গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা বা ‘পিস প্ল্যান’ অনুসরণ করে গাজার জন্য একটি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক কাঠামোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব দ্য গাজা স্ট্রিপ’ (এনসিএজি)।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা বিশেষ শর্তের ভিত্তিতেই ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়। এনসিএজি সরকারের নির্বাহী কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন প্রকৌশলী আলী আবদেল হামিদ শাথ। তিনি পশ্চিম তীরের একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং পূর্বে ক্ষমতাসীন ফাত্তাহ বা প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটি-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের উপ-পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কমিটির প্রধান ছাড়া বাকি ১৪ জন সদস্যের নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, তারা সবাই গাজার স্থানীয় বাসিন্দা এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী। এই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ মিসর ও কাতার।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে, গাজার চূড়ান্ত শাসনক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্ব থাকবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি বিশেষ পরিষদের হাতে। এই বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে। তার নেতৃত্বাধীন বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনসিএজি সরকার পরিচালিত হবে।
‘বোর্ড অব পিস’-এর নির্বাহী প্রতিনিধি হিসেবে মিসরে অবস্থান করবেন বুলগেরিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাই ম্লাদেনভ। ইতোমধ্যে এনসিএজি প্রধান আলী আবদেল হামিদ শাথ কায়রোতে তার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন।
সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, এনসিএজি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এর নিম্নপর্যায়ে পশ্চিম তীরের প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটির প্রশাসনিক প্রভাব বজায় থাকবে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গণহত্যাকারী ইসরাইল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মুখে কঠিন এক চাল দিয়েছে ইরান। বিশ্বের জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এতে বিশ্ববাজারে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এখন তারা এই সমুদ্রপথে শত্রু রাষ্ট্রের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে টোল আদায় শুরু করেছে। যারা তেহরানের অনুমতি নিয়ে হরমুজে ঢুকছে তারাই শুধু তেল নিয়ে আরব সাগরে বেরিয়ে আসতে পারছে, অন্যরা আক্রান্ত হচ্ছে। এতে এই পানিপথে চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পরও জ্বালানির দাম বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যে সমুদ্রপথ দিয়ে পার হয়, সেই পথটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের ফলাফল। কারণ, চলমান যুদ্ধে এই সমুদ্রপথকে ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। বর্তমানে এই সরু পানিপথের আশেপাশে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা ইরানের উত্তর পাশে এবং ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ পাশের মাঝে অবস্থিত। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, বিশ্বের এই একক গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা শুল্ক আদায়ের জন্য দেশটির পার্লামেন্ট একটি আইন পাসের চেষ্টা করছে। ইরানের তসনিম এবং ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে যে একটি খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির লিগ্যাল টিমের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইরানকে অবশ্যই ফি বা শুল্ক আদায় করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি খুবই স্বাভাবিক। অন্যান্য করিডোর বা স্থলপথের মতোই যখন পণ্য একটি দেশের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শুল্ক দিতে হয়। হরমুজ প্রণালিও একটি করিডোর। আমরা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, এবং জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলো আমাদের শুল্ক দেবে এটাই স্বাভাবিক।’ তবে এই অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইতোমধ্যে সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে বলে বুধবার নামী শিপিং জার্নাল ‘লয়েডস লিস্ট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর আগে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে যে, ইরান প্রতি জাহাজ থেকে দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ ডলার করে টোল আদায় করছে। একবারের যাত্রায় এই পরিমাণ ফি দিতে হচ্ছে জ্বালানিবাহী জাহাজ বা ট্যাঙ্কারগুলোকে। কেন ইরান টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরানের আঞ্চলিক পানিসীমা এই প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের শিকার হওয়ার পর থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের বাকি অংশে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে নিয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এতে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি রেশনিং করতে এবং শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। টোল আদায়ের প্রক্রিয়াটি কী যদিও ইরানি পার্লামেন্ট এখনও টোল সংক্রান্ত আইন পাস করেনি, ‘লয়েডস লিস্ট’ বুধবার জানিয়েছে যে, গত দুই সপ্তাহে প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী ২৬টি জাহাজ আইআরজিসির ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থার অধীনে একটি পূর্ব-অনুমোদিত রুট অনুসরণ করেছে, যার জন্য জাহাজ অপারেটরদের একটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই জাহাজগুলো চলাচলের সময় তাদের এআইএস সচল রাখেনি। নতুন এই ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো লয়েডস লিস্টকে জানিয়েছে, প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজ অপারেটরদেরকে প্রথমে আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং জাহাজের সব বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে নথিপত্র, আইএমও নম্বর, কী পণ্য বহন করা হচ্ছে, ক্রুদের নাম এবং জাহাজের গন্তব্যস্থল। এই মধ্যস্থতাকারীরা তখন তথ্যগুলো আইআরজিসির নৌ কমান্ডের কাছে জমা দেয়, যারা তথ্যগুলো যাচাই করে। যদি জাহাজটি এই স্ক্রিনিংয়ে উত্তীর্ণ হয়, তবে আইআরজিসি একটি ক্লিয়ারেন্স কোড এবং কোন রুট দিয়ে জাহাজটি যাবে তার নির্দেশনা দেয়। একবার জাহাজটি প্রণালিতে প্রবেশ করলে আইআরজিসি কমান্ডাররা ভিএইচএফ রেডিওর মাধ্যমে উচ্চস্বরে জাহাজের ক্লিয়ারেন্স কোড জানতে চান। জাহাজটি উত্তর দেয় এবং অনুমতি পেলে ইরানের একটি বোট এসে জাহাজটিকে লারাক দ্বীপের আশেপাশে তাদের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে পাহারা দিয়ে পার করে দেয়। আর যদি কোনও জাহাজ আইআরজিসির স্ক্রিনিং টেস্টে উত্তীর্ণ না হয়, তবে তাদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। গত মঙ্গলবার আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে জানিয়েছিলেন যে, ‘সেলেন’ নামে একটি কনটেইনার জাহাজকে ‘আইনি প্রোটোকল না মানা এবং অনুমতি না থাকার কারণে’ হরমুজ প্রণালি থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘এই জলপথ দিয়ে যে কোনো জাহাজ পারাপারের জন্য ইরানের মেরিটাইম অথরিটির সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় প্রয়োজন।’ ইসরাইল বৃহস্পতিবার দাবি করেছে যে, তারা বুধবার রাতে এক বিমান হামলায় তাংসিরিসহ নৌ-কমান্ডের ‘উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের’ হত্যা করেছে। ইরান অবশ্য এ বিষয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেনি। কারা এই টোল পরিশোধ করছে ইরান বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো বাদে বাকি সবার জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত। গত মঙ্গলবার আইএমও-র ১৭৬টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান জানায়: ‘মিত্র ভাবাপন্ন জাহাজগুলো, যার মধ্যে অন্য রাষ্ট্রগুলোর মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট জাহাজও রয়েছে, তারা যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ না নেয় বা সমর্থন না দেয় এবং ঘোষিত নিরাপত্তা বিধিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলে, তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।’ লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত মালয়েশিয়া, চীন, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের কিছু জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্তত দুটি জাহাজ চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ টোল পরিশোধ করেছে। লয়েডস লিস্ট সোমবার জানায় যে, একটি ‘পারাপারের মধ্যস্থতা করেছে একটি চীনা মেরিটাইম সার্ভিস কোম্পানি, যারা ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পেমেন্টটিও হ্যান্ডেল করেছে।’ তবে জাহাজগুলো ঠিক কত অর্থ দিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, ভারত সরকার দাবি করেছে যে, তাদের পক্ষ থেকে ইরানকে কোনও অর্থ দেওয়া হয়নি। ভারতের বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই। সেখানে চলাচলের স্বাধীনতা রয়েছে। যেহেতু প্রণালিটি সরু, তাই শুধু প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথগুলো চিহ্নিত করা থাকে যা শিপিং লাইনগুলোকে মেনে চলতে হয়। এটি চার্টারার এবং শিপিং কোম্পানির সিদ্ধান্ত যে তারা কখন চলবে বা চলবে না।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শুক্রবার (২৭ মার্চ) এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, তারা বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইসরাইলের বিভিন্ন স্থান এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরএনএ এবং ফারস নিউজ এজেন্সি জানায়, এই হামলায় দূরপাল্লার ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি অত্যন্ত বিধ্বংসী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইন। বিশেষ করে বাহরাইনে মার্কিন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর পূর্বনির্ধারিত সময়সীমা দ্বিতীয়বারের মতো পিছিয়ে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনার অনুরোধ আসায় এবং শান্তি আলোচনা 'খুব ভালোভাবে' এগিয়ে চলায় তিনি এই ১০ দিনের বিরতি দিয়েছেন। ট্রাম্প আরও জানান, আলোচনার সদিচ্ছা দেখাতে ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১০টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানকে ১৫ দফা সংবলিত একটি 'অ্যাকশন লিস্ট' পাঠানো হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক জবাব তেহরান ইতিমধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে ইরান ও হিজবুল্লাহর ওপর হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে হবে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানে কিছুটা সুর নরম করতে দেখা গেলেও হোয়াইট হাউসের বৈঠকে তিনি ইরানকে 'পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার' হুমকি দিতে ছাড়েননি। এমনকি ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে এসে ইসরাইলের ভেতরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই সরকার তাদের একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানি নৌবাহিনীর কমান্ডার আলী রেজা তাংসিরিসহ বেশ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাল্টা জবাবে ইরানের ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে দুইজন নিহত হয়েছে এবং সৌদি আরব ও কুয়েতেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে দুই পক্ষই আলোচনার টেবিলে থাকলেও মাঠপর্যায়ে পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রী জানিয়েছেন, রাশিয়া থেকে ছেড়ে আসা একটি তুর্কি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) কৃষ্ণসাগরে ইস্তাম্বুলের বসফরাস প্রণালির কাছে একটি ড্রোন আঘাত হেনেছে, যার ফলে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। পরিবহন মন্ত্রী আব্দুলকাদির উরালোলু সম্প্রচারমাধ্যম 'কানাল ২৪'-কে বলেন, রুশ বন্দর থেকে আসা বা যাওয়ার পথে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজগুলোর ওপর গত কয়েক মাসে যে কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে, এটি তার মধ্যে একটি। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ভোরে ঘটে। তিনি জানান, জাহাজের ২৭ ক্রু সদস্যই নিরাপদ আছেন। কোস্টগার্ডকে 'আলতুরা' নামক ওই জাহাজের কাছে পাঠানো হয়েছে। জাহাজটি বসফরাস প্রণালি থেকে প্রায় ১৮ নটিক্যাল মাইল (৩৩ কিমি) দূরে অবস্থান করছিল। বসফরাস প্রণালি কৃষ্ণসাগরকে মারমারা ও ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী পণ্য পরিবহনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। উরালোলু বলেন, তুর্কি জলসীমার ঠিক বাইরে হওয়া এই হামলার লক্ষ্য ছিল সম্ভবত সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ওই জাহাজটির ইঞ্জিন রুম অকেজো করে দেওয়া, যা রাশিয়ার তেল বহন করছিল। শিপ-ট্র্যাকিং এবং রিফিনিটিভ এআইএস তথ্য অনুযায়ী, আলতুরা জাহাজটি রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দর থেকে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে রওনা হয়েছিল এবং এটি প্রায় পূর্ণ বোঝাই ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেন জাহাজটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। কৃষ্ণসাগরের অংশীদার হিসেবে রাশিয়া ও ইউক্রেন গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধে লিপ্ত, এ ছাড়া সেখানে আরও কয়েকটি দেশের সীমান্ত রয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে ইউক্রেনীয় ড্রোন কৃষ্ণসাগরে রুশ অভিমুখী ট্যাঙ্কারে আঘাত হানার পর শিপিং ইন্স্যুরেন্স রেট (বীমা খরচ) বেড়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় মস্কো প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছিল এবং ন্যাটো সদস্য তুরস্ক পরিস্থিতি শান্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছিল। বৃহস্পতিবারের এই হামলার বিষয়ে মস্কো বা কিয়েভ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রিফিনিটিভের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজটির নিবন্ধিত মালিক চীনভিত্তিক 'সি গ্রেস শিপিং লিমিটেড' এবং এর ব্যবস্থাপক হলো তুরস্কভিত্তিক 'পেরগামন দেনিজিলিক'। বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে পেরগামনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। এর আগে সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভি জানিয়েছিল যে, জাহাজের ব্রিজে বিস্ফোরণ হয়েছে এবং ইঞ্জিন রুমে পানি ঢুকে পড়েছে, যার ফলে ক্রুরা সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।