মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মাঝে বাংলাদেশের সামনে কঠিন বছর। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং জুলাই গণভোট দেশকে নতুন মোড়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে প্রবেশ করছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি যেমন উত্তাল, তেমনি অর্থনীতিতেও চাপে রয়েছে সাধারণ মানুষ। বিশ্লেষকদের মতে, এই বছরটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ‘মেক অর ব্রেক’ বছর।
মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি:
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী,
২০২৫ সালে ৩৮টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ১০৭টি হেফাজতে মৃত্যু ঘটেছে।
২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২১ ও ৬৫।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে,
২৬ জন নিহত ‘বন্দুকযুদ্ধ’, শারীরিক নির্যাতন ও যৌথ বাহিনীর হেফাজতে
১২ জন নিহত বিভিন্ন থানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে
হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী ১০৭ জনের মধ্যে ৬৯ জন বিচারাধীন এবং ৩৮ জন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বনাম অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ:
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
রাজনীতির অস্থিরতার কারণে,
প্রবৃদ্ধি ধীর
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি
মূল্যস্ফীতি উচ্চ
ব্যাংকিং খাত সংস্কার
এগুলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ঐতিহাসিক নির্বাচন:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড
এই দুই নেত্রী ছাড়াই নির্বাচন হচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বড় পরীক্ষা।
‘মবোক্রেসি’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার রাজনীতি
রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্বিন্যাস
তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জটিল।
অর্থনীতি: স্থিতিশীলতার আভাস:
অর্থনীতিতে কিছু স্থিতিশীলতার লক্ষণ থাকলেও,
প্রবৃদ্ধি মন্থর
বৈদেশিক ঋণের চাপ বেশি
জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
জুলাই গণভোট: ভবিষ্যতের রূপরেখা:
জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রপ্তানি বৃদ্ধি, পরিবেশগত মানদণ্ড প্রতিপালন জোরদার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বৃহস্পতিবার জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত এই স্কিমের মাধ্যমে চামড়াশিল্পকে টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে পরিণত করতে সহায়তা দেওয়া হবে। এই স্কিমের আওতায় কারখানা নির্মাণ ও সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো যেমন-ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি), স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি), ডাম্পিং ইয়ার্ড এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা স্থাপনে অর্থায়ন করা হবে। এ ছাড়া লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জনের ব্যয়, বিদ্যমান ট্যানারি আধুনিকীকরণ এবং চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক, আনুষঙ্গিক উপকরণ ও অন্যান্য সহায়ক পণ্যের দেশীয় উৎপাদনেও এ তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হবে। স্কিমের আওতায় ঋণগ্রহীতারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাংশ সুদে পুনরর্থায়ন (রিফিন্যান্স) সুবিধা দেবে। রিভলভিং ভিত্তিতে তিন বছর মেয়াদে এই তহবিল পরিচালিত হবে। নতুন কারখানা নির্মাণে সর্বোচ্চ সাত বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়া হবে, যার মধ্যে দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। বিদ্যমান কারখানা আধুনিকীকরণে সর্বোচ্চ চার বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। কার্যকর মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর, যা সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত নবায়ন করা যাবে। বাংলাদেশের সব তফসিলি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের সঙ্গে চুক্তি সাপেক্ষে এই স্কিমে অংশ নিতে পারবে। স্কিমের আওতায় নতুন চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা, নতুন চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন অবকাঠামোর জন্য ২০ কোটি টাকা, বিদ্যমান স্থাপনা আধুনিকীকরণের জন্য ১০ কোটি টাকা এবং সহায়ক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে। টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে স্কিমের আওতায় বেশ কয়েকটি শর্তও আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন পাওয়ার দুই বছরের মধ্যে এলডব্লিউজি সনদ অর্জন করতে হবে। একই সময়ের মধ্যে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি দূরীকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংক কম্পানি আইন ১৯৯১ অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকৃত ঋণগ্রহীতারা এই স্কিমের আওতায় অর্থায়নের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না। এ ছাড়া একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) থেকে ইতিমধ্যে সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও এই স্কিমের সুবিধা পাবে না।
বগুড়া জেলায় ১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১২৫ কোটি ৯৮ লাখ ৯২ হাজার ১৯৭ টাকা, যা সরকারি অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে ব্যয় করা হবে। বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত পূর্ত কাজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। জানা গেছে, ‘সহনশীল অবকাঠামোর মাধ্যমে অভিযোজন ও ঝুঁকি হ্রাস’ শীর্ষক প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় বগুড়া জেলার ১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিলেও কারিগরিভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে যৌথ উদ্যোগে গঠিত ‘দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’ এবং ‘আহাদ বিল্ডার্স, ঢাকা’–কে ১২৫ কোটি ৯৮ লাখ ৯২ হাজার ১৯৭ টাকায় কাজটি দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি ২০২৩ সালের ১২ মার্চ অনুমোদন দেয়। এর বাস্তবায়নকাল ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। জানা গেছে, সুপারিশ করা দর দাপ্তরিক প্রাক্কলিত দরের তুলনায় শূন্য দশমিক ২৫১ শতাংশ কম। প্রকল্পের আওতায় ১৫টি বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সড়কবাতি, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা, সংযোগ সড়ক, রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিটের বক্স কালভার্ট, আসবাবপত্র সরবরাহ এবং বৃক্ষরোপণের কাজও সম্পন্ন করা হবে।
দেশে টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। উচ্চ সুদের হার সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামায় বর্তমান সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোতে পরিবর্তনের কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা হলো, ধীরে ধীরে সুদের হারকে মূল লক্ষ্য না রেখে মূল্যস্ফীতিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নামিয়ে আনার ভিত্তিতে একটি আধুনিক মুদ্রানীতি কাঠামো গড়ে তোলা। রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ কমিটির সদস্যরা অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে হলে বর্তমান মুদ্রানীতির কাঠামোকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে হবে। এ জন্য শুধু সুদের হার বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে রাখাকে কেন্দ্র করে নীতি পরিচালনার প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত সক্ষমতা ও স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমছে না বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগে টানা তিন মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ নীতি সুদহার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান বলেন, সদস্যদের অনেকেই উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, সুদের হার বাড়ানো হলেও কেন মূল্যস্ফীতি কমছে না। তিনি জানান, প্রথম বৈঠক হওয়ায় বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী বৈঠকগুলোতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। কেন বদলাতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। নীতি সুদহার বাড়ার ফলে ব্যাংক ঋণের সুদও বেড়েছে। এতে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণ কমেছে, বিনিয়োগ ও ব্যয় সংকুচিত হয়েছে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহও কমেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করবে। এরপর সুদের হার, তারল্য ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হারসহ সব ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হবে। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় সুদের হার নিজে লক্ষ্য নয়; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে মূল লক্ষ্য, আর সুদের হার হবে সেই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার। বাস্তবায়নে প্রয়োজন কয়েকটি শর্ত বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কার্যকর করতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতির নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক সুদের হার ব্যবস্থা কার্যকর করা, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এবং বিনিময় হারকে তুলনামূলকভাবে বাজারভিত্তিক রাখা। শুধু সুদের হার নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নীতি বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বিনিময় হার, রাজস্বনীতি এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এখনো মূল্যস্ফীতিকে চাপে রাখছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, সরকার ঘোষিত ৬৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে। যদিও এই অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহের একটি অংশ মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মুদ্রানীতির বিবর্তন বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, স্বাধীনতার পর প্রথমদিকে সুদের হার ও ঋণের মতো আর্থিক উপকরণ সরাসরি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুদ্রানীতি পরিচালিত হতো। ২০০৩ সাল থেকে অর্থের জোগানভিত্তিক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হয়। পরে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন, আর্থিক খাতের আধুনিকায়ন এবং বাজার ব্যবস্থার বিকাশের কারণে ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে সুদের হারভিত্তিক নতুন মুদ্রানীতি কাঠামো চালু করা হয়। বর্তমানে সুদের হার করিডর ব্যবস্থার মাধ্যমে নীতি সুদহার পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ সংসদীয় কমিটির সদস্য ও বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন বৈঠকে ব্যবসায়ীদের ঋণসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ আরও ছয় মাস বাড়ানোর এবং ‘ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক’ শর্তের কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধেরও আহ্বান জানান তিনি।