আর্থিক খাতসহ দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী । তিনি বলেছেন, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগ বা হস্তক্ষেপ থাকবে না। বরং এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগ পেশাদার কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
আজ মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি (বিএসআইসি)’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি কেবল একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে দৃশ্যমান ও গতিশীল করার একটি প্ল্যাটফর্ম।’ তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি যে মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে, ভবিষ্যতে তা আরো সম্প্রসারিত হবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রধান দুটি সংকট—অর্থায়নের অভাব এবং জামানত দিতে না পারা—উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই বাধা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ, দক্ষ ও পেশাদার।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। বিশেষ করে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রামীণ ও শহুরে তরুণদের অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের আর্থিক খাত সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সরকার পুঁজিবাজার সংস্কার এবং ‘সিরিয়াস ডিরেগুলেশন’-এর পথে এগোচ্ছে।
বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ব্যক্তিদের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীরাও সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের আন্ডার-ক্যাপিটালাইজেশন দূর করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জন্যও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশের একাধিক ব্যাংকের যৌথ অংশগ্রহণে গঠিত এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন অর্থায়ন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকিং খাত। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপ খাতকে উৎসাহ দিতে সহজ শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগ সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন উদ্যোক্তাবান্ধব ঋণনীতি প্রণয়নে কাজ করছে। জামানতবিহীন বা স্বল্প জামানতে ঋণ, কম সুদে অর্থায়ন এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদনের মতো সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং রপ্তানিমুখী খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজে ঋণ আবেদন ও কিস্তি পরিশোধের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এতে শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ উদ্যোক্তারাও অর্থায়নের আওতায় আসতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বচ্ছতা ও সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগ দেশের উদ্যোক্তা সংস্কৃতি শক্তিশালী করবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে। উদ্যোক্তারা বলছেন, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পেলে নতুন ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণ অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ সুবিধাও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, দেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বিনিয়োগনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় জরুরি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু নীতিমালা প্রণয়নের ওপর নির্ভর করবে না, বরং রাষ্ট্রের কার্যকরভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করবে।’ সোমবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘বাণিজ্য নীতি, শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগের প্রভাব ও ভোক্তা কল্যাণ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দ্য পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) সেন্টার ফর ট্রেড অ্যান্ড প্রটেকশন পলিসি রিসার্চ (সিটিপিপিআর) বাণিজ্যনীতি, শিল্প সুরক্ষা এবং এর বিনিয়োগ ও ভোক্তা কল্যাণের ওপর প্রভাব বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিল্পখাতের নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সেশনের সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি সুরক্ষাবাদী নীতিমালার প্রভাব দেশীয় শিল্প ও ভোক্তাদের পছন্দের ওপর কীভাবে পড়ে তা তুলে ধরেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তা কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বাণিজ্য ও ভ্যাটের আর্থিক দিক নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। অন্যদিকে, পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বৃহত্তর অর্থনৈতিক নীতিকাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রাখতে হবে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে সব অংশীজনের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও বাস্তবায়ন ঘাটতির কারণে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। আশিক চৌধুরী বলেন, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে একমত হলেও কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের মূলধন হিসাব শক্তিশালী করতে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগ দেশের শিল্পোন্নয়নের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তার মতে, উন্নত অর্থনীতিগুলোর মতো বাংলাদেশেও স্থানীয় বিনিয়োগই অর্থনীতির ‘সিংহভাগ’ হিসেবে অব্যাহত থাকবে। বিডা প্রধান আরও বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল ক্রমেই টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে, যা আর্থিক পরিকল্পনা ও জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিডা চেয়ারম্যান জানান, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ৪৬টি খাতভিত্তিক ডিরেগুলেশন প্রস্তাব এবং বিনিয়োগ প্রচার সংস্থার ১৯টি অতিরিক্ত সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা ও শিল্পখাতসমূহে অভিন্ন সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে মূল বিষয়, যা অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে।’ এ সময় তিনি কৌশলগত পরিকল্পনাকে তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নে রূপান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সমন্বিত নীতিনির্ধারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উন্নত অর্থনীতির বিভিন্ন দেশে অনুসৃত মিনিস্ট্রি অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমআইটিআই) মডেলে বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ নীতিগুলো ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে তিনি বিদেশি মডেল অন্ধভাবে অনুসরণের বিপক্ষে সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থানীয় সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের চ্যালেঞ্জও ইউনিক, পরিবেশও ইউনিক।’ তিনি স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা এবং শিল্পখাত জুড়ে অভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা যায়।
দেশের পণ্য পরিবহন, সরবরাহ, জোগানসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক (লজিস্টিকস) খরচ ২৫ শতাংশ কমানো গেলে সার্বিক রপ্তানি ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। আর বন্দরে পণ্যের কনটেইনার অবস্থানকাল এক দিন কমানো গেলে রপ্তানি বাড়বে ৭ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে জাতীয় সড়কে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার নিশ্চিত করা গেলেও দেশের রপ্তানি প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। গত শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে এক গোলটেবিল আলোচনার মূল প্রবন্ধে এ কথা বলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এম মাসরুর রিয়াজ রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা, রপ্তানিতে পোশাকনির্ভরতা, দেশের দুর্বল লজিস্টিকস, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এ ছাড়া দেশের রপ্তানি ও লজিস্টিকস খাতে প্রতিযোগী দেশ ভারত এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করেন। এ সময় আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ। এ সময় প্যানেল আলোচনায় বক্তব্যে দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মো.হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যায়ের (বুয়েট) শিক্ষক মো. শামসুল হক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, শাহরিয়ার স্টিল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা (পরিবহন) হুমায়ুন কবির ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পরিবহনবিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ বাবী। ভিয়েতনাম এগিয়ে কেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। যেখানে ভিয়েতনামর ৪৩তম ও ভারতের ৩৮তম। আবার কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্সে চট্টগ্রাম বন্দর ভিয়েতনামের হাইফং বা ভারতের মুন্দ্রা ও জওহরলাল নেহরু বন্দরের তুলনায় প্রায় ২০০-২৫০ ধাপ পিছিয়ে। এ সময় তিনি ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভিয়েতনাম কয়েক বছর আগে তাদের শুল্কব্যবস্থা সহজ করা, ঝুঁকিব্যবস্থাপনা, বহুমাত্রিক (সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান) পরিবহনব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় সংস্কার করে। ফলে দেশটির রপ্তানি এখন প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আর বাংলাদেশ এখন বছরে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রপ্তানি করছে। অথচ নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানি প্রায় সমপর্যায়ে ছিল। এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০৩০ সালে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্য দেশের বর্তমান লজিস্টিক ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য দেশের বন্দরগুলোর অবকাঠামো সংস্কার প্রয়োজন। ‘লজিস্টিকস খরচ কিছু পণ্যের বিক্রির ৪৮ শতাংশ’ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ডিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী বলেন, দেশের লজিস্টিকস খাতে অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতার ফলে দেশে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের লজিস্টিকস ব্যয় কিছু পণ্যের মোট বিক্রির ৪৮ শতাংশের বেশি, যা প্রতিবেশী দেশের হিসাবে অনেক বেশি। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আশির দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহন করলেও এখন তা ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে রেল এবং নৌপথের সঙ্গে সংযুক্ত না করলে কেবল বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে লাভ হবে না। এডিবির জেষ্ঠ্য প্রকল্প কর্মকর্তা (পরিবহন) হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান কাঠামোয় বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ও চুক্তিগত স্বচ্ছতার ঘাটতির অভাবে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে আকৃষ্ট হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও বিনিয়োগে বেসরকারি খাতের অনীহা তৈরি হচ্ছে।