জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পূর্তি আজ। এই দিনেই তফশিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে ইসি। এজন্য অনানুষ্ঠানিক কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভা শেষে তফশিল ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ জানানো হতে পারে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গণভোটের অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এই খসড়ার কপি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে পৌঁছেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই অধ্যাদেশটি জারি হওয়ার কথা রয়েছে। অধ্যাদেশ জারির পরই গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করবে ইসি।
তফশিল ঘোষণার সময় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে একজন নির্বাচন কমিশনার জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কাজ আবারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা যায়। এসব কাজ তফশিল ঘোষণার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই করা হচ্ছে। তিনি জানান, খুব শিগগিরই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং কমিশনের এক বছর পূর্তিতে কিছু বার্তাও দেওয়া হবে।
জানা গেছে, ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে তফশিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৪, ৭ ও ৮ ডিসেম্বর সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে বিবেচনায় আছে। ভোটগ্রহণ হতে পারে ৫, ৭, ৮ বা ১২ ফেব্রুয়ারি। তফশিল ঘোষণা থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দুই মাস সময় রাখার অভ্যাস অনুসরণ করা হতে পারে। কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ৮ ফেব্রুয়ারি রবিবার হওয়ায় দিনটি ভোটের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। অতীতে কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন রবিবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে সুবিধাজনক প্রমাণিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটগ্রহণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় রয়েছে ভোট আদৌ হবে কি না সে নিয়েও অনেকের প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখা যাবে এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, তফশিল ঘোষণার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিগুলো দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ৮১টি পর্যবেক্ষক সংস্থার সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এই সংলাপের মাধ্যমে তফশিলের আগে সকল আলোচনার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে চায় কমিশন। তবে কিছু রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিচ্ছে না, যদিও তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে আইনগত বাধা নেই। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় একটি প্রধান রাজনৈতিক দল এখনো ভোটে অংশ নিতে পারছে না।
আগামী ২৭ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবে ইসি। ৩০ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, কয়েকজন সচিব এবং বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, কর্মকর্তাদের নিয়োগ, মালামাল ব্যবস্থাপনা এবং ভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তফশিল ঘোষণার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার উদ্দেশ্যে ‘মক ভোটিং’ এর আয়োজন করছে ইসি। আগামী সপ্তাহে রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই মক ভোটিং অনুষ্ঠিত হবে। এতে নির্বাচনের সময় ভোটারদের সম্মুখীন হতে পারে এমন সমস্যা, ভোট দিতে একজনের কত সময় লাগে, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অসুবিধায় থাকা ভোটারদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এসব বিষয় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন নির্বাচন কমিশনাররা। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।
জাতীয় নির্বাচনের বড় প্রস্তুতি হিসেবে ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনসামগ্রী সংগ্রহ, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক সংস্থা নিবন্ধন, কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, প্রবাসীদের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ উদ্বোধনসহ বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত মামলাগুলো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
গণভোট প্রস্তুতি :
অধ্যাদেশ জারির পর গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করবে ইসি। এই বিধিমালায় ব্যালটের ধরন, ভোটগ্রহণ, গণনা প্রক্রিয়া ইত্যাদি উল্লেখ থাকবে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য পৃথক রঙের ব্যালট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সংসদ নির্বাচনে প্রচলিত সাদা-কালো ব্যালট এবং গণভোটের জন্য সবুজ বা গোলাপি ব্যালট বিবেচনায় আছে।
একই ব্যালট সিল ব্যবহার করা হবে নাকি পৃথক সিল এ বিষয়ে কমিশন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে দুটি সিল ব্যবহার করলে ভোটার বিভ্রান্ত হতে পারেন, তাই একটি সিল রাখার সম্ভাবনাই বেশি। ইতোমধ্যে সংসদ নির্বাচনের জন্য যে সিল সংগ্রহ করা হয়েছে, সেটিতে ‘১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ লেখা আছে। গণভোটের ব্যালটে এটি ব্যবহার হবে কি না সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। নতুন সিল সংগ্রহ করতে হলে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতেও অন্তত এক মাস সময় লাগবে।
নির্বাচনে একই দিনে দুটি ব্যালট ব্যবহারের ফলে ভোট দিতে সময় বেশি লাগবে। এজন্য প্রতি ৫০০ নারী ও ৬০০ পুরুষ ভোটারের জন্য আলাদা ভোটকক্ষ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভোটকক্ষ বাড়লে কর্মকর্তার সংখ্যাও বাড়বে ফলে খরচও বাড়বে। প্রতিটি ভোটকক্ষ বাড়াতে প্রায় ১৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। মক ভোটিংয়ের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিকে মাসিক সম্মানি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য বাজেটে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গঠিত সংশ্লিষ্ট সেলের সপ্তম সভায় এ তথ্য জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ও সেল সভাপতি মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। সভায় তিনি বলেন, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানি প্রদানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম বছরে দেশের মোট এর চতুর্থাংশ ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন সুবিধাভোগীকে এ ভাতা প্রদান করে আগামী চার বছরে শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এর আওতায় আসবে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ৮২,৬৫৬টি মসজিদের ২,৪৭,৯৬৮ জন, ৩০০০ মন্দিরের ৬০০০ জন, ৭৫২টি বৌদ্ধ বিহারের ১৫০৪ জন এবং ৩০১টি গির্জার ৬০২ জন উপোকারভোগীকে এ অর্থ প্রদান করা হবে। মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৬০১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের মোট ১৩,৯৪৯ জনকে সম্মানি প্রদান করা হয়েছে। জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বলেন, মাসিক ভিত্তিতে ইমাম, পুরোহিত, বিহার অধ্যাক্ষকে ও যাজকদের ৫০০০ টাকা, মুয়াজ্জিন, সেবাইত, বিহার উপধ্যাক্ষ ও সহকারি যাজকদের ৩০০০ এবং মসজিদের খাদেমদের ২০০০ টাকা হারে এ সম্মানি প্রদান করা হবে। এছাড়া বছরে প্রত্যেকে ২০০০ টাকা করে উৎসব ভাতা পাবেন। উপকারভোগীর চাহিদা অনুযায়ী মোবাইল ব্যাংকিং বা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এ অর্থ প্রদান করা হবে। সভায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি, শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, গাইবান্দা-৪ এর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার, ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক এবং অর্থ বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ধউর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার অংশের দুটি সার্ভিস লেন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সার্ভিস লেন চালু হওয়ার পর নিচের বিদ্যমান সড়ক বন্ধ করে সেখানে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভায়াডাক্ট নির্মাণকাজ শুরু হবে। আব্দুল্লাহপুর থেকে ধউর পর্যন্ত একপাশের সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে এবং অপর পাশের কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৮ সালের জুনে চালুর লক্ষ্য: ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়েটি কাওলা থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো ও বাইপাইল হয়ে সাভারের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দ্রুতগতির সড়ক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্প পরিচালক বলেন, ২০২৮ সালের জুনে পুরো এক্সপ্রেসওয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগোচ্ছে। ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯,৫০০ কোটি টাকা: সম্প্রতি একনেক সভায় প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৯ হাজার ৪৯২ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি। শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। এর ফলে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি ভ্যাট, ট্যাক্স ও কাস্টমস ডিউটির পরিমাণও বেড়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির খাতসমূহ: ডলারের মূল্যবৃদ্ধি: ৩,৭৩৬.৬১ কোটি টাকা ভ্যাট ও ট্যাক্স বৃদ্ধি: ১,০৩০.৩৬ কোটি টাকা কাস্টমস ডিউটি: ৩৯০.৭৩ কোটি টাকা নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি: ৮১০.২৮ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণ: ৭৪৭.৫৫ কোটি টাকা পরামর্শক সেবা: ২৫৭.৯ কোটি টাকা নতুন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তিনটি নতুন অঙ্গ: বাইপাইল তিনস্তরবিশিষ্ট ইন্টারসেকশন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের প্রবেশ ও প্রস্থান র্যাম্প নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১ (পাতাল মেট্রোরেল) এর সঙ্গে সংযোগ এ ছাড়া তুরাগ নদীর শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে তিনটি সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স পরিবর্তন এবং কাওলা রেলক্রসিংয়ের ক্লিয়ারেন্স পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত ১,৭৭০.৮৪ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। অগ্রগতি ৭১.৫ শতাংশ: প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৭১.৫০ শতাংশ এবং ভৌত নির্মাণ অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশ। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর ও ইপিজেড এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.২১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষজ্ঞের মতামত: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে একই সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে হলে দুই প্রকল্পের কাজ সমন্বিতভাবে শেষ করা জরুরি। তাহলেই উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গমুখী যানবাহন ঢাকার ভেতরে প্রবেশ না করে বিকল্প উড়ালপথ ব্যবহার করতে পারবে।
“আমার ছেলে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, দুই বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার পাইনি। সরকারের কাছে একটাই দাবি— আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।” কথাগুলো বলছিলেন জুলাই আন্দোলনে নিহত রফিকের মা চায়না বেগম। মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার রূপসা এলাকায় রফিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট দুটি ঘরে এখনো শোকের ছাপ স্পষ্ট। এক ঘরে থাকেন বাবা-মা, অন্য ঘরে ছোট বোন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে তারা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবার জানায়, সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে তারা এককালীন ৪ লাখ টাকা, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং অতিরিক্ত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন। সঞ্চয়পত্রের আয় দুই ভাগে ভাগ হয়—এক অংশ পান রফিকের বাবা, অন্য অংশ পান তার স্ত্রী ও সন্তান। কৃষিকাজ ও ওই আয়ের ওপর নির্ভর করেই এখন সংসার চলছে। রফিকের ছোট বোন নূর নাহার সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। অন্যদিকে, রফিকের স্ত্রী শাবনূর আক্তার ও তাদের তিন বছরের কন্যা রাইসা বর্তমানে বাবার বাড়িতে বসবাস করছেন। পরিবারের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পাটুরিয়া পুরাতন লঞ্চঘাট এলাকায় নৌ পুলিশের গুলিতে রফিক নিহত হন। তারা দাবি করেন, ঘটনার মূল অভিযুক্ত নৌ পুলিশের সদস্য শেখ এমদাদ হোসেনকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। জানা যায়, ওই দিন দুপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পদ্মা নদীতে থাকা একটি স্পিডবোট থেকে নৌ পুলিশের কয়েকজন সদস্য আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ২৪ বছর বয়সী রফিক। রফিকের পরিবার দাবি করছে, মামলায় মোট ৪৯ জনকে আসামি করা হলেও মূল অভিযুক্তকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারা আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে গুলিবর্ষণকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব। নিহত রফিকের স্ত্রী শাবনূর আক্তার বলেন, “সবাই বলেছিল আমাদের পাশে থাকবে। কিন্তু এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমার মেয়ে এখনো বাবাকে খোঁজে। ও যখন বুঝবে যে তার বাবা নেই, তখন আমি কী উত্তর দেব?” রফিকের চাচাতো ভাই জামাল হোসেন বলেন, “যে নৌ পুলিশ সদস্য গুলি করেছে, তার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি বলতে পারব না।” ঘটনার সময় রফিকের সঙ্গে থাকা বন্ধু সাকিব খান জানান, আন্দোলনের সময় তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানতে পারেন, রফিক নিহত হয়েছেন। তার অভিযোগ, নৌ পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু ব্যক্তি গুলিবর্ষণে জড়িত ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রমজান মাহমুদ বলেন, “মূল আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হোক।” এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, “রফিক হত্যা মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। মূল আসামির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” রফিক ২০২৩ সালে জীবিকার তাগিদে নারায়ণগঞ্জে জাহাজ ঝালাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না; বাড়িতে ছুটিতে এসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাতে অংশ নেন। ৫ আগস্ট দুপুরে বাবার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।