জঁ–পল সার্ত্রের অন্তহীন নরক নিয়ে অস্তিত্ববাদী নাটক ‘নো এক্সিট’ ১৯৪৪ সালের মে মাসে প্যারিসে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পঞ্চম বছরে পা দিতে যাচ্ছে। নাটকে দেখা যায়, সদ্য মৃত তিন লোক নরকের এক কক্ষে বন্দী হয়ে আছেন, নিজেদের জীবনের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন। সেখান থেকে পালানোর কোনো পথ নেই।
২০২৬ সালের এই সময়ে এসে রুশ কর্তৃপক্ষ যদি মস্কোতে সার্ত্রের এই নাটক মঞ্চস্থ করার অনুমতি দিত, তাহলে যে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেন, ইউক্রেনে চার বছরের বেশি সময় ধরে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সাধারণ রুশরা নাটকটি দেখে কী ভাবতেন।
প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে পুতিন রাশিয়াতে যে চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা জারি রেখেছেন, সেটা ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর যেন অদ্ভুত স্থিতিশীলতায় পৌঁছে গেছে। গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটা যে সবার জন্যই ফাঁদ।
আপাতদৃষ্টিতে সব শান্ত বলে মনে হবে। পুতিন এই ব্যয়বহুল যুদ্ধের অর্থ জোগানোর পথ খুঁজে পেয়েছেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকিয়েছেন, এবং নগদ বোনাসের লোভ দেখিয়ে সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগ দিচ্ছেন। রাশিয়াও সবার সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। যদিও সম্প্রতি কিছু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে, তবু পুতিন আত্মবিশ্বাসী যে এসব এখনো তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগ রাশিয়াকে কিছুটা সুবিধা দিলেও, এটা রুশদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। যেকোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার তো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত হবে। এ ধরনের কিছু বিজয় নিশ্চিত তো করবেই না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পক্ষ থেকে তীব্র সামরিক জবাবের ঝুঁকি থাকবে। এমনকি রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে।
পুতিন ইউক্রেন থেকে চাইলেই সেনা প্রত্যাহার করতে পারছেন না। রাশিয়া যদি বর্তমান যুদ্ধরেখা অনুযায়ী কোনো সমঝোতা মেনে নেয়, তবে কেবল দক্ষিণ ইউক্রেনের সংকীর্ণ এক ফালি ভূখণ্ড ছাড়া পুতিনের ঝুলিতে দেখানোর মতো তেমন কিছুই থাকবে না। কেবল তাঁর আত্মম্ভরিতায় আঘাতই নয়, এত স্বজন হারানোর পর এই ছোট অর্জন রুশ নাগরিকদের সামনে উল্টো এই যুদ্ধের অর্থহীনতাকেই প্রমাণ করবে। তখন তাঁর দুর্বল কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং আত্মম্ভরিতা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পুতিন নিজেকেই কৌশলের ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন। কেবল নিজেকেই নয়, পুতিনবাদের পুরো প্রকল্প যদি তাঁর মেয়াদের পরও টিকে থাকে, সেখানেও অন্তহীন যুদ্ধের বোঝা রয়ে যাবে। পুতিনের আদর্শের যেকোনো ভবিষ্যৎ নেতাই যখন দেখবেন একটি ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ইউক্রেন পশ্চিমা নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং পুরো ইউরোপ সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবেন না।
যদি পুতিনের যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ না থাকে, তাহলে রাশিয়ার সাধারণ জনগণের পুতিনবাদের বাইরেও যাওয়ার উপায় নেই আর। রাশিয়ার সাম্প্রতিক গণ-অসন্তোষকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এই অসন্তোষ বাস্তব, কিন্তু এর মূল নির্যাস হলো এই হতাশা যে পুতিনবাদ তার সব ব্যর্থতা সত্ত্বেও যেন এক অন্তহীন সত্য বলে মনে হচ্ছে।
আজ প্রেসিডেন্টকে কোনো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন সামলাতে হচ্ছে না, কোনো বিরোধী দলও নেই। ইচ্ছামতো রুশ নাগরিকদের দমন করতে পারেন। এমনকি দৈনন্দিন কাজকারবারও এই শাসনব্যবস্থাকে যুদ্ধ এগিয়ে নিতে ও নিপীড়নকে প্রশ্রয় দিতে সহায়তা করে। অধিকাংশ রুশকে কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রের কাজ করতে হয়। বেসরকারি খাতও সরকারের অধীন। তবু রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে তাদের কোনো মতামত নেই।
সামগ্রিকভাবে এই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব। প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নেই। তাঁর শাসনের অবসান বা প্রতিস্থাপন করার কোনো দৃশ্যমান পথ নেই। এই পরিস্থিতিতে মৌখিক প্রতিবাদের ঝলক দেখা দিলেও সেগুলোকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১৮ এবং ১৯ শতকের বিপ্লবের তাত্ত্বিকেরা ‘ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা’র গুরুত্বকে অনুঘটক হিসেবে দেখতেন। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে একটি উন্নত ভবিষ্যৎ সম্ভব, তখন তারা সেই প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৮৯ সালের পূর্ব ইউরোপীয় বিপ্লবগুলোর কথা বলা যায়। মিখাইল গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত এবং পেরেস্ত্রোইকার প্রতিশ্রুতির পরপরই এটা সংগঠিত হয়েছিল।
রুশ জনগণের প্রত্যাশা যেন সীমিত থাকে, সে ব্যাপারে পুতিন তৎপর। আধুনিক, সমৃদ্ধ ও উন্মুক্ত রাশিয়ার যে ওয়াদা ছিল, সেটা স্বৈরতন্ত্র ও অন্তহীন যুদ্ধের চাপে তলিয়ে গিয়েছে। এই অস্বস্তিকর ভারসাম্য চিরকাল চলতে পারে না। সোভিয়েত পতনের পর পুতিন ও পুতিনবাদের প্রাথমিক ওয়াদা ছিল—প্রকৃত স্বাধীনতা না মিললেও, একটি আরামদায়ক পরিবেশ ও উন্নত জীবনযাত্রা এবং দক্ষ শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু পুতিন নিজেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে চরম কর্তৃত্ববাদী হিসেবে গড়ে তুলেছেন, মাঝারি মানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
অন্যদিকে, দুর্বল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছেন, যা বুমেরাং হয়ে খোদ রাশিয়ার দিকেই আঘাত হানছে। রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের একেকটি আঘাত যেন রুশ নাগরিকদের ভালো থাকাটাকেও ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে।
রাশিয়ায় একটি দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য এখন ‘পুতিনবাদে’র সম্পূর্ণ অবসান প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থাটি যতই তার বৈধতা ও কার্যকারিতা হারাবে, পুতিন-পরবর্তী ক্ষমতার দখল নেওয়ার লড়াই ততই তীব্র রূপ ধারণ করবে। যখন সেই সময় আসবে, তখন সেই বছর বিশেক আগে যে স্থিতিশীলতাকে পুতিন চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সেটাও পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির পূর্বাঞ্চলের খুরাইস এলাকায় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমথিত হুতি গোষ্ঠী। হুতিদের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে এসব স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, দুটি হামলাই সফলভাবে লক্ষ্য অর্জন করেছে। ইয়াহইয়া সারি বলেন, হামলাগুলো ছিল নির্ভুল এবং এতে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরব ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। হুতিদের এই মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় ভবিষ্যতে আরো হামলা চালানো হতে পারে। ইয়াহইয়া সারির দাবি, গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং আল-জাওফ, তাইজ, আমরান, হাজ্জাহ ও সাদাহ প্রদেশে সৌদি বাহিনী প্রায় ৫০টি বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে হুতিদের দাবি করা হামলায় সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোর কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
হুথিদের সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান মোকাবিলায় সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের কাছে চারটি কার্গো উড়োজাহাজভর্তি অস্ত্র পাঠিয়েছে পাকিস্তান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা। এসব অস্ত্র ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অস্থায়ী রাজধানী এডেনে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের মিত্র হিসেবে ইয়েমেন যুদ্ধে ইসলামাবাদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ছে—এই অস্ত্র সরবরাহ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছেন এবং ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করছেন। এদিকে পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের একাধিক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, হুথিদের মোকাবিলায় উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা বর্তমানে ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে। এ অবস্থায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনী হুথিদের কাছ থেকে উপকূলীয় এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে পবিত্র নগরী মদিনার একটি বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ করেছে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, একটি ড্রোন তাইবাহ বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। ওই কেন্দ্র থেকে পবিত্র মসজিদে নববিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে হুথিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে কয়েক দশকের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে পাকিস্তান ও তুরস্ক কতটা সহায়তা করে, তা এখন বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ, গত আগস্টে দেশ তিনটি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, যার নাম ‘মক্কা চুক্তি’। এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহায়তা প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে চলমান গুঞ্জনের মধ্যে নতুন এক দাবি করেছেন তার শাশুড়ি তায়্যেবেহ মাহরুযাদেহ। তিনি দাবি করেছেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দাফন ও শেষ বিদায়ের রাতে মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে মোজতবা খামেনিকে উপস্থিত দেখেছিলেন তিনি। দেশটির ইরানওয়্যার এবং জর্ডানভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম রয়া নিউজ বলছে, সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তায়্যেবেহ মাহরুযাদেহ এসব তথ্য জানান। তিনি আরো বলেন, ওই রাতে মোজতবা সম্পূর্ণ সুস্থ ও সবল অবস্থাতেই ছিলেন। উল্লেখ্য, তায়্যেবেহ মাহরুযাদেহ হলেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম-আলী হাদ্দাদ-আদেলের স্ত্রী এবং মোজতবা খামেনির প্রয়াত স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেলের মা। চলতি বছরের শুরুর দিকে আলিয়া খামেনির বাসভবন ও দপ্তরে চালানো হামলায় জাহরা নিহত হয়েছিলেন। গত জুলাইয়ে মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে আলিয়া খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার সময় মোজতবা খামেনির উপস্থিতি নিয়ে জনমনে নানা কৌতূহল ছিল। কারণ দাফন বা শোকানুষ্ঠানের কোনো সরকারি বা দাপ্তরিক ভিডিও রেকর্ডে তাকে দেখা যায়নি, যা তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ ছাড়া চলতি বছরের মার্চের শুরুতে তিনি ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত হলেও এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে আসেননি এবং তার সব নির্দেশ লিখিতভাবেই প্রকাশ করা হচ্ছে।