অর্থনীতি

কম দামে পোশাক বিক্রি সত্ত্বেও সংকটে পোশাক শিল্প

মোঃ ইমরান হোসেন মে ২৫, ২০২৬
সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে কম দামে পোশাক বিক্রি করেও প্রত্যাশিত অর্ডার পাচ্ছে না বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যছাড় দিয়েও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না। বরং একদিকে যেমন পোশাকের ইউনিট মূল্য কমছে, অন্যদিকে রপ্তানির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। ফলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২৮৯ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫৭ কোটি ইউরো থেকে ১৯.২৬ শতাংশ কম।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পতনের পেছনে শুধু অর্ডার কমে যাওয়া নয়, বরং কম দামে পণ্য বিক্রির প্রবণতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ইউনিট মূল্য কমেছে ৯.১৩ শতাংশ। একই সঙ্গে রপ্তানি ভলিউমও কমেছে ১১.১৪ শতাংশ। অর্থাৎ কম দামে পোশাক বিক্রি করেও বাজারে চাহিদা বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ নেতা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে মূল্য কমানো।কিন্তু বাস্তবতা হলো, উৎপাদন ব্যয় কমছে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ব্যাংক সুদ ও শ্রম ব্যয় বেড়েছে। ফলে কম দামে রপ্তানি করতে গিয়ে কারখানাগুলোর মুনাফা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্রেতা এখন ছোট ছোট অর্ডার দিচ্ছে এবং মূল্য নিয়ে আগের চেয়ে বেশি দর-কষাকষি করছে। এতে বাজার ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শুধু দুই মাসের সামগ্রিক চিত্রই নয়, মাসভিত্তিক হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি মূল্য কমেছে ১২.৩৯ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি ভলিউম কমেছে ৩.৩০ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য কমেছে ৯.৩৯ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসকাউন্ট দিয়েও অর্ডার নেই—এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে অনেক কারখানা। বিশেষ করে বেসিক পণ্য যেমন টি-শার্ট, ট্রাউজার ও সোয়েটারের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের দর-কষাকষি বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও রপ্তানি মূল্য কমে যাওয়ায় মুনাফা সংকুচিত হচ্ছে।

নিট পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর এক নেতা বলেন, ‘নিটওয়্যার খাতে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইউনিট প্রাইস কমে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকায় সেই ছাড় দিয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ অর্ডার মিলছে না।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো তুলনামূলক কম দামের বেসিক পোশাকের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য চাপ তৈরি হলে দেশের রপ্তানি আয় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে ভিয়েতনাম বা চীনের মতো দেশ উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক পণ্যে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় তারা তুলনামূলকভাবে চাপ সামাল দিতে পারছে।

তথ্য অনুযায়ী, চীন ইইউতে ৪২০ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানি মূল্য ৪.০১ শতাংশ কমলেও রপ্তানি ভলিউম ১.৩৪ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ কম দামে হলেও চীন বাজারে সরবরাহ বাড়াতে পেরেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে মূল্য ও ভলিউম দুই সূচকেই পতন দেখা গেছে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কৃষি ব্যাংকে ভুয়া সিবিএ নেতাদের কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি

অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।  

অর্থনীতি

আরও দেখুন
ছবি: সংগৃহীত
ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদের নিয়োগ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকটির কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে রোববার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।   বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর আওতায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।   কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির পরিচালনা ও তদারকি কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।   ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী তিনি পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ব্যাংকটির পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।   বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকটির সুশাসন নিশ্চিত করা, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে আস্থা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।   সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা ব্যবস্থা ও পর্ষদ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে ব্যাংক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরাসরি তদারকির মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক ও অধিকতর স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।   তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আক্তারুজ্জামান জুন ১৪, ২০২৬

৬ হাজার ৮৮০ কোটি কীভাবে ২২ হাজার কোটি টাকা হলো

বৈশ্বিক সংকটেও কনটেইনার-কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ডের পথে চট্টগ্রাম বন্দর

ইসলামী ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নরের সঙ্গে জরুরি বৈঠক

ছবি: সংগৃহীত
বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবসরে পেনশন অর্থের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুইটি

  l বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় থাকা বেসরকারি কর্মীরা অবসরের সময় জমাকৃত মোট অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে পাবেন।   বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা বলেন।   বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।   এর অংশ হিসেবে অবসরের সময় অংশগ্রহণকারীরা তাদের সঞ্চিত মোট অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন। এ উদ্যোগের ফলে বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে এবং সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাবে।   নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় ছিল ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।   বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।  প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা) চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি সচল রাখতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি জুন ১৪, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বাজেটের সুফল তিন খাতে সুষম বণ্টন করা হয়েছে: সড়কমন্ত্রী

ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

ছবি : সংগৃহীত

বিদেশে থেকেও আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ, বাজেটে নতুন ব্যবস্থা

ফাইল ছবি
ইসলামী ব্যাংকে কেন তৈরি হলো নগদ সংকট?

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। কয়েক দিনের ব্যবধানে হাজার হাজার গ্রাহক নিজেদের জমাকৃত অর্থ তুলতে না পারায় ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। নগদ অর্থের সংকট, এটিএমে টাকা না থাকা, আরটিজিএস সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বড় অঙ্কের চেক সম্মান না করা এবং পে-অর্ডার বাউন্স হওয়ার মতো ঘটনাগুলো ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকাশ্যে আশ্বাস দিতে হয়েছে— ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা দেবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল একটি ব্যাংকের সাময়িক তারল্য সংকট, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব? আর এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? শাখায় টাকা নেই, এটিএমেও নগদ সংকট গ্রাহকদের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৯ জুন থেকে ইসলামী ব্যাংকের অনেক শাখায় নগদ অর্থের সংকট শুরু হয়। ১০ জুন মতিঝিলসহ বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারেননি। কোথাও ১০ লাখ টাকার চেকের বিপরীতে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ১১ জুন থেকে। বিভিন্ন জেলার গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, অনেক শাখা বড় অঙ্কের চেক গ্রহণই করেনি। কিছু শাখা পে-অর্ডার দিয়ে গ্রাহকদের সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোও সম্মানিত হয়নি। রাজধানী থেকে শুরু করে হবিগঞ্জ, রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকরা টাকা উত্তোলনে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। বহু গ্রাহক এটিএম বুথেও টাকা পাননি। চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংকটের সূত্রপাত বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগ। গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করার পর বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটিকে ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক, আন্দোলন ও বিক্ষোভ। 'সচেতন গ্রাহক ফোরাম' নামের একটি প্ল্যাটফর্ম নতুন চেয়ারম্যানের অপসারণসহ সাত দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তাদের অভিযোগ, ব্যাংকের পরিচালনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ হচ্ছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অপরদিকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চেয়ারম্যান নিয়োগ ছিল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক এবং একটি বৃহৎ ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড সচল রাখতেই তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমানত প্রত্যাহারের হিড়িক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন ও বিতর্ক শুরু হওয়ার পর মাত্র সাত দিনে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকার আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। ৩১ মে ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। ৭ জুন তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ফলে ব্যাংকটির ওপর নগদ অর্থের চাপ তৈরি হয়েছে। ঈদ-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবেই নগদ টাকার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আতঙ্কজনিত অর্থ উত্তোলন। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন স্বীকার করেছেন যে, ব্যাংকটি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য আমানত প্রত্যাহারের চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ইসলামী ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জামায়াতে ইসলামী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ, সরকার ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ সেই প্রক্রিয়ার অংশ। অপরদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, ইসলামী ব্যাংককে অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার মতে, চেয়ারম্যান নিয়োগের মতো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে হঠাৎ বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের অর্থ উত্তোলন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, যারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন এবং ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন, তাদের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। একই সুর শোনা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বক্তব্যেও। তিনি বলেছেন, খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই ব্যাংকটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালের দখল বিতর্কের ছায়া বর্তমান সংকটের পেছনে ইসলামী ব্যাংকের অতীত ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয় সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, এস আলম সংশ্লিষ্ট ঋণ বিতর্ক এবং খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা ব্যাংকটির ভিত্তিকে আগেই দুর্বল করে রেখেছিল। বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিরোধ সেই দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকের গুরুত্ব অন্য যেকোনো শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০টি ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় অর্ধেকই ইসলামী ব্যাংকের হাতে। ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। রেমিট্যান্স আহরণেও প্রতিষ্ঠানটির আধিপত্য রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে ব্যাংকটি। শুধু গত মে মাসেই ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা দেশের অন্যান্য নয়টি ইসলামী ব্যাংকের সম্মিলিত রেমিট্যান্সের কয়েকগুণ বেশি। ব্যাংকটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ছে প্রভাব ব্যাংকাররা আশঙ্কা করছেন, ইসলামী ব্যাংকের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিনের মতে, ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে গ্রাহকদের মধ্যে ধারণা তৈরি হতে পারে যে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অন্য ইসলামী ব্যাংক থেকেও আমানত প্রত্যাহার শুরু হতে পারে। ইতোমধ্যে সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী, এক্সিম ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বড় পরীক্ষা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। পাশাপাশি জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তুতি নিয়েছে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ব্যাংকটির জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল তারল্য সহায়তা দিয়ে আস্থার সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বার্তা পৌঁছে দেওয়া। সামনে কী হতে পারে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট কেবল একটি ব্যাংকের নগদ অর্থ সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক সুশাসনের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় স্বল্পমেয়াদে তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ ব্যাংকিং খাতে মূলধনের চেয়েও বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে— বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত পদক্ষেপ, রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ওপর।

মারিয়া রহমান জুন ১৪, ২০২৬

ইসলামী ব্যাংক সামলাতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক?

অর্থবছরের ২০ দিন বাকি থাকতেই ৩৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স

ছবি : সংগৃহীত

সিডিএ চেয়ারম্যান হলেন বিএনপি নেতা বেলায়েত হোসেন

0 Comments