আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ভোটগ্রহণ হবে বাংলাদেশে। আসন্ন এ নির্বাচনকে বিশ্বের প্রথম জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, ২০০৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেৃতত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। তবে এ নির্বাচনগুলো হয় বিরোধী দলগুলো বয়কট করেছে কিংবা অংশ নিলেও তা ছিল খুব সীমিত মাত্রায়।
কারণ, দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে বিরোধী দলগুলোকে দমন-পীড়নে রাখা হতো। শীর্ষ নেতাদের ব্যাপক গ্রেপ্তার ও তাদের ওপর দমন-পীড়নের কারণে মাঠে নামতে পারেনি তারা। তবে আসন্ন বৃহস্পতিবারের জাতীয় নির্বাচনে সেই চিত্র পাল্টাতে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তার সরকারের পতনের পেছনে ভূমিকা রাখা তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে, ২০০৯ সালের পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। ওই বছর থেকেই শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসন।
এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–কে। তবে ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, ৩০ বছরের কম বয়সী জেন-জি কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার দল সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যদি স্পষ্ট রায় আসে, তবে তা ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত, বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও ভারতের সম্পর্কের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। শেখ হাসিনা ভারতপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এর ফলে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কিছুটা কমেছে, আর সেই শূন্যতা পূরণ করছে চীন।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী রয়টার্সকে বলেন, ‘জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনো বিপুলসংখ্যক ভোটার অনিশ্চিত। নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে জেন-জি ভোটাররা, যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।’
দেশজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার-ব্যানারে ভরা রাজপথ। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীকও রয়েছে চোখে পড়ার মতো।
জরিপ বলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসতে পারে, যদিও তারা সরকার গঠন নাও করতে পারে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এই দলটির পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তাদের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ঢাকাভিত্তিক দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, এরপর রয়েছে মূল্যস্ফীতি। ধর্মীয় বিষয়ের চেয়ে অর্থনীতি ও সুশাসনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা।
প্রথমবারের ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব রয়টার্সকে বলেন, ‘মানুষ ভোট দিতে পারত না, কথা বলার সুযোগ ছিল না। সবাই আওয়ামী লীগের শাসনামলে ক্লান্ত ছিল। আমি আশা করি, যে সরকারই আসুক, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।’
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হাম-উপসর্গের রোগীকে অন্যত্র ফেরত না পাঠাতে এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, নির্দেশনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। একাধিক হাসপাতালের প্রধানরা জানিয়েছেন, হুট করে শয্যা বাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন জনবল, পর্যাপ্ত জায়গা, অক্সিজেন সরবরাহ এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা। তবে তারা চেষ্টা করছেন যাতে হামের রোগীদের ফেরত পাঠাতে না হয়। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শয্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ছয় মাস বয়সী সিনথিয়াকে নিয়ে মহাখালীর একটি হাসপাতালে আসেন তার বাবা রুবেল। কয়েক দিন ধরে জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও শরীরে র্যাশ থাকলেও চিকিৎসকরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বলা হয়, র্যাশ না কমলে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করতে। হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে দেওয়া ব্যবস্থাপত্রেও তাকে শিশু হাসপাতালে রেফার করা হয়। গত ২৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, কোনো অবস্থাতেই হাম বা হাম-উপসর্গের রোগীকে ফেরত পাঠানো যাবে না। শয্যা খালি না থাকলেও রোগী ভর্তি রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে। এরপরও বাস্তবে সেই নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না। রাজধানীর কয়েকটি বড় হাসপাতালে বর্তমানে হামের রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রায় সব হাসপাতালেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে হামের জন্য নির্ধারিত ২৫টি শয্যার বিপরীতে প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেড না থাকায় বারান্দাতেও রোগী রাখতে হচ্ছে। নতুন শয্যা বাড়াতে গেলে অক্সিজেন, জায়গা ও অন্যান্য সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়, যা দ্রুত ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অন্য রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যাও হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি শিশু হাসপাতালের পরিচালক জানান, সেখানে হামের জন্য নির্ধারিত ৭০টি শয্যার বিপরীতে ৮০ জনের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। নতুন শয্যা বাড়ানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বিকল্পভাবে অন্যান্য বেড ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে, যাতে রোগীদের ফেরত না পাঠাতে হয়। রাজশাহীর একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের শিশু ওয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ২০০ হলেও বর্তমানে তার চেয়েও বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত। তারা সাধারণত রোগী ফেরত দেন না, তবে অতিরিক্ত চাপের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। শিশুদের জন্য আইসিইউ বেড ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হয়েছে এবং আরও ১০০ বেডের চাহিদা জানানো হয়েছে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট হাসপাতাল শয্যার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৫। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৭১ হাজার ৬৬০টি শয্যা এবং বেসরকারি হাসপাতালে এক লাখের বেশি। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ১৬০০-এর কিছু বেশি হলেও একটি সমীক্ষা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট আইসিইউ শয্যা প্রায় ২৮৫৬টি। জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একটি শয্যাও নেই এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বিপরীতে একটি আইসিইউ বেড রয়েছে, যা বড় ধরনের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। সরকারি একটি প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা জানান, সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৬২০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে জেলা পর্যায়ে আইসিইউ বাড়ানোর একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে কিছু শিশু হাসপাতাল নির্মিত হলেও জনবল সংকটে সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেড বাড়ানো নয়—অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, প্রশিক্ষিত জনবলসহ সব ধরনের সুবিধা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আরও বেশি হাসপাতালে হামের রোগী ভর্তি করার ব্যবস্থা করতে হবে। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ভালো প্রস্তুতি থাকলেও স্বাস্থ্যখাতে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থ বরাদ্দ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সক্ষমতা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে পিঠ বা কোমরের ব্যথা (ব্যাক পেইন) একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাধুলার চোট থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন রোগের কারণে এই সমস্যা হতে পারে। তবে, জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কালবেলার পাঠকদের জন্য নিচে ব্যাক পেইন কমানোর সহজ ৮টি উপায় তুলে ধরা হলো। ১. কোর মাসল বা শরীরের কেন্দ্রের পেশি শক্তিশালী করুন আমাদের শরীরের উপরিভাগের পুরো ওজন বহন করে নিচের দিকের পিঠ বা কোমর। তাই মেরুদণ্ডকে সঠিক ভার বহনে সহায়তা করতে এর চারপাশের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আমাদের দৈনন্দিন কাজে এই পেশিগুলো খুব একটা ব্যবহৃত হয় না, তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে এগুলোকে সচল রাখতে হবে। ২. প্রতিদিন স্ট্রেচিং করার অভ্যাস পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া পিঠের ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। পেশি যদি নমনীয় না থাকে, তবে তা মেরুদণ্ড ও হাড়ের সংযোগস্থলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। সুস্থ মেরুদণ্ডের জন্য প্রতিদিন নিয়ম করে স্ট্রেচিং করার অভ্যাস করুন। ৩. বসার ভঙ্গিমা ঠিক রাখুন দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকলে মেরুদণ্ডের ডিস্কের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে। তাই দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করুন। ৪. নিয়মিত হাঁটুন হাঁটা শরীরের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ এবং কার্যকর একটি ব্যায়াম। নিয়মিত দ্রুত গতিতে হাঁটলে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা পিঠের ওপর থেকে বাড়তি চাপের ঝুঁকি কমায়। ৫. ভারি বস্তু তোলার সময় সাবধানতা ভারি কোনো কিছু তোলার সময় ভুলভাবে শরীর মোচড় দিলে পেশিতে টান লেগে তীব্র ব্যথা হতে পারে। কোনো কিছু তোলার সময় পিঠের ওপর চাপ না দিয়ে পায়ের পেশির শক্তি ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নিন। ৬. ঘুমানোর সঠিক ভঙ্গি একেবারে সোজা হয়ে চিৎ হয়ে ঘুমালে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। তাই চিৎ হয়ে ঘুমানোর সময় হাঁটুর নিচে একটি বালিশ দিয়ে পা কিছুটা উঁচু করে রাখুন। আর যদি আপনি কাত হয়ে ঘুমান, তবে দুই হাঁটুর মাঝে একটি বালিশ রাখুন, এতে পিঠের ওপর চাপ কমবে। ৭. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন শরীরের বাড়তি ওজন পিঠের পেশি ও মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে মেরুদণ্ড একদিকে হেলে যেতে পারে বা মেরুদণ্ডের হাড়ের স্বাভাবিক বক্রতা নষ্ট হতে পারে। তাই পিঠ ভালো রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি । ৮. ধূমপান ত্যাগ করুন ধূমপান মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলোতে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়, ফলে ডিস্কগুলো দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। এ ছাড়া ধূমপানের কারণে শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ কমে যায় এবং নতুন হাড় গঠন ব্যাহত হয়, যা অস্টিওপরোসিসের মতো হাড়ের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে পিঠের ব্যথা প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও, আঘাত বা চোটের কারণে ব্যথা তীব্র হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তথ্যসূত্র: ইউসি ডেভিস
ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করে হকারদের পুনর্বাসনে ছয়টি খোলা মাঠে অস্থায়ী মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নিবন্ধনের মাধ্যমে নির্ধারিত স্থানে হকারদের বসানো হবে এবং নির্দিষ্ট ফি আদায়ের মাধ্যমে এসব স্থান রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা কি মৃত নগরী হতে যাচ্ছে? সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক নগর সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ আয়োজিত এ সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহ এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমন। শফিকুল ইসলাম খান বলেন, আগে যেখানে ফুটপাতে প্রায় ২০০ হকার ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় দুই হাজারে পৌঁছেছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। বিশেষ করে হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “২ শতাংশ মানুষের কারণে ৯৮ শতাংশ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। আমরা কয়েকজন হকারের জন্য পুরো ঢাকাবাসীকে কষ্টে ফেলতে চাই না। নির্দিষ্ট জায়গায়ই তাদের বসতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে দোকান সরিয়ে নিতে হবে।” প্রশাসক আরও জানান, নতুন এই পুনর্বাসন ব্যবস্থায় হকারদের দোকান ট্রলির আদলে তৈরি করতে হবে, যাতে সহজে সরানো যায়। কোনোভাবেই স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। এতে ফুটপাত দখল কমবে এবং নগরের চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, নগর ব্যবস্থাপনায় বেশিরভাগ কাজই এখন সাময়িকভাবে করা হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। ওয়াসা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন এবং খাল রক্ষায় জনগণের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, মিরপুরের প্যারিস খাল মাত্র দুই মাসে সাতবার পরিষ্কার করা হলেও বারবার তা আবার নোংরা করা হচ্ছে। এজন্য যারা খালের পাড়ে বর্জ্য ফেলবে, তাদের জরিমানার আওতায় আনার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। সংলাপে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, ঢাকা শহর এখন এমন এক সংকটে দাঁড়িয়ে আছে, যা একে ধীরে ধীরে ‘মৃত নগরী’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নদী দখল, পানি সংকট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনা রাজধানীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, নগর সেবাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে পারলে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং সেবার মান বাড়বে। তিনি জানান, রাজধানীর যানজট নিরসনে পার্কিং স্পেস উদ্ধারে কাজ চলছে এবং যেসব ভবন পার্কিংয়ের জায়গা দখল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হকার পুনর্বাসন, গণপরিবহন শৃঙ্খলা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকা শহরকে আবারও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।