অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে এক দশক আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেন সোহেল রানা। কাজ করতেন হোটেলের বাবুর্চি হিসেবে। পরে চাকরি ছেড়ে নিজেই দুটি রেস্তোরাঁ চালু করেন। ভালোই চলছিল ব্যবসা। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন পেয়ে বসে তাঁর। দেশে ফিরে আসেন। দালালের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপে আর যাওয়া হয়নি তাঁর। পরে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর কথা বলে তাঁকে নেওয়া হয় কাজাখস্তানের বন্দিশিবিরে। অবশেষে নিঃস্ব হয়ে পালিয়ে কোনোমতে দেশে ফিরেছেন তিনি।
সোহেল রানা ওরফে জুয়েলের (৩৮) বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামে। ১২ বছর ও ৬ মাস বয়সী দুই ছেলে ও স্ত্রী মুক্তা বেগমকে নিয়ে তাঁর সংসার। ১৬ লাখ টাকার চুক্তিতে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার জন্য দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে নিজের জমানো টাকা, সুদের পরিবর্তে ধান দেওয়ার চুক্তিতে নেওয়া টাকা, এনজিওর ঋণ ও ধারদেনা করে ১২ লাখ টাকা দিয়েছিলেন দালালকে। নিঃস্ব হয়ে ২০ এপ্রিল দেশে ফেরার পর দেনাদারদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
এ ঘটনায় গত ৯ মার্চ যশোরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ একটি মামলার আবেদন করেন সোহেলের স্ত্রী মুক্তা বেগম। আদালতের নির্দেশে ৬ এপ্রিল বাঘারপাড়া থানায় মামলা রেকর্ড হয়। মামলায় ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার মুসলিমনগর গ্রামের মো. কাইয়ুম (৪৮) ও তাঁর স্ত্রী নাজমা আক্তারকে (৪৫) আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
সম্প্রতি বাঘারপাড়ার ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামে সোহেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, ৪ শতাংশ জমির এক পাশে দুই কক্ষের একটি টিনের ঘর। সেমিপাকা ঘরের বারান্দার এক পাশে একটি ছোট কক্ষ। ঘরের সামনে ছোট একটি রান্নাঘর। টিন দিয়ে ছাওয়া রান্নাঘরের দুই পাশে পলিথিনের বস্তা সেলাই করে বেড়া দেওয়া। রান্নাঘরের অন্য পাশে কোনো বেড়া নেই।
কথায় কথায় সোহেল রানা জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি মালয়েশিয়ায় গিয়ে একটি হোটেলে বাবুর্চির কাজ নেন। এরপর সেখানে নিজের দুটি রেস্তোরাঁ গড়ে তোলেন। হোটেলের চাকরি ছেড়ে নিজের রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন। তার আগে ২০১৪ সালে দেশে থাকতে দালাল নাজমা আক্তার ওরফে নূরজাহানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলে দালাল তাঁকে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখান।
সোহেল রানার ভাষ্য, দালালের প্রলোভনে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু নাজমা তাঁকে ইউরোপে পাঠাতে পারেননি। পরে মাসিক হাজার ডলারের বেতনের চাকরি দেওয়ার শর্তে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চুক্তি হয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর আজ-কাল করে তাঁকে ঘুরাতে থাকেন নাজমা। পরে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি এক মাসের ব্যবসা ভিসায় তাঁকে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই নেওয়া হয়। সেখান থেকে পরদিন ১৬ জানুয়ারি তাঁকে নেওয়া হয় কাজাখস্তানে। সেখানে এক মাস থাকার পর তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
নির্যাতনের কথা তুলে ধরে সোহেল বলেন, কাজাখস্তানের হোটেলে থাকতেই শুরু হয় নির্যাতন। সেখানে আরও দুই বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনজনের থেকেই পাসপোর্ট কেড়ে নেন নাজমার প্রতিনিধি। এরপর ২৪ জানুয়ারি গাড়িতে করে তাঁদের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরে শিমক্যাট নামের একটি পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে লোহা গলানোর কারখানায় তাঁদের তিনজনকে আটকে রাখা হয়। এরপর দালালের প্রতিনিধি সেখান থেকে বের হতে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন। অন্যথায় প্রাণে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেন। তখন তাঁদের দিনে একবার একটি করে রুটি খেতে দিত।
সোহেল রানার ভাষ্য, বন্দিদশা থেকে পালাতে বাংলাদেশি অন্য দুজনের সঙ্গে তিনি শলাপরামর্শ করেন। একজন প্রহরীর সহায়তায় ২৮ জানুয়ারি পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সঙ্গী দুজনের একজন রাজি হননি। পরে অন্যজনকে সঙ্গে নিয়ে কারখানার সীমানাপ্রাচীর টপকে পালান তিনি। পরে একটি হোটেলে উঠে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তাঁরা বিপদের কথা জানান। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী সব শুনে সোহেলকে দেশে পাঠাতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। সোহেলের স্ত্রী ধারকর্জ করে আইনজীবীর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ও বিমানভাড়া বাবদ আরও ১ লাখ টাকা পাঠান। এরপর ট্রাভেল পারমিট নিয়ে ২০ এপ্রিল দেশে ফেরেন সোহেল।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে নাজমা আক্তারের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করেও বন্ধ পাওয়া যায়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাঘারপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মামলার আসামি মো. কাইয়ুম দেশের বাইরে আছেন। অপর আসামি নাজমা আক্তারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শেষ হয়ে গেছি। ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রায় ১৫ লাখ টাকার দেনা। দেনাদারেরা প্রতিদিন টাকার জন্য বাড়িতে আসছেন। দেনার দায়ে কখনো বাড়ি থাকছি, আবার কখনো পালিয়ে থাকছি। সংসার চলছে না। আমার ওপর চরম নির্যাতন গেছে, সব মেনে নিয়েছি। এখন টাকাগুলো ফেরত পেলে বেঁচে যেতাম।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে কীভাবে ‘গুম’ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে সেই বর্ণনা দিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মামলার একজন সাক্ষী। সহযোগী সাক্ষী হিসেবে দেওয়া ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউলের নির্দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে ‘হত্যা ও লাশ গুম’ করার বিবরণ উঠে এসেছে। রোববার জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেওয়া এই সাক্ষী নিজেকে তার সাবেক ‘রানার’ হিসেবে পরিচয় দেন। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে গত ৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। সেখানে তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগে শতাধিক গুম-খুনের বিবরণ তুলে ধরা হয়। প্রথম অভিযোগে ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিন হত্যা; দ্বিতীয়টিতে বরগুনার চরদুয়ানী খাল মোহনায় ৫০ জনকে হত্যা এবং তৃতীয়টিতে সুন্দরবন অঞ্চলে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে আরও ৫০ জনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর এই তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। দীর্ঘ জবানবন্দিতে এই সেনা সদস্য তার যোগদান এবং জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ হিসেবে কাজ করার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তার ধারাবাহিক বর্ণনার এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ও গুম করার বিষয়টি আসেন। ইমরুল বলেন, “২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে তুলবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। ‘টার্গেট’ কখন আসবে তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে, ‘টার্গেট’ আসবে না।” পরে সেখান থেকে জিয়াকে বাসায় নামিয়ে দেন এবং পরের দিন সকালে ইমরুল নয় দিনের ছুটিতে যান বলে দাবি করেন তিনি। “ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভার ব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। নয় দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি।” প্রমাণ নষ্ট করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি যে, অস্ত্রের ‘ইন-আউট রেজিস্টার’ এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত ‘ফল ইন’ (লাইনে দাঁড়ানোর পর নাম ডেকে উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া) সকাল ৯টায় হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭টা ‘ফল ইন’ হতো এবং জিয়া স্যার পরপর বেশ কয়েক দিন ‘ফল ইনের’ সময় এসেছিলেন।” সহযোগী এই সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেন, জিয়া এক দিন ফোনে কোনো একজনের সাথে কথা বলছিলেন। “ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল আসলে স্যার বলেন- তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন। জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপর প্রান্তে কি বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন-স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে ‘গলফ’ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।” প্রথম লাশ গুমের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, “রানার হিসেবে যোগদান করার ২০/২৫ দিন পরে রাত আনুমানিক ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন-কই তুই? আমি বলি-আমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র্যাব-১ এর (দপ্তর) সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি দুটি কালো রংয়ের হায়েস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ওই গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন। “গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পিছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র্যাব-১ এর সিও রাশেদ স্যার এবং ক্যাপ্টেন কাউসার স্যার ছিলেন। আরও দুইজন ছিলেন আমি তাদেরকে চিনি না।” রাত আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে সেখান থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন রোড (উত্তরা) হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে কিছুদূরে একটি রেলক্রসিংয়ে যাওয়ার কথা বলেন ইমরুল। রাস্তার দুই পাশে গাছ-গাছালি থাকার বর্ণনা দিয়ে সেখানে তাদের গাড়িগুলো থামে এবং সেখানে লাশ ফেলা হয় বলে দাবি করেন তিনি। সেই বিবরণ দিয়ে এই সাক্ষী বলেন, “তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ইমরুল ডিকিটা খোল, বস্তাটা বের কর। আমি ডিকি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না, বরং একটা ‘ডেড বডি’ ছিল এবং ঠাণ্ডা ছিল।” লাশটি রেললাইনের পাশে নিয়ে জিয়াউল যেখানে দাঁড়ানো ছিলেন, সেখানে রেখে গাড়িতে ফিরে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তখন দেখি যে, জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেল লাইনের উপরে রাখেন এবং তারা গাড়িতে ফিরে আসেন। তার কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়। তারপর আমরা ওখান থেকে চলে আসি।” সুন্দরবনে সাজানো অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে সুন্দরবন অপারেশনে কয়েকবার যাই। তার মধ্যে একটি অপারেশনের কথা আমার মনে আছে। আমরা বোটে করে সুন্দরবন অপারেশনস্থলে যাই। ওই সময় সেখানে নদীর ভাটা ছিল। আমাদের সাথে র্যাব-৮ এর সদস্যরাও ছিলেন। আমাদের বোট থামার পর জঙ্গলের ভিতর থেকে দুই/তিন রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদেরকে ‘ফায়ার’ করার নির্দেশ দেওয়া হলে আমরা র্যাব ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা এবং র্যাব-৮ এর সদস্যরা ‘ফায়ার’ করি।” এক পর্যায়ে গুলিবর্ষণ থামাতে নির্দেশ দেওয়ার কথা তুলে ধরে ইমরুল বলেন, “সেখানে জিয়াউল আহসান স্যার, র্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার সদস্যরাও উপস্থিত ছিল। “আমরা জঙ্গলের ভিতরের দিকে যাই এবং দেখি সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই/তিনটি লাশ পড়ে আছে।” ঘটনাস্থলে বর্ণনা দিয়ে তিনি দাবি করেন, “এই অপারেশনটি আমার কাছে একটি সাজানো অপারেশন মনে হয়েছিল।” বিডিআর সদস্যদের হত্যার বিষয়ে এই সহযোগী সাক্ষী বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য। ওই সময় জিয়াউল আহসান স্যার ৮/১০ জন লোককে হত্যা করেন। যাদেরকে হত্যা করেছেন তারা বিডিআর সদস্য ছিল এবং আমাদের অফিসারদের এরা হত্যা করেছে মর্মে জিয়া স্যার বলেছেন।” হত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “এই লোকগুলোকে দুইভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ইনজেকশন দিয়ে এবং আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের নিকট আর্মি ক্যাম্প আছে, তার ভিতর দিয়ে নদীতে নিয়ে সিমেন্ট ভরা বস্তা বেঁধে বোটে করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। “যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে তাকে একটি বস্তা নিচে রাখা হতো, তার ওপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বাধা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।” উত্তরায় সাজানো ক্রসফায়ারের বর্ণনায় তিনি বলেন, “২০১১ সালের রমজান মাসের শেষের দিকে আমি লাইনে ছিলাম। একদিন ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে আহসান স্যার ফোন দিয়ে আমাকে ক্যামেরা নিয়ে উত্তরা নর্থ টাওয়ারের ওখানে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে আমি স্যারকে পাইনি। “একটু পরে জিয়া স্যার ফোন দিয়ে আমাকে আরেকটু সামনে যেতে বলেন। ওইদিন আমি ইফতার করতে পারিনি। নর্থ টাওয়ার থেকে সামনে গিয়ে দেখি চারজন লোককে ক্রস ফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যারা নাকি ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই অপারেশনটা সাজানো ছিল।” পোস্তগোলায় ১১ জনকে একত্রে হত্যার বর্ণনায় তিনি বলেন, “২০১২ সালের প্রথমের দিকে তিনটি মাইক্রোতে করে আমরা ১১ জন আসামি নিয়ে জিয়াউল স্যারের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ওখানে যাই। সেখানে ওই ১১ জন আসামিকে বোটে উঠানো হয়। জিয়া স্যার কাছে ডাকলে গিয়ে দেখি এই বোটটি সেই বোট যেটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিল।” সেখানে হঠাৎ করে একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার কথা তুলে ধরে ইমরুল দাবি করেন, “জিয়া স্যার আমাকে বলেন- ইমরুল ধর ধর। স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়ে উক্ত আসামিকে ধরি। রশির সাহায্যে আমাকে এবং ওই আসামিকে বোটে উঠানো হয়। ওই সময় অন্ধকার ছিল। আমি আসামিকে চিনতে পারিনি। তবে তার বয়স আনুমানিক ২৫/২৬ বছর হবে। “বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে পূর্বের ন্যায় এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।” ওই অপারেশনে জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ, কমান্ডার সোহায়েল, এডিজি (অপস) মুজিব ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। জাফলং বর্ডারে হস্তান্তর ও হত্যার বিষয়ে ইমরুল বলেন, “২০১২ সালের মাঝামাঝি র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে দুইজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা এবং মাথায় ‘জমটুপি’ পরানো ছিল। আনুমানিক রাত ২টা বা আড়াইটার দিকে আমরা সেখানে পৌছাই। “সেখানে ভারত থেকে দুজন আসামিকে সাধারণ পোশাকে চার/পাঁচজন লোক এসে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি।” ভারতের যে দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাদের পরে রাস্তায় পৃথক দুটি স্থানে হত্যা করার বর্ণনা দেন জিয়াউল আহসানের সাবেক এই ‘রানার’। তার দাবি, দুইজনকেই হত্যা করেছেন জিয়াউল আহসান। আরেকজনকে গুলি করে হত্যার কথা জবানবন্দিতে তুলে ধরে ইমরুল বলেন, “র্যাব-৪ এর ‘সেইফ হাউজ’ থেকে দুজন আসামিকে দুইটা মাইক্রোতে নেওয়া হয়। আনুমানিক আধাঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়।” ট্রাইব্যুনালের এক প্রশ্নে সাক্ষী বলেন, “গাড়ি দুটি থামানো হয়। আমি যে গাড়িতে ছিলাম সে গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। আমি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। “জিয়াউল আহসান স্যার ওই আসামিকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন এবং হত্যা করেন। ওই আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সকলে হাসাহাসি করছিল।” ওই আসামির হাত এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। হত্যা করার পর জিয়ার নির্দেশে গামছাগুলো খুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসার কথা বলেন তিনি। এরপর জিয়াউল আহসান তাদের গাড়ি নিয়ে র্যাব-৪ এর দপ্তরে চলে যেতে বলেন এবং তিনি অপর আসামিকে নিয়ে চলে যান, এ কথা তুলে ধরে ইমরুল জবানবন্দিতে বলেন, “জিয়া স্যার যখন র্যাব-৪ এ ফেরত আসেন তখন ওই আসামি তার সাথে ছিল না। কিছু কিছু অপারেশন স্যার আমার অগোচরে করতেন। যেটাতে তিনি প্রয়োজন মনে করতেন সেটাতে আমাকে নিয়ে যেতেন।” কাঁচপুর সেতুতে হত্যার ঘটনা তুলে ধরে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন- র্যাব-১ সামনে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়ানো আছে সেখানে গিয়ে ওই গাড়িতে ওঠো। আমি স্যারের আদেশ শুনে গাড়িতে গিয়ে ওঠি এবং দেখতে পাই মেজর নওশাদ স্যার গাড়িতে বসা আছেন। দুইজন আসামি (পরে বলেন) ‘টার্গেট’ জমটুপি পরা অবস্থায় গাড়ির ভেতরে বসে আছে। “কিছুক্ষণ পরে জিয়াউল আহসান স্যার রাস্তার অপর পাশের একটি প্রাইভেট কারে এসে নামেন তারপর রাস্তা পার হয়ে আমাদের গাড়িতে এসে ওঠেন। আমরা যাত্রা শুরু করে টঙ্গী হয়ে, আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের উপরে গিয়ে দাঁড়াই। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন-ইমরুল নামো। আমি স্যারের আদেশ অনুযায়ী গাড়ির পাশেই দাঁড়াই গার্ড দেওয়ার জন্য।” ইমরুল বলেন, “তখন জিয়া স্যার একজন ‘টার্গেট’কে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পর পর দুটি গুলি করেন এবং ব্রিজ থেকে যখন ফেলে দেন, তখন তার লুঙ্গি খুলে দেন।” তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখান থেকে ওই ব্যক্তির নদীর পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল দাবি করে এই সাক্ষী বলেন, “তখন একইভাবে মেজর নওশাদ স্যার পরবর্তী টার্গেটকেও গুলি করে হত্যা করেন এবং লুঙ্গি খুলে পানিতে ফেলে দেন।” বরিশালে নিয়ে হত্যা করা হতো দাবি করে জিয়াউল আহসানের সাবেক ‘রানার’ বলেন, “আমি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে বরিশালে গিয়েছিলাম এবং র্যাব-৮ এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চরদুয়ানী বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনও দুইজন, কখনও তিনজন, কখনও চারজন ‘টার্গেট’কে পূর্বের ন্যায় হত্যা করে, অর্থাৎ সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। “বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে ওই টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো।” তিনি বলেন, “জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে আমি এক বছর তিন/চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসাবে থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ্য করি যে, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এই বিভিন্ন পন্থার মধ্যে ছিল গুলি এবং ইঞ্জেকশন।” আগের ঘটনা ছাড়াও আরো ১০/১২ জন ব্যক্তিকে ইঞ্জেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে এই সাক্ষী বলেন, “এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনও টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনও গাড়িতে সংঘটিত হতো।” জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে কান্না করতে থাকেন ইমরুল কায়েস। এই পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি রানার হিসাবে তার সাথে দেখেছি তিনি ওই সময়কালে ১৫০/২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন।” তদন্তকারী কর্মকর্তা একাধিকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমানে আমি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত আছি। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই। এই আমার জবানবন্দি।” সাক্ষীর জবানবন্দির পর ব্রিফিংয়ে ইলিয়াস আলীকে গুম করার ঘটনায় ব্যবহৃত ‘গলফ’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই গলফটা শব্দটা প্রতীকী অর্থে তারা ব্যবহার করেছে। গলফ অর্থ হল কাউকে একটা গর্তে ফেলে দেওয়া।” ইলিয়াস আলীকে অপহরণের পর প্রমাণ নষ্ট করার বিষয়ে তিনি বলেন, “র্যাব হেডকোয়ার্টারের যে ভিডিও ফুটেজ—এই সবকিছু জিয়াউল আহসান ধ্বংস করে দিয়েছেন, নষ্ট করে ফেলেছেন। এই সাক্ষ্যটা যাতে না থাকে। এভিডেন্সটাকে নষ্ট করবার জন্যে ‘ইনস অ্যান্ড আউট রেজিস্টার’ এবং সকল ফুটেজ জিয়াউল আহসান গায়েব করে দিয়েছেন। “বোঝা গেল যে বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়েই তার এই কিলিং মিশনটার নেটওয়ার্কটা ছিল।” আদালতে জিয়াউল আহসানের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই জিয়াউল আহসান আজকে কোর্টে উনি উপস্থিত থেকে এই সমস্ত সাক্ষ্যটা শুনেছেন। আর যতক্ষণ তিনি শুনেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি হাসছিলেন, ‘দাঁত খিলিয়ে খিলিয়ে’ তিনি হাসছিলেন। তিনি বেশ উপভোগ করছিলেন যে তার এই কুকর্মের যখন বর্ণনা সাক্ষী দিচ্ছিলেন, তার কাছে কোনো অনুতপ্ত মনে হয় নাই।” সাক্ষী ইমরুল কায়েস সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও কেন তাকে আসামি করা হয়নি এমন প্রশ্নে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “সবগুলোর মধ্যেই তার ভূমিকা হল, তিনি জিয়াউল আহসানের নির্দেশে, তিনি ওই ভুক্তভোগীগুলোর লাশ ‘ডিসপোজাল’ করেছেন। তো সেই কারণে এই সাক্ষীকে আমরা ‘অ্যাকমপ্লিস উইটনেস’ হিসেবে আমরা ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছি। “তাকে যদি আজকে আমরা যদি এই সাক্ষীকে না পেতাম, তাহলে আজকের এই ঘটনার বর্ণনা কে দিত?" ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল আহসান ২০০৯ সালে র্যাবে যোগ দেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক এবং সবশেষ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত এবং ১৬ অগাস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিউ মার্কেট থানার একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও, পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে জুলাই-অগাস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। এছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে জিয়াউল এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক। ইতোমধ্যে আদালতের নির্দেশে তার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ফ্ল্যাট ও জমি জব্দ করা হয়েছে।
যশোর: ঝিনাইদহের ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দাখিলা বইয়ের পাতা গায়েব ও দুর্নীতির দায়ে অফিস সহায়ককে ২৭ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) যশোরের বিশেষ দায়রা জজ (জেলা ও দায়রা জজ) আদালতের বিচারক এস এম নূরুল ইসলাম ভিন্ন ভিন্ন ধারায় তাকে এই কারাদণ্ড দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক রেজাউল হক ভাস্কর মহেশপুর উপজেলার পান্তাপাড়া গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে। তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে পলাতক রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিভিন্ন ধারার দণ্ড মিলিয়ে মোট ২৭ বছর হলেও আদালত রায়ে সব সাজা একসাথে চলবে বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে আসামিকে দণ্ডগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আদালত ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর নেপা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত থাকাকালে রেজাউল হক ভাস্কর ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর ওই অফিসে ব্যবহৃত দাখিলা বই থেকে বিভিন্ন সিরিয়ালের মোট আটটি পাতা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গোপনে ছিঁড়ে নেন। অফিসের অন্য কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদে রেজাউল তা স্বীকার করেন এবং কয়েকটি পাতা ফেরতও দেন। পরে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুইটি ডিসিআর কপিসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সিলমোহর, টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাকে আসামি করে মামলা করেন নেপা ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা শাহজাহান আলী। এ মামলার তদন্ত শেষ দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন সহকারী পরিচালক রিজিয়া খাতুন আসামি রেজাউল হক ভাস্করকে অভিযুক্ত করে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ ঝিনাইদহ জেলা জজ আদালতে চার্জশিট জমা দেন। পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য যশোর বিশেষ জজ আদালতে পাঠানো হয়। দীর্ঘ সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এ আদালত রায় ঘোষণা করে। রায়ে রেজাউলকে ১৬১ ধারায় দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড, দুই হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ৪৬৭ ধারায় দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ৫ হজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৪৬৮ ধারায় তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড ২ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড, ২০৪, ৪৭১, ৪৮৫, ৪৮৮ ধারায় দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ২ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাস বিনাশ্রম করাদণ্ড, ২০১ ধারায় তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আরো তিন বছর সংশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন বিচারক।
গত কয়েকদিন থেকে সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টিপাত ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদী সুরমাসহ সব নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলগুলোতে সাময়িক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে ইতোমধ্যে পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার তাহিরপুরের আনোয়ারপুর সড়ক। এতে সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী- সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ভারতের মেঘালয়ে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জেলার নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যে সুরমা, বৌলাই, রক্তিসহ বিভিন্ন নদীর পানি বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি ৭৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বর্তমানে পানি বিপদসীমার প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী দুদিনে ভারী বৃষ্টিপাত হলে নদ-নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কোথাও কোথাও বিপদসীমা স্পর্শ করার সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলগুলো সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন হাওলাদার বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নদীর পানি বাড়ছে। তবে বৃষ্টিপাত হলে স্বল্প মেয়াদি বন্যা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক জানান, সকালে পানির স্রোত কিছুটা কম ছিল, কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিও বেড়েছে। স্থানীয় মানুষ যাতায়াতে কিছুটা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। তবে পাহাড়ি ঢল থামলে এই সড়ক ভেসে যবে তখন সবকিছুই স্বাভাবিক হবে।