পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন সত্য। বিশ্বের কোথাও ভয়াবহ দাবদাহে প্রাণহানি ঘটছে, কোথাও দীর্ঘ খরায় শুকিয়ে যাচ্ছে নদী-নালা, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে—পৃথিবী শিগগিরই নতুন একটি এল নিনো পর্বে প্রবেশ করতে পারে, যা ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং খাদ্য সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থা এবং উচ্চ জনঘনত্বের কারণে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে এল নিনো ‘আগুনের ওপর ঘি ঢালার’ মতো প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৩-২৪ সালের এল নিনো পৃথিবীকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরের রেকর্ড উপহার দিয়েছিল। এবারও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেল সম্ভাব্য শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’র ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এর তীব্রতা নিয়ে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে, বিজ্ঞানীরা একমত যে বিশ্বের বহু অঞ্চলে এর প্রভাব হবে ব্যাপক।
বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব সাধারণত তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে দেখা যায়। কখনো স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়, আবার কখনো অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষ কর্মঘণ্টা কমাতে বাধ্য হয়েছেন এবং হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। নতুন এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় কৃষি খাত। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো কৃষির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফল উৎপাদন সরাসরি আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডব্লিউএমও ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
বর্তমানে কৃষকরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। এর সঙ্গে যদি খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে ফসল উৎপাদন কমে যায়, তবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং বাজারমূল্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খরা-সহনশীল ফসল, আধুনিক সেচব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কৃষি বীমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
পানিসংকটও বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। এতে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলেও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ চাপে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগবাহী মশার বিস্তার ও প্রজনন মৌসুমের পরিবর্তন ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি আগে থেকেই বিদ্যমান। এল নিনোর প্রভাবে এসব ঝুঁকি আরও জটিল হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় জনজীবনের ওপর।
তবে আশার বিষয় হলো, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত সাফল্য অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো মোকাবিলা কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, জ্বালানি, নগর পরিকল্পনা এবং অর্থনীতির সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। তাই এখনই প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে হয়তো এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি যে বাস্তব এবং ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন সত্য। বিশ্বের কোথাও ভয়াবহ দাবদাহে প্রাণহানি ঘটছে, কোথাও দীর্ঘ খরায় শুকিয়ে যাচ্ছে নদী-নালা, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে—পৃথিবী শিগগিরই নতুন একটি এল নিনো পর্বে প্রবেশ করতে পারে, যা ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং খাদ্য সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থা এবং উচ্চ জনঘনত্বের কারণে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলে। এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে এল নিনো ‘আগুনের ওপর ঘি ঢালার’ মতো প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো পৃথিবীকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরের রেকর্ড উপহার দিয়েছিল। এবারও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেল সম্ভাব্য শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’র ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এর তীব্রতা নিয়ে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে, বিজ্ঞানীরা একমত যে বিশ্বের বহু অঞ্চলে এর প্রভাব হবে ব্যাপক। বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব সাধারণত তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে দেখা যায়। কখনো স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়, আবার কখনো অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষ কর্মঘণ্টা কমাতে বাধ্য হয়েছেন এবং হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। নতুন এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় কৃষি খাত। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো কৃষির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফল উৎপাদন সরাসরি আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডব্লিউএমও ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বর্তমানে কৃষকরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। এর সঙ্গে যদি খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে ফসল উৎপাদন কমে যায়, তবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং বাজারমূল্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খরা-সহনশীল ফসল, আধুনিক সেচব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কৃষি বীমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। পানিসংকটও বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। এতে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলেও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ চাপে পড়তে পারে। স্বাস্থ্য খাতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগবাহী মশার বিস্তার ও প্রজনন মৌসুমের পরিবর্তন ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি আগে থেকেই বিদ্যমান। এল নিনোর প্রভাবে এসব ঝুঁকি আরও জটিল হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় জনজীবনের ওপর। তবে আশার বিষয় হলো, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত সাফল্য অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো মোকাবিলা কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, জ্বালানি, নগর পরিকল্পনা এবং অর্থনীতির সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। তাই এখনই প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে হয়তো এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি যে বাস্তব এবং ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের পর এবার বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও জোট ত্যাগের কথা জানিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক আদর্শ ও নির্বাচনি সমঝোতায় বনিবনা না হওয়ায় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জোট বা সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গেছে। তাদের অভিযোগ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১০টির মতো আসনেও ছাড় চেয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর কাছে, কিন্তু তাদের একটি আসনে ছাড় দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবমূল্যায়ন করার অভিযোগ করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী যুগান্তরকে বলেন, প্রথমত এটি ছিল নির্বাচনি সমঝোতা। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় আমরা আলাদা নির্বাচন করেছি। বলা যেতে পারে তখন থেকেই আমরা একপ্রকার জোটে নেই। জোটের বৈঠক বা প্রোগ্রামে আপনারা অংশ নিচ্ছেন কি না- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় থেকে আমরা ১১ দলের কোনো বৈঠক বা প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছি না। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, জোট গঠনের পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী একক আধিপত্য ধরে রাখে। নিজেদের সিদ্ধান্ত জোট সঙ্গীদের ওপর চাপিয়ে দেয় জামায়াত। একইসঙ্গে কর্মসূচি কি হবে তা আগেই জামায়াত ঠিক করে তারপর জোটকে জানায়। লিয়াজু কমিটিতেও আলোচনার প্রয়োজন বোধ করে না দলটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১০টির মতো আসনে ছাড় চেয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর কাছে, কিন্তু তাদের একটি আসনে ছাড় দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবমূল্যায়ন করার অভিযোগ করেছে দলটির শীর্ষ নেতারা। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী শনিবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, আমাদের তো সমঝোতা ছিল নির্বাচনি সমঝোতা। এখন নির্বাচন তো শেষ। তা ছাড়া নির্বাচনের আসন নিয়েও আমাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি। নির্বাচনের পর আমরা সারাদেশের দায়িত্বশীলদের নিয়ে একটা বৈঠকে বসেছিলাম, কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে ওই বৈঠকে অনেকে অংশ নিতে পারেননি। আগামী ১০ তারিখে আমাদের মজলিসে আমেলার মিটিং আছে, সেই মিটিংয়ে জোটে থাকা না থাকার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের একটি জোরদার আলোচনা শুরু হয়। বিগত দিনের নানা মতবিরোধ ভুলে দীর্ঘদিন পর শীর্ষ নেতারা একটি বৃহত্তর ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অনুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক হতে সম্মত হন। প্রাথমিকভাবে এটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামি ঘরানার দলের সমন্বয়ে ‘আন্দোলনরত আট দল’ ব্যানারে যাত্রা শুরু করেছিল। শুরুতে ইসলামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হলেও আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক সমীকরণের পর্যায়ক্রমে এটি বিস্তৃতি লাভ করে এবং নির্বাচনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মূলত ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা ‘এক বাক্স নীতি’র অধীনে প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী দিয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার কৌশল হিসেবে এই জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। নির্বাচনে আসন সমঝোতা ও জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নিয়ে প্রাথমিকভাবে এই নির্বাচনী জোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১১ দলীয় এই নির্বাচনী জোট গঠনের পর থেকেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন শুরু হয়। বিশেষ করে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এই আসন সমঝোতা নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক এবং দর-কষাকষি চূড়ান্ত রূপ না পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। একই সময়ে এতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টিসহ অন্যান্য দল যুক্ত হয়।
ইসলামী ব্যাংক দখল নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা জনগণ মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেছেন, সরকার ইসলামী ব্যাংককে সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইসলামী ব্যাংক উদ্ধারের জন্য বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে প্রস্তুত। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে টানাটানির সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। বুধবার রাতে রাজধানীর মিরপুরে ঢাকা-১৫ আসনের নেতাকর্মীদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। আবারও ফ্যাসিবাদী কায়দায় ব্যাংক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতি হলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারকে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছেন, দেশ এভাবে চলতে পারে না। একদল পালিয়ে গেছে পাশের দেশে। বাকি দল যাবে কোথায়— এমন প্রশ্ন তোলেন। বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের স্বার্থে জামায়াত শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবে। গৃহপালিত বিরোধী দল হবে না। জামায়াত আমির বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে অনেক মানুষ এবার ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি। বিশেষ করে ইরান, লেবানন ও গাজাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ঈদ কাটিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি খাতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং এর ফলে দেশের মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। শফিকুর রহমান বলেন, দেশে সংকট কৃত্রিম হলে দ্রুত সমাধান করতে হবে। আর যদি প্রাকৃতিক বা বৈশ্বিক কারণে হয়ে থাকে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংসদ সঠিকভাবে কার্যকর হলে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিদ্যুত, জ্বালানি দাম বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেছেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। গ্যাসের দাম ৭০০ টাকা বাড়িয়ে পরে ৫০ টাকা কমানো জাতির সঙ্গে তামাশা। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের স্বার্থে জামায়াত শিগগিরই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে। কাফরুল পশ্চিম থানা সেক্রেটারি এস এম রায়হানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহানগর নেতারা।