রাজধানীর মিরপুরে দুই ছেলেকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল মোহাম্মদ আলম নুরী (৩৭) ও খাদিজা খাতুন (৩৫) দম্পতির। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেই সুখের সংসারে হঠাৎ আঘাত হানে এক বিধ্বংসী ঝড়। আলম নুরীর শরীরে নন অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ (এনএএলডি) শনাক্ত হয়। দ্রুত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য একদিকে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রয়োজন ডোনারের। অন্ধকার নেমে আসে আলম নুরী ও খাদিজা খাতুন দম্পতির জীবনে।
শেষমেশ স্বামীকে বাঁচাতে নিজের লিভারের অংশ দান করেন খাদিজা। প্রায় এক বছরের কঠিন লড়াই শেষে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতে সফল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন আলম নুরী। খাদিজার বাড়ি রাজশাহী শহরে। আলম নুরীর বাড়ি বান্দরবানের লামায়। তাদের দুই ছেলে কেএম আরিয়ান (৯) ও কেএম আদনান (৭)।
আলম নুরী ও খাদিজা খাতুন বিএনসিসির দুই সাবেক ক্যাডেট। তাদের পরিচয় ২০১১ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সেন্ট্রাল ট্রেনিং এক্সারসাইজ (সিটিই) ক্যাম্পে। সেই পরিচয় থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক ২০১২ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ের মাধ্যমে পরিণতি পায়। আলম নুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে বেসরকারি খাতে কাজ করেছেন। অন্যদিকে, খাদিজা খাতুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর আইন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালনে নিজেকে নিবেদিত করেন। বর্তমানে এই দম্পতি দুই ছেলেকে নিয়ে বান্দরবানের লামায় বসবাস করছেন।
গত বছরের ৮ নভেম্বর ‘স্ত্রীর ভালোবাসার লিভারে নতুন জীবন পেলেন স্বামী’ শিরোনামে আলম-খাদিজা দম্পতিকে নিয়ে ঢাকা পোস্টে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে চিকিৎসা করাতে তাদের এক বছরের লড়াই-সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়। তাদের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের এক বছর হতে চলেছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এই দম্পতি। তবে এখনো তাদেরকে নিয়মিত নানা মেডিকেল পরীক্ষা, ওষুধ ও নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে চলতে হচ্ছে। এই ধরনের রোগের চিকিৎসার আগের ও পরের জীবন সংগ্রাম নিয়ে নানা অভিজ্ঞতার কথা ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন এই দম্পতি।
রোগ নির্ণয় থেকে অস্ত্রোপচার
২০২৪ সালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন আলম নুরী। সেপ্টেম্বরে বেশ কিছুদিন জ্বরে ভোগার পর ১২ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ রক্তবমি শুরু হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে ছোটেন সোহরাওয়ার্দীসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। শেষে রক্তবমি না থামায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়, সেখানে ভর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারালে আইসিইউতে নেওয়া হয় তাকে এবং প্রায় ৯ ব্যাগ রক্ত-প্লাটিলেট দেওয়ার পর রক্তপাত বন্ধ হয়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিস তথা নন অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ (এনএএলডি), যার একমাত্র সমাধান লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বলে জানান চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকদের নির্দেশনায় ৬ মাসের ভিসা-প্রতীক্ষা ও অর্থ সংগ্রহ শেষে ২০২৫ সালের মার্চে দিল্লির ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে সার্জন ডা. সুভাষ গুপ্তার শরণাপন্ন হন তারা। সেখানে ডিএনএ ম্যাচিং, কাগজপত্র অ্যাপোস্টাইল ও ভিসা-জটিলতার মতো নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে মেডিকেল বোর্ডের অনুমতি মেলে। ৪ ও ৬ আগস্ট যথাক্রমে আলম নুরী ও খাদিজাকে হাসপাতালে ভর্তির পর ৭ আগস্ট রাত সাড়ে ৩টায় প্রস্তুতি শেষে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় দুজনকে। সেখানে ভোর ৪টায় অজ্ঞান করা হয় তাদের। দুপুর সোয়া ১টায় খাদিজার এবং বিকেল সাড়ে ৫টায় আলম নুরীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। খাদিজার লিভারের ৬৪ শতাংশ সফলভাবে প্রতিস্থাপিত হয় তার স্বামীর শরীরে। ৮ আগস্ট রাত আড়াইটায় জ্ঞান ফেরে আলম নুরীর।
ম্যাক্স হাসপাতালে ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য ২১ লাখ রুপি, যা ডালারে পেমেন্ট করে ভর্তি হতে হয় আলম ও খাদিজাকে। এর বাইরে তাদের ট্রান্সপ্ল্যান্ট পূর্ববর্তী চিকিৎসা, থাকা খাওয়া, ডকুমেন্টস প্রস্তুত করা, যাতায়াত, পরবর্তী ইনভেস্টিগেশন এবং ওষুধপত্র বাবদ আরও প্রায় ১৫-২০ লাখ রুপি খরচ হয়। চিকিৎসার পর এখন অনেকটা সুস্থ আলম নুরী। তবে তাকে নানা রুটিন ফলো করে চলতে হচ্ছে।
কেমন আছেন আলম নুরী
অস্ত্রোপচারের এক বছর পর শারীরিক অবস্থা ও আগের জীবনের সঙ্গে বর্তমান জীবনের পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আলম নুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, মহান আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া। আল্লাহ যেন এই রোগ আর কাউকে না দেন। আমরা প্রত্যাশিতভাবে ভালো আছি এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো আমি এখনো বেঁচে আছি।
তিনি বলেন, রোগ নির্ণয় হওয়ার প্রথম এক মাস আমার স্ত্রীকে বাংলাদেশের কিছু চিকিৎসক ভুল তথ্য দিয়ে যে মানসিক ট্রমায় ফেলেছিলেন, সেই অসহায়ত্ব আর আজকের এই জীবনে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আমি আর ১০টা মানুষের চেয়ে আলাদা। আমার রুটিন, খাবার, ঘুম, চলাফেরা, চিকিৎসা— সবই আলাদা। আমি একটা ছকেবাঁধা জীবন পার করছি। এ জীবন কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় এবং সকলের সহযোগিতায় ফিরে পাওয়া। সারা জীবন এই আতঙ্কে কাটাবো যে এই বুঝি লিভার রিজেক্ট (প্রত্যাখ্যান) করল।
আলম বলেন, তালিকাবহির্ভূত কোনো খাবার খেতে পারবো না, দীর্ঘক্ষণ বসে-শুয়ে-দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়, আজীবন মাস্ক পরতে হবে। কিন্তু দিনশেষে আমি বেঁচে আছি, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালো আছি— এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?
কাজে বা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার বিষয়ে আলম নুরী বলেন, একজন হেপাটাইটিস রোগীর করুণ পরিণতি হয় লিভার সিরোসিস-ক্যানসারে, সেখানে আমার ফিরে আসাটা মিরাকল। আত্মীয়-বন্ধুদের বেশির ভাগেরই ধারণা ছিল, আমার ফেরা অসম্ভব। আমার স্ত্রীর আত্মবিশ্বাস ছিল এমন—“যদি বেঁচে থাকার এক শতাংশ সুযোগও থাকে, আমি সেটাকে শতভাগ চেষ্টায় রাখব। এরপরও ফেরানো না গেলে সেটাকেই নিয়তি বলব, এর আগে নয়।”
তিনি বলেন, আমি এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এক পয়সা আয় করতে পারিনি। আমাদের যা ছিল, সবই বিক্রি করেছি। এখন গ্রামে থাকি, খামার করার চিন্তা করছি। আমার স্ত্রী তার বাবার বাসায় যান না প্রায় তিন বছর, আমার সুস্থতার অপেক্ষায়। অপারেশনের ছয় দিনের মাথায় ৯ ইঞ্চি কাঁচা সেলাই নিয়ে তিনি আমার জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিজের রান্না করা খাবার নিয়ে যেতেন, নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন। দিল্লির সেই হাসপাতালের চিকিৎসক-সেবিকারা সবাই অবাক হয়ে আমার স্ত্রীকে দেখতে এসেছিলেন। এ এক অনন্য ঋণ।
অস্ত্রোপচার পরবর্তী ওষুধ ও খরচের বিষয়ে আলম নুরী বলেন, অপারেশনের টেবিল থেকে নামার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাকে ওষুধ খেতেই হবে, বাদ পড়লে জীবন হারানোর সম্ভাবনা শতভাগ। আমাকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখার একটি ওষুধ খেতে হয়, যাতে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ বেড়ে যায়। এই ওষুধে কিডনি বিকল হওয়া, রক্তে শর্করা বৃদ্ধি বা ক্যানসারের ঝুঁকিও থাকে। এছাড়া সম্পূরক হিসেবে আরেকটি রোগপ্রতিরোধ-দমনকারী ওষুধও নিতে হয়। সবমিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকার ওষুধ এবং ১১ হাজার টাকার পরীক্ষা লাগে। বিদেশ থেকে ওষুধ আনলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মোটা অঙ্কের শুল্ক ধরে বসে। আমার মতো একই রোগে আক্রান্ত পোশাক কারখানার এক কর্মকর্তা অতিরিক্ত খরচের কারণে ওষুধ চালিয়ে যেতে না পেরে ২০২৫ সালের শুরুতে মারা যান।
এখন সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ও আগামীর স্বপ্ন নিয়ে আলম নুরী বলেন, আমার সবচেয়ে আনন্দের সময় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে একসঙ্গে বসে গল্প করা। ছোট ছোট দুই ছেলেকে দেশে রেখে আমি ও আমার স্ত্রী প্রায় সাত মাস দেশের বাইরে ছিলাম। আমার বড় ছেলে অঝোরে কেঁদেছিল, আত্মীয়রা কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল— আল্লাহ কেন বৃষ্টি দিচ্ছে না! অপারেশনের ২৩ ঘণ্টা পর জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে সেবিকার কাছে তারিখ-সময় জিজ্ঞেস করি, দুহাত তুলে আজান দিয়ে শুকরিয়া জানাই। চিকিৎসক আসার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, আমার স্ত্রী কোথায়, আমি দেখতে চাই। এখন দুই ছেলে দুই পাশে আর স্ত্রী সামনে বসে— তাদের সঙ্গে খাওয়াটাই আমার জীবনের আনন্দের মুহূর্ত। আমার স্বপ্ন— নিজের গ্রামে একটা দাতব্য চিকিৎসালয় চালাবো, সব ধরনের রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখবো। হায়াত থাকলে একটা ট্রাস্টের অধীনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবো। নিজেকে নিয়ে বিশেষ স্বপ্ন দেখি না, শুধু স্বপ্ন দেখি সুস্থ পৃথিবীর।
যারা লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের অপেক্ষায় আছেন— তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যেকোনো ট্রান্সপ্ল্যান্ট একটি জটিল ও জীবনের হুমকিস্বরূপ প্রক্রিয়া। এতে অর্থের পাশাপাশি সাহস ও ধৈর্যের প্রয়োজন। প্রচুর আমিষ দরকার, না হলে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাবেন না, হাত কাঁপবে, মাথা ঝিমঝিম করবে। তাই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও কিছু কাজ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ নেবেন না। হেপাটাইটিস বা লিভার সিরোসিস হলে লাল মাংস এড়িয়ে চলুন, খাবার পরিমিত খান। হতাশ হবেন না, এখন থেকেই সচেতন হন। লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য বয়স একটা বড় বিষয়— বয়স যত বাড়বে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। এ দেশের কিছু চিকিৎসক চিকিৎসা পদ্ধতি বা খরচের সঠিক ধারণা না দিয়ে ভুল ধারণা দেন— আমার বেলায় ছিল নন-অ্যালকোহলিক ক্রনিক লিভার ডিজিজ। বিদেশে গিয়ে প্রতিস্থাপন করাতে যে টাকা যায়, তার অর্ধেক ভিসা, যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া বাবদ ব্যয় হয়ে যায়। এই টাকার অর্ধেক দিয়ে দেশেই এর চেয়ে ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। মন থেকে চাই, চিকিৎসার মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার সদিচ্ছা পোষণ করুক। আমার এ রোগ পৃথিবীর আর কারও না হোক।
লিভারদাতা স্ত্রী সম্পর্কে আলম নুরী বলেন, যখন আমাদের বিয়ে হয়েছিল আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার কারণে আমি থাকতাম ঢাকায়, আর ও রাজশাহীতে। সুযোগ পেলেই বাসে চেপে চলে যেতাম ওর ক্যাম্পাসে, শুধু কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোর জন্য। একদিন খুব সকালে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেখি লাইব্রেরির সামনে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছে। ও তখনও ক্লাসে আসেনি। আমি একা একা প্রদর্শনী ঘুরে দেখছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে— বিএনসিসির পোশাক পরা আমার স্ত্রীর ছবি। ছবির নিচে লেখা, ‘Pride of Nation’। ওকে ডেকে ছবিটি দেখালাম। প্রথমে ও বিশ্বাসই করতে পারেনি। পরে জানতে পারি, ছবিটি ওকে না জানিয়েই একজন আলোকচিত্রী তুলেছিলেন। পরে তার সঙ্গে কথা বললে তিনি বিষয়টি জানাতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং প্রদর্শনী শেষে ছবিটি আমাদের হাতে তুলে দেন। সেই ছবিটি আজও আমাদের কাছে একটি অমূল্য স্মৃতি। আজ এত বছর পর ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেই ক্যাপশনটি শুধু একটি প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল না— ও সত্যিই আমার কাছে ‘Pride of Nation’। ও খুবই শান্ত, নম্র আর নরম স্বভাবের মানুষ। কিন্তু অন্যায়ের সামনে কখনো আপস করে না। সাহস, সততা আর দায়িত্ববোধ— এই তিনটি গুণ ওকে আলাদা করে চেনায়। ভালোবাসার মানুষের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে পারে। আমার জন্য, আমাদের সন্তানদের জন্য এবং পুরো পরিবারের জন্য ও যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার ঋণ কোনো দিন শোধ হওয়ার নয়।
কেমন আছেন স্বামীকে লিভারদাতা খাদিজা
নিজের লিভার দিয়ে স্বামীকে বাঁচিয়ে ভালোবাসার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন খাদিজা খাতুন। সকল বাধা পেরিয়ে এখন তিনি স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। স্বামীকে লিভারের অংশ প্রদান এবং পরবর্তীতে নানা প্রতিকূলতার বিষয়ে কথা বলেছেন খাদিজা খাতুন।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, শারীরিকভাবে ছোটবেলা থেকেই দুর্বল, সবসময় কোনো না কোনো অসুস্থতায় আক্রান্ত থাকি। জ্বর-সর্দি ও অ্যালার্জিজনিত সমস্যা আমার নিত্যসঙ্গী এবং হিলিং পাওয়ারও খুব কম। সেদিক থেকে আমার স্বামী খুব শক্ত-সামর্থ্যবান ছিলেন। উনি আমার খুব কেয়ার করতেন। সেই শক্ত মানুষটা যখন দুরারোগ্য মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন, তখন আমার মতো দুর্বল শারীরিক ও মানসিক অবস্থার মানুষটাকে আল্লাহ অসীম ধৈর্য ও সাহস দান করলেন। পরপর দুটি সিজারিয়ানের পর আরও কাহিল হয়ে পড়া সত্ত্বেও এত বড় অস্ত্রোপচারের জন্য আল্লাহর ইচ্ছায় নিজেকে সবদিক দিয়ে ফিট পেয়েছিলেন এবং চূড়ান্তভাবে স্বামীকে লিভার দানের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হন বলে জানান তিনি।
নিজের এই অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে খাদিজা বলেন, আমি জানি না এই অসুস্থ মানুষটাকে নিয়ে কোন শক্তির ওপর ভর করে একা ইন্ডিয়া পাড়ি জমালাম, দীর্ঘ কয়েক মাস কীভাবে সবকিছু ম্যানেজ করে একা একা সার্জারি রুমে ঢুকলাম। এরপর আরও দুই মাস সার্জারি-পরবর্তী ফলোআপ কমপ্লিট করে দেশে ফিরলাম। সবই কেমন জানি ঘোরের মতো লাগে, মনে হয় কোনো দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বেশ দুর্বল। যতটুকু কাজ করি তার দ্বিগুণ রেস্ট নিই। ব্যথাও আছে, বসা থেকে উঠতে গেলে টান লাগে। তবে বেশি কষ্ট হয় ঘুমাতে গেলে, পাশ ফিরতে হয় খুব কষ্টে। লিভারজনিত বড় কোনো শারীরিক জটিলতা নেই। সাধারণ অসুস্থতায় সহজে আক্রান্ত হই।
দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রসঙ্গে খাদিজা জানান, আগে থেকেই কাজেকর্মে একটু অলস প্রকৃতির হওয়ায় সবসময় সাহায্যকারীর সহায়তা নিতে হয়েছে ঘরের কাজে, আর তার বাইরেও স্বামী অনেক সহযোগিতা করতেন। আর এখন এই শারীরিক অবস্থাতেও ঘরের সব কাজ নিজে নিজে করতে হয় আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে অনুশোচনার প্রশ্নে খাদিজা বলেন, আফসোস বিষয়টা আমার মধ্যে কখনো ছিল না। মানুষ যখন তুলনা করতে অভ্যস্ত হয়, তখন আফসোস বিষয়টা আসে। আমাদের বিয়েটা ছিল আমার পছন্দে, তখন অনেকেই বলেছিল পস্তাতে হবে। বড় অফিসার বা সরকারি চাকরিজীবী আমার দরকার ছিল না, আমি আমার ভালোবাসার মানুষ পেয়ে সন্তুষ্ট, তাই কোনোদিনও আফসোস আসেনি এই ১৪ বছরের বিবাহিত জীবনে।
আইন পেশার সুযোগ ছেড়ে বিইউপিতে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া কিংবা পরবর্তীতে সন্তান ও পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে চাকরি ছেড়ে ঘরের কাজে মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্তেও কখনো অনুশোচনা হয়নি বলে জানান তিনি। ‘আমি পেছনে যা ফেলে আসি, তা কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই এবং নিজ সিদ্ধান্তে ফেলে আসি, তাই আমি সুখি,’ বলেন খাদিজা।
গ্ল্যামারাস জীবন ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করাকেই তিনি চূড়ান্ত বলে মনে করেন। তবে ভালো সিদ্ধান্তগুলো আরও আগে না নেওয়ার আফসোস তার রয়ে গেছে। নিজের এই পথচলাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সংকেত ও উত্তম পরিকল্পনা হিসেবে দেখেন তিনি, যেখানে প্রকৃতপক্ষে নিজেরই স্বার্থ বেশি ছিল বলে মনে করেন।
স্বামীকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আখ্যা দিয়ে খাদিজা বলেন, আমার জীবনে স্বামীর প্রয়োজন কতটা জরুরি এবং হৃদয়ের কতটা অংশ জুড়ে তিনি আছেন, তা এই বিপদের মধ্য দিয়েই আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছেন আল্লাহ। জীবন-মৃত্যু যে কতটা কাছাকাছি এবং সুস্থতা যে কত বড় নিয়ামত, তা এই অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছি।
অঙ্গদানের বিষয়ে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে খাদিজা বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ অনেক দূর এগিয়েছে এবং কিডনি, লিভার, হৃদযন্ত্র, চক্ষুর মতো জটিল অঙ্গদানের মাধ্যমে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। আমাদের দেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট নিয়মিতভাবে না হওয়ায় মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা কম, ভয় বেশি। দেশেই এই চিকিৎসা চালু হলে চিকিৎসা ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে, কমে যাবে অন্য দেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীর হয়রানি। এ বিষয়ে দরকার সরকারের সদিচ্ছা।
তিনি বলেন, যাদের আর্থিক সঙ্গতি আছে, ডোনার রেডি আছে, তাদের হেলাফেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে যত দ্রুত সম্ভব ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে ফেলা উচিত। কেননা এ রোগ নিয়ে একটা দিনও বসে থাকা মানে ট্রান্সপ্ল্যান্টের সাকসেস রেট কমে যাওয়া। রোগী যত দুর্বল হয়ে যাবে, তার হিলিং পাওয়ার তত কমে যাবে। তবে ট্রান্সপ্ল্যান্টই শেষ কথা নয়। এই চিকিৎসা লাইফলং, খুব ব্যয়বহুল। নিয়মিত ওষুধ ও ফলোআপের সামর্থ্য না থাকলে সার্জারির সুফল ভোগ করা সম্ভব নয়।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
হেপাটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রয়োজন এড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, লিভারের কিছু অসুখ থাকে। যেমন- একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস। এর লক্ষণ হচ্ছে খাওয়া দাওয়ায় অরুচি হওয়া, প্রস্রাব হলুদ হওয়া, চোখ হলুদ হওয়া, বমি হওয়া, পেটে ব্যথা হওয়া। স্পেশালি ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে জ্বর; প্রথমে জ্বর, গায়ে ব্যথা, মাথা ব্যথা, এরপর একসময় জন্ডিস। যখনই আপনার প্রস্রাব হলুদ, চোখ হলুদ, খাওয়া দাওয়ায় অরুচি তখনই লিভারটা জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হবে।
লিভার সিরোসিস প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্রনিক লিভার ডিজিজের শেষ স্টেজ হলো লিভার সিরোসিস। এটি নীরবঘাতক। অনেকদিন ধরে ভাইরাস থাকে, হেপাটাইটিস থাকে, রোগী জানেন না। এক সময় হঠাৎ দেখা যায় পেট ফুলে গেছে, পেটে ব্যথা হয়েছে, পেটের ডান পাশের উপরিভাগে অথবা বাম পাশের কোণার দিকে একটা চাকা দেখা যাচ্ছে, পা ফুলে গেছে— এগুলো লিভার সিরোসিসের লক্ষণ। এই লক্ষণগুলো যখনই দেখা যাবে তখনই আমাদের ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।'
লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রসঙ্গে এই চিকিৎসক বলেন, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগের চিকিৎসা আমাদের দেশে সম্ভব। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমটা কঠিন। তবে লিভারের একটা ভালো দিক হলো কিডনির তুলনায় লিভার দেওয়া-নেওয়া সহজ, কারণ রিজেকশন কম হয়। এমনকি রক্তের গ্রুপ না মিললেও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা সম্ভব। কিডনির ক্ষেত্রে মানুষকে একটা কিডনি পুরোটাই দিয়ে দেওয়া লাগে। লিভার দেওয়ার ক্ষেত্রে দাতাকে লিভারের একটা অংশ দিতে হয়, আর যে অংশটা দেওয়া হয় সেটা আবার তার শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পুনস্থাপিত হয়ে যায়। ফলে লিভার দেওয়ার কারণে দাতার ভবিষ্যতে আর কোনো অসুবিধা থাকে না।
ট্রান্সপ্ল্যান্ট পরবর্তী জীবনযাপন নিয়ে তিনি বলেন, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের রোগীকে ইমিউনোসপ্রেশন ওষুধ দিতে হয়, যাতে শরীর নতুন লিভার প্রত্যাখ্যান না করে। অন্যান্য ট্রান্সপ্ল্যান্টের তুলনায় লিভারের ক্ষেত্রে অনেক কম ওষুধ লাগে এবং ধীরে ধীরে এই ওষুধের পরিমাণ একটি বা দুটিতে নেমে আসে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় এসব রোগীকে জনবহুল জায়গা এড়িয়ে চলা এবং মাস্ক পরার মতো সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফলভাবে হলে দীর্ঘমেয়াদে রোগী ভালো থাকে, এমনকি কর্মক্ষম থাকে। আগের অফিস-আদালত, চাকরি সবকিছু মেনটেইন করতে পারে।
দেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সহজলভ্য করা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টে পিছিয়ে আছে। প্রতিবেশী দেশে ৯৭ বা ৯৯ সালের দিকে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট শুরু হয়ে এখন ১০০টির বেশি সেন্টারে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়।
তিনি বলেন, সবকিছুতেই সরকারের দিকে আঙুল তোলা ঠিক নয়, বরং সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান— সবাই মিলে উদ্যোগ নিলেই এটা সম্ভব। প্রতিবেশী দেশের প্রথম লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গঙ্গারাম হাসপাতালে। বিভিন্ন দেশে সমাজের বিত্তবান বা সচেতন মানুষেরা সংগঠিতভাবে ফিলানথ্রপিক ও চ্যারিটি হাসপাতাল তৈরি করে থাকেন। আমাদের দেশে এটা এখনো হয়নি। দেশের বড় বিত্তবান মানুষেরা অথবা যারা অনেকদিন বিদেশে অবস্থান করছেন তারাও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার খুলতে পারেন, যেটা অনেক জায়গায় হয়েছে এবং সেটা সম্ভব।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
কক্সবাজার শহরের একটি বসতঘরের খাটের বক্স থেকে ৯০ হাজার ইয়াবা ও ৩৫ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই ঘটনায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার সকালে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজার পাওয়ার হাউসসংলগ্ন উত্তর হাজীপাড়া কবরস্থান গেটের সামনের একটি নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে এসব ইয়াবা ও টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন টেকনাফের পশ্চিম পানখালী এলাকার আশিক মোমেন (২৩) ও তাঁর স্ত্রী সাদিয়া ফারহানা (২৩)। হেফাজতে নেওয়া কিশোরের বাড়িও টেকনাফে। তাঁরা তিনজনই উত্তর হাজীপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মন্ডল বিকেলে প্রথম আলোকে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। আশিক মোমেনের থাকার ঘরের একটি কক্ষের কাঠের তৈরি খাটের বক্সের ভেতরে বিশেষ কায়দায় ইয়াবাগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে ৯০ হাজার ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়। এ সময় ইয়াবা বিক্রির ৩৫ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। সোমেন মন্ডল আরও বলেন, অভিযানে তিনটি মুঠোফোনও জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিকেলে গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
একসময় ভেবেছিলেন আর পড়বেনই না। তবে পরে নিজেই এই সিদ্ধান্ত বদল করেন।দীর্ঘ বিরতির বিরতির পর জরিমানা দিয়ে ভর্তি হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। অবশেষে ৫১ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করেন মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের চূড়ান্ত পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় ১ সেপ্টেম্বর। এই পরীক্ষায় হাবিবুল্লাহ পাস করেন। ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বন্ধু, শিক্ষকসহ পরিচিতদের কাছ থেকে শুভেচ্ছাবার্তা পাচ্ছেন হাবিবুল্লাহ। বিভিন্ন গণমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। এই ব্যস্ততার ফাঁকে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। ৫১ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করে কেমন লাগছে, জানতে চাইলে হেসে উত্তর দিলেন হাবিবুল্লাহ। বললেন, এই যাত্রায় তাঁকে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে। এখন তিনি নিজের নামে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন। হাবিবুল্লাহ জানালেন, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ‘কে-৫৩’ ব্যাচের (সেশন ১৯৯৫-১৯৯৬) শিক্ষার্থী ছিলেন। আর এখন ‘কে-৭৮’ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমবিবিএস পাস করলেন। ২০০২ সালে তাঁর এমবিবিএস পাস করার কথা ছিল। কিন্তু পাস করলেন ২০২৬ সালে। এর মধ্যে কেটে গেছে ২৪টি বছর। দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বন্ধু, শিক্ষকসহ সবার সহযোগিতায় আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে এমবিবিএস শেষ করতে পেরেছেন বলে জানালেন হাবিবুল্লাহ। এ জন্য তিনি বিশেষ করে বন্ধু ও শিক্ষকদের নাম ধরে ধরে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। এ প্রসঙ্গে বললেন, তাঁর বন্ধুদের অনেকে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক হওয়ার পথে আছেন। কেন এই দীর্ঘ বিরতি হাবিবুল্লাহ প্রথমবার মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাননি। পরেরবার তিনি ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সুযোগ পান। তাঁর ক্লাস শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এসব তথ্য জানিয়ে হাবিবুল্লাহ বললেন, শুরুর দিকে তিনি ফলাফল ভালোই করছিলেন। একপর্যায়ে এক শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর ঝামেলা শুরু হয়। তবে এখন আর তিনি এই বিষয়ের বিস্তারিত বলতে চান না। একসময় হাবিবুল্লাহ ভেবেছিলেন, আর পড়বেনই না। তিনি বলেন, দোটানার মধ্যে পিছিয়ে পড়তে থাকেন। পিছিয়ে পড়ে জুনিয়রদের সঙ্গে তাঁকে ক্লাস করতে হতো। এতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। একদিকে পড়াশোনায় জটিলতা, অন্যদিকে পারিবারিক নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ফলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন। হাবিবুল্লাহর বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। হাবিবুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা সিভিল সার্জন হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিগত চেম্বারে তিনি রোগীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ টাকা ফি নিতেন। স্ত্রী, সাত ছেলে-মেয়ে নিয়ে আবু বক্করের বড় পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। এই আর্থিক টানাটানির বিষয়টি হাবিবুল্লাহর জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল। হাবিবুল্লাহর বাবা ২০০০ সালে মারা যান। আর মা মারা যান ২০১৬ সালে। জরিমানা দিয়ে আবার ভর্তি ২০২৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হানিফ টাবলু। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সেই সময় এক দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন হাবিবুল্লাহ। তখনই হাবিবুল্লাহর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। সাক্ষাতে হাবিবুল্লাহ তাঁকে বলেন, নানা জটিলতায় তাঁর পড়াশোনা দীর্ঘদিন থমকে ছিল। কিন্তু তিনি এখন আবার ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করতে চান। এই দীর্ঘ শিক্ষা বিরতির পর ভর্তির জন্য জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ টাকা। এই তথ্য জানিয়ে অধ্যাপক আবদুল হানিফ বলেন, তখন তিনি মেডিকেলের স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। এই কমিটি, হাবিবুল্লাহ নিজে এবং ‘কে-৫৩’ ব্যাচের বন্ধুদের সহায়তায় দুই লাখ টাকা জোগাড় হয়। আবার ভর্তি হয়ে এক দফা বিরতি দিয়ে তিনি এমবিবিএস শেষ করেন। হাবিবুল্লাহর এমবিবিএস পাসের পর আবদুল হানিফ তাঁর ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। হাবিবুল্লাহর সঙ্গে নিজের ছবিসহ দেওয়া এই পোস্টে তিনি তাঁর এই শিক্ষার্থীসহ অন্য নবীন চিকিৎসকদের অভিনন্দন, শুভকামনা জানান। হাবিবুল্লাহ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ২৪ বছর পর এমবিবিএস পাস! চেষ্টা থাকলে কি না হয়! পোস্টে আবদুল হানিফ উল্লেখ করেন, গত ফেব্রুয়ারিতে তাঁর জন্য উপহার নিয়ে এসেছিলেন হাবিবুল্লাহ। উপহারের মধ্যে ছিল হাবিবুল্লাহর প্রয়াত বাবার ব্যবহৃত একটি স্টেথোস্কোপ এবং একটি পবিত্র কোরআন শরিফ। পবিত্র কোরআন শরিফ রেখেছেন তিনি। স্টেথোস্কোপটি ফেরত দিয়েছেন, যাতে হাবিবুল্লাহ সেটি ব্যবহার করতে পারেন। ‘ইচ্ছাশক্তি বড় বিষয়’ হাবিবুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। নিজেই নিজেকে ‘কাউন্সেলিং’ করেছেন। বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষকেরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ভর্তির ক্ষেত্রে জরিমানার দুই লাখ টাকার মধ্যে এক লাখ টাকা তিনি নিজে দিয়েছেন। বাকি এক লাখ বন্ধু, শিক্ষকসহ অন্যরা দিয়েছিলেন। সবার সহযোগিতা ছিল বলেই তিনি সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে এমবিবিএস পাস করতে পেরেছেন। হাবিবুল্লাহ এখন ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায়। এরপর তিনি সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগ বিদ্যায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে চান বলে জানালেন। তিনি বলেন, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। এই আগ্রহ থেকে তিনি আগে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত একটি পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। হাবিবুল্লাহ বিয়ে করেছিলেন। ২০০২ সালে কিডনি জটিলতায় তাঁর স্ত্রী মারা যান। হাবিবুল্লাহ বলেন, তিনি জীবনে খুব বেশি কিছু চান না। পেটে-ভাতে মাস পার হলেই তিনি খুশি। ৫১ বছর বয়সে হাবিবুল্লাহর এমবিবিএস পাস করার ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছাশক্তিকে বড় বিষয় মনে করেন অধ্যাপক আবদুল হানিফ। তিনি বলেন, হাবিবুল্লাহর ইচ্ছাশক্তি তো ছিলই, পাশাপাশি অন্যরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তাঁর পক্ষে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। অধ্যাপক আবদুল হানিফ বলেন, মেডিকেল কলেজে দেশের সেরা শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তির পর পড়াশোনাকালে বিভিন্ন কারণে কিছু শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। এমন শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকের দিক থেকে একটু বেশি যত্ন দরকার। এ জন্য শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে মেন্টরশিপ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা দরকার।
নোয়াখালীর জেলা শহরের দত্তেরহাট ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে ‘অপচিকিৎসায়’ মো. মোসলিম (১২) নামের এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের কথিত ডাক্তার ও এর মালিক আবুল হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। এদিকে এ ঘটনায় নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ওই অবৈধ হাসপাতালটি সিলগালা করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে নোয়াখালী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়। পরে সদর কোর্টের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হামিদুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তার অপচিকিৎসায় নিহত মোসলিম লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরবসু গ্রামের মাহফুজুর রহমানের ছেলে। শনিবার বিকেলে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলার সময় এক শিশুর আঘাতে তার চোখে রক্ত জমে ফুলে যায়। পরে স্বজনরা এলাকার পল্লী চিকিৎসকের প্ররোচনায় তাকে নোয়াখালী জেলা শহরে দত্তেরহাটের ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যান। স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে হাসপাতালের মালিক আবুল হোসেন নিজে শিশুটিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে চোখে তিনটি ইনজেকশন দেন। এর কিছুক্ষণ পর শিশুটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে। পরে তাকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর আবুল হোসেনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় নিহত শিশুর ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দত্তেরহাট ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের মালিক আবুল হোসেন জানান, তিনি নিজেই একজন প্যারামেডিকস। তাই তিনি নিজেই তার চিকিৎসা করেন। নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, চোখের ওপরের ও নিচের পাতায় লোকাল অ্যানেসথেসিয়ার ড্রপ দেওয়া হয়েছিল। তার মতে, এ ধরনের অ্যানেসথেসিয়ার কারণে মৃত্যুর কোনো আশঙ্কা নেই। নোয়াখালীর জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘটনার পর হাসপাতালটি পরিদর্শন করে সিলগালা করে দিয়েছি। ঘটনা তদন্তে নোয়াখালী সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাঈমা নুসরাত জাবিন চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ডাক্তার নাইমা নুসরাত জাবিন জানান, এটি একটি অবৈধ হাসপাতাল। এর আগেও অপচিকিৎসার কারণে এ হাসপাতালকে দুবার এটি বন্ধ করা হয়। আর মালিক আবুল হোসনে তিনি কোনো ডাক্তার নন। এ ধরনের চিকিৎসা তিনি দিতে পারেন না। আমরা তদন্ত করে রিপোর্ট দেব। সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম জানান, আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। নিহত শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের জন্য অপেক্ষা করা হলেও তারা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় তাকে আপাতত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার চাইলে পরবর্তীতে মামলা করতে পারবে।