শিক্ষা বোর্ডগুলোর কঠোর নির্দেশনা ও সচেতনতামূলক বার্তার পরও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না। নিয়মানুযায়ী কেবল নির্ধারিত পরীক্ষকদের খাতা দেখার কথা থাকলেও অনেক পরীক্ষক সেই খাতা শিক্ষার্থীদের দিয়ে মূল্যায়ন করিয়ে নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া নম্বর গণনা, বৃত্ত ভরাট করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও শিক্ষার্থী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি, কিছু কিশোর-তরুণের এসএসসির খাতা দেখার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, পরীক্ষকের বদলে তাঁর ছাত্র বা পরিচিত তরুণরা উত্তরপত্র নিয়ে গোল হয়ে বসে আছে। কেউ খাতা পড়ছে, কেউ নম্বর দিচ্ছে, আবার কেউ অতি গুরুত্বপূর্ণ ওএমআর শিটের বৃত্ত ভরাটের কাজ করছে। খাতা দেখার এসব ছবি ও ভিডিও অনেকে নিজেদের প্রোফাইলে বিভিন্ন ক্যাপশন দিয়ে পোস্ট করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনে চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, নম্বর গণনা এবং বৃত্ত ভরাটের অন্তত ৮টি ভিডিও-রিলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেসব ভিডিওতে দেখা গেছে বোর্ড থেকে দেওয়া উত্তরপত্রের বান্ডিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে শিক্ষার্থী ও কিশোরদের সামনে। কিছু ভিডিওতে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, যশোর ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের খাতা দেখা গেছে। ঢাকা বোর্ডের এবং কুমিল্লাসহ কিছু বোর্ডের ২০২৫ কিংবা তারও আগের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের কিছু ভিডিও নতুন করে পোস্ট করে ট্রেন্ডে আনা হয়েছে।
এসব ভিডিওতেও দেওয়া হয়েছে চটকদার ক্যাপশনও। এর মধ্যে টিকটকের বেশকিছু ভিডিওতে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে—'সবার সাথে বসে এসএসসি পরীক্ষার খাতা দেখলাম', '২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী, কে কে আছো কমেন্টে জানাও', 'এখানে কার কার ভবিষ্যৎ আছে কমেন্ট করে জানাও' প্রভৃতি।
খাতা দেখায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়, জানেন অনেকে!
কেন এবং কীভাবে খাতা দেখার মতো স্পর্শকাতর কাজ শিক্ষার্থীদের হাতে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর বেশ কয়েকজন পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমন 'অনিয়ম' হয় বলে একরকম স্বীকার করে নিয়েছেন। তারা বলছেন, সময় স্বল্পতা, অবহেলা এবং বাড়তি আয়ের নেশা থেকে কিছু পরীক্ষক এই প্রতারণার আশ্রয় নেন।
নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক পরীক্ষক বলেন, অনেক পরীক্ষক একটি 'মডেল উত্তরপত্র' শিক্ষার্থীদের হাতে ধরিয়ে দেন এবং বলেন সে অনুযায়ী নম্বর দিতে। কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের উত্তরের বৈচিত্র্য বোঝার মতো গভীরতা বা অভিজ্ঞতা ওইসব তরুণ শিক্ষার্থীর নেই। ফলে যারা একটু ভিন্নভাবে বা নিজের ভাষায় উত্তর লেখে, তারা এই অপেশাদার মূল্যায়নের শিকার হয়ে নম্বর কম পায়।
রাজধানীর একটি স্কুলের একজন সিনিয়র শিক্ষক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বোর্ডের খাতা দেখছেন, তিনি জানান, মূলত সময় বাঁচানোর জন্যই অনেকে এই পথ বেছে নেন। একজন পরীক্ষককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩০০ থেকে ৫০০ খাতা মূল্যায়ন করতে হয়। আবার অনেক শিক্ষক কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউশনিতে ব্যস্ত থাকেন। ফলে তারা খাতাগুলো নিজেরা না পড়ে তাদের বিশ্বস্ত ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পরিচিতদের দিয়ে দেন। তারা কেবল শেষে নম্বরগুলো একবার যাচাই করে স্বাক্ষর করে দেন।
আরেক পরীক্ষক জানান, খাতা দেখার চেয়েও বেশি অনিয়ম হয় নম্বর গণনা ও ওএমআর শিট বৃত্ত ভরাটের ক্ষেত্রে।
ময়মনসিংহ বোর্ডের এক পরীক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক পরীক্ষক মনে করেন মূল্যায়নের কাজটা নিজে করলেই হলো, কিন্তু নম্বর যোগ করা বা বৃত্ত ভরাট করা তো যান্ত্রিক কাজ, তাই তারা এই কাজে নিজেদের সন্তান বা স্কুলের শিক্ষার্থীদের বসিয়ে দেন। অথচ এই যোগফল বা বৃত্ত ভরাটে সামান্য ভুল হলেই একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল ওলটপালট হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো গোপনীয়তা লঙ্ঘন। একটি খাতা যখন শিক্ষকের ড্রয়িং রুম বা ক্লাসরুমে উন্মুক্তভাবে পড়ে থাকে, তখন সেটি আর নিরাপদ থাকে না। যে শিক্ষার্থীরা আজ টিকটকে ভিডিও দিচ্ছে, তারা আসলে জানেই না তারা কত বড় অপরাধ করছে। আর এই সুযোগটা করে দিচ্ছেন খোদ শিক্ষকরাই।
এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট বোর্ড এবং প্রধান পরীক্ষকদের তদারকি আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
এসএসসির খাতা দেখায় অননুমোদিত ব্যক্তি, কী বলছে আইন?
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পাবলিক পরীক্ষার গোপনীয়তা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে। ভিডিওগুলোতে কোথাও শিক্ষার্থীদের খাতা দেখতে, কোথাও নম্বর তুলতে, আবার কোথাও ওএমআর বৃত্ত ভরাট করতে দেখা গেছে। অথচ আইন অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক ছাড়া অন্য কারও পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ নেই। এমন অপরাধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত বিধান উল্লেখ রয়েছে 'পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০'তে। আইন অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন, নম্বর প্রদান কিংবা ওএমআর শিট পূরণ করতে পারবেন না।
আইনের ৪২ এর ১০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা বোর্ড কর্তৃক নিযুক্ত বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হয়েও কেউ যদি পাবলিক পরীক্ষার হলে পরীক্ষা পরিচালনা করেন অথবা পরীক্ষার উত্তরপত্র পরীক্ষা করেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আইনে বলা হয়েছে—'যিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা বোর্ড কর্তৃক নিযুক্ত বা ক্ষমতা প্রদত্ত না হওয়া সত্ত্বেও কোনো পরীক্ষার হলে কোনো পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন অথবা কোনো পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো উত্তরপত্র পরীক্ষা করেন, অথবা যিনি অন্য ব্যক্তির পরিচয়ে কিংবা কল্পিত নামে পরীক্ষার হলে পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন, অথবা পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র পরীক্ষা করেন, তিনি দুই বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড অথবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।'
যা বলছেন বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোরের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন ঢাকা পোস্টকে জানান, শিক্ষা বোর্ডের খাতা মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসেনি। অনেক সময় পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচার করা হয়। তাই যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
তিনি বলেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কঠোর গোপনীয়তার নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। পরীক্ষকদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিজেদের বাইরে অন্য কাউকে দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন বা নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও কাছে যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ভিডিও থাকে, তাহলে তা শিক্ষা বোর্ডকে দিতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই কিংবা বোর্ডের নিজস্ব তদন্ত টিমের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, বরিশাল-এর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জি. এম. শহীদুল ইসলাম বলেন, বোর্ডের নজরে এখন পর্যন্ত এসএসসির খাতা মূল্যায়নের কোনো ভিডিও আসেনি।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ ধরনের কোনো ভিডিও আমাদের নজরে আসেনি। বিষয়টি ফেকও হতে পারে, আবার অন্য কোনো ঘটনাও হতে পারে।
খাতা মূল্যায়নে গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষকদের শুরু থেকেই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খাতা যেন কোথাও প্রকাশ্যে নেওয়া না হয় এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে বাসায় বসে মূল্যায়ন করা হয়—সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বা অন্য কারও সামনে খাতা উন্মুক্ত না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, খাতা বিতরণের দিন থেকেই পরীক্ষকদের বারবার সতর্ক করা হয় যেন তারা নিজেরাই মূল্যায়নের কাজ সম্পন্ন করেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেও কোনো কাজ না করানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাইরের কাউকে দিয়ে করানোর তো প্রশ্নই আসে না। খাতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করাও পরীক্ষা নীতিমালার পরিপন্থী।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, চট্টগ্রামের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নসংক্রান্ত কোনো ভিডিও, ছবি কিংবা এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ এখনো বোর্ডের দৃষ্টিগোচর হয়নি।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দারকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
মন্তব্য পাওয়া যায়নি ১১ বোর্ডের সমন্বয় কমিটির সভাপতির
দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব পালন করেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির। এসব বিষয়ে কথা বলতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে তাঁকে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে এবং জড়িতদের আটকের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর। সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে বাংলামোটর মোড় থেকে ঢাকা মহানগরী উত্তরের হাতিরঝিল অঞ্চলের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম। আয়োজকদের ভাষ্য, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আটকের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। রোববার রাতে এক তথ্য বিবরণীতে কর্মসূচির বিষয়টি জানান ঢাকা মহানগরী উত্তরের জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মো. আতাউর রহমান সরকার।
তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকাতে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অনলাইনে সংরক্ষিত তথ্য পর্যায়ক্রমে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে বিয়ের আগে একজনের আগের বৈবাহিক তথ্য অনলাইনে যাচাই করা সম্ভব হবে। শনিবার রাজধানীর নিকেতনে ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের (কাজী) জন্য আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ‘অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনে সফটওয়্যারের ব্যবহারবিধি এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি’ শীর্ষক এ প্রশিক্ষণে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আইনমন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের সব নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তিনি জানান, অনলাইনে বিয়ে ও তালাকের তথ্য সংরক্ষিত থাকলে কেউ আগের বিয়ের তথ্য গোপন করে অন্যত্র বিয়ে করতে চাইলে তা যাচাই করা সম্ভব হবে। এর ফলে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রতিরোধেও সহায়তা মিলবে। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় বিবাহসংক্রান্ত তথ্য পর্যায়ক্রমে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে একজন ব্যক্তির বিয়ে, তালাক ও পরিচয়সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য একই ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর স্ত্রী বা সন্তানদের পক্ষ থেকে একাধিক দাবি উঠলেও নিবন্ধিত তথ্য দেখে বৈবাহিক সম্পর্কের সত্যতা যাচাই করা যাবে। এতে উত্তরাধিকার বা বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ থেকে মামলা-মোকদ্দমার প্রবণতা কমতে পারে এবং রাষ্ট্রের ওপর চাপও কমবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সমূলে উৎখাত করা হবে। শুক্রবার এফডিসিতে ‘কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার চেয়ে সামাজিক আন্দোলনই অধিক কার্যকর’ শীর্ষক ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিযোগিতায় সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে পরাজিত করে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র দেয়া হয়। ছায়া সংসদে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংস্থার চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। চিফ হুইপ বলেন, ‘কিশোররা অস্ত্র নিয়ে, চাপাতি নিয়ে ঘুরবে না। তারা বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাবে। লেখাপড়া করবে, দক্ষ হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করবে। তারা রোবটিক যুগে প্রবেশ করবে। এখন যারা সমাজে সন্ত্রাস ও মব করছে, বিগত শাসনামলেও তারাই এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদেরকে ছেঁকে বের করার চেষ্টা করছি। আমরা কোনো হেলমেট বাহিনী দেখতে চাই না। হাতুড়ি বাহিনী তৈরির কোনো ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দায় চাপানোর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অশ্লীল ভাষা আর বরদাশত করা হবে না। ইউটিউব ও ফেসবুকের মাধ্যমে যারা অপপ্রচার করছে তাদের লাগাম টেনে ধরা হবে। মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছি। সংসদ-সদস্য মিষ্টির পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠিন ও কঠোর বার্তা দিয়েছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। আমরা নিজের ঘর থেকেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম শুরু করেছি। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী, মাদক কারবারি, জুয়াড়িরা সবসময় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক খোলস পালটায়। তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধ করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’