আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
বুধবার বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নির্বাচনে নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ সবার মৌলিক অধিকার। এর মধ্যে সকল নারী ও মেয়েদের অধিকার, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী, ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ এবং সমাজে যারা বেশি বাধা, বৈষম্য বা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকেন, তাঁদের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।
বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের আগে, বিভিন্ন নারী সংগঠন ও নাগরিক সমাজ নারী প্রার্থী ও ভোটারদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানি, বিশেষ করে অনলাইন সহিংসতা, নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে, সে বিষয়ে জাতিসংঘ সচেতন । রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার রক্ষাকারী সহ জনজীবনে কর্মরত নারীরা সাইবার বুলিং, ডিপফেক, পরিকল্পিত হয়রানি এবং ছবি বিকৃত করে অপব্যবহারসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিবর্তিত বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টের ঘটনা বাড়ছে বলে জানাচ্ছেন।
আরও বলা হয়, জাতিসংঘ সকল অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে নারীদের অর্থপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার পক্ষে কাজ করে আসছে এবং নারীদের নির্বাচনী অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদান করছে। নারীসহ সকল ভোটার যেন ভয়ভীতি, বৈষম্য, অনলাইন নির্যাতন বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই প্রার্থী ও ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘ সব অংশীদার, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতা, তাদের দল ও সমর্থকদের আহ্বান জানাচ্ছে যেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতি কোনো প্রকার হয়রানি, সহিংসতা বা ভয়ভীতি দেখানো না হয়। এটি নারী প্রার্থী ও ভোটারদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য, যাদের অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য।
জাতিসংঘ বিশ্বাস করে, কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে। সবার নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ সবসময় সরকারের পাশে থেকে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি যাত্রীরা ‘এমিরেটস হলিডেজ’-এর নির্দিষ্ট প্যাকেজের আওতায় ৯৬ ঘণ্টার দুবাই ট্রানজিট ভিসা পেতে পারেন। এই সুবিধার মাধ্যমে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সর্বোচ্চ চার দিন পর্যন্ত অবস্থান করার সুযোগ পাবেন। ‘এমিরেটস হলিডেজ’-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মরিশাস, জর্ডান, মিসর ও তুরস্কসহ বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রী এবং ওমরাহ পালনে গমনকারীদের জন্য এই সুবিধাটি বিশেষভাবে উপযোগী। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায়, যোগ্য বাংলাদেশি যাত্রীরা দুবাইয়ে চার দিন অবস্থানের সুবিধাসহ এমিরেটস হলিডেজের নির্ধারিত প্যাকেজ কিনে এই ৯৬ ঘণ্টার ট্রানজিট ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এই সুবিধার ফলে বাংলাদেশি যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মাঝে দুবাইয়ে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির সুযোগ পাবেন। এতে মূল যাত্রার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিমান চলাচল ও পর্যটন কেন্দ্রে স্বল্পসময়ের বিনোদনমূলক ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া দূরপাল্লার ভ্রমণের ক্ষেত্রে দুবাইকে সংযোগস্থল হিসেবে ব্যবহারকারী যাত্রীদের জন্য এই ট্রানজিট ভিসা যাতায়াত আরো সুবিধাজনক ও সহজ করবে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে বেশ আশাবাদী ভারত। এই ইস্যুতে ঢাকার সঙ্গে জোর আলোচনা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আগামী সপ্তাহের শেষ ভাগে বা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নয়াদিল্লি যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরকে সামনে রেখে ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয় রাজধানীতেই জোর প্রস্তুতি চলছে বলে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আজ তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এনডিটিভি লিখেছে, সম্ভাব্য এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে। সব ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুদিনের এই সফরটি একটি দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচি হিসেবে সাজানো হচ্ছে। তবে সফরের চূড়ান্ত সময়সূচি এখনও নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস আউটরিচ সেশনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। মোদি-তারেক প্রথম বৈঠক ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ প্রতিবেদন বরাতে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিল্লি ও ঢাকা—উভয় পক্ষই নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যকার সম্ভাব্য এই প্রথম বৈঠকের দিকে গভীর নজর রাখছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের পক্ষ থেকেও ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কৌশলগত সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর থেকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক দাবিসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে দুদেশের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছিল। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনেরও কিছু লক্ষণ দেখা গেছে। এর অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া গত ১০ আগস্ট ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, যেখানে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধান ইস্যু: শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং এরপর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লির কাছে তাকে হস্তান্তরের দাবি জানায়। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, এই অনুরোধটি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে শেখ হাসিনা দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি মতবিনিময় করলে এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। তবে ভারত সরকার ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বৈঠকেও প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গটি উঠে আসে। সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি ব্যাহত না করে কীভাবে এই বিরোধপূর্ণ ইস্যুটির সমাধান করা যায়, তা নিয়ে উভয় পক্ষকেই পথ খুঁজতে হবে। পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত সংকট উভয় দেশের মধ্যে সমাধানের অপেক্ষায় থাকা দীর্ঘদিনের বেশ কিছু বাস্তবভিত্তিক সমস্যাও রয়েছে। আসন্ন আলোচনায় মূলত বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্ত এবং জোরালো অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায়, রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হলে তা দ্রুত এই খাতগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আরেকটি বড় ইস্যু হতে পারে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে সময় ঘনিয়ে আসায় চুক্তি নবায়নের আলোচনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও ভারতের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, শুধু দীর্ঘ সীমান্তের কারণেই নয়, বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণেও বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখা নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের নতুন দিগন্তের পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশই যখন তাদের সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী, ঠিক তখনই এই সফরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি মাত্র সফরেই অমীমাংসিত সব সংকটের সমাধান হয়ে যাবে এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। শেখ হাসিনার ইস্যু, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্ত নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার প্রয়োজন পড়বে। তবে নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা দুই দেশের মতপার্থক্য নিরসনে একটি কার্যকর রাজনৈতিক পথ উন্মোচন করতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি এই সফর হয় তাহলে এর মাধ্যমে তারেক রহমান ঢাকার অবস্থান সরাসরি ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্যও এটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছ থেকে দিল্লির প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরার একটি সুযোগ হবে। প্রতিবেদন বরাত বলছে, সফরের চূড়ান্ত তারিখ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী সপ্তাহে তারেক রহমানের এই দিল্লি সফর হতে পারে ভারত-বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা। আপাতত উভয় পক্ষের মূল লক্ষ্য—পরস্পরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা আবার শুরু করা এবং জটিল সংকটগুলো যেন সার্বিক সম্পর্ককে আটকে না ফেলে, সেই পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ দিনে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন নাছির উদ্দীন নাছির। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি তার দায়িত্বের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ, কঠিন ও ঘটনাবহুল সাংগঠনিক একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলার নানা স্মৃতি তিনি তুলে ধরেন নাছির। বিদায়ের এই সময়ে স্মৃতিচারণ করে নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরের সীমাহীন অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আমাদের পথ চলতে হয়েছে। এই সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া সব নেতাকর্মীকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।’ নাছির বলেন, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।’ নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির উদ্দীন নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তখন একদিন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবেন, তা ভাবেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; এটি মানুষের জন্য কাজ করা, সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকার দীর্ঘ যাত্রা।’ নিজের রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, ‘খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা, ত্যাগ এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অবস্থান তাদের প্রতিটি সংগ্রামের শক্তি হয়ে থেকেছে।’ ২০২৪ সালের ১ মার্চ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে বলে উল্লেখ করে নাছির বলেন, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। সে সময় নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন বলে দাবি করেন নাছির। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি তাদের প্রতি ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা জানান। নাছির বলেন, ‘আমাদের অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না। তবে একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস শুধু কয়েকজন মানুষের নাম দিয়ে শেষ হয় না। এর পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক ও দুঃসাহসিক তরুণের ত্যাগ।’ জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে নাছির বলেন, ‘আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ছাত্রদলের অবদান সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে সংকটের সময়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নাছির।’ আন্দোলনের পরপরই নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথাও স্মরণ করেন ছাত্রদলের এই নেতা বলেন, ‘ওই এলাকার সন্তান হিসেবে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমাকে নির্দেশ দেন বেগম খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে আমি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকেও ফেনীতে গিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা পাই।’ নাছির বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদেশ এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা পাওয়ার পর সেদিন রাতেই আমি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হই। দু’দিন পর সভাপতি রাকিব ভাইসহ সুপার ফাইভের বাকি নেতারাও ফেনীসহ বৃহত্তর নোয়াখালী এলাকায় ছুটে যান।’ এই অভিজ্ঞতা থেকে রাজনীতির সংজ্ঞা সম্পর্কে নিজের উপলব্ধির কথা তুলে ধরে নাছির বলেন, ‘রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।’ বেগম খালেদা জিয়ার ওই নির্দেশকে নিজের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, সেটি শুধু একজন নেত্রীর নির্দেশ ছিল না; অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও ছিল। শারীরিকভাবে খালেদা জিয়া তাদের সঙ্গে না থাকলেও তার নির্দেশ, মমতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাদের পথ দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। দায়িত্ব পালনকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব সংস্কৃতি’কেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন জানিয়ে নাছির বলেন, ‘নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিল না। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করাও ছিল নিয়মিত চ্যালেঞ্জ।’ নিজেদের সময়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে নাছির বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে এটিকে কোনো ব্যক্তির কৃতিত্ব হিসেবে দেখছি না। এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।’ তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছু অপূর্ণতা থেকে গেছে বলেও স্বীকার করেন নাছির। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ তার থাকবে বলে জানান তিনি। এ অপূর্ণতার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন নাছির। কমিটিতে পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের প্রতিও নিজের অবস্থান তুলে ধরে নাছির বলেন, যারা কমিটির মাধ্যমে দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের অনেকেই যোগ্য ছিলেন এবং তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতিই তারা পেয়েছেন। তবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি, তাদের প্রতিও তার সমবেদনা ও শ্রদ্ধা রয়েছে। একটি পদকে কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে নাছির বলেন, যারা কোনো একটি কমিটিতে দায়িত্ব পাননি, তাদের অনেকেই আগামী দিনের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়াকেও নিজের দায়িত্বকালের একটি আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল আমাকে প্রায়ই ভাবিয়েছে। কোথায় ঘাটতি ছিল এবং কোথায় আরও ভালো করা যেত, তা নিয়ে আমি নিজের কাছে প্রশ্ন করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্রদল ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে বলে আশা করেন তিনি। দায়িত্ব পালনের সময়ে পাশে থাকা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। তিনি প্রথমেই বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এরপর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব রকিবুল বকুলসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের সব জ্যেষ্ঠ নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। বিশেষ করে কোনো পদ-পদবির প্রত্যাশা ছাড়াই যারা সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেন তিনি। নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাছির বলেন, আমরা হয়তো সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে পারেননি। ভুল হয়েছে, সীমাবদ্ধতা ছিল এবং কখনো কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ঘাটতি ছিল। তবে ছাত্রদলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তার কখনো ছিল না, এ বিষয়ে তিনি নিজের কাছে পরিষ্কার। দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করে নাছির বলেন, ‘পদ থেকে বিদায় নেয়া যায়, কিন্তু আদর্শ, ভালোবাসা ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়া যায় না।’ আগামী দিনে ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব আসবে উল্লেখ করে তাদের প্রতি আস্থার কথাও জানান তিনি। তার বিশ্বাস, নতুন নেতৃত্বের অধীনে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে। নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হলে তাদের ডাকে আগের মতোই পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নাছির। নিজের রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রদলের দেয়া পরিচয়কে কোনো পদ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংগঠনের পতাকার নিচে পাওয়া মানুষ, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাকেই নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন নাছির। দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে কিংবা কারও প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হলে সহযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চান তিনি। নিজের রাজনৈতিক জীবনের অনিশ্চয়তা, ব্যস্ততা, অনুপস্থিতি ও কঠিন সময়গুলো নীরবে সহ্য করা পরিবারের সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। একই সঙ্গে বন্ধু এবং সাংবাদিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। সাংবাদিকেরা তাদের কার্যক্রম মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন এবং কখনো প্রশংসা, কখনো সমালোচনা করেছেন উভয়কেই প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। সবশেষে নাছির বলেন, আমি একটি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, তবে সম্পর্ক, সংগ্রাম ও আদর্শ থেকে নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে বা অন্য কোনো সময়ে দেখা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার প্রত্যাশা, নিজেদের শক্তি, নেতাকর্মীদের ভালোবাসা এবং আদর্শের ভিত্তিতে ছাত্রদল সামনে এগিয়ে যাবে। পরবর্তী নেতৃত্বের হাত ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আরও শক্তিশালী হবে এমন আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক এমন প্রত্যাশা জানিয়ে নাছির বলেন, জীবনের কোনো এক প্রান্তে গিয়ে তিনি সুখময়, সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখতে চান। সেই স্বপ্ন তিনি নিরন্তর দেখেন। তার পরিচয়-প্রতীক ছাত্রদল সেই বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে অবিচল থাকুক এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে নিজের বিদায়ী বক্তব্য শেষ করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।