চতুর্থবারের মত লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত বারা টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন লুৎফুর রহমান।
অ্যাসপায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফুর তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলামকে প্রায় ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে নিবার্চনে বিজয়ী হয়েছেন।
লুৎফুর পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট, আর লেবার প্রার্থী পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোট।
লুৎফুর রহমান যুক্তরাজ্যের কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রথম বাঙালি ও মুসলমান মেয়র। ২০১০ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ২০১৪, ২০২২ সালেও মেয়র নির্বাচিত হন।
বৃহস্পতিবার লন্ডনের ৩২টি বারা কাউন্সিলে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে পাঁচটি কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে নির্বাহী মেয়র ও কাউন্সিল নির্বাচন করা হয়।
এর মধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটস ছাড়াও পাশের বারা নিউহ্যামে প্রথম বাঙালি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন লেবার পার্টির ফরহাদ হোসেন।
স্থানীয় কাউন্সিলের নির্বাচনে এবার পুরো ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবি ঘটিয়ে সবচেয়ে বেশি কাউন্সলর পদ জিতে নিয়েছে ডানপন্থি নতুন দল রিফর্ম ইউকে। প্রধান দুটি দল লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি এখন রিফর্ম ইউকের উত্থানে শঙ্কিত।
চতুর্থবারের মত মেয়র নির্বাচিত হয়ে বারার বাসিন্দাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন লুৎফুর রহমান।
তিনি বলেন, “আমাকে পুনর্নির্বাচিত করায় টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ। আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় যুগান্তকারী সহায়তা এবং সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন নির্মাণের রূপান্তরমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখব।
আশা ও ঐক্যের রাজনীতিকে ভয় ও বিভেদের রাজনীতির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
তিনি বলেন, “টাওয়ার হ্যামলেটসে আমরা গর্ব করি যে এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ এলাকাগুলোর একটি।
আমরাই দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করেছি, এবং জাতীয় সরকারের কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়েছি।
লুৎফুর রহমান বলেন, আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমি আশা করি আজ নির্বাচিত নতুন প্রগতিশীল প্রশাসনগুলো আমাদের পথ অনুসরণ করবে, একই ধরনের রূপান্তরমূলক নীতি গ্রহণ করবে এবং আমাদের কমিউনিটির জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনতে একসঙ্গে কাজ করবে।
লুৎফুর রহমান তার নির্বাচনি ইশতেহারে কিছু নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে কম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ট্র্যাভেল পাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে টাওয়ার হ্যামলেটস হবে দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা এমন উদ্যোগ নেবে।
এর আগে লুৎফুরের প্রশাসন দেশের প্রথম কাউন্সিল হিসেবে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করে।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, কাউন্সিল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন’ এর নেটওয়ার্কে ব্যবহারের উপযোগী ট্র্যাভেল পাসের অর্থায়ন করবে।
বর্তমানে লন্ডনে শুধু ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। নতুন পরিকল্পনার আওতায় টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় নির্ধারিত আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারের সব শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্ট’-এ নেয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই এসব কর্মীর প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে শ্রমবাজারটি পুনরায় চালু হবে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনা করেন। এসব সরাসরি বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়। ওই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকায়, মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয়। তবে বর্তমান সরকার মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা ও নেগোসিয়েশন করেছে-উল্লেখ করে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইনি শর্ত ও নীতিমালার সঙ্গে সর্বোচ্চ সমন্বয় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ ও সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম সাফল্য। মন্ত্রণালয় জানায়, মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি মালয়েশিয়া সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ৪২৩টি এজেন্সির মধ্যে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে অবশিষ্ট এজেন্সিগুলোকে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানায়। গত ছয় মাস ধরে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অনুরোধের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশকে এ সুযোগ দিয়েছে বলে জানায় মন্ত্রণালয়। এর আওতায় মালয়েশিয়া তাদের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত করেছে এবং বাংলাদেশের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দিচ্ছে। এর পাশাপাশি, একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলও এ প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে বিদ্যমান বহুবিধ নিয়মতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একযোগে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী প্রেরণের সুযোগকে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি সম্পন্ন করেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, অতীতে এ ধরনের স্বচ্ছ ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো নজির ছিল না। এ বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হলে নতুন সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে বলেও মন্ত্রণালয় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টার পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে প্রতিটি মেডিকেল সেন্টার সরেজমিনে পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ায় এ প্রক্রিয়ায় সময় প্রয়োজন হচ্ছে। এ অবস্থায় মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি, শ্রমবাজার চালুর সঙ্গে সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করে মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করবে। কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরে অতীতের সব ধরনের হয়রানি বন্ধ, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কাজে যোগদান এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া, অভিবাসন সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হবে। মন্ত্রণালয় জানায়, শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণকে ঘিরে নানামুখী বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে যে প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে, তা দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় হবে। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ এবং অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সব অংশীজনকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল টেস্ট কিংবা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি দিয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনা ঠেকাতে দালাল চক্র শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত ও অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা প্রতিরোধে সুনামগঞ্জে আয়োজিত এক সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন। সভায় মন্ত্রী বলেন, সুনামগঞ্জের অনেক যুবক দালালদের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ পথে অনেকেই নানা বিপদের মুখে পড়ছেন, এমনকি অকালে প্রাণও হারাচ্ছেন। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত দালালদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, শুধু বৈধ পথে বিদেশ যাওয়াই যথেষ্ট নয়, বিদেশে ভালো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অর্জন করতে হবে। এ জন্য সুনামগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। অবৈধ অভিবাসন বন্ধে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। তার মতে, অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি এবং বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ ও সুবিধা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। এ লক্ষ্যে সুনামগঞ্জের মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দেন তিনি। অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ সুনামগঞ্জ থেকেই শুরু হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। সভায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বর্তমান পরিস্থিতি ও নতুন সম্ভাবনার বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ সম্পর্কে তথ্যের অভাবে অনেক বাংলাদেশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য বৈধ পথে ইতালিতে যাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। দক্ষতা অর্জন করে এই সুযোগ কাজে লাগালে বাংলাদেশি কর্মীরা নিরাপদ ও বৈধ উপায়ে ইউরোপের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারবেন বলে জানান তিনি।
বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গতি ও স্বচ্ছতা বাড়াতে পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক আবেদন ব্যবস্থা চালু করেছে মালয়েশিয়া। নতুন এই ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তাদের সরকারি দপ্তরে গিয়ে ম্যানুয়ালি আবেদন জমা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। অনলাইনের মাধ্যমেই আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। মালয়েশিয়ার নতুন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে দেশটির শিল্প খাতের বিভিন্ন সংগঠন। মালয়েশিয়ান ম্যানুফ্যাকচারার্স ফেডারেশন (এফএমএম) এবং অ্যাসোসিয়েটেড চাইনিজ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসিসিসিআইএম) মনে করছে, অনলাইন ব্যবস্থার ফলে বিদেশি কর্মী নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। নতুন ব্যবস্থায় শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র (এসকেবি) ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আবেদনকারীরা অনলাইনে নিজেদের আবেদনের অবস্থান বা স্ট্যাটাস জানতে পারবেন। এতে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি সময়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা কৃষি ও নির্মাণের মতো খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ আরও সহজ করার জন্য সাক্ষাৎকারের সময়সীমা বাড়ানোরও প্রস্তাব দিয়েছেন। বাংলাদেশেও অনলাইন ব্যবস্থার উদ্যোগ: মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশ সরকারও বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা যাচাই, বিদেশি কর্মীর চাহিদা এবং নিয়োগের বিভিন্ন ধাপকে অনলাইন ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে। অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন জেলায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ রয়েছে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা যাচাইয়েও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে বিদেশি নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সরাসরি দক্ষতা যাচাই করে নিয়োগ দিতে পারবেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬ হাজার চালক পাঠানোর ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে এ পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়োগকর্তার সরাসরি দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং যোগ্য কর্মী বাছাই আরও সহজ হবে। প্রবাসীদের সরকারি সেবা সহজ করার উদ্যোগ: বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের সরকারি সেবা পেতে ভোগান্তি কমাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরাসরি তাদের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডাক বা কুরিয়ার সেবা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এতে দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় কার্ডটি চালু হলে প্রবাসীরা দেশে ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বিদেশে কর্মী পাঠানো থেকে শুরু করে প্রবাসীদের দেশে ও বিদেশে সরকারি সেবা পাওয়ার পুরো ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও সহজ করার দিকে এগোচ্ছে সরকার।