বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ সময়ে দেশটির পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। তবে আমদানি করা পোশাকের গড় একক মূল্য সামান্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এই সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান চীন ও ভারতের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই পোশাক খাত। সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয়, শুধু জুলাইয়ে রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের প্রথম সাত মাসের গড় পতনের তুলনায় জুলাইয়ে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে আরও দ্রুত হারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সর্বশেষ সাত মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। দেশটির বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ ও সংকলন করেছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)।
সংকুচিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজার
ওটেক্সার তথ্য বলছে, জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
আমদানির পরিমাণের হিসাবেও বড় পতন হয়েছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য পোশাক আমদানি করেছিল।
চলতি বছর তা কমে হয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য। অর্থাৎ পরিমাণের হিসাবে পতন হয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
অন্যদিকে গড় একক আমদানি মূল্য ৩ দশমিক ১৪ ডলার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১৭ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে কম পরিমাণে পোশাক ঢুকলেও আমদানিকারকরা গড়ে সামান্য বেশি দামের পোশাক কিনেছেন।
এতে বোঝা যায়, বাজারের মূল চাপটি মূলত চাহিদা ও আমদানির পরিমাণে। সামগ্রিক বাজারে পোশাকের গড় মূল্য কিছুটা বাড়লেও আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ ও ভোগের প্রবাহ আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশেও কমেছে রফতানি
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপরও। জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ সাত মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ৩২৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার বা ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।
তবে সামগ্রিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পতন তুলনামূলকভাবে কম। যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি যেখানে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রফতানি পতন বাজারের সামগ্রিক পতনের চেয়ে কম।
কিন্তু জুলাইয়ের তথ্য পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে। ওই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে। ফলে বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় জুলাইয়ে পতনের গতি বেড়েছে।
এ কারণে আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ক্রয়াদেশ ও রফতানি প্রবাহ কোন দিকে যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীন-ভারতের পতন আরও বড়
প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চীন। সাত মাসে দেশটির পোশাক রফতানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। গত বছরের ৬ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে চলতি বছর তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ চীনের রফতানি কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের রফতানিও কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে।
পাকিস্তানের রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।
ভিয়েতনামের পতন তুলনামূলকভাবে সামান্য– ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। দেশটির রফতানি ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
তবে সংকুচিত বাজারেও ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ইন্দোনেশিয়ার রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিমাণেও কমেছে বাংলাদেশের রফতানি
অর্থমূল্যের পাশাপাশি পোশাকের পরিমাণের হিসাবেও বাংলাদেশের রফতানি কমেছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। গত বছরের প্রায় ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য থেকে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন।
তবে এ ক্ষেত্রেও চীন ও ভারতের পতন অনেক বেশি। চীনের রফতানি পরিমাণ কমেছে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ভারতের ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া রফতানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের কাছ থেকে যে অংশ অন্য দেশগুলোর হাতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ নিতে হলে অন্য প্রতিযোগীদেরও পেছনে ফেলতে হবে।
কমেছে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পোশাকের গড় একক মূল্য কমে যাওয়া। বিএভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের গড় একক মূল্য ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ রফতানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্রতি ইউনিট পোশাক থেকেও আগের তুলনায় কম অর্থ পাওয়া গেছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের গড় একক মূল্য কমেছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ভারতের ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
অর্থাৎ বাংলাদেশেও পোশাকের দাম কমেছে, যদিও চীনের মতো বড় পতন হয়নি।
শুল্কের চাপ কতটা?
রফতানিকারকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকের দাম কমার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপ। বাড়তি শুল্কের পুরো বোঝা মার্কিন ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আলোচনার মাধ্যমে এর একটি অংশ রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের ধরে রাখতে পণ্যের দাম কমাতে হয়েছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, মূলত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের একটি অংশ বাংলাদেশের রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। ফলে পোশাকের দাম কিছুটা কমিয়ে দিতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ইউনিট মূল্যে।
রফতানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের এক-তৃতীয়াংশ, আবার কোনও ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য কঠিন। কারণ একই সময়ে দেশের ভেতরে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয়, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি– সব মিলিয়ে কারখানার ব্যয় বাড়ছে। অথচ বিদেশি ক্রেতারা উল্টো কম দাম চাইছেন।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, দাম কমছে
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, একদিকে উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ পণ্যের দাম বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা ধরে রাখতে লোকসানেও অর্ডার নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে অনেক কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে এবং বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তার মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানাকে বেশি দামে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে।
এই দুইমুখী চাপ– বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং কম রফতানি মূল্য, দীর্ঘমেয়াদে পোশাকশিল্পের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে সুযোগও দেখছেন রফতানিকারকরা
তবে পুরো পরিস্থিতি যে নেতিবাচক, তা নয়। রফতানিকারকদের মতে, কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের বোঝা ভাগাভাগি করার যে চাপ ছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। ফলে আগের তুলনায় ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
শোভন ইসলাম বলেন, মার্কিন ক্রেতারা এখন আর আগের মতো ছাড় দিতে বলছেন না। ফলে আগামী দিনে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে ক্রয়াদেশও বাড়ছে বলে জানান তিনি।
তার প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আবারও বাড়তে পারে।
এখন নজর জুলাইয়ের পরের দিকে
সাত মাসের তথ্য একদিকে বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সুযোগও তৈরি করেছে। চীন ও ভারতের বড় পতনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরবরাহকারী পরিবর্তনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ সেটি কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশও একই সুযোগ নিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংকুচিত বাজারে নিজেদের অংশ ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যেও প্রতিযোগিতামূলক দাম দিতে হবে।
বিশেষ করে জুলাইয়ের ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ পতনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একটি মাসের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা না গেলেও পরবর্তী মাসগুলোতেও যদি একই ধরনের পতন অব্যাহত থাকে, তাহলে তা পোশাক রফতানির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হবে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়ার পেছনে শুল্কের বাড়তি চাপের পাশাপাশি বাজারের সামগ্রিক সংকোচনও কাজ করছে। শুল্কের একটি অংশ রফতানিকারকদের বহন করতে হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পোশাকের দাম কমিয়ে দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় যখন বাড়ছে, তখন রফতানি মূল্য কমে যাওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। তবে চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি কম কমেছে– এটি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আরও তীব্র হচ্ছে। তাই শুধু কম দামে পোশাক রফতানি করে বাজার ধরে রাখা নয়, মান, পণ্যের বৈচিত্র্য ও সরবরাহ সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশকে এগিয়ে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ সময়ে দেশটির পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। তবে আমদানি করা পোশাকের গড় একক মূল্য সামান্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান চীন ও ভারতের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই পোশাক খাত। সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয়, শুধু জুলাইয়ে রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের প্রথম সাত মাসের গড় পতনের তুলনায় জুলাইয়ে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে আরও দ্রুত হারে। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সর্বশেষ সাত মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। দেশটির বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ ও সংকলন করেছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)। সংকুচিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজার ওটেক্সার তথ্য বলছে, জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। আমদানির পরিমাণের হিসাবেও বড় পতন হয়েছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য পোশাক আমদানি করেছিল। চলতি বছর তা কমে হয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য। অর্থাৎ পরিমাণের হিসাবে পতন হয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে গড় একক আমদানি মূল্য ৩ দশমিক ১৪ ডলার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১৭ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে কম পরিমাণে পোশাক ঢুকলেও আমদানিকারকরা গড়ে সামান্য বেশি দামের পোশাক কিনেছেন। এতে বোঝা যায়, বাজারের মূল চাপটি মূলত চাহিদা ও আমদানির পরিমাণে। সামগ্রিক বাজারে পোশাকের গড় মূল্য কিছুটা বাড়লেও আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ ও ভোগের প্রবাহ আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও কমেছে রফতানি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপরও। জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সাত মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ৩২৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার বা ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে সামগ্রিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পতন তুলনামূলকভাবে কম। যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি যেখানে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রফতানি পতন বাজারের সামগ্রিক পতনের চেয়ে কম। কিন্তু জুলাইয়ের তথ্য পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে। ওই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে। ফলে বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় জুলাইয়ে পতনের গতি বেড়েছে। এ কারণে আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ক্রয়াদেশ ও রফতানি প্রবাহ কোন দিকে যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন-ভারতের পতন আরও বড় প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চীন। সাত মাসে দেশটির পোশাক রফতানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। গত বছরের ৬ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে চলতি বছর তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ চীনের রফতানি কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের রফতানিও কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে। পাকিস্তানের রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনামের পতন তুলনামূলকভাবে সামান্য– ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। দেশটির রফতানি ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। তবে সংকুচিত বাজারেও ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ইন্দোনেশিয়ার রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। পরিমাণেও কমেছে বাংলাদেশের রফতানি অর্থমূল্যের পাশাপাশি পোশাকের পরিমাণের হিসাবেও বাংলাদেশের রফতানি কমেছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। গত বছরের প্রায় ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন বর্গমিটার সমতুল্য থেকে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন। তবে এ ক্ষেত্রেও চীন ও ভারতের পতন অনেক বেশি। চীনের রফতানি পরিমাণ কমেছে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ভারতের ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া রফতানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের কাছ থেকে যে অংশ অন্য দেশগুলোর হাতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ নিতে হলে অন্য প্রতিযোগীদেরও পেছনে ফেলতে হবে। কমেছে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পোশাকের গড় একক মূল্য কমে যাওয়া। বিএভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের গড় একক মূল্য ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ রফতানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি প্রতি ইউনিট পোশাক থেকেও আগের তুলনায় কম অর্থ পাওয়া গেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের গড় একক মূল্য কমেছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ভারতের ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশেও পোশাকের দাম কমেছে, যদিও চীনের মতো বড় পতন হয়নি। শুল্কের চাপ কতটা? রফতানিকারকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকের দাম কমার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপ। বাড়তি শুল্কের পুরো বোঝা মার্কিন ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আলোচনার মাধ্যমে এর একটি অংশ রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের ধরে রাখতে পণ্যের দাম কমাতে হয়েছে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, মূলত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের একটি অংশ বাংলাদেশের রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। ফলে পোশাকের দাম কিছুটা কমিয়ে দিতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ইউনিট মূল্যে। রফতানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের এক-তৃতীয়াংশ, আবার কোনও ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত রফতানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য কঠিন। কারণ একই সময়ে দেশের ভেতরে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয়, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি– সব মিলিয়ে কারখানার ব্যয় বাড়ছে। অথচ বিদেশি ক্রেতারা উল্টো কম দাম চাইছেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, দাম কমছে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, একদিকে উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ পণ্যের দাম বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা ধরে রাখতে লোকসানেও অর্ডার নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে অনেক কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে এবং বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানাকে বেশি দামে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে। এই দুইমুখী চাপ– বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং কম রফতানি মূল্য, দীর্ঘমেয়াদে পোশাকশিল্পের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সুযোগও দেখছেন রফতানিকারকরা তবে পুরো পরিস্থিতি যে নেতিবাচক, তা নয়। রফতানিকারকদের মতে, কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের বোঝা ভাগাভাগি করার যে চাপ ছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। ফলে আগের তুলনায় ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শোভন ইসলাম বলেন, মার্কিন ক্রেতারা এখন আর আগের মতো ছাড় দিতে বলছেন না। ফলে আগামী দিনে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে ক্রয়াদেশও বাড়ছে বলে জানান তিনি। তার প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আবারও বাড়তে পারে। এখন নজর জুলাইয়ের পরের দিকে সাত মাসের তথ্য একদিকে বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সুযোগও তৈরি করেছে। চীন ও ভারতের বড় পতনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরবরাহকারী পরিবর্তনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ সেটি কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশও একই সুযোগ নিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংকুচিত বাজারে নিজেদের অংশ ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যেও প্রতিযোগিতামূলক দাম দিতে হবে। বিশেষ করে জুলাইয়ের ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ পতনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একটি মাসের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা না গেলেও পরবর্তী মাসগুলোতেও যদি একই ধরনের পতন অব্যাহত থাকে, তাহলে তা পোশাক রফতানির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হবে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়ার পেছনে শুল্কের বাড়তি চাপের পাশাপাশি বাজারের সামগ্রিক সংকোচনও কাজ করছে। শুল্কের একটি অংশ রফতানিকারকদের বহন করতে হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পোশাকের দাম কমিয়ে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় যখন বাড়ছে, তখন রফতানি মূল্য কমে যাওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। তবে চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি কম কমেছে– এটি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আরও তীব্র হচ্ছে। তাই শুধু কম দামে পোশাক রফতানি করে বাজার ধরে রাখা নয়, মান, পণ্যের বৈচিত্র্য ও সরবরাহ সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশকে এগিয়ে থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। সে কারণে ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিনির ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পরিশোধনাগারগুলোয় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এতে উৎপাদনে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘বাংলাদেশের চামড়া খাতের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও সংস্কার’ শীর্ষক নীতি সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বাজারে চিনির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বড় পরিশোধনাগারগুলোর কাছে পর্যাপ্ত অপরিশোধিত চিনি আছে। গ্যাস সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদনে সাময়িক প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নিত্যপণ্যের দাম একেক সময়ে একেক কারণে বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহব্যবস্থার ব্যাঘাত, ফলন বিপর্যয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকট কিংবা পরিবহন সমস্যার প্রভাব পণ্যের দামে পড়ে। বাজার তদারকি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যসহায়তা ও ভর্তুকি মূল্যে চাল সরবরাহ করে। অন্যদিকে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্য বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আসে। বাজারে পর্যাপ্ত মজুত আছে কি না, এলসি খোলা হচ্ছে কি না বা সমুদ্রপথে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক আছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। আগামী পবিত্র রমজানে প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলা সদরে স্বল্প মূল্যে পণ্য বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি খোলাবাজারে নির্ধারিত দামে চাল বিক্রি অব্যাহত থাকবে। পে স্কেল বাস্তবায়ন ও বাজার প্রভাব নতুন পে স্কেলের কারণে বাজারে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া এটা একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। বেসরকারি খাতে নিয়মিত বেতন সমন্বয় করা হলেও সরকারি খাতে তা এত দিন বকেয়া ছিল। ফলে পে স্কেলের কারণে বাজারে নতুন করে বৈষম্য বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার যৌক্তিক কারণ নেই। সুগন্ধি চাল রপ্তানি ও মূল্যবৃদ্ধি সুগন্ধি চাল রপ্তানির কারণে বাজারে দাম বাড়ছে কি না, এমন প্রশ্নে মন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য, মাত্র দুই হাজার টনের মতো চাল রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির জন্য অনুমোদিত চালের বড় অংশ বাকি আছে। রপ্তানির জন্য অনুমোদিত চালের যে অংশ বাকি আছে, তা রপ্তানির পরিমাণও কমানো হচ্ছে। ফলে দেশীয় বাজারে সুগন্ধি চালের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ নেই।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' থেকে আমানত তোলার সুযোগ চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র হিড়িক পড়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে ব্যাংকটির শাখা ও উপশাখাগুলোতে আবেদন গ্রহণের কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম দিনেই ১৮ হাজার গ্রাহক মোট ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬৭ জন গ্রাহক এককালীন পুরো আমানত হিসেবে মোট ২৪৪ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকেরা এই চাহিদাপত্র জমা দিতে পারবেন এবং ওই দিন থেকেই টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকরা চাইলে পুরো বা আংশিক টাকা তুলতে পারবেন; তবে এককালীন সম্পূর্ণ আমানত তুলে নিলে তার বিপরীতে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না এবং পূর্বে কোনো ঋণ বা দায় থাকলে তা আমানত থেকে কেটে রেখে বাকি অর্থ নিষ্পত্তি করা হবে। উল্লেখ্য, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—এই পাঁচ সংকটাপন্ন ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর প্রায় ৭৬ লাখ আমানতের বিপরীতে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে, যার বিশাল একটি অংশজুড়ে রয়েছে খেলাপি ঋণের চাপ।