দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর বরিশাল সফরে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২৬ জানুয়ারি দুপুর ২টায় বরিশাল নগরীর বেলস পার্কে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন তিনি।
গত বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাতে দলের গুলশান কার্যালয় থেকে চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমানকে তারেক রহমানের এই সফরের বিষয়টি জানানো হয়।
তারেক রহমানের বরিশাল সফরের খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। নেতাকে বরণ করে নিতে শুরু হয়েছে নানামুখী প্রস্তুতি। বেলস পার্কের জনসভাকে জনসমুদ্রে পরিণত করতে আগামী ১৮ জানুয়ারি একটি প্রস্তুতি সভার ডাক দিয়েছে বরিশাল বিভাগীয় বিএনপি। এতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীসহ বিভাগের প্রতিটি জেলা ও উপজেলার নেতারা অংশ নেবেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, তারেক রহমানের বরিশাল সফরের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে। বুধবার রাতে গুলশান কার্যালয়ে চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার ও আমি উপস্থিত হলে তারেক রহমান নিজেই বরিশাল সফরের আয়োজন করতে নির্দেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ২০ বছর পর নেতাকে বরিশালে বরণ করতে আমরা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছি। আগামী ১৮ জানুয়ারি বরিশাল ক্লাবে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে বরিশাল বিভাগের সংসদীয় ২১টি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, জেলা, মহানগর ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। সভায় জনসভা সফল করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিন জানান, প্রায় ২০ বছর পর বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরিশাল সফরে আসছেন। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ১৪ মে তিনি বরিশালে এসেছিলেন। সে সময় তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি কর্মিসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন তিনি। পাশাপাশি সদর উপজেলার সাহেবেরহাট এলাকায় শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বাকেরগঞ্জ উপজেলায় একটি ব্রিজ উদ্বোধন করেন। তখন তিনি বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তারেক রহমানের এই আগমন বরিশালের রাজনীতিতে নতুন প্রত্যাশার বার্তা দেবে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে নেতার আগমনের খবরে বরিশালজুড়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ ও উদ্দীপনা বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন তারা। বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার জানান, আগামী ২৬ জানুয়ারির নির্বাচনী জনসভাকে জনসমুদ্রে রূপ দিতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেছেন দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, স্পষ্টভাবে আজকের এই বোমা বিস্ফোরণ প্রশাসনের সহায়তায় হয়েছে। কেন বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? স্পষ্টভাবে আমাদেরকে খুন করার পরিকল্পনায় এখানে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। সোমবার (৬ জুলাই) রাত সোয়া ১০টার দিকে সাভার থানা স্ট্যান্ড ঈদগাহ মাঠে এনসিপির সমাবেশ চলাকালে বোমা বিস্ফোরণের পর তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে রাত পৌনে ১০টার দিকে সাভার থানা স্ট্যান্ড ঈদগাহ মাঠে সমাবেশে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সমাবেশে ওই সময় ঢাকা জেলা এনসিপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বিস্ফোরণের পর নেতাকর্মীদের আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। এ সময় নাবিলা তাসনিদ মাইকে নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সাভার থেকে আমরা আগস্টে কর্মসূচি সমাপ্ত করছিলাম। তারা বিদ্যুৎ বন্ধ করে এখানে বোমা ফুটিয়েছে। আমরা মনে করি প্রশাসনের সহায়তায় আজকের এই পদযাত্রাকে বন্ধ করার জন্য এখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এই সরকারকে, এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হুঁশিয়ার করে বলতে চাই- জবাব দিতে হবে। কেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেন না, তার জবাব দিতে হবে। এনসিপির কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা হুঁশিয়ার থাকুন। আমরা জুলাইয়ের আন্দোলন চালিয়ে যাব। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করবো, হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করব, সীমান্ত সুরক্ষা ও তরুণদের কর্মসংস্থানের দাবি সফলভাবে আদায় নিশ্চিত করব। পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সভার দায়িত্বে যারা ছিল—পুলিশ প্রশাসন, ডিসি—কেন বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেল? কীভাবে এটা ঘটল? এই এলাকার এমপি কী করছে? সে কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে? তিনি বলেন, আজকে এখান থেকে আমাদের কয়েকজন ভাই গুরুতর আহত হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে এখানকার স্থানীয় প্রশাসন এবং এমপিকে আমরা জবাবদিহিতার আওতায় আনব। ঘটনার বিচার দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচার চাই। কোনো সন্ত্রাসীর ঠিকানা এই সাভারে হবে না। যারা গণহত্যাকারীদের প্রশ্রয় দেবে, যারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও খুনিদের প্রশ্রয় দেবে, তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের মতো হবে। এনসিপির কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এনসিপির পদযাত্রা চলমান থাকবে। ভয়ভীতি, বোমাবাজি—সবকিছুকে উপেক্ষা করে আমাদের পদযাত্রা চলমান থাকবে।
জরুরি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল ৫টায় বাংলামোটরের দলটির অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে। দলটি দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় তা জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার ও আলী আহসান জুনায়েদ এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকবৃন্দ।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তাসলিম লিরা (ছদ্মনাম)। প্রবাসী বাবা মেয়েকে বিয়ে দিলেন ঢাকার এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর সাথে। এইচএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে আগে বিয়ে হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন করেও বিয়ের হইহুল্লোড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আর যাওয়া হয়নি লিরার। কিন্তু ঢাকা বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া তারই ননদের মেয়ের পরীক্ষার তদারকির সব ভার তাঁর কাঁধে। ভাগনী সকালে পড়তে উঠলে নিয়ম করে উঠতে হয় লিরাকে। কী খাবে, পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবার আগে কলম, এডমিড কার্ড সব ঠিকঠাক আছে কি না চেক করে দেওয়ার দায়িত্ব নববধূর। এই করতে গিয়েই যে নববধূর মনটা ভেঙে যায় তা দেখার কেউ নেই। বিবাহিত লিরার মন চলে যায় নিজের বান্ধবী সহপাঠীদের কাছে। তারওতো এই রকম করেই সবার সাথে সিরিয়াস মুডে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবার কথা ছিল। ছিল মাকে জড়িয়ে ধরে, বাবার আশীর্বাদ নিয়ে পরীক্ষার আসনে বসার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিরা বলেন, এটা ভাগ্য! বিয়ে করলে সবদিক থেকে নিশ্চিত মা-বাবা তাই তাদের কথা মানতে হলো। আসলে কি তাই। লিরা, সানজিদা, দোলাদের মতো আরও কত লাখ লাখ নাম না জানা কিশোরী আজ বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বিয়ের পর লেখাপড়া চালানোর আশ্বাস থাকলেও আসলে কত জনের কপালে সেই সুযোগ হয়, বলতে গেলে জ্যোতিষশাস্ত্র জানতে হয় না। কিশোরীর গায়ে নববধূর ঘ্রাণ যাওয়ার আগেই নতুন মা হওয়ার আনন্দে বিভোর হয়ে যান তিনি। পড়ালেখার পাট তখন একেবারেই চুকে যায়। ঘর কন্যায় ব্যস্ততায় তখন দিন কাটে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেশজুড়ে শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা, অন্যদিকে পরীক্ষাকেন্দ্রের বেঞ্চগুলো জানান দিচ্ছে এক নীরব ও বেদনাদায়ক হারিয়ে যাওয়ার গল্প। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে সাড়ম্বরে নিবন্ধ করা প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীই ঝরে পড়েছেন। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই অস্বাভাবিক অনুপস্থিতির নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে যে সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, তা একাধারে শিউরে ওঠার মতো চরম উদ্বেগের। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুপস্থিত বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে যে তাদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশের পরীক্ষার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বাল্যবিবাহই আজ উচ্চশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় সামাজিক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা জীবনের সোনালী স্বপ্ন যখন ডানা মেলার কথা ঠিক তখনই এক বিপুলসংখ্যক কিশোরীকে বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। নোয়াখালী মহিলা কলেজের ছাত্রী ফাতিমা মাহি, পরীক্ষার বেঞ্চে বসার চেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছে। প্রস্তুতির ঘাটতি এবং ফেসবুক টিকটকে ভাইরাল হওয়াটাই তার কাছে বেশি মজার। তার মতে আয় করা এখন অনেক সহজ। বিনোদন যখন আয়ের মাধ্যম হয় তখন কেন কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হবে। যেখানে নিজের অফিস নিজের সময় মতো করব। কারো কোনো বকা নেই জবাবদিহিতা নেই, সার্টিফিকেট নিয়ে প্যারা নাই। ঠিক তার মতো ভাবনা পরীক্ষা না দেওয়া আরেক ছাত্রী নাবাহা বলেন, পড়তে ভালো লাগে না তাই আম্মুকে বলেছি এবার পরীক্ষা দেব না, মাও বললেন ঠিক আছে বিশ্রাম নাও। গ্লোবাল ভিলেজ, প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের বেড়াজালে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা। সম্প্রতি দৈনিক সমকাল ও রেড অরেঞ্জ লিমিটেডে যৌথ উদ্যোগে ইয়ুখ শেয়ার-নেট প্রকল্প এবং অ্যাপ্লিফাই চেঞ্জের সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিলে বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বাল্যবিবাহকে জরুরি সামাজিক সংকট ঘোষণা দিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সরকার ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করার পরামর্শ দেন। আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (সিএমআরএ) সংশোধন করে ’বিশেষ বিধান’ ধারাটি অপসারণ কিংবা সংশোধনের দাবি জানান। গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১ শতাংশের বেশি, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কিশোর-কিশোরী ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলেও তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাল্যবিয়ের পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য এবং পরীক্ষার পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবম বা দশম শ্রেণিতে বাল্যবিয়ের হার নিয়ে কিছুটা আলোচনা হরেও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে যে এত বিশালসংখ্যক ছাত্রী একই কারণে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে, তা আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেকে শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রনভতার উল্লেখযোগ্য কারণ। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার অবশ্য আরেকটি দিকের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার কারণে নির্ধারিত বছরেও পরীক্ষায় অংশ নেয় না; তারা পরবর্তী বছরগুলোতে পরীক্ষায় বসে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রস্তুতির অভাবের পেছনেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে পারিবারিক চাপ ও বিয়েসংক্রান্ত মানসিক অস্থিরতা। একবার পড়াশোনার গতি থেকে ছিটকে পড়লে একটি মেয়েল পক্ষে পুনরায় পড়াশোনায় ফেরা গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জাতীয় এই ক্ষতি ও লাখো কিশোরীর স্বপ্নভঙ্গের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, শিক্ষার এই দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন গণ-ঝরে পড়া রোধ করা যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করবে মন্ত্রণালয়। বাল্যবিয়ে শুধু একটি মেয়ের ব্যক্তিগত অধিকারই ক্ষুণ্ন করে না বরং এটি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের চাকাকে স্তব্ধ করে দেয়। সাড়ে পাঁচ লাখ সম্ভাবনাময় তরুণের এই হারিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এখনই যদি স্থানীয় প্রশাসন, অভিভাবক ও সমাজ সম্মিলিতভাবে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক বিশাল মেধাবী ও স্বাবলম্বী নারী জনগোষ্ঠী থেকে বঞ্চিত হবে। পরীক্ষার টেবিলগুলো যেন আর শূন্য না থাকে কিশোরীদের খাতা-কলম যেন রান্নাঘরের ব্যস্ততায় হারিয়ে না যায়-এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। লেখক: সামিনা রোশনি এসোসিয়েট ম্যানেজার, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি