কোনো দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা ‘উদ্বেগের বিষয়’ মন্তব্য করে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য গ্রেস মেং বলেছেন, এ ধরনের প্রবণতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ‘দুর্বল’ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি এবং প্রবাসী বাঙালিদের অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গে গ্রেস মেং বলেন, “কোনো ব্যক্তি যদি আইন ভঙ্গ করে থাকেন, তবে অবশ্যই তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা উদ্বেগের বিষয় এবং এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিৎ বলে মত দেন তিনি।
কুইন্সে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা থেকে নির্বাচিত চীনা বংশদ্ভূত গ্রেস মেং মার্কিন কংগ্রেসে নিউ ইয়র্ক থেকে যাওয়া প্রথম এশিয়ান। বাংলাদেশ ককাসের (মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের একটি অনানুষ্ঠানিক দল, যা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করে) সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির এই কংগ্রেস সদস্য।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে অভিবাসীদের উদ্দেশে আপনার কোনো বার্তা আছে?
গ্রেস মেং: যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই অভিবাসীদের দেশ এবং অভিবাসীরা এ দেশের সাফল্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা আমেরিকার উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন, যার সুফল আজ আমরা সবাই ভোগ করছি। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত অভিবাসী সম্প্রদায়ের মত বাংলাদেশি আমেরিকানরাও যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অভিবাসীর সন্তান হিসেবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা ও আমেরিকার ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছি, তখন অভিবাসীরা আমেরিকাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত করতে যে অবদান রেখেছেন, সেটিও যথাযথভাবে উদযাপন করা উচিত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: অভিবাসীদের কঠোর পরিশ্রমে যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে অভিবাসীবিরোধী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে অভিবাসীদের সুরক্ষার জন্য কী করণীয়?
গ্রেস মেং: অভিবাসীদের ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য করা মানবিক ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। আইসের (মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) বিভিন্ন অভিযানের কারণে অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই আমার নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ পাই, যারা আইসের অভিযানের ভুক্তভোগী। আমি এবং আমার দল পরিবারগুলোকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে রক্ষার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছি। গুরুতর অপরাধীদের পরিবর্তে কঠোর পরিশ্রমী ও আইন মেনে চলা মানুষদের আটক করা কোনভাবেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
আমি মনে করি, বর্তমান কাঠামোয় আইসের কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ কারণে আমি আইসের অতিরিক্ত অর্থায়নের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছি এবং সংস্থাটির জবাবদিহিতা নিশ্চিতে একটি আইনের প্রস্তাব করেছি। এর মাধ্যমে আইস কর্মকর্তাদের ব্যাজ নম্বর দৃশ্যমান রাখা বাধ্যতামূলক করা হবে, সংস্থাটিকে বিচার বিভাগের প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে, ২৬ ফেডারেল প্লাজার মত স্থানে রুটিন চেকিংয়ের সময় ব্যাপক আটক এড়াতে অভিবাসীদের ভার্চুয়াল চেক-ইনের সুযোগ দেওয়া হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে নথিপত্রহীন অবস্থায় বসবাসরত অনেকেই কঠোর পরিশ্রম করছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের জন্য গ্রিনকার্ডের ব্যবস্থা করতে কংগ্রেসের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?
গ্রেস মেং: যুক্তরাষ্ট্রের ভেঙে পড়া অভিবাসন ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি ব্যাপক অভিবাসন সংস্কার অপরিহার্য। কংগ্রেসের সদস্য হওয়ার পর থেকেই আমি এ ধরনের সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছি।
এই সংস্কারের মধ্যে থাকবে অভিবাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বৈধ আবেদনগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা কমান, মানবিক উপায়ে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন নিষ্পত্তি, লাখ লাখ অভিবাসীর জন্য বৈধভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে একদিন তারা গর্বিত মার্কিন নাগরিক হতে পারেন।
দুঃখজনকভাবে কার্যকর সমাধান খোঁজার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমি অভিবাসন সংস্কারের পক্ষে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব এবং এ বিষয়ে দ্বিদলীয় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে যাব।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কংগ্রেশনাল বাংলাদেশ ককাস দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। এটিকে আবার কার্যকরের বিষয়ে কোনো আগ্রহ আছে কি?
গ্রেস মেং: কংগ্রেশনাল বাংলাদেশ ককাস একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিদলীয় প্ল্যাটফর্ম, যার লক্ষ্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদার করা এবং বাংলাদেশি-আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষা করা। এই ককাসের সদস্য হতে পেরে আমি গর্বিত। আশা করি, ভবিষ্যতে ককাসের আরও সভা, আলোচনা ও কার্যক্রম হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বাংলাদেশি আমেরিকান সম্প্রদায় সম্পর্কে রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের মূল্যায়ন কি?
গ্রেস মেং: কংগ্রেসে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই আমি বাংলাদেশি আমেরিকান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছি। তাদের স্বার্থ রক্ষায় আমি সবসময় সক্রিয় থেকেছি, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে সমর্থন দিয়েছি। বিভিন্ন উদ্বেগের সমাধানে কাজ করেছি এবং ফেডারেল প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে সহায়তা করেছি।
প্রতি বছর আমি অসংখ্য বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটির অনুষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোগ এবং স্থানীয় নেতাদের আয়োজনে অংশগ্রহণ করি। এমন একটি প্রাণবন্ত ও কর্মঠ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের কণ্ঠস্বর হতে পেরে আমি গর্বিত। ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করছি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বাংলাদেশি আমেরিকানদের পক্ষে আপনি কোন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন?
গ্রেস মেং: বাংলাদেশি আমেরিকান সম্প্রদায়ের স্বার্থে আমি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করছি। এর মধ্যে রয়েছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে ফেডারেল ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সরকারি স্বীকৃতির জন্য আইন প্রস্তাব। এ ছাড়া ইসলামোফোবিয়াসহ সব ধরনের ঘৃণাজনিত অপরাধ মোকাবিলার জন্য আইন প্রণয়নে আমি কাজ করেছি।
হালাল খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার এবং মসজিদ, অলাভজনক সংস্থা ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোকে সুরক্ষিত রাখার জন্যও উদ্যোগ নিয়েছি। আমি এশিয়ান আমেরিকান, নেটিভ হাওয়াইয়ান ও প্যাসিফিক আইল্যান্ডার সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রথম জাতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিল পাসে ভূমিকা রেখেছি। পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছি এবং ভবিষ্যতেও সে অবস্থান বজায় রাখব।
বর্তমানে আমি ‘কংগ্রেশনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাস এর চেয়ারম্যান হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছি এবং দেশজুড়ে এশিয়ান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম:
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
গ্রেস মেং:
আমি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে কথা বলে আসছি এবং ক্ষমতায় কে রয়েছে তার ভিত্তিতে আমার অবস্থান পরিবর্তিত হবে না। মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি একটি সার্বজনীন মূল্যবোধ। যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অন্যদের জন্য উদাহরণ স্থাপন করে।
যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক তাদের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাক। সেই লক্ষ্যেই দেশে ও বিদেশে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার পক্ষে আমার সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
গ্রেস মেং:
চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অনেকের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং পর্যবেক্ষকদের মতে তা তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল। যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। কোনো ব্যক্তি যদি আইন ভঙ্গ করে থাকেন, তবে অবশ্যই তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা উদ্বেগের বিষয় এবং এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হওয়া উচিৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম:
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে অভিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় তাদের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
গ্রেস মেং:
নিশ্চয়ই। ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে আমরা নির্বাহী বিভাগের ওপর কংগ্রেসের সাংবিধানিক তদারকি আরো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করব। আমরা আইসসহ বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেব। একইসঙ্গে অভিবাসন সংস্কার, অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা এবং আমার প্রস্তাবিত আইস সংস্কার বিলের মত গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের লক্ষ্য হবে এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা একইসঙ্গে মানবিক, কার্যকর এবং ন্যায়ভিত্তিক।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর থাইল্যান্ডে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটনসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে ঢাকা ও ব্যাংকক। শুক্রবার (২৪ জুলাই) ব্যাংককে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং থাইল্যান্ডের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজাবাত ইসারাভাকদির মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা সফর শেষে ব্যাংককে যাত্রাবিরতিকালে হুমায়ুন কবির এ বৈঠক করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, পর্যটন এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর থাইল্যান্ডে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষ মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অব্যাহত সমর্থনও কামনা করেন। জবাবে থাইল্যান্ডের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে দেশটির গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা আরও গভীর করা এবং সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারের মর্যাদা অর্জে কাজ করে যাচ্ছে। বৈঠকে হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে পরিচালিত অভিবাসনবিরোধী এক যৌথ অভিযানে ৩২ জন বাংলাদেশিসহ মোট ১০৮ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান এবং অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার (২০ জুলাই) রাতে জোহরের তামান শ্রী বাহাগিয়া এলাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের পাসপোর্ট, ভিসা ও কাজের অনুমতিপত্র যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জোহর ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক দাতুক মোহদ রুসদি মোহদ দারুস জানান, নথিপত্র যাচাইয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ১০৮ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ৩২ জন বাংলাদেশি, ২২ জন মিয়ানমারের নাগরিক, ১৬ জন পাকিস্তানি, ১৫ জন নেপালি, ১২ জন ইন্দোনেশীয় এবং ৪ জন ভারতীয় পুরুষ। এছাড়া মিয়ানমারের তিনজন, ইন্দোনেশিয়ার দুজন এবং নেপালের দুজন নারীও রয়েছেন। ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের জোহরের সেতিয়া ট্রপিকা ইমিগ্রেশন ডিপোতে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও বিস্তারিত তদন্ত করা হবে। এদিকে, অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সুশাসন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং প্রবাসীদের মধ্য থেকে অন্তত একজন পরিচালক নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের প্রকৃত মালিকানা পুনর্বহাল ও ব্যাংক খাতের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও দাবি উঠেছে। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ‘ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী গ্রাহক পরিষদ’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। সম্প্রতি লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের আহ্বায়ক গোলাম মুর্তজা সিআইপি। কমিটির মেম্বার সেক্রেটারি মাহমুদুর সুমনের পরিচালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আতাউর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক সাংবাদিক বদরুজ্জামান বাবু ও জোবায়ের আহমদ। বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশের রেমিট্যান্স সংগ্রহে শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠান। ফলে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকসেবার মান প্রবাসীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিগত দিনে রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবের কারণে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির পরিচালনা ও মালিকানা নিয়ে অতীতে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদ সম্মেলনে এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী গ্রাহক পরিষদের পক্ষ থেকে ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো— ১. সততা ও ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা। ২. ব্যাংকের প্রকৃত মালিকানা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ৩. অতীতের সকল অনিয়মের তদন্তে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৪. ব্যাংক থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। ৫. প্রবাসীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও হয়রানিমুক্ত ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা। ৬. ইসলামী ব্যাংককে সব ধরনের রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত রেখে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং নীতিমালার আলোকে পরিচালনা করা। ৭. পরিচালনা পর্ষদে প্রবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে অন্তত একজন যোগ্য প্রবাসী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া। সংগঠনের নেতারা জোর দিয়ে বলেন, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা ও ব্যাংকের প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। এই সংকট উত্তরণে তারা সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহ্বান জানান।