ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এরই মধ্যে নিজ দল এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর জন্য ছাড় দেওয়া আসনে প্রার্থী তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করেছে।
তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিএনপির সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতায় যাচ্ছে এমন গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হচ্ছে না। বরং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোচ্ছে এনসিপি। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের একাধিক বৈঠকে নীতিগতভাবে এ সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বুধবার জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দুদফায় বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। বৈঠকগুলোতে আনুষ্ঠানিক জোটের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে মূলত আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়। সংস্কার, বিচারসহ কয়েকটি মৌলিক ইস্যুতে দুই দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
আসন সমঝোতা হলে এনসিপিকে কতটি আসন দেওয়া হবে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, এনসিপি অন্তত ৫০টি আসনের নিশ্চয়তা চাইলেও জামায়াতে ইসলামী ৩০টি আসনের প্রস্তাব দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও ৩০ থেকে ৫০টি আসন ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এসব আসনে এনসিপির বর্তমান জোটসঙ্গী আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও থাকতে পারে।
এনসিপির সংশ্লিষ্ট এক নেতা জানান, দলটি বিভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে এবং খুব দ্রুত জোট বা আসন সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতায় আগ্রহী ছিলেন এনসিপির অনেক নেতা। তবে বিএনপি ইতোমধ্যে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করায় সেই সুযোগ আর নেই। বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেই নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছে এনসিপি। এতে ৩০–৫০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হলে এনসিপির ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় কিছু রদবদল হতে পারে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপির ভেতরে ও বিভিন্ন দলের সঙ্গে রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা চলছে। এখনো চূড়ান্তভাবে কোনো জোট বা আসন সমঝোতা ঘোষণা করা হয়নি। বিএনপি বা জামায়াত—উভয়ের সঙ্গেই আলোচনা হয়েছে এবং খুব দ্রুত বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারা জোট সম্প্রসারণে আগ্রহী। বিএনপির পথ বন্ধ হলেও জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা হলে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ কমবে এবং আসনের নিশ্চয়তাও বেশি থাকবে বলে মনে করছেন তারা। জোটে আরও কয়েকটি দল যুক্ত হতে পারে এবং চলতি সপ্তাহেই তা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবি পার্টির এক নেতা বলেন, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় না যাওয়া দলগুলো এই জোটে যুক্ত হতে পারে। তবে নির্বাচনে বড় সুবিধা না হলে বড় কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোলা থাকবে—সেক্ষেত্রে জামায়াতই এগিয়ে আছে।
জামায়াতের সঙ্গে চূড়ান্ত জোট না হলেও গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের ব্যানারে নির্বাচন করার প্রস্তুতিও রয়েছে। এরই মধ্যে সমন্বিত প্রার্থী বাছাই, যৌথ ইশতেহার, ব্র্যান্ডিং ও প্রচার কৌশল নির্ধারণে পৃথক উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।
এনসিপি প্রথম ধাপে ১২৫টি আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪০–৫০টি আসনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের পথে। এবি পার্টি ১০৯টি আসনে এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ অন্যান্য দল মিলিয়ে নতুন জোটে ৪০–৫০টি আসনে প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব প্রার্থী নিয়ে ৩০০ আসনে সমন্বিত মনোনয়ন ঠিক করার প্রক্রিয়া চলছে।
এনসিপির নেতারা মনে করছেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ নেতৃত্বের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও ধারাবাহিক হুমকিতে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা, আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াই এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তুলতে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে আসন সমঝোতা হলেও এনসিপি নিজেদের প্রতীক ‘শাপলা কলি’ নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবে। জোটে থাকা বা যুক্ত হতে যাওয়া দলগুলোর মধ্যেও এ প্রতীকেই নির্বাচন করার আগ্রহ রয়েছে, বিশেষ করে যেসব দলের নিবন্ধন নেই। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানিয়েছেন, অন্য কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা হলেও এনসিপির কোনো প্রার্থী ভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করবেন না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জামায়াতের ইশতেহার প্রগতিশীল, উদ্ভাবনী ও তারুণ্যনির্ভর লেগেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শেহরিন আমিন ভূঁইয়া (মোনামী)। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণার পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, জামায়াত, শিবির বা এনসিপিতে যারা আছেন এখানে সব শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা; একেকজন পিএইচডি করছে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার। তারা টেকনোলজি ভিত্তিক একটা ইশতেহার দিয়েছে। এটা করা তাদের জন্য কোন অবিশ্বাস্য বিষয় না। তাদের ইচ্ছা আছে, জনশক্তি আছে, ক্যাপাসিটিও আছে, তাহলে এটা কেন বাস্তবসম্মত হবে না। এই ঢাবি শিক্ষিকা আরও বলেন, তাদের পুরো ইশতেহার আমার কাছে খুবই প্রগতিশীল, উদ্ভাবনী ও তারুণ্যনির্ভর লেগেছে। তারা বিভিন্ন অ্যাপ্সের কথা বলেছে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক কথা বলেছেন, এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে আমাদের দেশে। তিনি বলেন, নারী বিষয়ের ইশতেহারও আমি দেখেছি, যেহেতু এই বিষয়ে আগে কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখেছিলাম তাই আমিও শুরুতে একটু উদ্বিগ্ন ছিলাম। কারণ আমিও একজন অ্যাম্বিশিয়াস একজন নারী, তাই আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি সব জায়গায় যাই না, এনসিপির ইশতেহারে গিয়েছিলাম এবং এখানে এসেছি এই জন্য যে, যদি সামনে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করে তাহলে বাংলাদেশের বিষয়ে তাদের ধারণা ও বিশেষ করে নারীদের নিয়ে তারা ভাবছেন কী। মোনামী বলেন, আমি যখন দেখলাম তারা যে পলিসিগুলো দিয়েছে খুবই ভালো ও ভালো চিন্তার, তা দেখে বুঝা যাচ্ছে তারা এবার যথেষ্ঠ ইনক্লুসিভ পলিসিতে বিশ্বাস করছেন এবং এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি এবার তারা হিজড়া কমিউনিটি নিয়েও একটি আলাদা পলিসি রেখেছে। ঢাবি শিক্ষিকা আরও বলেন, তাদেরকে অনেক কনজারভেটিভ মনে করতাম, কিন্ত মনে হচ্ছে এবার তারা সেখান থেকে সরে এসেছে। আমি অবাক হয়েছি তারা যে হিজড়া কমিউনিটির বিষয়টা মাথায় রেখেছেন। সবমিলিয়ে তারা নারীদের নিয়ে যে পলিসি দিয়েছেন আমার কাছে মনে হয়েছে খুব সুন্দর পলিসি। মোনামী বলেন, ইশতেহার পড়ে আমারও কিছু আইডিয়া হয়েছে, আবার জামায়াত আমির এটাও বলেছেন; ইশতেহার সম্পর্কে কেউ সাজেশন বা রিকমেন্ডেশন দিতে পারেন, পরে হয়তো কিছু সংশোধন আসতে পারে। আমি কয়েকটা আইডিয়া দিব তাদেরকে, আমার মাথায় ঘুরঘুর করছে। এতদিন কোনো অনুষ্ঠানে যাইনি। এই অনুষ্ঠানে এসে মনে হয়েছে দেশ গঠনের জন্য তারা যদি সচেষ্ট হন, ইশতেহারের কথাগুলো কার্যকর করতে পারলে দেশের জন্য ভালো হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে আগামী ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আজ বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে সুবিধা নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলেরর সহযোগিতা কামনা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
রাজনীতি মানব সমাজ পরিচালনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। ইসলাম—রাজনীতিকে ধর্মের বাইরে কোনো বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে নয়, বরং এটিকে নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মৌলিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত। এই আয়াতে ক্ষমতা লাভের পর ইসলামী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে—‘তাদের যদি আমরা জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই হাতে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১) আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির চারটি মৌলিক ভিত্তি ও একটি নৈতিক পরিণতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। ১. নামাজ কায়েম করা : ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে নামাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে পাঁচটি ভিত্তির ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে এর মধ্যে নামাজ দ্বিতীয়। নামাজ ছাড়া ইসলামের মৌলিকত্ব অসম্ভব। ঈমানের পর ইসলামে নামাজের চেয়ে অধিক গুরুত্ব অন্য কোনো ইবাদত প্রদান করা হয়নি। ইসলামী রাজনীতির প্রথম অঙ্গীকার হলো নামাজ কায়েম করা। সব মানুষ আসলে নামাজি হয়ে গেলে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলাই থাকবে না। কারণ নামাজ মানুষকে অবশ্যই অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫) কাজেই নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আল্লাহভীতির প্রতীক। যে রাষ্ট্র নামাজকে গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্র নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে। ২. জাকাত আদায় : জাকাত ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অতএব, ইসলামী রাজনীতির ইশতেহারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি থাকা আবশ্যক। জাকাত ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার। জাকাত দানকারীদের নিজ দায়িত্বে জাকাতের সম্পদ জাকাত গ্রহিতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের (ধনীদের) ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৯) ৩. সৎ কাজের আদেশ : ‘সৎ কাজের আদেশ’ ইসলামী রাজনীতির গঠনমূলক দিক। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু নিষেধের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চায়। সৎ কাজের প্রসার মানে হলো—নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। এটি ইসলামী রাজনীতিকে ইতিবাচক ও জনমুখী করে তোলে। ৪. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ : ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। এর অর্থ হলো— দুর্নীতি, জুলুম, শোষণ ও নৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইসলামী রাষ্ট্রে আইন হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রয়োগ হবে পক্ষপাতহীন। এ দিকটি ইসলামী রাজনীতিকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর তারাই হবে সফল।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১০৪) ৫. আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনা : আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর হাতে’—এটি ইসলামী রাজনীতির নৈতিক উপসংহার। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; এর চূড়ান্ত পরিণাম আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস শাসকদের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখে এবং রাজনীতিকে ইবাদত ও আমানতের মর্যাদায় উন্নীত করে। পরিশেষে বলা যায়, সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির ইশতেহার হবে এমন একটি নীতিপত্র, যা নৈতিকতায় পরিশুদ্ধ, অর্থনৈতিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক, সামাজিকভাবে কল্যাণমুখী এবং সর্বোপরি আল্লাহভীতিতে পরিচালিত। এই ইশতেহারে ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ইসলামী রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং এটি মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাজনীতি। লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়