বাংলাদেশের বিনিয়োগ সেবাকে একীভূত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের লক্ষ্যে আজ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) যৌথ উদ্যোগে বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মের নতুন সংস্করণ ‘বাংলাবিজ ২.০’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে।
এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি একক, পূর্ণাঙ্গ ও ডিজিটাল বিনিয়োগ সেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পথে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
একটি তথ্যভিত্তিক পোর্টাল হিসেবে বাংলাবিজের প্রথম সংস্করণ ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়।
সে সময় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বিদ্যমান ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) পোর্টালগুলো সংযুক্ত করে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি একক ডিজিটাল প্রবেশদ্বার তৈরি করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিডা কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাবিজের দ্বিতীয় সংস্করণ উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন। বিডার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ এ তথ্য জানানো হয়।
বাংলাবিজ ২.০-তে যুক্ত হওয়া নতুন সুবিধাসমূহের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও সময়সাশ্রয়ী করা হয়েছে। নতুন ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’-এর আওতায় ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় পাঁচটি প্রধান অনুমোদন, যেমন: নেম ক্লিয়ারেন্স, অস্থায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, কোম্পানি নিবন্ধন, ই-টিআইএন এবং ট্রেড লাইসেন্স একটি মাত্র আবেদনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যাবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যেই ব্যবসা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবেন।
এছাড়াও পরিবেশ ছাড়পত্র, ভ্যাট নিবন্ধন, কারখানা ও অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত লাইসেন্স, আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি ও ইআরসি)সহ ২০টিরও বেশি বহুল ব্যবহৃত ব্যবসায়িক অনুমোদন বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। যাতে বিনিয়োগকারীরা এক জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারেন।
বাংলাবিজের নতুন ‘নো ইওর অ্যাপ্রুভালস (কেওয়াইএ)’ ফিচারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট খাত অনুযায়ী অনুমোদন ক্ষেত্রে কোন ধরনের ডকুমেন্টস সাবমিট করা বাধ্যতামূলক, তা আগেই শনাক্ত করতে পারবেন। প্রয়োজনে তারা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিলেশনশিপ ম্যানেজারের (আরএম) সাথে যোগাযোগ করে সহায়তা নিতে পারবেন।
এই সংস্করণে আরও যুক্ত হয়েছে বাংলাবিজ আইডি (বিবিআইডি), যা একটি ইউনিক ব্যবসায়িক পরিচিতি নম্বর হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে ব্যবসার প্রোফাইল ব্যবস্থাপনা, তথ্য শেয়ারিং এবং বিভিন্ন সংস্থায় দাখিল করা আবেদনের অগ্রগতি সহজে ট্র্যাক করা যাবে। ভবিষ্যতে এটি জাতীয় পর্যায়ে ইউনিক বিজনেস আইডি (ইউবিআইডি) চালুর ভিত্তি তৈরি করবে। পাশাপাশি সিঙ্গেল সাইন-অন (এসএসও) সুবিধার ফলে একটি মাত্র লগইন ব্যবহার করে বাংলাবিজ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ওএসএস সিস্টেমে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী এবং জাইকার প্রধান প্রতিনিধি তোমোহিদে ইচিগুচি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, সরকারি সেবা ডিজিটাল করতে হলে তা ব্যবহারকারীকেন্দ্রিক ও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডিজিটাল হতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ও জটিল প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাইকার বাংলাদেশ অফিসের প্রধান তোমোহিদে ইচিগুচি বলেন, বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছ, দ্রুত ও পূর্বানুমেয় সরকারি সেবার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিলেন, বাংলাবিজ সেই দাবির একটি বাস্তব ও কার্যকর সমাধান। অনলাইন সিস্টেমে ব্যবসা নিবন্ধন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া একীভূত করার মাধ্যমে বাংলাবিজ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে বিশ্বমানের একটি ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করবে।
তিনি আরও বলেন, জাইকা বিনিয়োগবান্ধব, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বচ্ছ কার্যপ্রবাহ এবং কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। তাই বাংলাবিজ একটি মাল্টি-এজেন্সি সার্ভিস পোর্টাল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তিনি এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে জাইকার সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, গত সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিডার গভর্নিং বোর্ডের বৈঠকে বাংলাবিজকে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সব সরকারি সেবার একক প্রবেশদ্বার হিসেবে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই এটি গেজেট আকারে প্রকাশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, এই প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশকে ডিজিটাল বিনিয়োগ সেবায় বৈশ্বিক মানদণ্ডের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে। বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মে ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে এমন নতুন ফিচার যুক্ত করা হবে, যা বিনিয়োগের খরচ, সময় ও অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে দেশি বিদেশী বিনিয়োগকারীগণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উপপরিচালক আবু মোহাম্মদ নূরুল হায়াত টোটুল এবং বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের (বিসিজি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পার্টনার তৌসিফ ইশতিয়াক।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন অসহনীয় চাঁদাবাজি ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ব্যবসায়ীদের একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরে এক দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব। গতকাল সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআইয়ের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথাগুলো বলেন তিনি। ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত সরকারের নিকট প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি সালিম সোলায়মান প্রমুখ। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, নতুন সরকার এমন একসময় ক্ষমতায় এসেছে, যখন অর্থনীতি অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন, বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তলানি ঠেকেছে। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং অস্থিতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও তার সামান্যতম বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদন প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। এখন কারখানায় চাঁদা দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে এবং আওয়ামী দুঃশাসন পার হলেও তা বন্ধ হয়নি। স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবার আগে উন্নতি করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন, পুলিশ, রাজস্ব কর্মকর্তাসহ অনেকেই চাঁদাবাজি করেন। কারা চাঁদাবাজি করছে, সেটা সরকারকে বের করতে হবে। চাঁদাবাজরা এসে বলে, তারা সরকারি দলের লোক। যখনই যে সরকার আসে, তখনই বলে আমরা সরকারি দলের লোক; আমাদের চাঁদা দিতে হবে। আমাদের এই অনুষ্ঠান আছে, পাড়ার এই চাঁদা দিতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব। তিনি আরো বলেন, কারখানায় ঢুকতেও চাঁদা দিতে হয়। অফিস ও রাস্তায় চাঁদা দিতে হয়। জনগণ ও ব্যবসায়ী মহল চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধে আমরা নতুন সরকারের কাছ থেকে কড়া বার্তা প্রত্যাশা করছি। এলডিসি উত্তরণ পেছানোর চেষ্টা করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে তাসকীন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাত থেকে একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও একটি অপ্রকাশিত চুক্তির (এনডিএ) নামে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ববিরোধী একটি চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ মওকুফে সম্মত হলেও এটা এমন নয় যে সম্পূর্ণ শুল্ক মওকুফ করে দিয়েছে। ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিটি এমনভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যা উভয় দেশের জন্য সমানভাবে লাভজনক হয়। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, অপরিবর্তিত নীতি সুদহারের (পলিসি রেট) কারণে ব্যবসায়ীদের ১৬-১৭ শতাংশ হারে ব্যাংকঋণ নিতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং ঋণ শ্রেণীকরণের সীমা ৯ মাস থেকে ৩ মাসে নামিয়ে আনার কারণে আর্থিক খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা তৈরি করেছে। তা ছাড়া শিল্প-কারখানায় চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ না থাকার পাশাপাশি গ্যাসের দাম বাড়ানোয় উৎপাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবনে ৪টি পরামর্শ দেওয়া হয়। এগুলো হলো— আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি চাঁদাবাজি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। সরকারি খাতে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন, তাদের প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং ঋণের সুদের হারকে যুক্তিসংগত ও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। টানা দুই দফা দাম কমার পর ফের স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এবার ভরিতে বেড়েছে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) এক বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস জানায়, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। আজ সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকেই নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বেড়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সোনার সঙ্গে দেশের বাজারে বাড়ানো হয়েছে রুপার দামও। এবার ভরিতে ৩৫০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৭০৭ টাকা। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাজুস। আজ সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকেই নতুন এ দাম কার্যকর হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আজ সূচকের বড় পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আজ ডিএসইতে মোট ৩৯২টি কোম্পানির ২১ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৪১২টি শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে। দিন শেষে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫৯ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ১১৪ টাকা। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৫৩ দশমিক ২১ পয়েন্ট কমে ৫,৪৬৫ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে নেমে আসে। ডিএস-৩০ মূল্য সূচক ১২ দশমিক ১৭ পয়েন্ট কমে ২,০৯৭ দশমিক ৮৮ পয়েন্টে এবং ডিএসইএস শরীয়াহ সূচক ১০ দশমিক ১৮ পয়েন্ট কমে ১,০৯৫ দশমিক ১০ পয়েন্টে অবস্থান করে। লেনদেনকৃত কোম্পানিগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ৪৬টির, কমেছে ৩১৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৩টি কোম্পানির শেয়ার। টাগরি ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ‘এ’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হওয়া ২০৬টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ২৯টির, কমেছে ১৬৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৪টির। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হওয়া ৭৯টির মধ্যে ৭টির দর বেড়েছে, ৬৩টির কমেছে এবং ৯টি অপরিবর্তিত রয়েছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হওয়া ১০৭টির মধ্যে দর বেড়েছে ১০টির, কমেছে ৮৭টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১০টির। ‘এন’ ক্যাটাগরিতে কোনো ইস্যুর লেনদেন হয়নি। মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে লেনদেন হওয়া ৩৪টির মধ্যে ২টির দর বেড়েছে, ২২টির কমেছে এবং ১০টি অপরিবর্তিত রয়েছে। কর্পোরেট বন্ডের ৩টি ইস্যুর মধ্যে ২টির দর বেড়েছে এবং ১টির কমেছে। সরকারি সিকিউরিটিজ (জি-সেক) খাতে লেনদেন হওয়া ৪টির মধ্যে ১টির দর বেড়েছে এবং ৩টির কমেছে। লেনদেনের ভিত্তিতে ডিএসইতে আজ শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো- ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ঢাকা ব্যাংক, সায়হাম কটন মিলস, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ইনফিউশন, রহিমা ফুড, মুন্নু ফেব্রিকস এবং সিটি ব্যাংক। দর বৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো- রহিমা ফুড, আইসিবি এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড-১, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স, এপেক্স স্পিনিং, বিডি থাই ফুড, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, বিডি থাই এবং ব্র্যাক ব্যাংক। অন্যদিকে দর কমার শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো- ফার্স্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, এপোলো ইস্পাত, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, বিআইএফসি, টুং হাই নিটিং এবং ফনিক্স ফাইন্যান্স।