ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসার কথা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের বাস্তবচিত্র একেবারেই উল্টো। বর্ষা শেষে, এমনকি শীতের দোরগোড়ায় এসে ডেঙ্গু এখন নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ। গত তিন মাসের তথ্য দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, প্রতি মাসে গড়ে দেড় গুণ হারে বেড়েছে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। নভেম্বরের প্রথম সাত দিনেই প্রাণ গেছে ২৯ জনের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাওয়ায় মশার প্রজনন চক্রও দীর্ঘ হয়েছে। ফলে একসময় কেবল বর্ষার রোগ হিসেবে যেটি দেখা দিত, এখন তা সারাবছরের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা। নিষ্ক্রিয় মশা নিধন কর্মসূচি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আগাম প্রস্তুতির অভাব। সবমিলিয়ে ডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং নতুন এক জনস্বাস্থ্য মহামারির আশঙ্কা তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আগস্টে সারাদেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১০ হাজার ৪৯৬ জন, মৃত্যু ৩৯ জনের। সেপ্টেম্বরে ভর্তি হওয়া রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৮৬৬ জনে, মৃত্যু হয় ৭৬ জনের। অক্টোবরে হাসপাতালে ভর্তি হন ২২ হাজার ৫২০ জন, মারা যান ৮০ জন। আর নভেম্বর মাসের প্রথম সাত দিনেই ভর্তি হয়েছেন ছয় হাজার ৬৫২ জন, মৃত্যু ২৯ জনের। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি মাসেই (নভেম্বর) রোগী ৩০ হাজার ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা চিকিৎসকদের।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আগস্টে সারাদেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১০ হাজার ৪৯৬ জন, মৃত্যু ৩৯ জনের। সেপ্টেম্বরে ভর্তি হওয়া রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৮৬৬ জনে, মৃত্যু হয় ৭৬ জনের। অক্টোবরে হাসপাতালে ভর্তি হন ২২ হাজার ৫২০ জন, মারা যান ৮০ জন। আর নভেম্বর মাসের প্রথম সাত দিনেই ভর্তি হয়েছেন ছয় হাজার ৬৫২ জন, মৃত্যু ২৯ জনের। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি মাসেই (নভেম্বর) রোগী ৩০ হাজার ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা চিকিৎসকদের।
গত বছরের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ছিলেন এক লাখ এক হাজার ২১১ জন। এর মধ্যে সর্বাধিক রোগী ভর্তি হয় নভেম্বরে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, এবারও সেই ধারার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, বরং বাড়তি তীব্রতা নিয়ে।
ডেঙ্গুর বাহক ‘টাইগার মশা’ চেনার উপায়
বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা থাকলেও বাংলাদেশে বেশি দেখা যায় অ্যানোফিলিস, এডিস ও কিউলেক্স। তিনটিই মানুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ছড়ায় ম্যালেরিয়া। কিউলেক্স ছড়ায় ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ। আর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক হলো এডিস প্রজাতির মশা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে মূলত এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) ও এডিস এলবোপিকটাস (Aedes albopictus) নামের দুই জাতের মশা। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল-এর তথ্যমতে, এই দুই জাতের দেহে স্পষ্ট সাদা–কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে, যা দেখতে অনেকটা বাঘের চামড়ার মতো। এ কারণে একে অনেকে ‘টাইগার মশা’ও বলেন।
এডিস মশা সাধারণত মাঝারি আকারের হয়। এর মুখাংশ বা অ্যান্টেনা কিছুটা লোমশ এবং পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে বেশি ঘন লোমযুক্ত দেখা যায়। কীটতত্ত্ববিদেরা বলছেন, এই বিশেষ ডোরাকাটা দাগ আর অ্যান্টেনার গঠন খালি চোখেই শনাক্ত করা সম্ভব। তবে, এমন মশা চোখে পড়লে বোঝা উচিত, আশপাশের পরিবেশে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বিদ্যমান।

দেরিতে হাসপাতালে আসাই মৃত্যুর মূল কারণ
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতালটিতে মোট এক হাজার ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন, তাদের মধ্যে মারা যান নয়জন। অক্টোবরে ভর্তি দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৯৬ জনে, মৃত্যু ১১ জনের। আর নভেম্বর মাসের প্রথম সাত দিনের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এই মাসে পূর্বের দুই মাসের দ্বিগুণ হতে পারে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৃতদের ৯০ শতাংশ রোগীকে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ডিএনসিসি হাসপাতালের অ্যাডমিন অফিসার ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে আসা ৯০ শতাংশ রোগীই ক্রিটিক্যাল অবস্থায় আসে। ডেঙ্গুর জটিলতার দুটি ফেজ আছে। একটা ক্রিটিক্যাল, আরেকটা নন-ক্রিটিক্যাল। কেউ যদি ক্রিটিক্যাল ফেজে পৌঁছায়, তখন চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাঁচানো অনেক কঠিন হয়ে যায়। আগে আসলে রোগীকে সহজে সুস্থ করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে জ্বর-কে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে পরীক্ষা করতে দেরি করেন। এটা ভয়াবহ ভুল। জ্বর এলেই পরীক্ষা করা, প্রচুর তরল খাবার খাওয়া— এই দুটি বিষয় এখন জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করছে।’

সচেতনতার অভাব, পরীক্ষায় অনীহা
দেশে বর্তমানে সর্দি-কাশি ও ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। ফলে অনেকে ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ জ্বর ভেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি পর্যায়ে সীমিত পরীক্ষার সুযোগ ও আর্থিক অনীহা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে ‘প্রথম ৭২ ঘণ্টা’র গুরুত্বপূর্ণ সময় অনেক রোগী হারাচ্ছেন, যা পরবর্তীতে রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ বিকলতার ঝুঁকি বাড়ায়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ হোক বা স্থানীয় প্রশাসন— কেউই মৃত্যু ঠেকাতে পারছে না। অথচ এই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। আমাদের স্বীকার করতে হবে, ডেঙ্গু এখন একটা জরুরি পরিস্থিতি। এটাকে মৌসুমি রোগ ভেবে হালকা করে দেখার সময় শেষ।’
‘যে দেশে এক বছরে এক লাখের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়, সেখানে আগাম সতর্কতা, ভেক্টর কন্ট্রোল আর কমিউনিটি অ্যাকশন ছাড়া ডেঙ্গু থামানো সম্ভব নয়। জনগণকে এখন নিজ দায়িত্বে এগোতে হবে’— যোগ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ : জলবায়ু, বর্জ্য ও দুর্বল প্রস্তুতি
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাতের ধরন ও শহরাঞ্চলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই এবারের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি, অপরিষ্কার ছাদ, খোলা ড্রেন ও নির্মাণাধীন ভবনগুলো মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।
একজন সিনিয়র এপিডেমিওলজিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জুলাইয়ে যখন সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে, তখন সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম ছিল নিস্তেজ। পরে যখন অভিযান শুরু হয়, তখন সংক্রমণ অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সময়ের আগে প্রস্তুতি নিতে না পারলে প্রতিবার একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হবে।’
এডিস মশার বিস্তার ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন শুধু নগরভিত্তিক নয়; গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মশার প্রজনন চক্রও বদলে গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশা সাধারণত স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। শহর এলাকার ছোট ছোট সৌন্দর্যবর্ধক বাগান, ফ্লাওয়ার পট বা টবে জমে থাকা পানি মশার জন্য উপযুক্ত প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। তবে, ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই মশা শুধু পরিষ্কার পানিতেই নয়, নোংরা বা আবর্জনা জমে থাকা পানিতেও বংশ বিস্তার করতে সক্ষম।

অধ্যাপক বাশার বলেন, ‘প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর মতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে মশারও কিছু ধরনগত পরিবর্তন হয়। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপের ধরনও আগে যেমন ছিল, তা আর প্রযোজ্য নয়। আমরা এখন দেখছি, মশার বিস্তার ও সংক্রমণ দুটোই দ্রুত এবং অনির্ধারিত।’
ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ বা ধরন রয়েছে— উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর একই ধরনের ভাইরাসই সংক্রমণ ঘটায়, এমন নয়। যেকোনো ধরনের ভাইরাসই খুব দ্রুত মিউটেশন বা জেনেটিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা রোগের প্রকোপ ও গুরুতরতা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।’
অধ্যাপক বাশার সতর্ক করে বলেন, ‘আগে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব মূলত শহর এলাকায় সীমিত থাকত। বর্তমানে নগরায়ণের প্রভাবে এটি গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। বৃষ্টিপাত, জল জমে থাকা জায়গা, অপরিষ্কার পানির ব্যবস্থা— এসব কারণে গ্রামের মানুষও ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই শুধু শহর নয়, দেশের সব অঞ্চলে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।’
প্রতিরোধই একমাত্র উপায়, বলছেন চিকিৎসকরা
ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘যদি প্রথম বা দ্বিতীয় দিনেই পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাহলে রোগীকে জটিল অবস্থায় যেতে হয় না। কিন্তু আমরা অনেক সময় দেখি, জ্বরের চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে রোগী আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।’
তার মতে, ‘রোগীর মৃত্যুর জন্য শুধু ভাইরাস নয়, অবহেলা দায়ী। আগে পরীক্ষা, পরে ভয়— এই অভ্যাস তৈরি করতে হবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে এডিস মশা নির্মূলের বিকল্প নেই। তবে, আমরা এখনও সেই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারিনি।’ তার মতে, ‘কেবল কীটনাশকের ধোঁয়া বা স্প্রে দিয়ে মশার প্রজনন রোধ সম্ভব নয়। কার্যকর প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।’
অধ্যাপক হোসেন আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু দেশে নতুন হলেও আগে এডিস মশা থাকত। তবে, টেস্টিং ব্যবস্থা সীমিত থাকায় মশার অস্তিত্ব বা সংক্রমণের প্রকৃত ধরন নিয়ে গবেষণা বা সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এখন যদিও পরীক্ষার সুযোগ বেড়েছে, তবুও জনগণকে সচেতন না করলে প্রকল্প বা প্রশাসনিক প্রচেষ্টা যথেষ্ট হবে না।’
মশার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারি দায়িত্ব নয়, প্রত্যেক নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়— বলেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস : দুই দশকের লড়াই
বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকজন রোগীর দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু ধরা পড়ে। ২০০০ সালের দিকে রোগটির প্রকোপ বাড়তে শুরু করে।
দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা প্রকট আকার নেয় ২০১৯ সালে। ওই বছর এক লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৯ জনে। যা তখন পর্যন্ত ছিল সর্বোচ্চ। তবে চার বছর পর, ২০২৩ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ইতিহাসের সর্বাধিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড তৈরি হয় সে বছর, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশ, ৩ লিটার বিদেশি মদ ও ২৪টি ভারতীয় শাড়িসহ দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন সানোয়ার আলী (৩৬) ও ইমতিয়াজ আহমেদ (৩৬)। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় পাসপোর্টও উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিমানবন্দরের নিচতলায় আগমনী হলের গ্রিন চ্যানেল থেকে তাদের আটক করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ডিএনসি সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ড. মো. আবু সাঈদ মিয়ার নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেলে অবস্থান নেয়। এ সময় ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে আসা দুই ভারতীয় নাগরিককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে উপস্থিত সাক্ষী ও বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে তাদের ট্রাভেল ট্রলি তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে কাপড়ের নিচে লুকানো ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশ, ৩ লিটার বিদেশি মদ ও ২৪টি ভারতীয় শাড়ি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে। ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) বিমানবন্দর সার্কেলের পরিদর্শক শাহরিয়া শারমিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ডিএনসি জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
পবিত্র ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সীরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দায়িত্বগ্রহণের পর বঙ্গভবনের বাইরে এটি তার প্রথম কর্মসূচি। আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে রাষ্ট্রপতি সেখানে গিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করবেন। তার আগমন ঘিরে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২০ আগস্ট ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে হারিয়ে দেশের ১১তম রাষ্ট্রপতি হন মির্জা ফখরুল। পরদিন ২১ আগস্ট বঙ্গভবনে শপথ নেন তিনি। ২৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। হুমায়ুন কবির বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশেরও এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশ্ব নেতাদের আমন্ত্রণ রয়েছে। একই সঙ্গে মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মক্কা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। মধ্যপ্রাচ্য বা ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা জোট গঠিত হলে সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অস্বাভাবিক হবে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে স্বাক্ষর করে। চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।