জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্ব পালন করা বিতর্কিত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের নেওয়া সেই পদক্ষেপেই অটল বর্তমানে সরকার।
এরই অংশ হিসেবে গত ৩ মে পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ডিআইজি। এর আগে গত ২২ এপ্রিল পুলিশের ১১ জন ডিআইজি এবং দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরো ৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তারা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও দপ্তরে দায়িত্বরত ও সংযুক্ত ছিলেন।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো নিয়ে পুলিশে আলোচনা চলছে; আর কোনো কোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। জানা যায়, যেসব পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা এখন আতঙ্কে আছেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়ের আরো ৫৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে। এর মধ্যে ১৩ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩১ জন এসপি এবং ৯ জন এএসপি রয়েছেন। এসব এসপির মধ্যে আওয়ামী সরকারের ডামি ও রাতের ভোটে দায়িত্ব পালন করেন অনেকে। এছাড়া বিগত সময়ে এইসব পুলিশ কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল। তারা বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত আছেন।
সূত্র জানায়, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী চাকরির বয়স থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর দিয়ে থাকে সরকার। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যে কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার ওই কর্মচারীকে ‘জনস্বার্থে’ যেকোনো সময় অবসরে পাঠাতে পারে। এ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অতিরিক্ত আইজিপি জানান, চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী গত দেড় বছরে কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়। আরো একাধিক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিষয়টি জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা জানান, বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন হলে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে। যাচাই-বাছাই করে পদায়ন ও পদোন্নতি দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগার হয়ে অপকর্ম করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পুলিশের মধ্যে দলীয়করণ করলে পুরো বাহিনীর বদনাম হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী সরকারের সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনে অতিউৎসাহী ছিলেন। তারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর অযাচিত দমনপীড়ন চালিয়েছেন। এদের কিছু কর্মকর্তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পদায়ন হওয়ায় খোদ পুলিশের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
সূত্র জানায়, মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ৫ মে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা আছে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন । ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী সরকারের পতন হলে মাহবুবের কর্মকাণ্ড সামনে আসে।
দুটি হত্যা মামলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার যুবদল নেতা মিজান হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মিজান। এ ঘটনায় নিহত যুবদল নেতার বাবা আইনাল হক ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার ১০ নম্বর আসামি মাহবুব আলম খান।
এছাড়া ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে আরো একজন ভুক্তভোগী বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় অপর হত্যা মামলাটি করেন। মাহবুব ওই মামলায় ৩ নম্বর আসামি।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ৩১ জুলাই বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতি নূরে আলম। এ ঘটনায় ২০২২ সালের ৪ আগস্ট ভোলা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আরমান হোসেনসহ ৩৬ পুলিশ সদস্যের নামে হত্যা মামলা হয়। সেই আরমানকে সম্প্রতি কক্সবাজারের রামু থানার ওসি হিসেবে পদায়নের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে আর সেখানে পদায়ন করা হয়নি।
সূত্র জানায়, বিতর্কিত এসব কর্মকর্তার পদায়নে পুলিশ প্রশাসনে ঝড় ওঠে। এসব কর্মকর্তা যাতে আবার বাহিনীটির গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন না পান, এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো প্রায় ৫৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাবে বলে জানা গেছে। পুলিশের ১১৪ কর্মকর্তা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বর্তমানে সংযুক্ত আছেন। এদের বড় অংশকেই অবসরে পাঠানোর চিন্তা রয়েছে সরকারের।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার পুলিশে পেশাদার ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ পেশাদার কর্মকর্তা আগে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকের আওয়ামী আমলে পদোন্নতি না পেয়ে মনোবল ভেঙে গেছে। প্রায় সোয়া দুই মাস আগে ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাত আলী পদত্যাগ করার পর মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়। আস্থাভাজন পুলিশ কর্মকর্তা সংকটের কারণে এ বিলম্ব হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, এ সংকট শিগগির কেটে যাবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে আগামীকাল রোববার মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই। আজ শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, গতকাল শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আগামীকাল মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দও শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি মেনে নিয়েছেন। বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধিও দেওয়া হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়েও বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া বেতন পরিশোধের উদ্যোগ নেবেন। মন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন ও বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ভাঙচুর বা কারখানা বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। এতে গার্মেন্টস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করলেও বাইরে থেকে কিছু লোক এসে শ্রমিকদের উত্তেজিত করা চেষ্টা করছে। প্রকৃত শ্রমিক কারা এবং কারা আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে, তা গণমাধ্যমকে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আগামী ৭ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হবে। ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে মালিকপক্ষ অর্থ পাবে না। ফলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তিনি শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের দাবি পূরণে সরকার ও মালিকপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। তাই গার্মেন্টস শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অনুষ্ঠানের সঞ্চলনা করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার। এসময় বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজেএমইএ’র সহসভাপতি মিজানুর রহমান, রেজওয়ান সেলিমসহ অন্যান্য প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানী ঢাকার বায়ুর মান আজও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে বিশ্বের ১২৫টি শহরের মধ্যে বায়ুদূষণের তালিকায় ১৩তম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এ সময় শহরটির বায়ুমান সূচক (একিউআই) ছিল ১২৭, যা সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের হংহু শহর, যার একিউআই স্কোর ১৬৪। ১৬২ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি। এ ছাড়া চীনের সাংহাই ১৬২ স্কোর নিয়ে চতুর্থ এবং পাকিস্তানের করাচি ১৫৮ স্কোর নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। তালিকার শীর্ষ দশে থাকা অন্যান্য শহরের বায়ুমান সূচক ছিল ৯৯ থেকে ১৫৪-এর মধ্যে। বায়ুমানের সূচক অনুযায়ী, একিউআই স্কোর ০ থেকে ৫০ হলে বাতাসের মান ভালো বলে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর মাঝারি মান নির্দেশ করে। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং ১৫১ থেকে ২০০ স্কোর সাধারণভাবে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সূচকে ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরকে খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। বায়ুদূষণের প্রভাবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। বায়ুর মান খারাপ থাকলে এসব ব্যক্তিকে বাইরে চলাফেরা সীমিত রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো চূড়ান্ত বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বা সরকারি ঋণ নয়। জাপানের বেসরকারি খাতের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ হিসেবে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য জাপানের একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে বলেও জানান তিনি। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু, ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় জাপানের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জাপানের পাঁচ হাজার কোটি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে চলমান প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এবং কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআইজি-বি উদ্যোগ বাংলাদেশ ও জাপান দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিআইজি-বি উদ্যোগকে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে এই উদ্যোগের আওতায় শিল্পায়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে আলোচনা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কোনো তৃতীয় দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। জাপানের বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং, মারুবেনি করপোরেশন, মিতসুবিশি করপোরেশন এবং টয়োটা সুশো করপোরেশন। আলোচনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক উৎপাদনশিল্প ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ কর্মী তৈরি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিষয়েও মতবিনিময় হয়। বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনে টয়োটার আগ্রহ জাপান সফরের শেষ দিন ২৯ অক্টোবর নাগোয়া শহরে টয়োটার একটি উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিদর্শনকালে টয়োটার কর্মকর্তারা বাংলাদেশে গাড়ি ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুৎসু এলাকায় জেরা (জেইআরএ)-এর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চিবা প্রিফেকচারের একটি লজিস্টিকস হাব ঘুরে দেখেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, এসব স্থাপনা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। বিভিন্ন খাতে ছয়টি সহযোগিতা দলিল সই চার দিনের সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলে জানান হুমায়ুন কবির। এসব দলিলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু সহযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া নগর উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানেও জাপানের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এই সফরে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কেবল বৈদেশিক ঋণ বা উন্নয়ন সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং যৌথ অর্থনৈতিক সুযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে যেকোনো বিনিয়োগ ও অর্থায়ন প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয়, অর্থনৈতিক সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করা হবে। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সরকার। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি পরবর্তী আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।