সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট আগামী সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশের লক্ষ্যে জোর প্রস্তুতি চলছে। সব প্রক্রিয়া ঠিকঠাক এগোলে অক্টোবর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন।
এর আগে জুলাইয়ে, পরে আগস্টের মধ্যে গেজেট প্রকাশের আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বেতন বৃদ্ধির হার, বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা, জুডিসিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনার কারণে গেজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মন্ত্রিসভায় যাবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকেই নবম পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। চূড়ান্ত সুপারিশের আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে আরও একটি বৈঠক হতে পারে। ওই বৈঠকে অবশিষ্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে সুপারিশ চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বেতন-ভাতা নিয়ে যেসব বিষয় পর্যালোচনা হচ্ছে
সচিব কমিটির আলোচনায় বেতন কমিশনের সুপারিশ, গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল উঠে এসেছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কমিশনের পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নে কিছুটা কাটছাঁটের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে মূল বেতন বৃদ্ধির হার এবং কয়েকটি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রধান জানিয়েছিলেন, ওই সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। পরে বিষয়টি সচিব কমিটির মাধ্যমে আরও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়।
প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার কথা জানালেন উপদেষ্টা
গত বৃহস্পতিবার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনে ঋণ নেওয়া হবে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তবে এটি কবে থেকে এবং কত ধাপে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে।
‘নতুন পে-স্কেলের অর্থের সংস্থান করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণও নেওয়া হবে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
১ জুলাই থেকে কার্যকর, অক্টোবরে নতুন বেতন
সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন। তবে নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া হিসেবে সমন্বয় করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বকেয়া অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ না করে কয়েক ধাপে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের ওপর এককালীন বড় আর্থিক চাপ কমবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন পে-স্কেলে বেতন পাবেন। এর আগে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ করা হবে। সচিব কমিটির আরেকটি বৈঠকের পরই পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
দ্রুত জটিলতা নিষ্পত্তির তাগিদ
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকেও বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগেই জানিয়েছেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে এবং চলতি অর্থবছর থেকেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মূল বেতন কার্যকর করে পরে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে, গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ীই বেতন পাচ্ছেন। নতুন গেজেট প্রকাশের পর ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং ওই সময়ের বকেয়া অর্থ সমন্বয় করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করা সত্ত্বেও চলমান আন্দোলনে সহিংসতা ও নাশকতার পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের লুটপাটের অর্থ বিনিয়োগের সংযোগ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। পোশাক খাতের আন্দোলন ও নাশকতার প্রসঙ্গ টেনে উপদেষ্টা বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই সরকার পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ফলে এখন আর শ্রমিকদের মূল আন্দোলন বা দাবির যৌক্তিকতা থাকার কথা নয়। কিন্তু এর মধ্যেও যারা সহিংস আচরণ করছে, তাদের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকতে পারে না। গোয়েন্দা তথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট চক্র বা নিষিদ্ধ দলটির কাছে থাকা প্রচুর লুটপাটের টাকা খরচ করে কোথাও না কোথাও নাশকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যার সাথে শ্রমিক আন্দোলনের সংযোগ থাকতে পারে। সরকার ও প্রশাসন এটি কঠোরভাবে প্রতিহত করতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে এর মানে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার পথ তৈরি করা হচ্ছে— সরকার সেটা মনে করে না। উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন প্রসঙ্গে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী তিনি আসতে চাইলে সরকার কোনো বাধা দেবে না। এছাড়া বিগত আমলের মতো নির্বিচারে বা মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে পুলিশ বাহিনীকে বের করে আনা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, পুলিশের আইনি অধিকার রয়েছে পরিস্থিতি সাপেক্ষে বলপ্রয়োগ করার, তবে তা যেন সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে নিশ্চিত করে পরিচালিত হয়। জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের (এলপিজি বা এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং এলএনজি আমদানিতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রেকর্ড পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কথা বিবেচনা করে সরকারকে কিছু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আর এই চাপ কারো না কারো ওপর পড়ছে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে— ভর্তুকি দেওয়ার সামর্থ্য সরকারের ক্রমাগত কমছে। জনগণের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই সরকার এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে বলে তিনি জানান। ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম এবং তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরতে আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন। এতে দেশি-বিদেশি শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে চার হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি, শুল্ক-কর ছাড় এবং স্বল্প সুদে ঋণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে এই এক্সপোর আয়োজন করছে। প্রদর্শনীতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি আটটি বিশেষ অধিবেশনে বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। গত রবিবার বিদ্যুৎ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’ প্রতিপাদ্যে এ আয়োজন করা হচ্ছে। সরকার সৌরবিদ্যুৎ অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি এবং জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-৩০ গ্রহণ করেছে। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিজস্ব বিনিয়োগ ছাড়াই ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ওপেক্স মডেলও উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিদ্যুত্মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। আগামী গ্রীষ্মে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কিছুটা হলেও লোডশেডিং কমানোর আশা করছে সরকার। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সরকারের তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সক্ষমতা ও প্রস্তুতি রয়েছে। সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়া যাবে। এ সুবিধা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সব ফি-চার্জসহ এ ঋণের সর্বোচ্চ কার্যকর বার্ষিক সুদহার ৬ শতাংশ। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে মোট করভার ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ সুবিধা ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয় কমবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, জমির প্রাপ্যতা ও গ্রিড অবকাঠামোর উন্নয়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) বলেছেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ব্যবসা করেছে। বর্তমানে আরেকটি দল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ব্যবহার করে একই ধরনের ব্যবসা করছে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায় না। বরং মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে চায়। আজ দুপুরে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে আর্থিক অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন, প্রত্যেককে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হবে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করতে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই দলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করে কায়কোবাদ বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জানমাল ও মর্যাদা রক্ষা করা দায়িত্ব। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ গত নির্বাচনে তাকে সহযোগিতা করেছেন। এমনকি তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সময়ও তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। এজন্য তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সবাইকে মিলেমিশে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ধর্মমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রবাসী কার্ড এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর মতো উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন, আট মাসে এতগুলো উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় সবার কাছে দোয়া চান, যাতে আল্লাহ তাঁকে সব ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করেন। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ধর্মমন্ত্রী জানান, মুরাদনগরের পরীক্ষার ফলাফল তাকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল পরপর দুই থেকে তিনবার খারাপ হবে, সেসব প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের জন্য তিনি সুপারিশ করবেন। তিনি বলেন, সরকার থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়া হবে, অথচ শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো হবে না— এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অভিভাবকরা অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান। তাদের সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন শিক্ষার্থীদের ফলাফলে থাকতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও কল্যাণে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে কায়কোবাদ বলেন, তিনি প্রতিভা স্কুল পরিদর্শন করে সেখানকার পরিবেশে অভিভূত হয়েছেন। সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়টির উন্নয়নে প্রয়োজন হলে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও তিনি প্রস্তুত রয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও মুরাদনগরের মানুষের টানে এলাকায় এসেছেন উল্লেখ করে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, হিপ রিপ্লেসমেন্ট ও চোখের অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করেই তিনি এখানে এসেছেন। চিকিৎসার জন্য ছুটি দেওয়ায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মুরাদনগরের জনগণ তাকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কায়কোবাদ যতক্ষণ বেঁচে আছে, ততক্ষণ আপনাদের পাশে থাকবে।’ উপজেলার উন্নয়ন প্রসঙ্গে ধর্মমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মুরাদনগরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, আল্লাহর রহমতে সেগুলো সম্পন্ন হলে আগামী পাঁচ বছরে এখানে আর উন্নয়নকাজের প্রয়োজন হবে না। অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রীর নিজস্ব তহবিল থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৫ লাখ টাকা এবং অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৫ লাখ টাকা, মোট ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া মুরাদনগর উপজেলায় ১ লাখের বেশি গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকারী প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার, দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে ৭ হাজার এবং তৃতীয় স্থান অধিকারীকে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। ধর্মমন্ত্রী বলেন, এই পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য অর্থ দেওয়া নয়, বরং বৃক্ষরোপণে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করা। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে একটি উপজেলায় ১ লাখের বেশি গাছ লাগানোর উদ্যোগে অংশ নেওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, সনাতন ধর্মাবলম্বী, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দিনের শুরুতে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতিভা স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে শিশুদের সঙ্গে কেক কাটেন এবং তাদের উৎসাহ দিতে নগদ অর্থ প্রদান করেন। এ সময় তিনি বিদ্যালয়টিকে ১ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি এর উন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।