আপনি থানার মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করছেন এমন অভিযোগ তুলে একজন ব্যক্তি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনির হাসানকে ফোনে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের ভাইব্রাদারকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করছেন, মিথ্যা মামলায় ঢুকাচ্ছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠনের মতো আচরণ করছেন। আপনাকে কিন্তু ৩০ বছর চাকরি করতে হবে, বাংলাদেশের মধ্যেই থাকতে হবে, পরিবার নিয়ে বের হতে পারবেন না এটা মনে রাখবেন।
একই ধরনের হুমকি রাজধানীর গুলশান থানার ওসিকেও দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পুলিশ সদস্যকে ফোনসহ নানা কায়দায় হুমকি দিচ্ছে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পলাতক নেতাকর্মীরা। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পুলিশ কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তাদের এ ধরনের হুমকি বাড়ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় ফোন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে, এবং এসব নম্বর কার নামে নিবন্ধিত তা জানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে।
সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের ভয় দেখাতে এবং মনোবল দুর্বল করতে পলাতক নেতাকর্মীরা তাদের টার্গেট করছে। অনেককে বলা হচ্ছে পরিবারের সদস্যদেরও দেখা হবে, এমনকি চাকরি শেষ হওয়ার পরও ক্ষতি করা হবে। অনেক ক্ষেত্রেই ফোনালাপের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এতে কর্মকর্তাদের নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করছেন।
একজন মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এ ধরনের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে হুমকির প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে একজন সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হুমকি দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, টুঙ্গিপাড়া থানার এসআই মনির হাসানকে ফোন করা ব্যক্তি নিজেকে এলাকার সাধারণ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। ৭ নভেম্বর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজে ৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের সেই কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করা হয়, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এসআই মনির জানান, তিনি সন্ত্রাস দমন আইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, আর মাঝেমধ্যে বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকি পান। পরে জানা যায়, হুমকিদাতার বাড়ি পাশের কোটালিপাড়া থানায়, নাম ইমরান হোসেন রাজিব।
একইভাবে গুলশান থানার ওসিকেও ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। হুমকিদাতা বলেন, আপনি যে শহরে চাকরি করেন সেই শহরের হর্তাকর্তা আমরা। আজ হোক বা কাল, আমরা এমপি–মন্ত্রী হবো। চাকরি কয়দিন করবেন? আপনার চৌদ্দগোষ্ঠীর খবর আমাদের কাছে আছে। আপনারও পরিবার আছে আমরা ছাড়ব না। এই অডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওসি জানান, তিনি জিডি করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছেন এবং প্রায় প্রতিরাতেই বিদেশি নম্বর থেকে হুমকি পাচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। মামলা প্রয়োজন হলে মামলা নেওয়া হয়, জিডির বিষয়েও তদন্ত করা হয়। বিদেশি সিম কারও নামে নিবন্ধিত তা জানতে আন্তর্জাতিকভাবে তথ্য সংগ্রহের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় অগ্নিকাণ্ডে সাতটি পাটের গুদাম ও তিনটি দোকান পুড়ে ছাই হয়েছে। এতে পাটের গুদামে থাকা তিন হাজার মণ পাট পুড়ে গেছে। শনিবার রাত ৮ টার দিকে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের ফলিয়া বাজারে ঘটনাটি ঘটে। আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটের সদস্যরা দুই ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাত ৮ টার দিকে ফলিয়া বাজারের একটি পাটের গুদামে প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা বাজারের আরো কয়েকটি গুদাম ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে একে একে সাতটি পাটের গুদাম ও দুটি কাঁচা মালের দোকান, একটি চায়ের দোকান সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়। আগুন লাগার খবর পেয়ে বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। দুই ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হয়। আগুন নেভানোর আগেই পাটের গুদামসহ দোকানের সমস্ত মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাজারের ব্যবসায়ী কাশেম মন্ডল জানান, "রাত ৮টার দিকে স্থানীয় লোকজন একটি পাটের গুদামে আগুন দেখতে পান। খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখি, গুদামগুলোতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। এতে সাতটি গুদামে থাকা প্রায় তিন হাজার মণ পাট পুড়ে গেছে। এসব পাটের বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।" ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সোহেল রানা জানান, "আগুন লাগার খবর পেয়ে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় কিছু মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।"
খুলনায় সন্ধানী ক্লিনিক লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুর চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত পৌনে ১০টার দিকে নগরীর বাবুখান রোডে খুলনা থানাধীন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে কেউ হতাহত না হলেও ক্লিনিকের রোগী, স্বজন ও কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মোটরসাইকেলে করে ৭-৮ জন দুর্বৃত্ত ক্লিনিকের সামনে এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। পরে তারা ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকে প্রফেসর ডা. মো. কুতুব উদ্দিন মল্লিকের চেম্বার ও রিসেপশন এলাকায় ভাঙচুর চালায়। হামলার পর দুর্বৃত্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ক্লিনিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুরের ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দুর্বৃত্তরা রাস্তা থেকে সন্ধানী ক্লিনিক লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। তিনি আরও জানান, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ও দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলা এখন এক মহা-রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তার প্রথম খুলনা সফর। অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার পরিকল্পনা, চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বড় অঙ্কের ঋণচুক্তি এবং প্রধানমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে বন্দরটিকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাব বা ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি সড়ক, রেল ও আকাশপথের সমন্বয়ে মোংলা বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ১০ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা) একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং বন্দরকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। পাশাপাশি মোংলা বন্দর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে অধিক ড্রাফট বা গভীরতার বড় পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারবে, যা বর্তমানে সীমিত পরিসরে সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ বা প্রথম নোঙর স্থল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া যেকোনো বন্দরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক। বিদেশি জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি মোংলা বন্দরে ভিড়তে পারলে পণ্য খালাসের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক, পাট, চামড়া ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে। শুধু বন্দর আধুনিকায়ন নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও। খুলনা-মোংলা সড়ক ৪ লেনে উন্নীত করা এবং খুলনা-ভাঙ্গা সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ওয়াগন ও কনটেইনার ট্রেন চালু এবং খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বড় শিল্পগোষ্ঠী কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হতে পারে। গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটি ও প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। তার এ সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে। মোংলা বন্দর হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, বিদেশি জাহাজের প্রতিনিধি ও বড় বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ করতে বহুল প্রত্যাশিত খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগমন বাড়তে পারে। এসব অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের দ্রুত সমাধান হলে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় নাব্যতা অর্জনসহ বন্দরের সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পরে তিনি প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, বন্দর চ্যানেলে ড্রেজিং করা হলে নাব্যতা বাড়বে। ফলে অধিক ড্রাফটের জাহাজ এ বন্দরে ভেড়ানো সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে খুলনা, বাগেরহাটসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নে মোংলা বন্দর আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বন্দর এলাকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয় ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশা করেন। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।