২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনে সারা দেশে ৫৮ নিহতের পরিচয় শনাক্ত করার তথ্য জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের ঊধ্বর্তনদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই মামলায় প্রধান আসামি হবেন শেখ হাসিনা।
মঙ্গলবার (৫ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
মঙ্গলবার (৫ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি জানান, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের ঊধ্বর্তনদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া, সরকারের হেফাজতে ইসলামকে নিধনের উদ্দেশ্য ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ ঘটনায় ৯০ শতাংশ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে৷ আগামী ৭ জুনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে প্রসিকিউশন। মামলায় ৩০ জনের বেশি আসামি করা হতে পারে বলেও জানান আমিনুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদ এবং ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে হেফাজতে ইসলাম। ওই দিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আলেম, মাদরাসাশিক্ষার্থী ও সমর্থকরা রাজধানীতে সমবেত হন। কর্মসূচি শেষে তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।
সেদিন দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করছিল এলাকায়। সন্ধ্যার আগেই দুজনের মরদেহ সমাবেশস্থলের অস্থায়ী মঞ্চের সামনে আনা হয়। পরে মধ্যরাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালালে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মধ্যে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সমাবেশ। এতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
এ ঘটনার নিহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। ২০২৫ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম তাদের পক্ষ থেকে ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে। তারা জানিয়েছিল, যাচাই-বাছাই শেষে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এর আগে, ২০২১ সালের ১০ জুন মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের এক প্রতিবেদনে ৬১ জনের নাম সংগ্রহের কথা জানায়। ২০১৪ সালে ‘শহিদনামা’ নামে একটি গ্রন্থে ৪১ জন নিহতের তথ্য তুলে ধরা হয়।
ঘটনার ১৩ বছর পার হলেও এখনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দাখিল করেন।
ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক তিন পুলিশপ্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহিদুল হক এবং পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলামও রয়েছেন।
আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহও এগিয়ে চলছে। তার আশা, শাপলা চত্বরের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে সার্ক ও বিমসটেক—দুটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এ দুটি সংস্থাকে প্রতিযোগী নয়, পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়াকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। অন্যদিকে সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত আঞ্চলিক পরিচয় বহন করে, যেখানে বিমসটেকের বাইরে থাকা দেশগুলোরও অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোকে সার্কের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সার্ক বর্তমানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে এবং প্রত্যাশিত মাত্রায় আঞ্চলিক একীকরণ সম্ভব হয়নি। শামা ওবায়েদ ইসলাম আরও বলেন, সার্কের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং এর সচিবালয়ের স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সব সদস্য রাষ্ট্রকে সার্কের লক্ষ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রদর্শনের আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, গত কয়েক দশকে যদি সদস্য দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে সার্কের কার্যক্রমে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাত, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগিতা ও উন্নয়ন আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত। সেই সুযোগগুলো এখন অনেকটাই হাতছাড়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও সার্কের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে। সংস্থাটির সনদ, সচিবালয়, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং আইনি কাঠামো সদস্য দেশগুলোর জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিদ্যমান। বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসম রিদওয়ানুর রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রদূত তারিক এ. করিম। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব মো. শামসুল হক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী যদি দলগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে থাকে তাহলে আমি তাদের স্বাগত জানাই। কারণ বিরোধী দলে যারা থাকে তাদের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সংস্কৃতি বিভিন্ন দেশে আছে। এটি আমাদের দেশেও চালু হলো।’ শেখ হাসিনা দেশে ফেরা প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে আইনগতভাবে অবশ্যই কোনও বাধা নেই। তিনি ফিরবেন, সারেন্ডার করবেন এবং জামিন চাইবেন। সেটা আমাদের নরমাল সিআরপিসি প্রক্রিয়া। দেশে ফিরলে অবশ্যই তিনি এগুলো ফলো করবেন।’ সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘তারা যদি সঠিকভাবে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক তাদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে থাকে তাহলে মন্ত্রণালয়গুলো কোথায় কী ভুল করছে; তারা যদি সেই ফিডব্যাক দেয়, কী করলে ভালো হয়, আমার মনে হয় অবশ্যই ছায়া মন্ত্রিসভা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।’ এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামসহ উপজেলা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশকে যে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’-এর প্রস্তাবটি দিয়েছেন, তা বর্তমান ভূরাজনীতিতে আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি আমরা গভীরভাবে লক্ষ করি, তবে দেখতে পাব, এই করিডোরটি আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বিশেষ ব্লেসিং বা আশীর্বাদ। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন দেশে আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চীন এ ধরনের করিডোর তৈরি করেছে। আফ্রিকান দেশগুলোর বেলায় আমরা দেখেছি, সেখানে যুদ্ধ বা অনেকটা অশান্ত পরিবেশ থাকার পরও চীন বিভিন্ন দেশকে রেললাইনে ও রাস্তায় সংযুক্ত করেছে। যেসব দেশে ব্যাপকভাবে গৃহযুদ্ধ হয়, সেখানেও চীনের এই উন্নয়ন কাজে কোনো বাধা হয়নি; একবার শুরু হওয়ার পর তা সফলভাবে এগিয়ে গেছে। একইভাবে, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও চীন এভাবে রাস্তাঘাট তৈরি করে দিয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলের কাছাকাছি ইরানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইরান থেকে চীন পর্যন্ত যে করিডোর, তা বেশ দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক। তা সত্ত্বেও চীন সেখানে কাজ করেছে। এমনকি আমাদের দক্ষিণ এশিয়াতে নেপালের মতো দুর্গম পাহাড়বেষ্টিত দেশে সুদূর তিব্বতের লাসা থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত রেলসংযোগ গড়ে দিয়েছে চীন। এই রেলসংযোগের শেষ বাধাটা ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, সেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প (আর্থকোয়েক) হয় এবং নানারকমের অত্যন্ত কঠিন ও উঁচু স্তরের পর্বতমালার ভেতর দিয়ে এই রেলসংযোগ নিয়ে যেতে হয়েছে, যা এখন প্রায় শেষ হওয়ার পথে। ভূরাজনীতিতে চীনের এই দূরদর্শিতার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো ‘ওয়াখান করিডোর’। পাকিস্তানের সাথে তাজিকিস্তান আর আফগানিস্তানকে সেপারেট করা এই ন্যারো স্ট্রিপ অব ল্যান্ডটি আফগানিস্তানের সাথে চীনের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। চীন একসময় অনেক ভয় পেত যে, এই করিডোর গড়া হলে আফগানিস্তান থেকে ইসলামিক ফ্যানাটিকস বা চরমপন্থীরা ঢুকে পড়বে। কিন্তু সেই ভয় উতরে গিয়ে এখন আফগানিস্তানেরই চাপে ও উদ্যোগে চীন সেই রাস্তাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে গড়ছে, যাতে চীন আফগানিস্তানের থ্রুতে সরাসরি ইরানে প্রবেশ করতে পারে। এটি হবে অন্যতম শর্টকাট রুট, যা ইরান থেকে সরাসরি বন্দর আব্বাসে যাওয়ার পথ সুগম করবে। এই যে ভূরাজনৈতিক ফিউচারিস্টিক গ্রিম্পস বা দূরদর্শী চিন্তা, এগুলো আগে কেউ ভাবতেও পারত না। অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোরকে অনিশ্চিত করার জন্য নানা যুক্তি দেন; তারা বলেন, মিয়ানমারের সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) না থামা পর্যন্ত এই করিডোর করা সম্ভব হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ধরনের সিভিল ওয়ার মিয়ানমারে অনেক বছর ধরে চলছে এবং আগামী ১০০ বছর ধরেও তাদের এই ধরনের দ্বন্দ্ব চলতে পারে। তাই বলে তো রাস্তা বা করিডোরের কনস্ট্রাকশন থেমে থাকতে পারে না। মিয়ানমারের সাথে থাইল্যান্ডের রাস্তার সংযোগ রয়েছে, যে সংযোগ স্বয়ং ভারত মিজোরামের মাধ্যমে মিয়ানমারে ঢুকে থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য স্থাপন করেছে। সুতরাং, আমাদের সাথে যে সংযোগটি হবে, তা যদি কক্সবাজার হয়ে নাফ নদী বা ল্যান্ড বাউন্ডারির (স্থলসীমানা) উপর দিয়ে যায়, তবে তা অত্যন্ত কার্যকর হবে। আমাদের রেললাইন অলরেডি কক্সবাজার পর্যন্ত রয়েছে, এটা কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। সেখান থেকে নাফ নদীর ওপর দিয়ে ব্রিজ গড়ে এবং আরাকান মাউন্টেনস বা পর্বতমালা পার হয়ে এই পথ সোজা চীনের দিকে চলে যাবে, যা মোটেও কোনো কঠিন বিষয় নয়। মিয়ানমার অংশ থেকে চীন পর্যন্ত সংযোগ অলরেডি অনেক আগে থেকেই স্থাপিত হয়ে গেছে। এখন চীন মূলত বাংলাদেশের পোরশন বা অংশের সাথে সংযোগ স্থাপন করে দেওয়ার কাজটি করবে। অনেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সিভিল ওয়ারের যে অজুহাত তুলছেন, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও আত্মঘাতী। কারণ, মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে কীভাবে পথ তৈরি হবে, কীভাবে সিকিউরিটি এনশিওর্ড বা নিশ্চিত হবে, সেটা সম্পূর্ণ চীনের চিন্তা। চীনে নিজেই এনশিওর করবে, যেন এই পুরো লিংকটি টোটালি সিকিউর থাকে। এই করিডোরের স্বার্থেই চাইনিজরা তখন বাধ্য হয়ে মায়ানমারে আরও বেশি করে পিস ইনিশিয়েটিভ বা শান্তিপ্রক্রিয়া গ্রহণ করবে। আর এটি সম্ভব ও নিরাপদ বলেই চীনের প্রেসিডেন্ট নিজে বাংলাদেশের কাছে এই অনুরোধ জানিয়েছেন। আমাদের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। এই বাস্তবতায় তাত্ত্বিকভাবে বা থিওরিটিক্যালি বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি (মাল্টিল্যাটারাল পলিসি) কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামিক দেশগুলোর সংস্থা ও ভারতের সাথে একটি স্বাভাবিক ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ বজায় রাখার ধারণাটি আইডিয়াল বা চমৎকার মনে হতে পারে, কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালি তা কতটা প্রাসঙ্গিক, তা ভাববার বিষয়। প্রতিটি দেশ, যাদের ভূরাজনৈতিক লোকেশন ভালনারেবল (ঝুঁকিপূর্ণ), যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যÑ তাদের কিন্তু একটি ‘প্যারেন্ট অ্যালাই’ বা প্রধান সামরিক মিত্র প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ কাতার বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলো সাম্প্রতিক যুদ্ধে আমেরিকার বিট্রেয়াল (বিশ্বাসঘাতকতা) এবং ইসরাইলের প্রতি তাদের অন্ধ সমর্থন দেখার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন মিত্রতার বন্ধন থেকে বের হওয়া নিরাপদ মনে করছে না। . বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্যারেন্ট মিত্রের প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য। কারণ, গত কয়েক বছরে আরএসএস-বেজড বিজেপি ভারতে ক্ষমতায় আসার পর তাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে তারা এখন একটি সুনির্দিষ্ট আইডিয়ায় কমিটেড। তারা মূলত বাংলাদেশকে একটি ‘সাবঅর্ডিনেট স্টেট’ বা অধীনস্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। তারা মনে করে, এটি না করতে পারলে উত্তর-পূর্ব ভারতের (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব বিঘিœত হবে। ফলে আমাদের সামনে এখন একটি চরম বাস্তবতা এসে দাঁড়িয়েছে। এই কথাটিকে আপাতদৃষ্টিতে এক্সপ্যানশনিস্ট বা উগ্র মনে হতে পারে, কিন্তু ভারতকে আমাদের গিলে খাওয়া থেকে যদি ঠেকাতে হয়, তবে চীনকে সর্বাত্মক সামরিক মিত্র হিসেবে গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। অতীতে (পাঁচ বা তিন বছর আগে) হয়তো এই কথাটি বলার প্রয়োজন হতো না, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটিই বাস্তব। ভারত আসলে কোনো কিছুই মেনে নিতে চায় না। আমাদের উত্তরবঙ্গে চীনের ইনভলভমেন্ট, বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট কিংবা চীনকে ইকোনমিক জোন দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভারত যেভাবে হইচই শুরু করে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। কারণ, ওদের মাইন্ডসেটই হয়ে গেছে, বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে ইন্ডিয়ান ডমিনেশন বা ভারতের নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই অর্থনৈতিক করিডোরটি আমাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম। কারণ, আমরা পুরোপুরি ভারতবেষ্টিত এবং আমাদের বের হওয়ার আর কোনো বিকল্প সংযোগ নেই। এই করিডোরের মাধ্যমে যখন চীনের বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর সুযোগ ঘটবে এবং তারা চট্টগ্রাম পোর্টসহ আমাদের অন্যান্য পোর্ট ব্যবহার করতে পারবে, তখন আমাদের শিল্পাঞ্চল এবং পোর্ট অঞ্চলগুলো প্রচুর সমৃদ্ধি অর্জন করবে। আশেপাশের অন্যান্য দেশও তখন চীনে যাওয়ার ব্যাপারে এই সংযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করবে। তাছাড়া, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তার জন্য এই করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্ট বা বিদ্রোহী গ্রুপগুলো যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং আমাদের সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করছে, তা রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল। চীনকে আমরা যদি এই করিডোরে নিয়ে আসতে পারি, তবে বাংলাদেশে চীনের যে বিশাল ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ রয়েছে, তা রক্ষার স্বার্থেই চীন মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই দেশকেই এই ধরনের বিদ্রোহী দমনে নিজে থেকে সাহায্য করবে এবং তারা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের পক্ষেই থাকবে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানেও এই করিডোর চীনের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করবে। অতীতে যখনই রোহিঙ্গা সমস্যা দেখা দিয়েছে, অনেকেই সামরিক শক্তি বা বলপ্রয়োগের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কৌশলগত কারণে কোনোভাবেই বলপ্রয়োগ করতে চায়নি। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি ছিল, চীনের সাথে আমাদের আরও অনেক বড় স্বার্থ রয়েছে, তাই রোহিঙ্গা ইস্যু টেনে এনে আমাদের সেই বৃহত্তর স্বার্থের ক্ষতি করা যাবে না। অনেক সিনিয়র কূটনীতিক ও ফরেন সার্ভিস অফিসারদেরও দাবি ছিল যে, সরাসরি চীনে যেতে হলে অবশ্যই মিয়ানমার সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। অতীতে চীন সবসময় বলত যে, রোহিঙ্গা প্রলেবমটি একটি মাইনর বা ছোট ইস্যু, এটি মূলত মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। চীনের মূল ফোকাস ছিল মায়ানমারের মাধ্যমে চীনের সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা, যা ছিল তাদের বিগার ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট। আর সেই কারণে রোহিঙ্গারা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে ফেরত যায় এবং ওখানকার বিদ্রোহ যাতে দমন করা সম্ভব হয়, সেই ব্যাপারে আমরা মিয়ানমার সরকারকে পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছিলাম এবং মায়ানমার জান্তার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলাম। সুতরাং, চীনে যাওয়ার এই বৃহত্তর নীতি অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত এবং তখন আমরাই চীনকে অনুরোধ জানাবার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলাম। এখন যখন চীনের প্রেসিডেন্ট নিজে এই করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছেন, তখন আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত সৌভাগ্যের। এই করিডোর প্রতিষ্ঠা পেলে ভারত বাংলাদেশ ও মায়ানমারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় ভুগছে। ভারত চেয়েছিল একটি এশিয়ান হাইওয়ে করতে, যেখানে মায়ানমারের পাশাপাশি ভারতও ইনক্লুডেড বা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু ভারতকে নিয়ে আমাদের পক্ষে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়; ভারতকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা মানে মূলত ভূরাজনৈতিক আত্মহত্যা করা, যার বড় প্রমাণ হলো মৃতপ্রায় ‘সার্ক’। ভারত কখনোই আমাদের চীনের সাথে এই রাস্তা তৈরিতে অ্যালাও বা অনুমতি দেবে না; তারা এই প্রক্রিয়ায় ঢুকলে কেবলই ‘ডিলে’ বা বিলম্ব ঘটাবে। বর্তমানে আমাদের দেশের ভেতর যে ভারতপন্থী জার্নালিস্ট বা ভারতপন্থী মিডিয়া চ্যানেলগুলো রয়েছে, তারা এই করিডোর থেকে আমাদের লাভ-ক্ষতি নিয়ে নানারকম সংশয় প্রকাশ করে হইচই শুরু করেছে। কিন্তু এই ধরনের প্রপোজাল আসার পর আমাদের হ্যাঁ, হু বা পরীক্ষা করে দেখবÑ এসব বলে সময় নষ্ট করা চরম ভুল। আমাদের উচিত কোনো প্রকার ডিলে না করে স্ট্রেইটওয়ে এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো। চীনকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার মাধ্যমে আমরা ভারতের অসৎ উদ্দেশ্যকে সীমিত করতে পারব। এর ফলে চীন আমাদের ওপর নতুন আস্থা পাবে এবং উত্তরবঙ্গে চীনের সাথে উন্নয়নমূলক যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, তা আরও বেশি গতি পাবে। পরিশেষে বলা যায়, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নতজানু ও একক ভারতমুখী পলিসির দিকে আবার ফেরত যাওয়া আমাদের জন্য বড় ধরনের সর্বনাশ ডেকে আনবে। বর্তমানে বিএনপির জন্য এটি একটি বিরাট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ। সুতরাং, ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং আমাদের অর্থনীতির স্বার্থে চীনের সাথে এই সংযোগটা গড়ে তোলা আমাদের জন্য এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার (হাইয়েস্ট প্রায়োরিটি)। এটিকে কেবল সাধারণ কোনো যোগাযোগ বা অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্বজনিত সুবিধা বা ‘এক্সিসটেন্সিয়াল রিয়ালিটি’।