‘চলচ্চিত্র চর্চায় নতুন প্রজন্ম, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নবদিগন্ত’—এই স্লোগান সামনে রেখে গত ১০ মে যাত্রা শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আড্ডা, আলোচনা সভা ও কর্মশালার মাধ্যমে জেলায় একটি সৃজনশীল সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে তারা আয়োজন করেছে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’র আটটি পর্ব।

 

এর ধারাবাহিকতায় আগামী ৩০ মে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে নবম প্রদর্শনীর। সেখানে প্রদর্শিত হওয়ার কথা রয়েছে ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। তবে প্রদর্শনীর প্রচারণা শুরু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও চলচ্চিত্রকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ।

 

ফেসবুকে বিরোধিতা, ছড়ানো হচ্ছে পোস্টার

বাংলাট্রিবিউনের হাতে আসা একাধিক ফেসবুক পোস্ট ও মেসেঞ্জার গ্রুপের স্ক্রিনশট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি সংগঠিত গোষ্ঠী চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। চলচ্চিত্রটির পোস্টারের ওপর লাল কালি দিয়ে ‘ক্রস’ (এক্স) চিহ্ন এঁকে সেটি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

 

ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে আবু বকর মোহাম্মদ আয়মান নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল রহ. একসময় সিনেমা বন্ধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রী মহল আবারও শহরে সিনেমা চালু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।” একই বক্তব্য ‘সাংগঠনিক ঐক্য...’ নামের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপেও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

 

এইচ এম সৈয়দ কাসেম নামে আরেকজন তার পোস্টে লেখেন, “আলেম-ওলামার শহরে সিনেমা নামক নিষিদ্ধ জিনিস প্রদর্শনী দেখতে চাই না।

 

এ ছাড়া এইচ এম কাজী আকরাম, মো. সাকিবুল হাসান চৌধুরী ও আরিফ বিল্লাহ মুজাহিদসহ আরও কয়েকজন একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে প্রদর্শনীর বিরোধিতা করেছেন। কয়েকটি পোস্টে সরাসরি হুমকিসূচক ভাষাও ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

“বিষয়টি আমাকে মর্মাহত করেছে”—তানিম নূর

ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্রটির নির্মাতা তানিম নূর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি প্রদর্শনীতে বাধা দেওয়ার যে খবরটি দেখলাম, তা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সবসময়ই ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উর্বর ভূমি।

 

তিনি আরও লেখেন, সুস্থ বিনোদন ও শিল্পের চর্চা কখনো আমাদের সমাজ কিংবা বিশ্বাসের ক্ষতি করে না, বরং মানসিক বিকাশ ঘটায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো নিষেধাজ্ঞার চেয়ে পারস্পরিক আলোচনা ও শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেশি প্রয়োজন।

একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান হিসেবে এই ঘটনাকে “মর্মাহত” বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

 

“শো বন্ধ করতে পারবে না”—চলচ্চিত্র সংসদ

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলচ্চিত্র সংসদ–এর সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার শাহরিয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা আগামী ৩০ মে প্রদর্শনীটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে চাই। কিন্তু ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রপন্থী নানা ব্যক্তিকে এই প্রগতিশীল উদ্যোগের বিরোধিতা করে পোস্ট দিতে দেখছি।

 

তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা অবশ্যই উদ্বিগ্ন। তবে আমরা আশা করছি, তারা আমাদের এই শো বন্ধ করতে পারবে না। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা চাইব।

 

এদিকে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা এবং ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এরই মধ্যে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন। তাদের দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক জনপদে চলচ্চিত্র ও শিল্পচর্চার পরিবেশ কোনোভাবেই সংকুচিত হতে দেওয়া উচিত নয়।