব মিলিয়ে গাজা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসস্তূপে। সেখানে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে এখন গাজাকে বলা হচ্ছে ‘মর্ত্যের নরক’।

গাজার অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে। পুরো গাজা দখলের পাঁয়তারা করছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি আগ্রাসন শুধু ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। ইরান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েল প্রকাশ্য বা গোপনে হামলা-আগ্রসন চালিয়ে যাচ্ছে। পাপ, অপরাধ, সন্ত্রাস, দখলদারি, রক্তখেলার মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের এক ‘বিষফোড়া’। এই বিষফোড়ার ভুক্তভোগী পুরো মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি সারা বিশ্ব।

তথ্যসূত্র:

*আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স, আনাদলু, প্রথম আলো।

*ইয়ান ক্যারল, ইসরায়েল অ্যান্ড প্যালেস্টাইন: দ্য কমপ্লিট স্টোরি (২০১৮ কিন্ডল ই-বুক সংস্করণ)।

Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহে ভাটা

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না।   একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।   এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন।   গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে।   জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।   সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে।   কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে।   প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।   আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’   সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না।   এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

সংগৃহীত ছবি
তেহরান দ্রুত সমঝোতা চাইছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

তেহরান খুব দ্রুত এবং মরিয়া হয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।     তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসা বা কোনো সমঝোতায় যাওয়া উচিত হবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রই নেবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই মন্তব্য করেন।       পোস্টে ট্রাম্প আরও হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল পরিবহন নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখতে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করছে না, তাদের মার্কিন প্রশাসনকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অর্থ পরিশোধ করতে হবে।     এর আগে গত রোববার আয়ারল্যান্ড সফরে আইরিশ ওপেন গলফ চ্যাম্পিয়নশিপে দেওয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন যে, চলতি বছর এবং নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরান সংঘাতের অবসান ঘটবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হলেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে।

মারিয়া রহমান সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেন সংঘাত ও হুথি হামলায় হরমুজ সংক্রান্ত বৈঠক স্থগিত

ইরানে ভাঙা পিঠ-কাঁধ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন সেনা ব্রাভো। ছবি: সংগৃহীত

ইরানি ভূখণ্ডে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমান, ৫০ ঘণ্টা পর সেনা উদ্ধার

ছবি: সংগৃহীত

এক লাফে ১০৭ ডলার ছাড়াল তেলের দাম

ইরানে হামলা চালাতে গিয়ে বিমান থেকে পড়ে মেরুদণ্ড ভাঙে মার্কিন কর্মকর্তার

২ এপ্রিল, ইরানের ছোড়া কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি এফ-১৫ই ‘স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ইতিহাসের অন্যতম বড় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওই ঘটনায় দুই মার্কিন সেনা যুদ্ধবিমান থেকে ইরানের দুর্গম পাহাড়ে পড়ে যান।   বিমানের পাইলট—যাকে মিশনের ভাষায় ‘আলফা’ বলা হয়—কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার হন। কিন্তু অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ‘ব্রাভো’, প্রায় ৫০ ঘণ্টা শত্রু নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আটকে ছিলেন। ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পিঠে গুরুতর আঘাত নিয়ে একটি পাহাড়ি ফাটলে লুকিয়ে থেকে তিনি ইরানি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে ছিলেন। পরে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।   নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। মিশনের কলসাইন ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি রিজ ভাঙা পিঠ নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন, দুই দিন ইরানি বাহিনীর কাছ থেকে লুকিয়ে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী তাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনে।   তিনি তার বেঁচে থাকার সময়কার ‘সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তের’ কথাও জানিয়েছেন—যখন তিনি প্রায় মুক্তপতনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।   ‘আধুনিক যুগের এক অলৌকিক ঘটনা’ সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রাভো তার বেঁচে থাকার ঘটনাকে ‘আধুনিক যুগের এক অলৌকিক ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।   মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, ওই রাতে ব্রাভোর মিশন ছিল ইসফাহানের দক্ষিণে একটি পাহাড়ি এলাকার কাছে থাকা শিল্প স্থাপনায় হামলা চালানো। ধারণা করা হয়, ইরান সেখানে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের বড় একটি অংশ সংরক্ষণ করে।   ব্রাভো বলেন, ‘সেদিন পর্যন্ত আমাদের কাছে যুদ্ধের অন্য যেকোনো দিনের মতোই ছিল। কিন্তু ইরানের একটি অস্ত্র আমাদের আঘাত করার মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়।’   তিনি সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, আমেরিকার ৩ কোটি ডলার মূল্যের দুই আসনের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি—যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন বিমানযুদ্ধ অভিযানের অন্যতম প্রধান যুদ্ধবিমান—কাঁধে বহনযোগ্য একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। অথচ ওই ধরনের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১ লাখ ডলার হতে পারে।   ব্রাভো ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতকে বর্ণনা করেন, ‘মনে হয়েছিল যেন একটি মালবাহী ট্রেন এসে ধাক্কা দিয়েছে।’   তিনি বলেন, আলফা যুদ্ধবিমানটি বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দ্রুতই তারা বুঝতে পারেন, বিমানটি আর রক্ষা করা সম্ভব নয়। এরপর দুজনই যুদ্ধবিমান থেকে ইজেক্ট করে বেরিয়ে যান।   আলফা নিরাপদে ইজেক্ট করে বেরিয়ে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাসুট সামলাতে গিয়ে ব্রাভো প্রায় ৫ মাইল দূরে গিয়ে কঠিনভাবে মাটিতে অবতরণ করেন।   ব্রাভো বলেন, ‘একপর্যায়ে আমি ওপরে তাকিয়ে দেখলাম, কোনো প্যারাসুট নেই। জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য ছিল সেটি।’   ‘তখন আমি থেমে গেলাম এবং প্রার্থনা করলাম, “প্রভু, আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। তবে আমি যদি এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারি, তাহলে আমার সাহায্য দরকার”।’   অত্যন্ত বেশি গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়ায় তার মেরুদণ্ড, একটি হাত ও একটি কাঁধ ভেঙে যায়।   অন্ধকার কেটে যাওয়ার পর শত্রু এলাকায় নিজের অবস্থান বুঝতে পারেন ব্রাভো। এরপর সেখান থেকে পালানোর পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি নিজেকে দুই পাশে খাড়া পাহাড়ঘেরা একটি উপত্যকায় দেখতে পান। তাই নিরাপদ জায়গা হিসেবে ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। হাড় ভাঙা অবস্থাতেও তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি রিজে হেঁটে ও চড়ে ওঠেন।   সিবিএসকে ব্রাভো বলেন, ‘আমার চোট ছিল। কিন্তু আমরা যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেয়া এবং তা মোকাবিলা করার প্রশিক্ষণ আমরা সবাই পেয়েছি। আঘাত থাকা সত্ত্বেও যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।’   হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘প্রেরণার অভাবকে কখনোই আপনাকে ইরানি টেলিভিশনে পৌঁছে দিতে দেবেন না।’   যেভাবে উদ্ধার করে মার্কিন বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রে এদিকে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, দুই সেনাসদস্য জীবিত থাকুন বা মারা যান—যেভাবেই হোক তাদের ফিরিয়ে আনবে মার্কিন সামরিক বাহিনী।   কুপার জানান, এরপর দুই কর্মকর্তাকে খুঁজে বের করতে বিশাল অভিযান শুরু করা হয়। এতে আকাশে শত শত সেনা এবং তাদের সহায়তায় আরও কয়েক হাজার সদস্য যুক্ত হন।   সেন্টকম প্রধান জানান, ইরানের মাটিতে ৯০ জনেরও বেশি মার্কিন সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়। ৪৬ বছর পর এটিই ছিল ইরানে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের প্রথম ঘটনা।   ছয় ঘণ্টার মধ্যেই আলফাকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ব্রাভোর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে তাকে প্রায় কোনো খাবার বা পানি ছাড়াই পাহাড়ে আরও একদিন একা থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের অবস্থান জানিয়ে মার্কিন বাহিনীর কাছে একটি বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন।   ব্রাভো যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, তার কাছাকাছি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী বোমারু বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে। এরপর চূড়ান্ত উদ্ধারকারী দলকে সেখানে পাঠানো হয়।   এই অভিযানে সিআইএও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে তারা একটি প্রতারণামূলক অভিযান চালায় এবং নিখোঁজ মার্কিন কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্ত করতে গোপন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।   মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিমান ব্যবহার করে প্রায় ৫০ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালানোর পর অবশেষে ব্রাভোকে খুঁজে পাওয়া যায়।   উদ্ধারের মুহূর্তটিকে তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত’ হিসেবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

প্রশান্ত মহাসাগরে স্বর্ণ-রুপার বিশাল মজুতের সন্ধান পেলো চীন

মাত্র ৩০০ রুপির ওভেন দিয়ে শুরু, আজ ৭ হাজার ৪০০ কোটির সাম্রাজ্য

ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের ওপর নির্ভর করছে ইরান সংকটের ভবিষ্যৎ সমাধান

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
আন্তর্জাতিক যুব উৎসবে ন্যায়সংগত বিশ্ব গড়ার আহ্বান পুতিনের

আন্তর্জাতিক যুব উৎসব-২০২৬-এ অংশ নেওয়া তরুণ ও অতিথিদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবুর্গে আয়োজিত এ উৎসবের উদ্বোধনী ভিডিওবার্তায় তিনি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্বের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নিয়ে তরুণ নেতাদের ভাবার আহ্বান জানান।     রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দেওয়া শুভেচ্ছাবার্তায় পুতিন বলেন, ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থল উরাল অঞ্চলের শহর ইয়েকাতেরিনবুর্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ নেতাদের সমবেত হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। উরাল অঞ্চল থেকে এমন অনেক ধারণা ও উদ্ভাবনের জন্ম হয়েছে, যা রাশিয়ার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।       তিনি বলেন, নতুন প্রযুক্তির আগমনে মানুষের জীবন কীভাবে বদলে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে মানুষ কেমন বিশ্ব চায়—এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দেশের তরুণ নেতাদের আলোচনা করার জন্য ইয়েকাতেরিনবুর্গ উপযুক্ত স্থান।       রাশিয়ান ভাষার ‘মির’ শব্দটির অর্থ বন্ধুত্ব, শান্তি ও সম্প্রীতি—একই সঙ্গে এর অর্থ বিশ্ব বা পৃথিবী।       পুতিন বলেন, এই অর্থ রাশিয়ার বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।     রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, বন্ধুত্ব থাকলে তা দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ন্যায়বিচার ও সম্মান থাকা প্রয়োজন।       তিনি আরো বলেন, মানুষের ভাগ্য যেন তার জাতীয়তা, অর্থসম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের মতো বিষয় দিয়ে নির্ধারিত না হয়—এটাই তাদের প্রত্যাশা।       প্রতিটি দেশের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। একই সঙ্গে ওষুধ, খাদ্য, পানি, জ্বালানি, শিক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পুতিন বলেন, ‘এটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা, আমাদের লক্ষ্য ও আমাদের স্বপ্ন। আপনারাও যদি এসব আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেন, তাহলে আসুন আমরা একসঙ্গে বিশ্বকে বদলে দিই।’     রাশিয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পে অংশ নিতে আগ্রহীদের স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, একইভাবে তরুণরা নিজ নিজ দেশেও একটি নতুন, উন্মুক্ত ও ন্যায়সংগত বিশ্ব গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারেন।     তরুণ প্রজন্মের ওপর আস্থা প্রকাশ করে পুতিন বলেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তরুণ প্রজন্ম সফল হবে। সময় এখন তোমাদের।’       বার্তার শেষে তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে তোমাদের স্বপ্ন অনুসরণ করো।’ একই সঙ্গে তিনি উৎসবে অংশ নেওয়া সবাইকে সুস্বাস্থ্য, সৌভাগ্য ও সাফল্যের শুভকামনা জানান।

মারিয়া রহমান সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেন সংঘাতের জেরে সৌদির সীমান্ত শহরে জরুরি সতর্কতা জারি

সৌদির পাইপলাইন বন্ধ, বিশ্ববাজারে ৪% তেল সরবরাহ কমার শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা কমছে, নতুন করে ভাবছে বিশ্ব

0 Comments