উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ-আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি যন্ত্রের গণউৎপাদন শুরু করেছে চীন। মূলত এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নতমানের এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র কিনতে পারে না চীন। তাই এবার নিজেরাই সেই প্রযুক্তি উৎপাদন করতে যাচ্ছে দেশটি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এই পদক্ষেপকে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বেইজিংয়ের বড় অগ্রগতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। খবর রয়টার্সের।
সূত্রটির দাবি, সাংহাইভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই উৎপাদন কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি লিথোগ্রাফি স্টার্টআপের বিশেষজ্ঞ দলকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সংবেদনশীলতার কারণে সূত্রটি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেনি।
এই অগ্রগতি চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জাতীয় কর্মসূচির একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ডাচ প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের বাণিজ্যিক অবস্থানে তাৎক্ষণিক কোনো বড় প্রভাব পড়বে না।
ডিইউভি লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য ধরে রেখেছে এএসএমএল। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনফরমেশন’ সোমবার প্রথম জানায়, সাংহাইয়ের একটি রাষ্ট্রীয় সমর্থিত প্রতিষ্ঠান এই যন্ত্রের উৎপাদন শুরু করেছে। চলতি বছরে প্রায় পাঁচটি এবং ২০২৭ সালে প্রায় ২০টি যন্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। রয়টার্স প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় প্রকাশ করেছে।
সূত্রটি জানায়, আইশেংনার তৈরি ডিইউভি যন্ত্র এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এটি এএসএমএলের সমমানের নয়। তবে ভবিষ্যতে পশ্চিমা দেশগুলো যদি লিথোগ্রাফি যন্ত্র বা রক্ষণাবেক্ষণ সেবার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে চীনের চিপ নির্মাতারা বিকল্প উৎস হিসেবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
‘দ্য ইনফরমেশন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরই চীনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, হুয়া হং সেমিকন্ডাক্টর এবং মেমোরি চিপ নির্মাতা চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিসের কাছে এই যন্ত্র সরবরাহ করা হবে।
ইমার্শন ডিইউভি প্রযুক্তিতে প্রজেকশন লেন্স ও সিলিকন ওয়েফারের মাঝখানে পানির একটি স্তর ব্যবহার করা হয়, যা প্রচলিত শুষ্ক পদ্ধতির তুলনায় আরও ক্ষুদ্র সার্কিট নকশা তৈরি করতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। একই স্তরে বারবার আলোকপ্রক্ষেপণের মাধ্যমে আরও উন্নতমানের সেমিকন্ডাক্টরও তৈরি করা সম্ভব।
এএসএমএল, এসএমআইসি, হুয়া হং এবং চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
‘দ্য ইনফরমেশন’-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোমবার এএসএমএলের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ কমে যায়। মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৬ মিনিট পর্যন্ত শেয়ারটির দাম আরও ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে। যদিও একই সময়ে ইউরোপের অন্যান্য চিপ খাতের শেয়ারও নিম্নমুখী ছিল, তবু সামগ্রিক ইউরোপীয় শেয়ারবাজার সূচকের তুলনায় এএসএমএলের দরপতন বেশি ছিল।
২০২৩ সালের আগস্টে প্রায় ৭০০ কোটি ইউয়ান নিবন্ধিত মূলধন নিয়ে আইশেংনা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পেছনে রয়েছে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী সাংহাই ইলেকট্রিক হোল্ডিং এবং সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্টের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব কম তথ্য রয়েছে। তাদের কোনো ওয়েবসাইট নেই এবং কার্যক্রম সম্পর্কেও কিছু প্রকাশ করা হয়নি। সূত্রটি জানায়, ডিইউভি প্রযুক্তির একটি প্রোটোটাইপ নিয়ে গত বছর পরীক্ষা চালানো ইউলিয়াংশেং এবং সাংহাই মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স ইকুইপমেন্টের (এসএমইই) বিশেষজ্ঞদেরও আইশেংনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এসএমইই এবং ইউলিয়াংশেং দুই প্রতিষ্ঠানই চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউলিয়াংশেং আবার হুয়াওয়ে-সমর্থিত যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সিক্যারিয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট ও নিয়োগসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, আইশেংনা ও ইউলিয়াংশেং একই ঠিকানা থেকে পরিচালিত হয়।
আইশেংনা, এর বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, এসএমইই এবং ইউলিয়াংশেং কোনো পক্ষই রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন এএসএমএলের সবচেয়ে উন্নত এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র কিনতে পারে না। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ফলে উন্নতমানের কিছু ডিইউভি যন্ত্রের সরবরাহও সীমিত করা হয়েছে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এএসএমএলের জন্য চীন একটি বড় বাজার। চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রতিষ্ঠানটির মোট নিট বিক্রির প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। উন্নত ইইউভি যন্ত্র না পেলেও চীনের চিপ নির্মাতারা এখনো তুলনামূলক কম উন্নত ডিইউভি যন্ত্র ব্যাপকভাবে কিনছে।
গত ডিসেম্বরে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীন নিজস্ব ইইউভি লিথোগ্রাফি যন্ত্রের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইশেংনার অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদে এএসএমএলের আয় বা বাজার অবস্থানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না।
জেপি মরগান চেজের বিশ্লেষকেরা এক প্রতিবেদনে বলেন, কয়েকটি ইমার্শন ডিইউভি যন্ত্র তৈরি করা আর হাজার হাজার ওয়েফারে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ উৎপাদন সক্ষম, নির্ভুল, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যন্ত্র তৈরি করা এক বিষয় নয়।
সূত্র : রয়টার্স
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে একটি বহুতল শপিং মলের একাংশ ধসে পড়েছে। এতে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস। একই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশত মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা এর মাত্রা ৭.১ বলে জানিয়েছে, যদিও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) ৬.৮ মাত্রার তথ্য দিয়েছে। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর প্রধান দ্বীপ কিউশুর কয়েকটি এলাকায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। কিছু সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে এবং বিভিন্ন সড়কে ফাটল দেখা গেছে। এছাড়া অন্তত ১২টি বাড়ি ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি জানিয়েছেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ভবনে ভূমিকম্পের পর আগুন লাগে। তিনি বলেন, সরকার ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংগ্রহ করছে। সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়েছে ভূমিকম্পের পর উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সাময়িকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও কয়েক ঘণ্টা পর তা প্রত্যাহার করে নেয় জাপানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ। শপিং মলে উদ্ধার অভিযান চলছে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাশিমা শহরের ‘কাশিমা শপিং মল’-এর দ্বিতীয় তলার একটি অংশ ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং উদ্ধারকর্মীরা অভিযান চালাচ্ছেন। এর আগে পুলিশ জানায়, কাশিমার একটি শপিং মল থেকে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে তখন কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। ভূমিকম্পের কারণে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলো উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: সিবিএস, এনএইচকে
ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা সাইয়্যেদ আলী খামেনি বলেছেন, লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘অটল শিলাখণ্ডের’ মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর এই দৃঢ়তা বিশ্বের মুক্তিকামী জাতিগুলোর জন্য অনুপ্রেরণার বার্তায় পরিণত হয়েছে। খবর তাসনিম নিউজ এজেন্সির। হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম ও সংগঠনটির যোদ্ধাদের পাঠানো আনুগত্যের চিঠির জবাবে খামেনি এ মন্তব্য করেন। ২৬ জুলাই প্রকাশিত এক চিঠিতে তিনি হিজবুল্লাহর সদস্যদের ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের প্রশংসা করেন। চিঠিতে খামেনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জাতি যুক্তরাষ্ট্র ও ‘অপরাধী জায়নবাদীদের’ অত্যাচার ও নিপীড়নে ক্লান্ত। এ পরিস্থিতিতে ‘জিহাদ ও প্রতিরোধ’ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, এই পথে অবিচল থাকলে শেষ পর্যন্ত বিজয় অর্জিত হবে। তিনি বলেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ এখন ইসরাইলি আগ্রাসন ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে লড়াইরত গোষ্ঠীগুলোর অগ্রভাগে রয়েছে। সংগঠনটির এই অবস্থান বিশ্বের স্বাধীনতাকামী জাতিগুলোর জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ হয়ে উঠেছে। খামেনি আরও বলেন, এই অর্জনের পেছনে লেবাননের জনগণের, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও সমর্থনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা জানান, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য ‘নিপীড়িত কিন্তু শক্তিশালী প্রতিরোধযোদ্ধাদের’ সমর্থনকে নিজেদের কৌশলগত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি বলেন, লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং ইসরাইলি আগ্রাসনের নিঃশর্ত অবসান যেকোনো যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত। চিঠিতে তিনি হিজবুল্লাহর সাবেক মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহসহ নিহত নেতাদের স্মরণ করেন এবং তাদের অবদানকে ‘ইসলামি প্রতিরোধকে শক্তিশালী বৃক্ষে পরিণত করার’ কৃতিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। শেষে তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের যোদ্ধা, শহীদ, আহত ব্যক্তি এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য দোয়া করেন এবং তাদের ওপর আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ কামনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কী করবেন, তা আগে থেকে অনুমান করা যায় না; আর এই স্বভাব নিয়ে তিনি প্রায়ই গর্ব করেন। তার ভাষায়, এ বিষয়টি শত্রু-মিত্র সবাইকে একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। ট্রাম্প ১৩ মাস আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার সিদ্ধান্ত। গত জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনতে কমান্ডো পাঠান। তার ভাষ্য, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তিনি কতটা বেপরোয়া হতে পারেন। তার পূর্বসূরিরা কেউ এমন কাজ করার সাহসও করতেন না। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তিনি কেবল নিজের 'নিজের বিবেকর কাছে’ দায়বদ্ধ। কিন্তু ইদানিং তাকে ফাঁদে আটকে পড়া এক নেতার মত মনে হচ্ছে, যিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, ধীরে ধীরে সেই যুদ্ধ তার প্রেসিডেন্সিকে গ্রাস করছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত বন্ধ করা এবং দেশটির সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। তখন তিনি সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি যে তার ক্ষমতারও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, পাঁচ মাস পর, সেই লক্ষ্যগুলো ট্রাম্পের অধরাই রয়ে গেছে। একসময় তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, বিপুল শক্তি প্রয়োগ করে ইরানে তিনি ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। মানে সেখানকার সরকার পাল্টে মার্কিনপন্থি সরকার বসাতে পারবেন। কিন্তু এখন তিনি আবার বড় যুদ্ধ শুরু করতে ইতস্তত করছেন; কারণ তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, তেহরানে ওই কৌশল কাজ করবে না। তেলের দাম চড়ছে, শেয়ারবাজার পড়ছে—এগুলো তিনি থামাতে পারছেন না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে; মাঝে কিছুদিন চালু ছিল, এখন আবার কমে গেছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে আরেকটি সংকীর্ণ পথও এখন হুমকির মুখে। ট্রাম্প যদিও হুমকি দিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করবেন অথবা তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডার দখল করে নেবেন, তবে প্রকাশ্যে তিনি এও স্বীকার করেছেন যে সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো ইচ্ছা তার নেই। তার সহযোগীদের মতে, এই ব্যর্থতাগুলো ট্রাম্পকে ক্রমশ হতাশ করে তুলেছে; তার স্বভাবসুলভ আচরণকে আরও খামখেয়ালি করে তুলছে। বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গত সপ্তাহেই সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্পের জ্বালানিমন্ত্রী। কিন্তু ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নিজে সেই চুক্তি উল্টে দেন। ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব যতক্ষণ না ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে আসছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত ওই চুক্তি অকার্যকর থাকবে। ১৮ মাসের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা ওই চুক্তি এভাবে ভেস্তে যেতে দেখে সৌদিরা একেবারে হতবাক হয়ে যায়। পশ্চিম এশিয়ার বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, “মিস্টার ট্রাম্প আবারও সৌদিদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে খুশি করেছেন। “ইরানকে তিনি এই শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা বোকামি, কারণ তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবেই।” পরদিন সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু সংক্রান্ত চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে জনপ্রিয় এক হকি তারকার নামে এই সেতুটির নামকরণ করা হছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন ধরনের কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যা তার প্রথম মেয়াদে করা যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির লঙ্ঘন বলেই মনে করা হচ্ছে। এ অবস্থায়, গর্ডি হাও সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমেরিকানদের আমন্ত্রণপত্র যে কানাডা প্রত্যাহার করে নেবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সোমবার যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে সেতুটি। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, রাগ বা হতাশা থেকে ট্রাম্পের এ ধরনের খামখেয়ালি আচরণ তার দলকেও সামলাতে হচ্ছে। একটি বিরল দ্বিদলীয় আবাসন বিল স্বাক্ষরের জন্য রিপাবলিকানরা ক্যাপিটল ভবনে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউজও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু সবাইকে হতবাক করে বেঁকে বসেন ট্রাম্প; ওই বিলে সই করতে অস্বীকার করেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তার একমাত্র অগ্রাধিকার হল 'সেইভ আমেরিকা অ্যাক্ট', যা মূলত ভোটাধিকার আইন পরিবর্তনের একটি চেষ্টা। সেই আইনের পক্ষে রিপাবলিকানদের যথেষ্ট সমর্থন ছিল না। শেষ পর্যন্ত ক্যাপিটল হিলের অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। ট্রাম্পের সই ছাড়াই বিলটি আইনে পরিণত হয়। এর ফলে নতুন বাড়ির মালিকদের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসা এই পদক্ষেপের কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ হারায় তার দল। প্রেসিডেন্টের কাছের লোকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এই হতাশার পুরোটাই যে যুদ্ধ থেকে আসছে তা নয়, তবে এর বড় অংশই যুদ্ধের কারণে। ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৯ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকাকে সমর্থন করেছেন। যখন মিত্ররাই এ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে, তখন যে কোনো মূল্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প নিজেকে আরও চাপে ফেলছেন। স্পিকার মাইক জনসন গত সপ্তাহে বলেন, “আমাদের এটা শেষ করতে হবে।” ট্রাম্পের সবচেয়ে কট্টর সমর্থকদের কাছ থেকেও এখন এমন মন্তব্য শোনা যাচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, প্রেসিডেন্টের কাছে তার লক্ষ্য অর্জনের স্পষ্ট কোনো পথ নেই। জয়ী হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে জড়ানোর পর, এখন তিনি সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। এক মাস আগেও ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে জয়ের পথ তিনি পেয়ে গেছেন। গত ১৭ জুন তিনি ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে তাড়াহুড়ো করে ১৪ দফার একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ১৯১৯ সালে সেখানেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছিল। সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের একদল ‘যুক্তিবাদী’ নেতা এখন বুঝতে পারছেন, কীসে তাদের অর্থনীতির লাভ হবে। ১৪ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, তারা যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে।” তিনি দাবি করেন, তার ব্যাপক হামলার হুমকির কারণেই ইরান পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। “আমরা বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আর তারা বলল, ‘দয়া করে এটা করবেন না, আমরা চুক্তি করব।’ আর ঠিক তার পরপরই আমরা চুক্তি করলাম,” বলেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু সেই চুক্তি টিকে ছিল মাত্র দুই সপ্তাহ। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, যে ইরানি নেতারা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তারা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন বলে ধারণা করা হয়। যেসব জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আইআরজিসি সেসব জাহাজের ওপর গুলি চালায়। ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইরানি নেতারা চান—বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের তহবিল অবমুক্ত করা হোক এবং তেল রপ্তানি আবার চালু হোক। কিন্তু আইআরজিসি মনে হয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দেখাতেই বেশি আগ্রহী। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ আছে—আরও সামরিক হামলা চালানো, আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, অথবা বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে আসা। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকে এই তিনটি বিকল্প নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিটি পথই ভিন্ন ভিন্ন কারণে কঠিন বলে মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে পুরোটা সময় ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুমকি দিলেও শুক্রবার সেখান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের সহযোগীরা সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে বা ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করলেই যে তারা আবার আলোচনায় ফিরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং সেটা করলে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হতে পারে। ট্রাম্পকে জানানো হয়, এ ধরনের হামলায় ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। অথচ একসময় তিনিই ইরানিদেরই তাদের সরকারের হাত থেকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওভাল অফিসে শুক্রবার যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হল, তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করতে দ্বিধা বোধ করছেন কি না, কারণ সেটি যুদ্ধাপরাধ হতে পারে। জবাবে তিনি বলেন, “আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেব না।” নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ট্রাম্পের দ্বিধান্বিত হওয়ার আসল কারণ হতে পারে এই যে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী অস্ত্রের মজুদ হয়ত ফুরিয়ে আসছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ গত এপ্রিলে এক মূল্যায়নে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টরের মজুদ হয়তো এরই মধ্যে অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। চলতি মাসে টানা ১৩ রাত ধরে চলা হামলা ও পাল্টা হামলার পর, কিছু কর্মকর্তার মতে, সেই মজুদ এখন আশঙ্কাজনক স্তরে নেমে এসেছে। আর এটাই ট্রাম্পকে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান থেকে বিরত রেখেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এখন চিন্তিত যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হয়ত যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘাটতির সুযোগ নিতে পারেন। পুতিন ইউক্রেইন ও ইউরোপে এবং শি জিনপিং তাইওয়ানে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি হিসাবের মধ্যে রাখতে পারেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় বিকল্প হল, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হতে দেওয়া। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজ চলাচলে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে তেল রপ্তানির ওপর আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে সময় লাগে। ওবামার সময়ে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে বেরিয়ে এসে ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন, ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আট বছর পর ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে একজন নতুন নেতার নেতৃত্বে, যিনি গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর বিষয়ে আবারো উদ্যোগী হতে পারেন। অবরোধের কৌশল হয়তো কাজে দেবে, কিন্তু সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলে সামরিক বাহিনী মোতায়েন রাখতে হবে, যা অনেক ব্যয়বহুল। আর মাঝেমধ্যে গোলাগুলি হবে, যা মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি বাড়াবে; মিত্র দেশগুলোর ওপরও হামলা হতে পারে। তৃতীয় পথ হল নিজের বিজয় ঘোষণা করে ফিরে আসা। ট্রাম্প এক মাস আগে সেটাই করতে চেয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধবিরতি বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তিনি অর্থনৈতিক মন্দা চাননি, যেটা হার্বার্ট হুভারের সময়ে হয়েছিল। ৩১তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুভারের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি কখনোই তার মত হতে চাইনি। আমি অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাইনি। যুদ্ধ চলতে থাকলে বিশ্বে তেলের মজুত ফুরিয়ে যেত।” কিন্তু সেই প্রস্থানের জন্যও ট্রাম্পকে মূল্য দিতে হবে। তিনি যদি ইরানে বোমা তৈরির উপযোগী ইউরোনিয়াম রেখে চলে আসেন এবং হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতে ছেড়ে দেন, তাহলে যে কারণে তিনি আক্রমণের সূচনা করেছিলেন, তার সমাধান করতে তিনি ব্যর্থ হবেন এবং জ্বালানি বাজারের জন্য একটি নতুন বড় সমস্যা তৈরি করবেন। এটা তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। আর এটা প্রমাণ করবে যে, তার ক্ষমতারও সীমা আছে, যা তিনি জানুয়ারিতে ভাবতেও পারেননি।