সহযোগী সাক্ষী হিসেবে দেওয়া ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউলের নির্দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে ‘হত্যা ও লাশ গুম’ করার বিবরণ উঠে এসেছে।
রোববার জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেওয়া এই সাক্ষী নিজেকে তার সাবেক ‘রানার’ হিসেবে পরিচয় দেন।
বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এর আগে গত ৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। সেখানে তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগে শতাধিক গুম-খুনের বিবরণ তুলে ধরা হয়।
প্রথম অভিযোগে ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিন হত্যা; দ্বিতীয়টিতে বরগুনার চরদুয়ানী খাল মোহনায় ৫০ জনকে হত্যা এবং তৃতীয়টিতে সুন্দরবন অঞ্চলে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে আরও ৫০ জনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে।
গত ১৭ ডিসেম্বর এই তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১।
দীর্ঘ জবানবন্দিতে এই সেনা সদস্য তার যোগদান এবং জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ হিসেবে কাজ করার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তার ধারাবাহিক বর্ণনার এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ও গুম করার বিষয়টি আসেন।
ইমরুল বলেন, “২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে তুলবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। ‘টার্গেট’ কখন আসবে তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে, ‘টার্গেট’ আসবে না।”
পরে সেখান থেকে জিয়াকে বাসায় নামিয়ে দেন এবং পরের দিন সকালে ইমরুল নয় দিনের ছুটিতে যান বলে দাবি করেন তিনি।
“ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভার ব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। নয় দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি।”
প্রমাণ নষ্ট করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি যে, অস্ত্রের ‘ইন-আউট রেজিস্টার’ এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত ‘ফল ইন’ (লাইনে দাঁড়ানোর পর নাম ডেকে উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া) সকাল ৯টায় হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭টা ‘ফল ইন’ হতো এবং জিয়া স্যার পরপর বেশ কয়েক দিন ‘ফল ইনের’ সময় এসেছিলেন।”
সহযোগী এই সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেন, জিয়া এক দিন ফোনে কোনো একজনের সাথে কথা বলছিলেন।
“ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল আসলে স্যার বলেন- তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন। জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপর প্রান্তে কি বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন-স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে ‘গলফ’ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।”
প্রথম লাশ গুমের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, “রানার হিসেবে যোগদান করার ২০/২৫ দিন পরে রাত আনুমানিক ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন-কই তুই? আমি বলি-আমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র্যাব-১ এর (দপ্তর) সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি দুটি কালো রংয়ের হায়েস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ওই গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন।
“গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পিছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র্যাব-১ এর সিও রাশেদ স্যার এবং ক্যাপ্টেন কাউসার স্যার ছিলেন। আরও দুইজন ছিলেন আমি তাদেরকে চিনি না।”
রাত আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে সেখান থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন রোড (উত্তরা) হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে কিছুদূরে একটি রেলক্রসিংয়ে যাওয়ার কথা বলেন ইমরুল।
রাস্তার দুই পাশে গাছ-গাছালি থাকার বর্ণনা দিয়ে সেখানে তাদের গাড়িগুলো থামে এবং সেখানে লাশ ফেলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সেই বিবরণ দিয়ে এই সাক্ষী বলেন, “তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ইমরুল ডিকিটা খোল, বস্তাটা বের কর। আমি ডিকি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না, বরং একটা ‘ডেড বডি’ ছিল এবং ঠাণ্ডা ছিল।”
লাশটি রেললাইনের পাশে নিয়ে জিয়াউল যেখানে দাঁড়ানো ছিলেন, সেখানে রেখে গাড়িতে ফিরে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তখন দেখি যে, জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেল লাইনের উপরে রাখেন এবং তারা গাড়িতে ফিরে আসেন। তার কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়। তারপর আমরা ওখান থেকে চলে আসি।”
সুন্দরবনে সাজানো অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে সুন্দরবন অপারেশনে কয়েকবার যাই। তার মধ্যে একটি অপারেশনের কথা আমার মনে আছে। আমরা বোটে করে সুন্দরবন অপারেশনস্থলে যাই। ওই সময় সেখানে নদীর ভাটা ছিল। আমাদের সাথে র্যাব-৮ এর সদস্যরাও ছিলেন। আমাদের বোট থামার পর জঙ্গলের ভিতর থেকে দুই/তিন রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদেরকে ‘ফায়ার’ করার নির্দেশ দেওয়া হলে আমরা র্যাব ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা এবং র্যাব-৮ এর সদস্যরা ‘ফায়ার’ করি।”
এক পর্যায়ে গুলিবর্ষণ থামাতে নির্দেশ দেওয়ার কথা তুলে ধরে ইমরুল বলেন, “সেখানে জিয়াউল আহসান স্যার, র্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার সদস্যরাও উপস্থিত ছিল।
“আমরা জঙ্গলের ভিতরের দিকে যাই এবং দেখি সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই/তিনটি লাশ পড়ে আছে।”
ঘটনাস্থলে বর্ণনা দিয়ে তিনি দাবি করেন, “এই অপারেশনটি আমার কাছে একটি সাজানো অপারেশন মনে হয়েছিল।”
বিডিআর সদস্যদের হত্যার বিষয়ে এই সহযোগী সাক্ষী বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য। ওই সময় জিয়াউল আহসান স্যার ৮/১০ জন লোককে হত্যা করেন। যাদেরকে হত্যা করেছেন তারা বিডিআর সদস্য ছিল এবং আমাদের অফিসারদের এরা হত্যা করেছে মর্মে জিয়া স্যার বলেছেন।”
হত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “এই লোকগুলোকে দুইভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ইনজেকশন দিয়ে এবং আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের নিকট আর্মি ক্যাম্প আছে, তার ভিতর দিয়ে নদীতে নিয়ে সিমেন্ট ভরা বস্তা বেঁধে বোটে করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
“যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে তাকে একটি বস্তা নিচে রাখা হতো, তার ওপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বাধা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।”
উত্তরায় সাজানো ক্রসফায়ারের বর্ণনায় তিনি বলেন, “২০১১ সালের রমজান মাসের শেষের দিকে আমি লাইনে ছিলাম। একদিন ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে আহসান স্যার ফোন দিয়ে আমাকে ক্যামেরা নিয়ে উত্তরা নর্থ টাওয়ারের ওখানে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে আমি স্যারকে পাইনি।
“একটু পরে জিয়া স্যার ফোন দিয়ে আমাকে আরেকটু সামনে যেতে বলেন। ওইদিন আমি ইফতার করতে পারিনি। নর্থ টাওয়ার থেকে সামনে গিয়ে দেখি চারজন লোককে ক্রস ফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যারা নাকি ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই অপারেশনটা সাজানো ছিল।”
পোস্তগোলায় ১১ জনকে একত্রে হত্যার বর্ণনায় তিনি বলেন, “২০১২ সালের প্রথমের দিকে তিনটি মাইক্রোতে করে আমরা ১১ জন আসামি নিয়ে জিয়াউল স্যারের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ওখানে যাই। সেখানে ওই ১১ জন আসামিকে বোটে উঠানো হয়। জিয়া স্যার কাছে ডাকলে গিয়ে দেখি এই বোটটি সেই বোট যেটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিল।”
সেখানে হঠাৎ করে একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার কথা তুলে ধরে ইমরুল দাবি করেন, “জিয়া স্যার আমাকে বলেন- ইমরুল ধর ধর। স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়ে উক্ত আসামিকে ধরি। রশির সাহায্যে আমাকে এবং ওই আসামিকে বোটে উঠানো হয়। ওই সময় অন্ধকার ছিল। আমি আসামিকে চিনতে পারিনি। তবে তার বয়স আনুমানিক ২৫/২৬ বছর হবে।
“বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে পূর্বের ন্যায় এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।”
ওই অপারেশনে জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ, কমান্ডার সোহায়েল, এডিজি (অপস) মুজিব ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
জাফলং বর্ডারে হস্তান্তর ও হত্যার বিষয়ে ইমরুল বলেন, “২০১২ সালের মাঝামাঝি র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে দুইজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা এবং মাথায় ‘জমটুপি’ পরানো ছিল। আনুমানিক রাত ২টা বা আড়াইটার দিকে আমরা সেখানে পৌছাই।
“সেখানে ভারত থেকে দুজন আসামিকে সাধারণ পোশাকে চার/পাঁচজন লোক এসে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি।”
ভারতের যে দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাদের পরে রাস্তায় পৃথক দুটি স্থানে হত্যা করার বর্ণনা দেন জিয়াউল আহসানের সাবেক এই ‘রানার’। তার দাবি, দুইজনকেই হত্যা করেছেন জিয়াউল আহসান।
আরেকজনকে গুলি করে হত্যার কথা জবানবন্দিতে তুলে ধরে ইমরুল বলেন, “র্যাব-৪ এর ‘সেইফ হাউজ’ থেকে দুজন আসামিকে দুইটা মাইক্রোতে নেওয়া হয়। আনুমানিক আধাঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়।”
ট্রাইব্যুনালের এক প্রশ্নে সাক্ষী বলেন, “গাড়ি দুটি থামানো হয়। আমি যে গাড়িতে ছিলাম সে গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। আমি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
“জিয়াউল আহসান স্যার ওই আসামিকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন এবং হত্যা করেন। ওই আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সকলে হাসাহাসি করছিল।”
ওই আসামির হাত এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। হত্যা করার পর জিয়ার নির্দেশে গামছাগুলো খুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসার কথা বলেন তিনি।
এরপর জিয়াউল আহসান তাদের গাড়ি নিয়ে র্যাব-৪ এর দপ্তরে চলে যেতে বলেন এবং তিনি অপর আসামিকে নিয়ে চলে যান, এ কথা তুলে ধরে ইমরুল জবানবন্দিতে বলেন, “জিয়া স্যার যখন র্যাব-৪ এ ফেরত আসেন তখন ওই আসামি তার সাথে ছিল না। কিছু কিছু অপারেশন স্যার আমার অগোচরে করতেন। যেটাতে তিনি প্রয়োজন মনে করতেন সেটাতে আমাকে নিয়ে যেতেন।”
কাঁচপুর সেতুতে হত্যার ঘটনা তুলে ধরে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন- র্যাব-১ সামনে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়ানো আছে সেখানে গিয়ে ওই গাড়িতে ওঠো। আমি স্যারের আদেশ শুনে গাড়িতে গিয়ে ওঠি এবং দেখতে পাই মেজর নওশাদ স্যার গাড়িতে বসা আছেন। দুইজন আসামি (পরে বলেন) ‘টার্গেট’ জমটুপি পরা অবস্থায় গাড়ির ভেতরে বসে আছে।
“কিছুক্ষণ পরে জিয়াউল আহসান স্যার রাস্তার অপর পাশের একটি প্রাইভেট কারে এসে নামেন তারপর রাস্তা পার হয়ে আমাদের গাড়িতে এসে ওঠেন। আমরা যাত্রা শুরু করে টঙ্গী হয়ে, আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের উপরে গিয়ে দাঁড়াই। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন-ইমরুল নামো। আমি স্যারের আদেশ অনুযায়ী গাড়ির পাশেই দাঁড়াই গার্ড দেওয়ার জন্য।”
ইমরুল বলেন, “তখন জিয়া স্যার একজন ‘টার্গেট’কে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পর পর দুটি গুলি করেন এবং ব্রিজ থেকে যখন ফেলে দেন, তখন তার লুঙ্গি খুলে দেন।”
তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখান থেকে ওই ব্যক্তির নদীর পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল দাবি করে এই সাক্ষী বলেন, “তখন একইভাবে মেজর নওশাদ স্যার পরবর্তী টার্গেটকেও গুলি করে হত্যা করেন এবং লুঙ্গি খুলে পানিতে ফেলে দেন।”
বরিশালে নিয়ে হত্যা করা হতো দাবি করে জিয়াউল আহসানের সাবেক ‘রানার’ বলেন, “আমি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে বরিশালে গিয়েছিলাম এবং র্যাব-৮ এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চরদুয়ানী বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনও দুইজন, কখনও তিনজন, কখনও চারজন ‘টার্গেট’কে পূর্বের ন্যায় হত্যা করে, অর্থাৎ সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো।
“বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে ওই টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো।”
তিনি বলেন, “জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে আমি এক বছর তিন/চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসাবে থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ্য করি যে, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এই বিভিন্ন পন্থার মধ্যে ছিল গুলি এবং ইঞ্জেকশন।”
আগের ঘটনা ছাড়াও আরো ১০/১২ জন ব্যক্তিকে ইঞ্জেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে এই সাক্ষী বলেন, “এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনও টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনও গাড়িতে সংঘটিত হতো।”
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে কান্না করতে থাকেন ইমরুল কায়েস।
এই পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি রানার হিসাবে তার সাথে দেখেছি তিনি ওই সময়কালে ১৫০/২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন।”
তদন্তকারী কর্মকর্তা একাধিকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমানে আমি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত আছি। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই। এই আমার জবানবন্দি।”
সাক্ষীর জবানবন্দির পর ব্রিফিংয়ে ইলিয়াস আলীকে গুম করার ঘটনায় ব্যবহৃত ‘গলফ’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই গলফটা শব্দটা প্রতীকী অর্থে তারা ব্যবহার করেছে। গলফ অর্থ হল কাউকে একটা গর্তে ফেলে দেওয়া।”
ইলিয়াস আলীকে অপহরণের পর প্রমাণ নষ্ট করার বিষয়ে তিনি বলেন, “র্যাব হেডকোয়ার্টারের যে ভিডিও ফুটেজ—এই সবকিছু জিয়াউল আহসান ধ্বংস করে দিয়েছেন, নষ্ট করে ফেলেছেন। এই সাক্ষ্যটা যাতে না থাকে। এভিডেন্সটাকে নষ্ট করবার জন্যে ‘ইনস অ্যান্ড আউট রেজিস্টার’ এবং সকল ফুটেজ জিয়াউল আহসান গায়েব করে দিয়েছেন।
“বোঝা গেল যে বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়েই তার এই কিলিং মিশনটার নেটওয়ার্কটা ছিল।”
আদালতে জিয়াউল আহসানের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই জিয়াউল আহসান আজকে কোর্টে উনি উপস্থিত থেকে এই সমস্ত সাক্ষ্যটা শুনেছেন। আর যতক্ষণ তিনি শুনেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি হাসছিলেন, ‘দাঁত খিলিয়ে খিলিয়ে’ তিনি হাসছিলেন। তিনি বেশ উপভোগ করছিলেন যে তার এই কুকর্মের যখন বর্ণনা সাক্ষী দিচ্ছিলেন, তার কাছে কোনো অনুতপ্ত মনে হয় নাই।”
সাক্ষী ইমরুল কায়েস সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও কেন তাকে আসামি করা হয়নি এমন প্রশ্নে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “সবগুলোর মধ্যেই তার ভূমিকা হল, তিনি জিয়াউল আহসানের নির্দেশে, তিনি ওই ভুক্তভোগীগুলোর লাশ ‘ডিসপোজাল’ করেছেন। তো সেই কারণে এই সাক্ষীকে আমরা ‘অ্যাকমপ্লিস উইটনেস’ হিসেবে আমরা ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছি।
“তাকে যদি আজকে আমরা যদি এই সাক্ষীকে না পেতাম, তাহলে আজকের এই ঘটনার বর্ণনা কে দিত?"
১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল আহসান ২০০৯ সালে র্যাবে যোগ দেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক এবং সবশেষ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত এবং ১৬ অগাস্ট গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রথমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিউ মার্কেট থানার একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও, পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে জুলাই-অগাস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
এছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে জিয়াউল এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক। ইতোমধ্যে আদালতের নির্দেশে তার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ফ্ল্যাট ও জমি জব্দ করা হয়েছে।