ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশন্স (ইউএফএস) ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ইউএফএস-প্রগতি লাইফ ইউনিট ফান্ড অবসায়নের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
ফান্ডটির ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বিজিআইসি) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। ট্রাস্টির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট বিএসইসির পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ফান্ডটি অবসায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিজিআইসি জানিয়েছে, ট্রাস্টি হিসেবে তারা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫ অনুসরণ করে ইতোমধ্যে অবসায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে। ফান্ডের সম্পদ নগদায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনা যথাসময়ে জানানো হবে।
ইউএফএস-প্রগতি লাইফ ইউনিট ফান্ডটি একটি বেমেয়াদি বা ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ড। এর স্পন্সর ছিল প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ফান্ডটিতে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৯৮ লাখ টাকা। আর ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশন্স লিমিটেড।
ইউএফএসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক তদন্ত ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে নতুন করে ফান্ডটি অবসায়নের সিদ্ধান্ত এসেছে। ২০২২ সালে বিএসইসি ইউএফএসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের তথ্য শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
এরপর একাধিক ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ড থেকে ১৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে ইউএফএসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর মধ্যে ইউএফএস-বাংলাদেশ এশিয়া ইউনিট ফান্ড, ইউএফএস-আইবিবিএল শরিয়াহ ইউনিট ফান্ড, ইউএফএস-পদ্মা লাইফ ইসলামিক ইউনিট ফান্ড এবং ইউএফএস-পপুলার লাইফ ইউনিট ফান্ডের নাম রয়েছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় ইউএফএসের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা, ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কর্মকর্তাসহ স্বাধীন নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের ৩১১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
দুদকের মামলার নথিতে বলা হয়েছে, সৈয়দ হামজা আলমগীরসহ অভিযুক্তরা জালিয়াতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিভিন্ন অননুমোদিত ব্যাংক হিসাব ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, তদন্তে ৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার অননুমোদিত বিনিয়োগ, ১৪৮ কোটি টাকার ভুয়া ফিক্সড ডিপোজিট রসিদ (এফডিআর) এবং শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ফান্ডে জমা না দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠে আসে। এছাড়া ব্যবস্থাপনা ও ট্রাস্টি ফি বাবদ আদায় করা অর্থ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এসব আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আহমেদ জাকের অ্যান্ড কোং-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় বিএসইসি। অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীসহ ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এ বিষয়ে দেশের সব ব্যাংকে নির্দেশনা পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তালিকায় কয়েকটি শীর্ষ শিল্পগ্রুপের মালিক, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নাম রয়েছে। তবে ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং হামিদ গ্রুপের মালিক ও সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। এ তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদীর নামও রয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন ফেবিয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম মোশাররফ হোসেন এবং গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপা।
নগদ বৈদেশিক মুদ্রা নিরাপদে সংরক্ষণ ও পরিবহনের ঝুঁকি কমাতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমার হিসাব খোলার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোতে বিশেষ ধরনের কাস্টডিয়াল হিসাব খোলার অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বুধবার (৪ নভেম্বর) এ বিষয় একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলার অনুযায়ী, এসব হিসাব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার নোট জমা, উত্তোলন ও নিরাপদে সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এসব হিসাবে জমা অর্থের বিপরীতে কোনো সুদ দেওয়া হবে না। পাশাপাশি নির্ধারিত সীমার বাইরে মুদ্রা জমার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লেনদেনের পরিমাণ ও ধরন যথাযথভাবে নথিভুক্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, মানি চেঞ্জারদের নগদ বৈদেশিক মুদ্রা পরিবহনের ক্ষেত্রে বৈধ ক্যাশ-ইন-ট্রানজিট (সিআইটি) বিমা থাকতে হবে। এ ছাড়া এডি ব্যাংক নির্ধারিত সীমার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা পরিবহনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত, সিআইটি সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান অথবা নিরাপত্তা প্রহরীসহ নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। দিনের শেষভাগে বৈদেশিক মুদ্রা জমা দেওয়ার সুবিধার্থে এডি ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ কাউন্টার ও অস্থায়ী ভল্টের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়, মানি চেঞ্জাররা তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে চেক বা উত্তোলন স্লিপ ব্যবহার করে এসব হিসাব থেকে অর্থ তুলতে পারবেন। তবে উত্তোলনের পরিমাণ কোনোভাবেই হিসাবের জমা স্থিতির বেশি হতে পারবে না। এসব হিসাবে ওভারড্রাফট বা ঋণসুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের দাম শুনে ফিরে আসতে হচ্ছে অনেককে। সন্তানের পছন্দের খাবার কেনার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। কোনো পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে মাছ-মাংস, আবার কারও সংসারে চাল, ডাল আর আলুই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। এমনকি কোনো কোনো পরিবারে সন্তানের জন্য দুধ কেনার টাকাও জুটছে না। সংসারের খরচ সামলাতে কেউ কমিয়েছেন খাবারের পরিমাণ, কেউ বাদ দিয়েছেন প্রয়োজনীয় পণ্য। তবু মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না স্বল্প আয়ের মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্তরাও। সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযুদ্ধে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন সংকট। একদিকে বাজারের বাড়তি খরচ, অন্যদিকে যাতায়াত, রান্না ও অন্যান্য ব্যয়। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি আয়। বরং কারও কারও কাজ ও উপার্জন কমেছে। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে বিলাসিতা তো দূরের কথা, মৌলিক প্রয়োজনেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। কমছে খাবারের বৈচিত্র্য, সঞ্চয়ে পড়ছে টান, অপূর্ণ থাকছে সন্তানের আবদার। রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা, বিক্রেতা ও নানা পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমন চিত্র। তাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, দ্রব্যমূল্যের চাপ এখন আর শুধু বাজারের হিসাব নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সংকট। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে তার ব্যবসায়ও। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় তিন হাজার টাকায়। আয় কমে যাওয়ায় সংসার ও ব্যবসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। রিফাত বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। আগে যে আয় হতো, এখন তা হচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় জিনিসও কিছুটা ত্যাগ করতে হচ্ছে। কোনোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি, আর কি।’ রাস্তার পাশের আরেক দোকানি মিজানের অবস্থা আরও করুণ। আগে সপ্তাহে এক-দুবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন সবজি কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। দৈনিক আয় ছয় থেকে সাতশ টাকা হলেও খরচ হচ্ছে সাত থেকে আটশ টাকা। ঘাটতি মেটাতে খাবারের খরচ কমানো ছাড়া উপায় নেই তার। মিজান বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্তরা বেশি কষ্টে আছি। অতি নিম্নবিত্তরা কারও কাছে হাত পাততে পারে, কিন্তু আমরা তো পারি না। সন্তানের আবদার পূরণ করা তো দূরের কথা, প্রয়োজনও ঠিকমতো মেটাতে পারছি না।’ বাজারের বাড়তি খরচে দিশাহারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মধ্যবিত্তরাও। এক দম্পতি জানান, বাজারে ঢুকলেই অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই চলে যায় পাঁচশ টাকা। মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতন হলে বাজারের খরচেই ব্যয় হয় অর্ধেকের বেশি। এরপর যাতায়াত ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় তো রয়েছেই। একটি পোশাক কারখানায় মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কাজ করেন সাইফ। তার মতে, পণ্যের দাম বাড়ারও একটি সহনীয় সীমা রয়েছে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষের পক্ষে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সাইফ বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। আবেগের জায়গা থেকে সব সময় যেটা খেতে অভ্যস্ত, সেটাই খেতে চাই। কিন্তু সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের চাহিদার সঙ্গেও আপস করতে হচ্ছে। একেবারে খাওয়া বন্ধ করার সুযোগ নেই, তাই কমিয়ে-বাড়িয়ে খেতে হচ্ছে।’ আগে কম টাকায় বেশি পণ্য কেনা গেলেও এখন কেনাকাটায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। বাজারে এসে বেশি দাম দেখে অনেক সময় প্রয়োজনীয় পণ্য না কিনেই ফিরতে হয়। আবার একান্ত প্রয়োজনের কারণে কোনো কোনো পণ্য বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, ক্রেতারা আগের মতো কেনাকাটা করছেন না। অনেকে প্রয়োজনের তালিকা ছোট করেছেন, কমিয়েছেন পণ্যের পরিমাণ। আহাদ আলী নামে এক বিক্রেতা বলেন, ‘ক্রেতা খুবই কম। সবাই হিসাব করে কেনাকাটা করছেন। আমরা পাইকারিতে আগে যে দামে পণ্য কিনতাম, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বিক্রি করতে হচ্ছে বেশি দামে।’ তিনি বলেন, গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে পাইকারিতে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে পাম তেল কিনতেন। এখন সেই দামে আর কিনতে পারছেন না। ফলে বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দরে। বিক্রির দাম গিয়ে ঠেকেছে ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায়। মাছ বিক্রেতা শাকিলের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো পরিমাণে বাজার করা যেত। এখন শুধু সবজি কিনতেই পাঁচশ টাকা খরচ হয়ে যায়। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য হচ্ছে না।’ দিনমজুর আমীন আলীর জীবনেও সংকটের শেষ নেই। আগে একটি কাজ করে পাঁচ থেকে আটশ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারতেন। এখন কাজই পান কম, পেলেও অনেক সময় আয় হয় মাত্র চার-পাঁচশ টাকা। সেই টাকায় সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানো এবং রান্নার জ্বালানির ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমীন আলী বলেন, ‘আমাদের জীবন অনেক কষ্টে আছে। কাজ পাই না। যা আয় হয়, তাতে অনেক কষ্টেই চলছি।’ গরুর মাংসের কথা উঠতেই আক্ষেপ ঝরে তার কণ্ঠে। বলেন, ‘গরুর মাংস আমাদের জন্য না, এটা বড় লোকদের খাবার। আমার আয় যদি ছয়-সাতশ টাকা হয় আর গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা, তাহলে এক কেজি গরুর মাংস কিনলে চাল-তেল কিনব কিভাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে মাসে দুইবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন একবারও পারি না। আমাদের মতো মানুষের এখন দুই-বেলা চাল, ডাল কেনাই কঠিন।’ তার ভাষ্য, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য চাল, ডাল, তেল, আলু—এই চারটি জিনিসের দাম কমলেই আমরা খুশি। আমাদের আর কিছু লাগবে না।’ সংসারের টানাপোড়েনের সবচেয়ে নির্মম চিত্র উঠে আসে এক মধ্যবয়স্ক বাবার কথায়। পাঁচ বছর আগেও সীমিত আয়ে সংসার চালানো তুলনামূলক সহজ ছিল। এখন রান্নার জ্বালানি জোগাড় করতেও বাড়তি খরচ হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় কখনো কাঠের চুলা, কখনো কেরোসিন ব্যবহার করতে হয়। তিনি বলেন, ‘আগে সীমিত আয়েও চলতে পারতাম। এখন মরা ছাড়া বাঁচার পথ নাই।’ সন্তানের খাবারের প্রসঙ্গ তুলতেই অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, ‘সন্তানের দুধ কেনার টাকা নেই। সাবু জ্বাল দিয়ে খাওয়াতে হয়। বাচ্চা খেতে চায় না। সন্তানদের কিছুই দিতে পারিনি।’ সংসারের ব্যয় সামলাতে স্ত্রীকেও কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন সেলাইয়ের কাজ করা মিলন। তিনি জানান, ‘বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না। সবকিছুর দাম অনেক বেড়েছে। বাধ্য হয়ে বউকেও বাইরে কাজে পাঠিয়েছি। কী করব, তিনটা সন্তান আছে, সংসার তো চালাতে হবে।’ সাধারণ মানুষের এমন দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাড়তি দ্রব্যমূল্যের চাপ সামাল দেওয়ার সামর্থ্য সচ্ছল মানুষের থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস না পেলেও বিল দিচ্ছেন। টাকা দিয়েও সেবা না পাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, উৎপাদন পর্যায় থেকে পণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল ও পরিবহন খরচের কারণে দাম বাড়ে। চালের দাম জাত ও মানভেদে ভিন্ন। ডিমের দামও বর্তমানে ক্রেতাদের নাগালে রয়েছে। অন্যদিকে ভোজ্যতেলের দাম সরকার নির্ধারণ করছে। বাজারে চাল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও অধিদপ্তর নজর রাখছে।