এম ইমরান
যুদ্ধকৌশল, নিরাপত্তা ও সমসাময়িক সংঘাত বিশ্লেষক
বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ কেবল সামরিক সাফল্য–ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, মুদ্রা-ব্যবস্থা, জোট রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর গভীর ছাপ ফেলে। যদি কখনো তাত্ত্বিকভাবে একটি ইরানবিরোধী মার্কিন সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়, তবে তার অভিঘাত হবে বহুমাত্রিক—শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির স্থিতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত পর্যন্ত কেঁপে উঠতে পারে। ইতিহাসে দেখা গেছে, বৃহৎ শক্তির ছোট বা সীমিত পরিসরের অপারেশনও কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি মর্যাদা-হানি ডেকে এনেছে।
পরাশক্তির পতনের লক্ষণগুলো: বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
বিশ্ব ইতিহাসে কোনো পরাশক্তির পতন হঠাৎ ঘটে না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ বা উপসর্গ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রোমান সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন—সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, পতনের আগে অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক অতিবিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থান একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তৈরি করে। বর্তমান সময়ে এই তাত্ত্বিক লক্ষণগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-এর অবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ বিশ্বরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
অর্থনৈতিক চাপ ও ঋণনির্ভরতা:
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
পরাশক্তির পতনের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা, উচ্চ ঋণ, এবং উৎপাদনশীল খাতের দুর্বলতা। সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক প্রতিযোগিতায় অতিরিক্ত ব্যয় করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হলেও তার সরকারি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। বাজেট ঘাটতি, সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামরিক খরচ অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে পার্থক্য হলো—যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো বহুমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষণ: পতনের লক্ষণ আংশিক দেখা গেলেও অর্থনীতির মৌলিক শক্তি এখনও দৃঢ়।
সামরিক অতিবিস্তার (Military Overextension):
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
যখন একটি পরাশক্তি বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও সামরিক উপস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার শক্তি ক্ষয় হতে থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা আফগানিস্তান অভিযান এই বাস্তবতার উদাহরণ।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার এবং ইরাক-পরবর্তী পরিস্থিতি সামরিক নীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে।
বিশ্লেষণ: সামরিক অতিবিস্তার একটি সতর্ক সংকেত, তবে প্রযুক্তিগত সামরিক আধিপত্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির বড় ভিত্তি।
বৈশ্বিক মুদ্রা আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ:
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
যখন কোনো পরাশক্তির মুদ্রা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য হারাতে শুরু করে, তখন তার অর্থনৈতিক প্রভাবও কমতে থাকে।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
ডলার এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার শীর্ষে, কিন্তু বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে চীন ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহার বাড়াতে চায়।
বিশ্লেষণ: ডলারের আধিপত্য এখনো দৃঢ়, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে—যা পতনের সম্ভাব্য উপসর্গের একটি প্রাথমিক রূপ।
নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থান:
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
একটি পরাশক্তির পতনের সময় নতুন শক্তির উত্থান দেখা যায়। যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক আধুনিকীকরণে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অবকাঠামো বিনিয়োগ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষণ: এটি পতনের সরাসরি লক্ষণ নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য বহুমুখী হওয়ার প্রক্রিয়া।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ:
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
রোমান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে যেমন রাজনৈতিক বিভাজন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বেড়ে গিয়েছিল, তেমনি আধুনিক পরাশক্তির পতনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট দেখা যায়।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, এবং নীতিনির্ধারণে অচলাবস্থা ক্রমশ দৃশ্যমান। সামাজিক বিভাজনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষণ: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
বৈশ্বিক জোট ও প্রভাবের পরিবর্তন:
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
পরাশক্তির পতনের সময় মিত্র দেশগুলো ধীরে ধীরে বিকল্প কৌশল গ্রহণ করে এবং একক নির্ভরতা কমায়।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
ন্যাটো এখনও শক্তিশালী হলেও ইউরোপীয় দেশগুলো স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা কৌশলের কথা বলছে। মধ্যপ্রাচ্যেও অনেক দেশ বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষণ: জোট দুর্বল হয়ে পড়েনি, তবে একমুখী নির্ভরতা কমে যাচ্ছে—যা বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত।সফট পাওয়ার ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন
ঐতিহাসিক লক্ষণ:
পরাশক্তির সফট পাওয়ার কমে গেলে আন্তর্জাতিক নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়। সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ—এসবের প্রভাব কমে গেলে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাও কমে।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা:
যুক্তরাষ্ট্র এখনও শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিতে শক্তিশালী প্রভাব বজায় রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছু সিদ্ধান্ত নৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণ: সফট পাওয়ার এখনও বড় শক্তি, কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সার্বিক তুলনামূলক মূল্যায়ন:
|
পতনের ঐতিহাসিক লক্ষণ |
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা |
মূল্যায়ন |
|
অর্থনৈতিক চাপ |
ঋণ বৃদ্ধি কিন্তু শক্তিশালী অর্থনীতি |
আংশিক ঝুঁকি |
|
সামরিক অতিবিস্তার |
বহু অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি |
সতর্ক সংকেত |
|
মুদ্রা আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ |
ডলার শক্তিশালী, বিকল্পের উত্থান |
দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা |
|
নতুন শক্তির উত্থান |
চীনের দ্রুত অগ্রগতি |
ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন |
|
রাজনৈতিক মেরুকরণ |
অভ্যন্তরীণ বিভাজন বৃদ্ধি |
গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি |
|
জোট দুর্বলতা |
বহুমুখী কূটনীতি বাড়ছে |
নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন |
|
সফট পাওয়ার হ্রাস |
এখনও শক্তিশালী |
তুলনামূলক স্থিতিশীল |
সুপারপাওয়ার থেকে ‘সাধারণ সুপারপাওয়ার’—মর্যাদাগত অবক্ষয়:
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একক আধিপত্যশীল শক্তি বা 'হেজিমনি' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা সত্ত্বেও, সামরিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তার ভাবমূর্তি অটুট ছিল। কিন্তু ইরানের মতো একটি আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে বড় ধরনের পরাজয় বা পিছুটান ঘটলে সেই ভাবমূর্তি তীব্রভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবে।
সামরিক ব্যর্থতা কেবল যুদ্ধের ফলাফল নয়; এটি বিশ্বব্যাপী প্রতিপক্ষ ও মিত্রদের মনে একটি বার্তা পাঠায়—আমেরিকার শক্তি সর্বগ্রাসী নয়। যখন একটি দেশ বুঝতে পারে যে 'বিশ্ব পুলিশ' আর আগের মতো কার্যকর নয়, তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তা-নীতিতে বিকল্প ভাবতে শুরু করে। ন্যাটোর ভেতরের ফাটল আরও চওড়া হবে এবং মিত্ররা ওয়াশিংটনের ছাতা ছেড়ে বেইজিং বা মস্কোর সাথে নতুন সমীকরণে যাবে। ফলাফল? আমেরিকা তখন আর একমাত্র সুপারপাওয়ার থাকবে না, বরং চীন বা রাশিয়ার মতো একটি 'আঞ্চলিক পরাশক্তি' বা বড়জোর একটি 'সাধারণ পরাশক্তিতে' পরিণত হবে।
অর্থনৈতিক প্রতিঘাত: মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের বোঝা:
একটি বৃহৎ সামরিক অভিযান ব্যর্থ হলে তার সরাসরি আর্থিক খরচ তো থাকবেই, সঙ্গে যুক্ত হবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। আমেরিকার বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি এমনিতেই নাজুক। এর ওপর যদি কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের একটি ব্যর্থ যুদ্ধ চেপে বসে, তবে মার্কিন অর্থনীতি ধসে পড়তে বাধ্য। ব্যর্থ অভিযানের ফলে ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা কমবে, শেয়ারবাজারে ধস নামবে এবং জ্বালানি বাজারে অগ্নিকাণ্ড ঘটবে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। হরমুজ প্রণালী যদি যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে কেবল আমেরিকা নয়, পুরো বিশ্ব এক ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে, যার দায়ভার দিনশেষে আমেরিকার ওপরেই বর্তাবে।
পেট্রোডলার আধিপত্যের অবসান:
মার্কিন শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'পেট্রোডলার'। ১৯৭০-এর দশকের চুক্তিতে বিশ্ববাজারে তেলের বাণিজ্য ডলারে হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু যদি ইরান আক্রমণ ব্যর্থ হয়, তবে সৌদি আরবসহ ওপেক (OPEC) দেশগুলো আর ডলারের ওপর ভরসা রাখবে না।
ইতিমধ্যেই ব্রিকস (BRICS) জোট ডলারবিহীন বাণিজ্যের কথা বলছে। যুদ্ধের ব্যর্থতা সেই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করবে। তেল লেনদেনে ইউয়ান বা ইউরোর ব্যবহার শুরু হলে ডলারের চাহিদা বিশ্ববাজারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এর ফলে আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হবে এবং তারা নিজেদের ঘর সামলাতেই হিমশিম খাবে, বিশ্ব শাসন করা তো দূরের কথা।
চীনের উত্থান: নতুন বিশ্বব্যবস্থার কারিগর:
প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, রাজনীতিও তেমনি ক্ষমতার শূন্যতা পছন্দ করে না। আমেরিকার পতনের সাথে সাথেই সেই স্থান দখল করবে চীন। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এর মাধ্যমে তারা ইতিমধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতা চীনের জন্য একটি কৌশলগত 'গোল্ডেন সুযোগ' তৈরি করবে। বিশ্ব দেখবে যে মার্কিন হার্ড-পাওয়ারের দিন শেষ এবং চীনা সফ্ট-পাওয়ার ও অর্থনৈতিক কূটনীতিই ভবিষ্যৎ। তখন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ বা আইএমএফ-এ আমেরিকার পরিবর্তে চীনের কথা বেশি গুরুত্ব পাবে। মূলত, ইরানের পরাজয় হবে চীনের বিশ্ব পরাশক্তি হওয়ার আনুষ্ঠানিক অভিষেক।
মার্কিন সামরিক ব্যয় বনাম চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: একটি তুলনামূলক চিত্র:
গত দুই দশকে বিশ্ব দেখেছে আমেরিকার খরচের খাত এবং চীনের আয়ের খাতের এক বিপরীতমুখী মেরুকরণ। নিচে একটি সারণির মাধ্যমে এই পার্থক্যের মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
|
বিষয় |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) |
চীন (China) |
|
মূল শক্তি |
সামরিক আধিপত্য ও হার্ড পাওয়ার। |
অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও সফ্ট পাওয়ার। |
|
বার্ষিক সামরিক বাজেট |
প্রায় ৮০০-৯০০ বিলিয়ন ডলার (বিশ্বের সর্বোচ্চ)। |
প্রায় ২৫০-৩০০ বিলিয়ন ডলার (ক্রমবর্ধমান)। |
|
জিডিপি প্রবৃদ্ধি |
২% - ৩% (পরিপক্ক ও স্থিতিশীল অর্থনীতি)। |
৫% - ৭% (দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি)। |
|
ঋণের বোঝা |
৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে (বিশাল যুদ্ধঋণ)। |
অভ্যন্তরীণ ঋণ থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল রিজার্ভ। |
|
বৈশ্বিক কৌশল |
মিত্র দেশগুলোতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন। |
'বেল্ট অ্যান্ড রোড' প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্য নেটওয়ার্ক। |
|
প্রযুক্তিগত ফোকাস |
স্টেলথ ফাইটার, ড্রোন ও নেভাল পাওয়ার। |
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ৫জি এবং গ্রিন এনার্জি। |
বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর:
ইরান আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পরিস্থিতি কেবল একটি সামরিক পরাজয়ের গল্প নয়; এটি হতে পারে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাঁকবদল। যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাগত অবক্ষয়, পেট্রোডলারের পতন এবং চীনের উত্থান—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্র নতুনভাবে আঁকা হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, পরাশক্তিরা সহজে হার মানে না। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো—অতিরিক্ত দম্ভ এবং ভুল সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোমান বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো আধুনিক মার্কিন সাম্রাজ্যকেও পতনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইরান হতে পারে সেই চূড়ান্ত পরীক্ষা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।