দেশীয় বাজারে স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে ৩ হাজার ৪৫৩ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকা, যা আজ রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) রাতে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দামের পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে স্বর্ণের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন দামে সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৫ হাজার ৮০০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৩৮ টাকা।
এর আগে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৪ টাকা, ২১ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ২ হাজার ৪৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪২৪ টাকা।
বাজুস জানায়, নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যুক্ত করতে হবে। তবে গহনার নকশা ও মানভেদে মজুরির তারতম্য হতে পারে।
এদিকে স্বর্ণের দামের পাশাপাশি রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৭২ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৩৬২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি ৩ হাজার ৭৩২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ২ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছিল ৪ হাজার ২৪৬ টাকায়, ২১ ক্যারেট ৪ হাজার ৪৭ টাকায়, ১৮ ক্যারেট ৩ হাজার ৪৭৬ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ২ হাজার ৬০১ টাকায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় গঠন এবং বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বীমা খাত প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। বাজেট বক্তৃতায় এ খাতের জন্য আলাদা কোনও নীতিগত সংস্কার, করপোরেট কর কমানো কিংবা বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়নি। তবে সীমিত পরিসরে কয়েকটি ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রি-ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানো এবং প্রথমবারের মতো মৎস্য বীমা স্কিম চালুর ঘোষণা। বীমা কোম্পানিগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট করহার কমানো, ভ্যাট-ট্যাক্সে যৌক্তিকতা আনা, লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা দূর করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কারের দাবি জানানো হলেও এবারের বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে খাতটির কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণে বাজেট থেকে বড় ধরনের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। রি-ইনস্যুরেন্সে কর কমায় কিছুটা স্বস্তি বাজেটে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো বিদেশি পুনর্বিমা (রি-ইনস্যুরেন্স) প্রতিষ্ঠানে পরিশোধিত প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা। এর ফলে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর পুনর্বিমা ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক পুনর্বিমা সেবা গ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বড় শিল্প, বিদ্যুৎ, জাহাজ, বিমান বা অবকাঠামো প্রকল্পের ঝুঁকি বহনে পুনর্বিমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর কমানোর ফলে কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে। মৎস্য বীমা স্কিম নতুন সংযোজন প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক মৎস্য খামারের জন্য বিশেষ মৎস্য বীমা স্কিম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগবালাইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি বীমার পাশাপাশি মৎস্য বীমা চালু হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। জীবন বীমায় কর সুবিধা বহাল ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য জীবন বীমার প্রিমিয়ামের বিপরীতে বিদ্যমান কর রেয়াত বহাল রাখা হয়েছে। তবে কর ছাড়ের পরিমাণ বাড়ানো হয়নি কিংবা নতুন কোনও কর প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়নি। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানির করপোরেট করহারেও কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের কর-সংক্রান্ত দাবিগুলো এবারও অপূর্ণই থেকে গেছে। প্রণোদনার বদলে সংস্কারের বার্তা বাজেটে বীমা খাতের জন্য আলাদা কোনও বেলআউট তহবিল বা প্রণোদনা না থাকলেও খাতটির সংস্কারের বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ইতোমধ্যে জানিয়েছে, খাতের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারে 'ওয়ান-টাইম' বিশেষ সহায়তা প্যাকেজের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন, ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থা, রিয়েল-টাইম তথ্যভিত্তিক নজরদারি, কমিশন কাঠামো সংস্কার, অ্যাকচুয়ারিয়াল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বীমা পণ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেন এত সংকটে বীমা খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান এখনও ১ শতাংশের নিচে। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বীমা প্রবেশহারও অত্যন্ত কম। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে গ্রাহকের আস্থাহীনতা থেকে। আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরুতে জীবন বীমায় সক্রিয় পলিসি ছিল প্রায় ৭৮ লাখ। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি তা কমে প্রায় ৬৮ লাখে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আড়াই বছরে ১০ লাখের বেশি পলিসি হারিয়েছে খাতটি। একই সময়ে জীবন বীমায় দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৩৫ শতাংশ। সাধারণ বীমায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। উত্থাপিত দাবির প্রায় ৯২ শতাংশই বকেয়া রয়েছে। ফলে নতুন গ্রাহক যেমন বিমুখ হচ্ছেন, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই খাত থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। বিদেশি বিনিয়োগও কমছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ বীমা কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বিদেশি অংশীদারিত্ব থাকলেও অনেক কোম্পানিতে তা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি, সময়মতো দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন। শিল্পের প্রত্যাশা কী ছিল বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এবারের বাজেটের আগে করপোরেট কর কমানো, ভ্যাট-ট্যাক্সে যৌক্তিকতা আনা, তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিকে বাধ্যতামূলক নগদ লভ্যাংশ নীতি থেকে অব্যাহতি, লাইসেন্স নবায়নের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং সুশাসন নিশ্চিতে নীতিগত সহায়তা চেয়েছিল। তবে বাজেটে এসব দাবির অধিকাংশই প্রতিফলিত হয়নি। ফলে খাতটির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে বীমা খাতকে রাজস্ব সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও সুশাসনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রি-ইনস্যুরেন্সে উৎসে কর কমানো ইতিবাচক হলেও এটি পুরো খাতের দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, সময়মতো দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা, করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল তদারকি জোরদার এবং গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে শুধু কর সুবিধা দিয়ে বীমা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বীমা খাত ভবিষ্যতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৬ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৪ জুন) দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের অক্টোবরে রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ২০২৪ সালের আগস্টে তা ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ আরও কমে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বাজার থেকে ডলার ক্রয়, বৈদেশিক দায় পরিশোধে কৌশলগত ব্যবস্থাপনা এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় ইতিবাচক ধারায় রয়েছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছায়। এরপরও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। সর্বশেষ ৫৬ মাস পর দেশের গ্রস রিজার্ভ আবারও ৩৬ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করলো। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ৩১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন এক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ নতুন ঋণ আসছে, তার প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে অতীতে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন করে যে অর্থ যোগ হওয়ার কথা, তার পরিমাণ দ্রুত কমে আসছে। একই সময়ে কমেছে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং কমেছে অর্থছাড়ও। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ের (১১ মাস) বৈদেশিক সহায়তা সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। একই সময়ে পূর্বে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ বিদেশি সহায়তা হিসেবে যে অর্থ এসেছে, তার ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশই চলে গেছে ঋণ পরিশোধে। হিসাব করলে দেখা যায়, পুরো অর্থছাড়ের মধ্যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যদিও সরকার সরাসরি নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করছে না, তবে সামগ্রিক বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের হিসাবে নতুন যে অর্থ আসছে তার অধিকাংশই ঋণ পরিশোধে চলে যাওয়ায় কার্যত একই ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। রেকর্ড পরিমাণ ঋণ পরিশোধ ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল বাবদ মোট ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরের ১১ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় ৯ শতাংশ। পরিশোধের এই অর্থের মধ্যে সুদ বাবদ গিয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৪০ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অন্যদিকে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ শুধু সুদ নয়, আসল ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। কেন বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ গত এক দশকে নেওয়া বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্পসহ বিভিন্ন বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড বা অবকাশকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি ও সুদ পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। কয়েক বছর আগেও এক ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৫-৯০ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ১২২ টাকার কাছাকাছি। ফলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে সরকারের অনেক বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক ঋণের চাপ শুধু ডলারের হিসাবে নয়, টাকার হিসাবেও দ্রুত বাড়ছে। কমছে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ঋণ পরিশোধের চাপ যখন বাড়ছে, তখন নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ ও অনুদান প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতি কমেছে ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। বিশেষভাবে কমেছে অনুদান। চলতি অর্থবছরে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে যাওয়ায় এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ায় অনুদানভিত্তিক সহায়তা ক্রমেই কমে আসছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি অর্থ বাজারভিত্তিক বা তুলনামূলক উচ্চ সুদের ঋণ থেকে সংগ্রহ করতে হতে পারে। অর্থছাড়েও বড় ধাক্কা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্থছাড়েও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে অর্থছাড় হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড় হয়েছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ অর্থছাড় কমেছে ১০৩ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতির শ্লথগতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ সময়মতো ছাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একদিকে নতুন ঋণ কম আসছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে—যা বৈদেশিক অর্থায়নের ভারসাম্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। কারা সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি প্রায় ৯৬ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, যারা প্রায় ৯৩ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে প্রায় ৭৮ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার, জাপান ৪৩ কোটি ডলার এবং ভারত ২৫ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নে এখনো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সামনে কী ঝুঁকি বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। কারণ বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের মূল সময় এখন শুরু হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বছরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তার মতে, রাজস্ব আদায়, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ পর্যাপ্ত হারে না বাড়লে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অপরদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের( সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, এখন থেকে ঋণ গ্রহণে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। শুধু ঋণ নিলেই হবে না, সেই ঋণের অর্থ এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে যেখান থেকে অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায় এবং যা ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে। সতর্কবার্তা অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ এখনো ঋণ সংকটে পড়েনি। বৈদেশিক ঋণের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—নতুন ঋণের প্রবাহ কমছে, অনুদান কমছে, অথচ ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের যে সুবিধা বৈদেশিক ঋণ থেকে পাওয়ার কথা, তার বড় অংশই এখন পুরোনো দায় পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এখন সময় এসেছে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ নয়, বরং ঋণের গুণগত ব্যবহার, প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফলন এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ ঋণ তখনই টেকসই হয়, যখন সেই ঋণ ভবিষ্যতে নিজেই নিজের পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করে। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।