স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে যোগ হয় রেলপথ। এটি শিবচরসহ এই এলাকার মানুষজনের অনেক কাঙ্ক্ষিত। অথচ চালুর পর থেকে কিছুতেই থামছে না রেলপথের যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা। রেলপথের সিগন্যাল ব্যবস্থার মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরির ফলে বাড়ছে ঝুঁকি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে রেলপথ অনেকটাই আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলে এ অঞ্চলের মানুষজনের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এরপর ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর চালু হয় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত রেল। এরপর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করে রেলগাড়িতে। এতে করে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হয়ে যায়।
তবে এই সহজ যাত্রার সঙ্গে যোগ হয় কিছু ভোগান্তি ও দুর্ভোগ। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে রেলপথের বিভিন্ন এলাকায় সিগন্যালের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও ক্যাবল চুরি। আরেকটি হচ্ছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু।
সিগন্যালের যন্ত্রাংশ-ক্যাবল চুরি
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জুন রাতে মাদারীপুর শিবচরের অংশের পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের সিগন্যাল পয়েন্টের কয়েকটি ট্র্যাক পট (ট্র্যাক সার্কিটের যন্ত্রাংশ) খুলে নিয়ে যায় চোরচক্র।
এর আগে ৯ জুন একই স্টেশনের শিবচর প্রান্তের সিগন্যাল পয়েন্টের সবগুলো ট্র্যাক পট চুরি হয়ে যায়। এছাড়াও গত ১৮ মার্চ শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের ট্র্যাক পট খুলে নিয়ে যায় চোরচক্র। এভাবেই মাঝে মধ্যেই চোরচক্র রেললাইনের বিভিন্ন স্থানের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় বেশ কয়েকবার চোরদের আটক করলেও কোনোভাবেই এই চুরির ঘটনা থামছে না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন চলাচল করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, গত ছয় মাসে ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথের বিভিন্ন স্টেশন থেকে ট্র্যাক পটসহ সিগন্যাল ব্যবস্থার বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনা অনেক বেড়েছে। এসব যন্ত্রাংশ চুরির ফলে ট্রেন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়েছে। এছাড়াও ট্রেন চলাচলেও অতিরিক্ত সময় লাগছে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলওয়ের কর্মীদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে পেপার লাইন ক্লিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। তাই এই চুরি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, এই রুটের ট্র্যাক পট চুরির কারণে ট্রেন চালাতে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সেইসঙ্গে সময়ও বেশি লাগছে। এই চুরি জরুরিভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে।
শিবচরের পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, শিবচরের এই রুটে সিগন্যালের ট্র্যাক পটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। তাই এই রুটে ট্রেন চলাচল ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
ভাঙ্গা রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক) মো. শাহ-জালাল বলেন, ভাঙ্গা জংশন থেকে শিবচর ও পদ্মা স্টেশনের দূরত্ব বেশি। তাই নিয়মিত টহলে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তাই এই রুটে রেললাইনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা খুব বেড়েছে। এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। এতে করে ট্রেন চলাচলে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে এসব চুরির ঘটনায় আগেও মামলা হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকজন চোরকে গ্রেফতার করাও হয়েছে। তবুও চুরির ঘটনা কমছে না। তাই এই চুরি প্রতিরোধ করার জন্য টহল আরও জোরদার করা হবে। যাতে করে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা পায় আর ট্রেন চলাচল নিরাপদ হয়।
নতুন সমস্যা ট্রেনে কেটে মৃত্যু
গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে মাদারীপুর জেলার শিবচরে ট্রেনে কাটা পড়ে কমপক্ষে ২৫ জন মারা গেছে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা সন্ধ্যার পর ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে পদ্মা সেতু হয়ে আংশিক ট্রেন চলাচল শুরু করে। এরপর ডিসেম্বরে পুরোপুরিভাবে এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পদ্মা সেতুর জাজিরা পয়েন্ট থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের দূরত্ব ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে শিবচরে পদ্মা ও শিবচর স্টেশন আছে। ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজশাহী, খুলনা পর্যন্ত ট্রেন চলে এই রুটে।
মাদারীপুরের শিবচরে প্রথমবারের মতো রেললাইন চালু হওয়ায় এই এলাকার মানুষজনের মধ্যে কৌতুল ও আগ্রহ বেশি ছিল। তাই রেললাইন ও রেলগাড়িকে কেন্দ্র করে এই এলাকার মানুষজনের মধ্যে একটি উৎসব ও আনন্দ দেখা যায়। অনেক স্থানে রেললাইনের কাছাকাছি বাড়ি হওয়ায় অনেকেই বিকেল হলে ঘুরতে আসেন। তাছাড়া অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষজন ঘুরতে আসেন। সন্ধ্যার পর ভিড় আরও বাড়ে। তাই অসাধনতাবশত দুর্ঘটনাও অনেকে বেড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি ২০ জুন সকালে শিবচর উপজেলার মাদবরেরচর এলাকার তেলের পাম্প সংলগ্ন স্থানে রেলে কাটা পড়ে একই উপজেলার বাচামারা গ্রামের মোকশেদ হাওলাদারের স্ত্রী শুকরণ বেগম মারা যান। এই বছর কমপক্ষে আরও ৩ জন মারা গেছেন।
২০২৫ সালের ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় মাদারীপুরের শিবচরে উপজেলার মোল্লা বাজার এলাকায় পদ্মা রেলস্টেশনের কাছাকাছি ট্রেনে কাটা পড়ে এক ব্যক্তি মারা যান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বড় কেশবপুর এলাকার রেলসড়কের ৫ নম্বর সেতুতে ট্রেনের ধাক্কায় শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বড় কেশবপুরের বেপারীর কান্দি গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর মোল্লার ছেলে ও একই এলাকার স্থানীয় ইক্বরা রওজাতুল উলুম মাদরাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্র মাহমুদুল ইসলাম (১০) মারা যান। একই বছর ১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শিবচরের পাঁচ্চরবাজার সংলগ্ন মাদবরেরচর এলাকায় এক নারী (৩০) মারা যান।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘুরতে গিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রেললাইনের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর এলাকায় একই উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের আবু খলিফা ওরফে মিজান সরদারের মেয়ে মিথিলা আক্তার (১৭) মারা যান। এসময় ওই কিশোরীর সঙ্গে থাকা তার ১১ মাস বয়সি ভাগনি আয়শার দুই হাত ও পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এছাড়াও মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর গোল চত্বরের পাশে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত এক যুবক মারা যান। একই বছর শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের সীমানা এলাকায় রেলে কাটা পড়ে একই উপজেলার চরকেশবপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান মোড়ল ছেলে ও স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রাকিব (১২) মারা যায়।
তারও আগে ২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর শিবচর উপজেলার পাঁচ্চরের লাইফ কেয়ার হাসপাতাল সংলগ্ন রেললাইনে ছবি তোলার সময় ট্রেনের ধাক্কায় একই উপজেলার মাদবরেরচর ইউনিয়নের লপ্তীকান্দি এলাকার হিরু খানের ছেলে এবং একই ইউনিয়নের মাদবরেরচর রহিমুদ্দিন মাদবর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণি ছাত্র মো. ইব্রাহিম খান (১৪) মারা যান।
পাঁচ্চর এলাকার স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকে এখানে এসে আত্মহত্যা করার ঘটনাও আছে। তা না হলে ট্রেনে কদিন পরপরই এত মারা যাবে কেন। তাছাড়া ট্রেনের নিচে ফেলে হত্যার ঘটনাও থাকতে পারে। তাই এসব ব্যাপারে আইনশৃংখলা বাহিনীর আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
পাঁচ্চর এলাকার রেল সড়কে ঘুরতে আসা স্থানীয় জয়নাল হোসেন বলেন, বিকেল হলেই রেললাইনে মানুষের আড্ডা জমে ওঠে। এছাড়া সকাল-দুপুরেও রেললাইন ধরে অনেককেই হাঁটতে দেখা যায়। আসলে স্থানীয়রা ছাড়া অনেকেই ট্রেন চলাচলের সময় জানে না। দূর থেকে ট্রেন দেখে সরতে গিয়েও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অনেক সময় দেখলে মনে হয় ট্রেন ধীরে আসছে আসলে ট্রেন প্রচণ্ড গতিতে চলে এখানে। তাই অনেক সময় অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে। এ ব্যাপারে সকলের সচেতন হতে হবে।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন, মাঝে মধ্যে রেলে কাটা পড়ে মারা যাবার ঘটনা ঘটে থাকে। সম্প্রতি শুকরণ বেগম নামের এক নারী মারা গেলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
শিবচর স্টেশনের মাস্টার মো. সেলিম হোসেন বলেন, এই লাইনটি খুবই গতিশীল। এখানে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ট্রেন চলাচল করে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রেললাইনে হাঁটাহাঁটি বন্ধ করতে হবে। মানুষকে সচেতন হতে হবে। রেললাইন ঘোরার জায়গা না। তাই এই ব্যাপারে সবার সচেতন হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
মিয়ানমার সীমান্তে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছত্রচ্ছায়ায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীপ্রধান নবী হোসেনের বাহিনীকে একটি শক্তিশালী ‘প্রক্সি’ গ্রুপ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এতোদিন মাদক ও অস্ত্রের কারবারকে কেন্দ্র করে সক্রিয় থাকা নবী নেটওয়ার্ককে এখন সীমান্তের নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম একটি সশস্ত্র শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের বিরোধ মিটিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে নবী হোসেনের যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছে এবং আরসাসহ ক্যাম্পে সক্রিয় একাধিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একই বলয়ে আনার উদ্যোগ চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নবী হোসেন ঘনিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নবী নেটওয়ার্কে আধুনিক ও ভারি অস্ত্রের সরবরাহ বাড়ানো, রকেটসহ ভারি অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মাদক ব্যবসা থেকে আসা অর্থ এই নেটওয়ার্কের অস্ত্র, লোকবল ও যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও দাবি তাদের। তাদের মতে, ইরানকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর আদলে নবী বাহিনীকে এমন একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্কে পরিণত করার চেষ্টা চলছে, যার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান না থাকলেও আড়াল থেকে নির্দিষ্ট স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আরসার আমির আতা উল্লাহ জুনুনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কারাগারে থাকায় বর্তমানে সংগঠনটির কমান্ডারের দায়িত্বে থাকা রোহিঙ্গা আবদুল খালেকসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একই কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলেও সূত্রগুলোর দাবি। তাদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, সীমান্ত নিরাপত্তায় চাপ তৈরি এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতেই এ ধরনের সশস্ত্র ‘প্রক্সি’ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের সঙ্গে থানা লুটের অস্ত্র নবী নেটওয়ার্কে পৌঁছানো এবং সীমান্তের ওপারে বিপুল অস্ত্র মজুতের তথ্য যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। থানা লুটের ১৭ পিস্তল এখন নবীর হাতে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ পৌঁছে গেছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীপ্রধান নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য ও নবী হোসেনের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, এ পর্যন্ত অন্তত ১৭টি পিস্তল ওই নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে। আরও ১০টি লুট হওয়া পিস্তলের একটি চালানও যেকোনো সময় তার বাহিনীর হাতে পৌঁছাতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র একের পর এক নবী হোসেনের হাতে পৌঁছানোর ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অভিযোগে আলোচিত এ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, থানা লুটের এসব অস্ত্র কয়েক হাত ঘুরে নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে পৌঁছাচ্ছে। অস্ত্র সংগ্রহে জড়িত কয়েকজনের নামও পেয়েছে এক জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। তাদের মধ্যে রয়েছেন উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু বশর, যিনি নবী হোসেনের ইয়াবা ব্যবসার ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত। রামুর গর্জনিয়া এলাকার যুবলীগ নেতা গোলাম মওলা, ধুমধুমের ইলিয়াস মাঝিসহ আরও কয়েকজন অস্ত্র সংগ্রহ করে তার নেটওয়ার্কে পৌঁছাতে সহযোগিতা করেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এক জাতীয় দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধান, গোয়েন্দা সংস্থা ও একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নবী হোসেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ভারি ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্রের প্রায় সবই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বলে সূত্রগুলোর দাবি। এর মধ্যে জি-৩, এম-১৬, একে-৪৭-এর মতো সামরিক রাইফেল, বিদেশি পিস্তলসহ নানা ধরনের অস্ত্র রয়েছে। তার বাহিনীর কাছে ভারি গ্রেনেড ও রকেটের মতো বিধ্বংসী অস্ত্রও রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রগুলোর দাবি, অস্ত্রভান্ডারের বড় একটি অংশ মিয়ানমারের তোতার দ্বীপসংলগ্ন সীমান্তের ওপারে মজুত করা হয়েছে। ২০২২ সালে নবী হোসেনকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তার ভাই মো. কামাল গুলিতে নিহত হওয়ার পর ক্যাম্পের ভেতরে নবী গ্রুপ কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০২২ সালেই হাজার কোটি টাকার অস্ত্র আনার তথ্য ২০২২ সালের ২৯ এপ্রিল এক জাতীয় দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘রোহিঙ্গা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা! হাজার কোটি টাকার অস্ত্র আনছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে নবী হোসেনের নেটওয়ার্কের বিপুল অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ‘স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। এ বিষয়ে নজর রাখা গোয়েন্দা সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নবী হোসেনের ঘনিষ্ঠদের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সহযোগিতায় হাজার কোটি টাকার ওই অস্ত্রের চালান কয়েক দফায় সফলভাবে নবী হোসেনের হাতে পৌঁছায়। পরবর্তীকালে নবী হোসেনের ডেরায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এম-১৬, একে-৪৭, বিদেশি পিস্তলসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ইলিয়াসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার মতে, নবী হোসেনের হাতে তিন হাজার নয়, এর কয়েক গুণ বেশি অস্ত্র থাকতে পারে। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবাই নবী হোসেন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত বলে আমরা জানি। তার বাহিনীতে ১০ থেকে ১৫ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে বলেও আমরা শুনেছি।’ কে এই নবী হোসেন: ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আট লাখের বেশি রোহিঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশে আসেন নবী হোসেন। তার বাড়ি রাখাইনের মংডু শহরের ঢেকুবনিয়ায়। উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৮ পশ্চিমের বি-ব্লকের ৪১ নম্বর শেডে আশ্রয় নেন তিনি। ২০১৮ সালের শুরুতে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইয়াবার বড় চালান আনা শুরু করেন নবী। পরে ক্যাম্পে গড়ে তোলেন ‘নবী হোসেন বাহিনী’। পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, এ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ১০ হাজারের বেশি। বালুখালীর ক্যাম্প-৮ পশ্চিম, ৯, ১০ ও ১৪ তার নেটওয়ার্কের প্রভাবাধীন বলে বিভিন্ন সময়ে তথ্য পাওয়া গেছে। মাদক ব্যবসায় নবীকে কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী অর্থ ও কমিশনের বিনিময়ে সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ। এর মধ্যে মাস্টার মুন্না, ইসলাম, আবদুল হাকিম, আসাদ, জুবাইর, জাবু, মুমিন, জাকির ও শফিউল্লাহ বাহিনীর নাম রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসার অর্থের একটি অংশ অবৈধ পথে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। দেশে-বিদেশে তার সম্পদের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা বিজিবির বিজিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নবী হোসেনকে জীবিত অথবা মৃত ধরতে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় তার গতিবিধি ও নেটওয়ার্কের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না বলেও জানান তারা। ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, উখিয়া, কক্সবাজারের অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্যাম্পে নবী হোসেন গ্রুপসহ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। নবী হোসেনকে গ্রেফতারেও বিশেষ নজর রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, নবী হোসেনের কাছে বিপুল অস্ত্র থাকার তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব অস্ত্র নিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকা বা দেশের অভ্যন্তরে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড চালাতে পারলে তাকে রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু তাকে গ্রেফতার নয়, অস্ত্রের উৎস, মজুতস্থল ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করাও জরুরি।
বগুড়ার সান্তাহার জংশনের কাছে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সান্তাহার রেলওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনটি সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সান্তাহার জংশনে পৌঁছালে পেছনের দিকের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। খবর পেয়ে সান্তাহার জংশন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। সান্তাহার রেলওয়ে থানার ওসি দুলাল বলেন, সন্ধ্যা ৭টার দিকে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হওয়ার খবর পাই। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে আসি। আমাদের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও স্টেশন কর্তৃপক্ষও রয়েছেন। আমরা প্রাথমিকভাবে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, লাইনচ্যুত বগিটি উদ্ধারের জন্য ঈশ্বরদী থেকে রিলিফ ট্রেনকে খবর দেওয়া হয়েছে। রিলিফ ট্রেনটি উদ্ধারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন ৬ থেকে ৭ হাজার যাত্রী। এই স্টেশন থেকে প্রতি মাসে সরকারের প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। কিন্তু যাত্রী নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্টেশনের সব সিসিটিভি ক্যামেরাই অচল হয়ে আছে। স্টেশনে স্থাপিত ১৪টি এবং রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির আরও ৬টি—মোট ২০টি ক্যামেরার কোনোটিই বর্তমানে কার্যকর নেই বলে জানা গেছে। ফলে স্টেশনে চুরি, ছিনতাই কিংবা মাদকসহ কোনো অপরাধ ঘটলে ঘটনাটি শনাক্ত করা এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ না হওয়ায় অপরাধের সময় ঘটনাস্থলের গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যও পুলিশের হাতে থাকছে না। সড়কপথের যানজট ও দীর্ঘ সময়ের ভোগান্তি এড়াতে নিরাপদ ও দ্রুত যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন হাজারো মানুষ রেলপথ বেছে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, সিসিটিভি অচল থাকায় স্টেশন এলাকায় পকেটমার, ছিনতাই, টিকিট কালোবাজারি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাতে স্টেশনের বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির কিছু সদস্যের যোগসাজশে স্টেশন এলাকায় মাদক পাচার, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। চুরি-ছিনতাই ও মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে স্টেশন এলাকার কয়েকটি অংশের সীমানাপ্রাচীরও ভেঙ্গে আছে। পুলিশ বলছে, এসকল অংশ দিয়ে রাতে মাদকসেবীদের আনাগোনা ও আড্ডা বসে। যাত্রী ও স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সীমানাপ্রাচীর সংস্কারের পাশাপাশি স্টেশনের সব সিসিটিভি ক্যামেরা সচল করা এবং মাদক, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। রেলওয়ে পুলিশ বলছে, স্টেশন এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগ নিয়মিতই আসে। সম্প্রতি এক প্রবাসীর মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনাতেও সিসিটিভি অচল থাকায় ফুটেজ দেখে ছিনতাইকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক শাহ আলম বলেন, সিসিটিভি সচল থাকলে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়ত। স্টেশন এলাকার অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা সমাধান করা গেলে মাদক, চুরি ও ছিনতাই দমনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। এবিষয়ে স্টেশন মাস্টার মো. শাকির জাহান বলেন, ক্যামেরাগুলোর হার্ডডিস্কে সমস্যা হওয়ায় গত প্রায় ১৫ দিন ধরে স্টেশন এলাকার কোনো ফুটেজ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে স্টেশনে ১৪টি ক্যামেরা রয়েছে। আরও ১৪টি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। খুব শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে বলেও জানান তিনি।