বিকেলের নরম আলো তখন সাতাশ মৌজার মাঠজুড়ে। আর এই মাঠে মঞ্চে দেশের প্রথম ‘জাতীয় দুর্যোগ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা চলছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ, স্লোগান আর করতালির শব্দ। কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই যেন পুরো আয়োজনটির আবহ বদলে গেল। একটি সাধারণ উপহার কীভাবে একটি আস্ত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে এক মুহুর্তেই আবেগ আর ইতিহাসের মহাকাব্যে রূপ দিতে পারে, আজ বুধার গাজীপুরবাসী দেখল তারই এক পরম দৃশ্যপট।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন একটি বিশেষ স্মারক। মখমলের আবরণে ঢাকা সেই উপহারটি যখন উন্মোচন করা হলো, তখন মঞ্চে বসা খোদ সরকারপ্রধানও হয়তো ভাবেননি তার জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে। সেটি ছিল ১৯৭৮ সালের এক খণ্ড জীবন্ত দলিল— তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক স্মারক চিহ্ন।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান গাজীপুরকে মহকুমা ঘোষণা করে এই অঞ্চলের আধুনিকায়নের সূচনা করেছিলেন। সেই সময়ের একটি স্মারক যখন তারই পুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে পৌঁছাল, তখন চারপাশের প্রটোকলের দেয়াল যেন নিমেষেই ভেঙে গেল।
প্রধানমন্ত্রী স্মারকটি হাতে নিয়ে আলতো করে আঙুল বুলালেন। রাষ্ট্রনায়কের চাদর গলে তখন বেরিয়ে এলেন এক আকুল পুত্র। পরম মমতায় তিনি পিতার স্মৃতিচিহ্নটি ছুঁয়ে দেখলেন, যেন ওই জড় বস্তুর ভেতরেই তিনি খুঁজে ফিরছিলেন তার বীর পিতার অস্তিত্ব, তার কর্মময় জীবনের সেই চিরচেনা অনুভূতি। উপস্থিত হাজারো মানুষ দেখল, কিছুক্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রী স্তব্ধ হয়ে রইলেন, তার চোখ জুড়ে নেমে এলো স্মৃতিকাতরতার এক অবাধ্য আবেগ।
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সাধারণত দামী বা প্রথাগত ক্রেস্ট দেওয়ার যে চল, তার বাইরে গিয়ে জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগটি ছিল অনন্য। উপহারদাতার এই গভীর সংবেদনশীলতা ও দূরদর্শিতার কারণে প্রধানমন্ত্রী নিজে মঞ্চেই তার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করেন।
গাজীপুরের সাতাশ মৌজা থেকে যখন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন তার সাথে ছিল এক নতুন ইনস্টিটিউটের স্বপ্ন, আর হৃদয়ের খুব কাছে যত্ন করে রাখা পিতার এক টুকরো অমলিন স্মৃতি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
রেলওয়ের সব স্টেশন, স্থাপনা, অবকাঠামো ও প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন স্থাপনে টানা ১০ বছর এককভাবে ব্যবহার করতে চান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুবলীগের আলোচিত নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম। এ বিষয়ে তাকে ‘প্রয়োজনীয় সহযোগিতা’ দিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখিতভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। রেল মন্ত্রণালয়ের সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতার আবেদনে মন্ত্রীর এমন লিখিত নির্দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে সদর দপ্তর এবং এর অধীন সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে। পুরো মন্ত্রণালয়কে এক ব্যক্তির জন্য ব্যবহারের এমন আবেদন ও নির্দেশনা দুটিই নজিরবিহীন বলে জানান তারা। তাদের মতে, রুলস অব বিজনেস ও বিজ্ঞাপন নীতিমালা অনুযায়ী এমন আবেদন ও নির্দেশনা দুটিই অস্বাভাবিক ঘটনা। এদিকে রেলমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের কাছে প্রতিদিন এমন অনেক আবেদন আসে। এগুলো আইন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য সচিবকে মার্ক করে পাঠিয়ে দেই। যুবলীগ নেতা জি কে শামীম কিংবা তার মনোনীত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার দূরতম সম্পর্কও নেই বলে জানান তিনি। সরল বিশ্বাসেই তিনি আবেদনটিতে সহযোগিতা করার কথা লিখেছেন। অন্যদিকে জি কে শামীমের এমন আবেদনকে ‘সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন বিএনপি ও যুবদলের নেতারা। এ বিষয়ে দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ। নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতার এমন আবেদনকে কীভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের দুই বছর পার না হতেই গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এসে রেলওয়ের সব স্টেশন, কম্পার্টমেন্ট, প্ল্যাটফর্মসহ সব স্থাপনার বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ নিতে জি কে শামীমের আবেদন আমাদের ব্যথিত করেছে। যে সময়ে তার (জি কে শামীম) বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়ার কথা, ঠিক সে সময়ে দাপট দেখিয়ে সরকারের সঙ্গে তার ব্যবসা করার ঘটনা বিস্ময়কর। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জি কে শামীম তার মালিকানাধীন জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের পক্ষে নিজেকে এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে গত ১১ জুন রেলমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড–একটি সরকারি তালিকাভুক্ত (স্পেশাল ক্লাস পিডব্লিউডি) প্রকৌশল নির্মাণ, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক, সংযোগ ও স্থাপন এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ের সমগ্র নেটওয়ার্কব্যাপীÑ সব স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, রোলিং স্টক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে একটি সমন্বিত বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, স্থাপন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে আগামী ১০ বছরের জন্য একক অধিকার চাই।’ রেলওয়ের সব স্থাপনায় নিজের একক অধিকার প্রতিষ্ঠার এ আবেদন অনুমোদনের পাশাপাশি জি কে শামীম রেলওয়ের সব স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম ও রোলিং স্টকে বিজ্ঞাপন পরিচালনার এককভাবে অধিকার দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদনের অনুরোধ করেন। বিজ্ঞাপন সামগ্রী ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা দিতে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। একই সঙ্গে জি কে বি কোম্পানির প্রতিনিধিদের রেলওয়ের সব জায়গায় ঢোকার অধিকারও নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ জানান জি কে শামীম। পাশাপাশি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে রেলওয়ের কোনো স্থাপনায় বিজ্ঞাপন স্থাপন করতে না পারে, সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রার্থনা জানান তিনি। রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১১ জুন জি কে শামীমের স্বাক্ষরিত আবেদনটিতে রেলমন্ত্রী ১৫ জুন সচিবকে নির্দেশনাসহ পাঠান। আবেদনের উপরে মন্ত্রী সচিবকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করুন।’ আবেদনটি মন্ত্রীর দপ্তরের ডায়েরিতে অন্তর্ভুক্ত না করেই সরাসরি সচিবের দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর ১৭ জুন সচিবের দপ্তরের রেজিস্ট্রারে এটি ১২৯২ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের আইন ও ভূমি শাখায় পাঠিয়ে দেন। টানা ১০ বছরের জন্য এককভাবে রেলওয়ের সব স্থাপনা, নেটওয়ার্ক, স্টেশন ও প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপনের জন্য এককভাবে ব্যবহারের আবদার করে জি কে শামীমের করা আবেদনের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তোলপাড় চলছে। কর্মকর্তারা জানান, সহযোগিতা করার বিষয়ে মন্ত্রীর নির্দেশনা মানতে গেলে বিজ্ঞাপন নীতিমালা ও প্রচলিত আইন এবং বিধি-বিধান লংঘন করতে হবে। তবে মন্ত্রীর নির্দেশনা ও প্রচলিত বিধিবিধান সামনে রেখে আইনগত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। কর্মকর্তাদের মতে আবেদনটিই বেআইনি রেল মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টানা ১০ বছর রেলওয়ের সব স্থাপনা এককভাবে ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে জি কে শামীমের আবেদনটিই বেআইনি। এমন আবেদন কোনোভাবেই মন্ত্রণালয় গ্রহণ করতে পারে না। ২০২৬ সালে করা রেলওয়ে বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিং নীতিমালা অনুযায়ী, রেলওয়ের যে কোনো স্থাপনায় বিজ্ঞাপন প্রচারের বিষয়টি উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। প্রতি বর্গফুট ১২ হাজার টাকা দাম নির্ধারণের নির্দেশনাও রয়েছে এ নীতিমালায়। জি কে শামীমের আবেদন গ্রহণ করলে নীতিমালার প্রতিটি ধারাকে অমান্য করা হবে বলেও জানান তারা। রুলস অব বিজনেস না মেনে আবেদনের ওপর মন্ত্রীদের দেওয়া নির্দেশনাগুলো নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কর্মকর্তাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় বলে জানান জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া। আমার দেশকে তিনি বলেন, মন্ত্রীরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ায় জনগণের অনেক আবদার তাদের মানতে হয়। কিন্তু এটাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা বিপদে পড়েন। যেখানে আইন, বিধি-বিধান ও নীতিমালার বিষয় জড়িত, সেসব বিষয়ে কেউ আবেদন করলে তা পদ্ধতিগতভাবেই নিষ্পত্তি করতে হয়। এখানে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আগ্রহীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রীরা কোনো নির্দেশ দিলেও সেটা রুলস অব বিজনেস ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কার্যকর নয়। কাজেই এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রীদেরও নিয়ম মেনে চলা উচিত। তবে সেবামূলক কাজে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন্ত্রীর যে কোনো নির্দেশনা দেওয়াটা দোষের কিছু নয়। এমনিতেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনবান্ধব নয় বলে সাধারণ মানুষের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেবার জন্য রাজনীতিবিদদের কাছেই তারা যায়। জি কে শামীমকে নিয়ে প্রশ্ন ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে জি কে শামীমের নাম আসে যুবলীগের তৎকালীন বিতর্কিত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে। রাজধানীর ক্যাসিনোকেন্দ্রিক অবৈধ আয়ের একাংশ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে ভাগাভাগি হতো, আর এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন জি কে শামীম ও সম্রাট। তবে জি কে শামীমের মূল পরিচিতি ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি একের পর এক বড় সরকারি নির্মাণ প্রকল্পের কার্যাদেশ বাগিয়ে নিতেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে দেশের মানুষ প্রথমবারের মতো জানতে পারে, রাজধানীর অভিজাত ক্লাবগুলো ঘিরে কীভাবে গড়ে উঠেছিল বিশাল অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। তখন রাজধানীর নিকেতনে তার বিলাসবহুল কার্যালয়ে র্যাব অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও নগদ অর্থের পরিমাণ দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তার অফিস থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল আটটি আগ্নেয়াস্ত্র, শত কোটি টাকার এফডিআর, বিপুল নগদ টাকা আর বিদেশি মদ। সাত দেহরক্ষীসহ তাকে গ্রেপ্তার করার পর দেশের মানুষ ভেবেছিল মাফিয়াতন্ত্রের বুঝি অবসান ঘটল। এরপর একে একে তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং মামলা। এর মধ্যে অর্থপাচার মামলায় নিম্নআদালত তাকে দণ্ডিত করলেও পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত সেই রায় বাতিল করে খালাস দেয়। অন্যদিকে দুদকের মামলায় আদালত হাজতবাসে কাটানো সময়কে সাজার মেয়াদ হিসেবে বিবেচনা করায় ওই মামলাতেও তাকে কারাগারে রাখার সুযোগ থাকেনি বলে কারা সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে। এর আগে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে তার ও তার মায়ের নামে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য। এসব সম্পদের বড় অংশের বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়। রেলওয়ের সবকিছুই এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আবেদনের বিষয়ে জি কে শামীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে আমার দেশ। আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা দেওয়ার পর তিনদিন অপেক্ষা করলেও তিনি জবাব দেননি। সরেজমিনে গত সোমবার জি কে শামীমের অফিস রাজধানীর গুলশান-১-এর নিকেতন আবাসিক এলাকার এ ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালে অস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘জি. কে. বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’। নিকেতন কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থিত বাড়িটির মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে গেলে কোম্পানির নাম ও লোগোসংবলিত গোলাকার মনোগ্রামও চোখে পড়ে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল একাধিক স্টাফ এ প্রতিবেদককে জানান, বাড়িটি জি কে শামীমের মালিকানাধীন এবং এখানেই কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জি কে শামীম নিয়মিত এ কার্যালয়ে আসেন। তবে দিনের বেলায় নয়, অধিকাংশ সময় সন্ধ্যার পর তিনি অফিসে প্রবেশ করেন। এ সময় কোম্পানির অফিস দেখার কথা বললে গেটে দায়িত্বরত কর্মী সন্ধ্যার পর আসতে বলেন। এ বিষয়ে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন আমার দেশকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সহযোগী বা তাদের কোনো স্টেকহোল্ডার একচ্ছত্রভাবে ব্যবসার সুযোগ পাকÑ এটি দেশের মানুষ চায় না। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও তা চাই না। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত।’ জি কে শামীমের এমন অদ্ভুত আবেদনের বিষয়ে রেলমন্ত্রী আমার দেশকে আরো বলেন, ‘আমরা নীতিমালার বাইরে যাব না। যাওয়ার সুযোগও নেই।’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিষয়টি আরো ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারি মুদ্রা হওয়া সত্ত্বেও নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বিভিন্ন বাজারে ১ টাকার ধাতব মুদ্রা কার্যত লেনদেনের বাইরে চলে যাচ্ছে। কাঁচাবাজার, মুদি দোকান, চায়ের দোকান, গণপরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনেকেই এই কয়েন গ্রহণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটায়। এমনকি ভিক্ষুকও ১ টাকার কয়েন নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। অনেকের অভিযোগ, ব্যাংকেও কয়েন জমা দিতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে কথা বলে জানা যায়, খুচরা হিসেবে ১ টাকার কয়েন দিলে অনেক দোকানি তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ফলে ক্রেতাদের কখনো অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, আবার কোথাও ১ টাকার পরিবর্তে চকলেট বা অন্য কোনো সামগ্রী নিতে হচ্ছে। সরকারি মুদ্রা হাতে রেখেও ব্যবহার করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। চা-পানের দোকানদাররা জানান, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ১ টাকার কয়েন প্রত্যাখ্যান করছেন না। তাদের দাবি, খুচরা লেনদেন থেকে সংগৃহীত এসব কয়েন পাইকারি বাজারে সহজে গ্রহণ করা হয় না। কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী শফিক জানান, কয়েন জমে থাকলেও তা পুনরায় প্রচলনে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বাধ্য হয়েই নতুন করে ১ টাকার কয়েন গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়েছে। একাধিক ভিক্ষুক জানান, ১ টাকার কয়েন নিয়ে দোকানে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয় না। প্রয়োজনীয় কোনো পণ্যও কেনা যায় না। তাই তারাও এখন ১ টাকার কয়েন নিতে আগ্রহী নন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র কর্তৃক ইস্যুকৃত ১, ২ ও ৫ টাকার ধাতব মুদ্রা বৈধ লেনদেনের মাধ্যম। এসব মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো আইনসম্মত নয়। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় সরকারি মুদ্রার কার্যকর ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, বাজারে কয়েনের স্বাভাবিক প্রচলন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তদারকি এবং ব্যাংকগুলোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কেন ব্যাংক ও পাইকারি পর্যায়ে কয়েন ব্যবহারে অনীহা তৈরি হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। অন্যথায় সরকারি মুদ্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ার এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। সোনালী ব্যাংক পূর্বধলা শাখার ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম জানান, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের শাখায় ১ টাকা, ২ টাকা, ৫ টাকাসহ সব ধরনের বৈধ ধাতব মুদ্রা নিয়মিত গ্রহণ ও বিতরণ করা হয়। গ্রাহকরা এসব কয়েন জমা দিতে পারেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তোলনও করতে পারেন। ব্যাংকে কোনো ধরনের কয়েন গ্রহণে বাধা নেই।’ এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, ‘এক টাকার কয়েন বাংলাদেশ সরকারের বৈধ মুদ্রা। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে এ কয়েন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তা আইনসম্মত নয়। বাজারে কয়েন না নেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ পেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা ছয়টি যাত্রীবাহী বাস ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত মুঠোফোনের ক্ষতিপূরণ আদায়ের পর ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটানোর অঙ্গীকার করে মুচলেকা দেওয়ার পর বাসগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আহত দুই শিক্ষার্থীর চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরেক শিক্ষার্থীর ক্ষতিগ্রস্ত মুঠোফোনের জন্যও ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। সব মিলিয়ে ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধের পর বাসগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাস কর্তৃপক্ষ লিখিত মুচলেকাও দিয়েছে যে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করবে না। এর আগে গত শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পথে গাবতলী থেকে মৌমিতা পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী হিরু মিয়া ও তাঁর দুই বন্ধু। বাসটি আমিনবাজার এলাকায় পৌঁছালে শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র দেখিয়ে তিনজনের হাফ ভাড়া হিসাবে ৬০ টাকা দেন হিরু মিয়া। কিন্তু বাসচালকের সহকারী হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে কথা–কাটাকাটি হলে হিরু মিয়ার জামার কলার ধরেন সহকারী। পরে হেমায়েতপুর এলাকায় তাঁকে ঘাড় ধরে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন। হিরু মিয়া বিষয়টি তাঁর বন্ধুদের জানালে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বাসটি আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বাসচালক দ্রুতগতিতে বাসটি নিয়ে চলে যান। শিক্ষার্থীরা জানান, পরে অন্য একটি বাসে করে শিক্ষার্থীরা ধাওয়া দিয়ে ওই বাসকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল ফটক এলাকায় আটক করা হয়। এ সময় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাগিব মারজান কাঁধে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী ইয়াছির আরাফাত আঙুলে চোট পান। পরে শিক্ষার্থীরা একই পরিবহনের আরও পাঁচটি বাস আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এ ঘটনার পর গত রোববার রাতে আলোচনায় বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও বাস কর্তৃপক্ষ। ওই আলোচনায় ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর আজ ক্ষতিপূরণ পরিশোধের পর বাসগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়।