ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনীত মুফতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের এই ঘটনা ঘটলেও বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুর বিষয়টি জানা যায় বলে তার জামাতা ডা. হিমেল কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন।
মুফতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের গ্রামের বাড়ী টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কাকরাজান ইউনিয়নে। তিনি পরিবার সদস্যদের নিয়ে ঘাটাইল পৌরর কলেজ রোড এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। বর্তমানে ঘাটাইল উপজেলার হামিদপুর ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। ইসলামি শিক্ষায় সুদক্ষ এই আলেম একাধারে একজন মুহাদ্দিস ও বিজ্ঞ ইসলামীক চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ডা. হিমেল জানান, বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতের কোনো এক সময়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে তার বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি ফসলি ক্ষেত থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে সারারাত তার ব্যবহৃত মোবাইলে কল করলেও সেটির সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।
কাকরাজান এলাকার স্থানীয়রা জানান, তার বসতবাড়ির পাশে নিজস্ব একটি ফসলি ক্ষেতে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বুধবার রাতের কোনো এক সময়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে বাড়ির পাশের ক্ষেত থেকে বৃহস্পতিবার সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মুফতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের আকস্মিক এই মৃত্যুতে ঘাটাইলের আলেম সমাজ ও সচেতন মহল, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং তার ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বিএনপিসহ বিভিন্ন ইসলামী ও রাজনৈতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সমবেদনা প্রকাশ করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার আসরের নামাজের পর কাকরাজান এলাকায় নামাজে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে সংগঠনটির প্রার্থী ছিলেন মুফতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। পরবর্তীতে সংগঠনটি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হলে তিনি তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে সম্প্রতি এক সভায় আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসিরকে সমর্থন করেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
নেত্রকোনায় চাঁদা দাবির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় নজরুল ইসলাম (৩৬) নামে এক জামায়াত নেতাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে সদর আমলি আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম জেলা সদরের কয়ড়া গ্রামের নাইব উদ্দিনের ছেলে। তিনি সদর উপজেলার বাংলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন। নজরুল ইসলামের দলীয় পদের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলা ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, আজ তাকে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছেন। তবে কী ঘটনায় মামলা হয়েছে তা সঠিকভাবে জানি না। এ মামলায় নজরুল ইসলামের সঙ্গে একই এলাকার আ. হেকিমসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. রুবেল রানা (৩৯) জেলা সদরের কয়ড়া গ্রামের মো. আব্দুল হাসিমের ছেলে। তিনি নেত্রকোনায় ‘মেসার্স সন্ধি ট্রেডার্স’ নামে বালু, পাথর ও কয়লার ব্যবসা পরিচালনা করছেন। মামলার বাদী ব্যবসায়ী মো. রুবেল রানা আদালতে দেওয়া অভিযোগে জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় জুতার ব্যবসার পাশাপাশি বর্তমানে নেত্রকোনায় বালু, পাথর ও কয়লার ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অভিযুক্ত নজরুল ইসলামসহ অন্যান্যরা দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৭ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জেলা শহরের অজহর রোডে রুবেল রানা তার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও গাড়িচালককে নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে একদল লোক তার গাড়ির গতিরোধ করে। পরে তাকে জোরপূর্বক মোক্তারপাড়া মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং তার পকেটে থাকা ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার পরদিন নজরুল ইসলাম মুঠোফোনে বাদীর প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে হুমকি দেন। এছাড়া ঘটনাস্থলের কাছের একটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার কিছু অংশ ধারণ হয়েছে বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম প্রদীপ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আদালত আজ আসামি নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসার আগেই বাতাসে উপকারভোগীদের বসার প্যান্ডেল ভেঙে পড়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি ও মূল মঞ্চের কোনও ক্ষয় ক্ষতি হয়নি। বুধবার (১৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে উপকারভোগী ও অতিথিদের জন্য নির্মিত প্যান্ডেল বাতাসে ভেঙে পড়ে যায়। এ সময় ভেতরে বসা উপকারভোগী ও অতিথিদের ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। পরবর্তীতে প্যান্ডেল খুলে ফেলা হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক নজর দেখতে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি চা শ্রমিকসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতিতে বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে আগত চা শ্রমিকরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে জেলার সব চা বাগান বন্ধ দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার জন্য এসেছি। বাগানের গাড়িতে করে আমরা এসেছি। চা বাগানে বাসিন্দা তপন বৈদ্য বলেন, আমরা সবাই এসেছি প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে। চায়ের দেশে তিনি এসেছেন এজন্য আমরা একনজর দেখতে। সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর ১টায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এবং দুপুর আড়াইটায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পাশাপাশি সেখানে তিনি ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত ৫ জনকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদানের চেক, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও নৃগোষ্ঠীর ৫ জনকে জীবনমান উন্নয়নে ১০ হাজার টাকা করে এককালীন আর্থিক অনুদান, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও নৃগোষ্ঠীর ৫ জন শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা করে এককালীন আর্থিক অনুদান এবং দুঃস্থ, অসহায়, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও গৃহহীন ১০০ জনকে ১০ হাজার টাকা করে বিশেষ অনুদানের চেক দেবেন। প্রধানমন্ত্রী টেকসই আবাসনের জন্য ৫ জন চা শ্রমিকের হাতে দুই লাখ টাকা করে বরাদ্দপত্র তুলে দেবেন।
খুলনার বুড়িভদ্রা নদী খননের মাটি চাপা পড়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক ঘর। সেখানে বসবাস করা পরিবারগুলো এখন উপজেলার চুকনগর বাজারের পাশে গরুর হাটে খোলা মাঠে বসবাস করছেন। তারা বলছেন, ছোট ছোট দুটি কক্ষ বিশিষ্ট আধাপাকা ঘর আর জমির মালিকানা ছিল বাসিন্দাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নদী ভাঙন, দারিদ্র্যতা আর ঠিকানাহীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাথা গোঁজার যে শেষ আশ্রয়স্থল তারা পেয়েছিলেন, আজ তা ধ্বংসের মুখে। উপজেলার চুকনগর এবং কাঁঠালতলার বরাতিয়া সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া বুড়িভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন, নদী খননের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। খননের মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে রাখায় মানুষের যাতায়াতে একটু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এতে কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, ২০২১ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় তিনটি ধাপে ডুমুরিয়ার চুকনগর, বরাতিয়া এবং খর্নিয়া এলাকায় শতাধিক ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করে সরকার। তাদের জন্য দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। ভুক্তভোগীরা জানান, বুড়িভদ্রা নদীর চরে চুকনগর অংশে ১৪৫টি এবং কাঁঠালতলার বরাতিয়া অংশে ১২৪টি ঘর নির্মাণ করেছিল সরকার। কিন্তু পাঁচ মাস আগে বুড়িভদ্রা নদী খনন শুরু হওয়ায় চুকনগর অংশে উচ্ছেদ করা হয় ১৪৩টি ঘর। বর্তমানে সেখানে অক্ষত আছে মাত্র দুটি ঘর। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো চুকনগর বাজারের পাশে পুরনো টিন, পলিথিন আর কাপড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঝুপড়িতে প্রচণ্ড রোদ, কাদা-বৃষ্টির মধ্যেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন বলেন, প্রায় এক হাজার মানুষ কয়েক মাস ধরে চুকনগর বাজারের পাশে খোলা একটি মাঠে বাস করছে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, নিরাপত্তা নেই, খাবারের কষ্টও আছে। বিষয়টি অনেকবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে দাবি করে হেলাল বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা; কিন্তু চুকনগরে সেই প্রকল্পের বাসিন্দাদেরই এখন খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে নদী খনন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে আশ্রয়হীন মানুষের মানবিক সংকট- দুই বাস্তবতার মাঝখানে আটকে পড়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের জীবন। পুনর্বাসনের আশ্বাস মিললেও কবে তারা আবার স্থায়ী ঠিকানায় ফিরতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। চুকনগরে উচ্ছেদের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন সংকটে পড়েছেন কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। নদী খননের মাটি বাসিন্দাদের ঘরগুলোর পাশে রাখা হয়েছে স্তূপ করে। সেই মাটির চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১০টি ঘর। বন্ধ হয়েছে বাসিন্দাদের চলাচলের পথ। বর্ষা শুরু হওয়ায় মাটির স্তূপ ঘিরে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীতে ধসে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে অনেক ঘর। বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, খননের মাটি একেবারেই নদীর পাড়ে ফেলায় কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বিশাল স্তূপ; যা বৃষ্টিতে ধুয়ে নামছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের উপর। পলিমাটিতে অনেক ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাঁদা ঢুকে গেছে। মাটির ভারে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। বেশ কয়েকটি পরিবার ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ আসবাবপত্র বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে রেখেছেন। কাঁঠালতলার স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা বেগম বলেন, নদী খননের মাটি পাহাড়ের মত উঁচু করে রাখা হয়েছে। এতে বন্ধ হয়েছে বাসিন্দাদের চলাচলের পথ। কয়েক দিন আগে বৃষ্টির সময় সেই মাটি ধসে তিন বছরের এক শিশু চাপা পড়ে। পরে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করায় বেঁচে যায়। বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সি রহিমা বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, নদী ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাঁদা-মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম। খননের সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত মাটি কাটা হয় দাবি করে রহিমা বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে যাবে। মাটির অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিজেরাই মাটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রকল্পের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সি ময়না বেগম বলেন, প্রচন্ড গরমে ঘরে থাহার উপায় নেই। ঘরে দরজার অংশ ভেঙে গেছে। কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। শিশুদের নিয়ে ঘরে নিরাপদে থাকতি পারতিছি নে। রান্না করার জায়গা নেই। বাথরুম, টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের জিনিসপত্রও সরিয়ে রাখতে হয়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা গেছে, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নদীর ৮১ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার খননকাজ চলছে। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন, যশোর সদরের আংশিক, অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয় শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইস গেইট দিয়ে। নদীতে পলি পড়ে এলাকার মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর বুক উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে বোরো আবাদ হচ্ছে না। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, এর মধ্যে নদী খননের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। খননের মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে রাখায় মানুষের যাতায়াতে একটু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসনে কোনও অর্থ বরাদ্দ নেই। তবে মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে। বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে নদী খননের মাটি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন ডুমুরিয়ার ইউএনও সবিতা সরকারও। চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে ইউএনও বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে; তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।