উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছরে নতুন ঋণ নেয় ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার। চড়া সুদ ছাড়াও ঋণের বড় অংশই ছিল কঠিন শর্তের জালে বন্দি।
বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে আগামী অর্থবছরে, ইতোমধ্যে চলতি মার্চ পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৪০০ কোটি ডলার। আর স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বিদেশি ঋণের মধ্যে ৭৮ শতাংশই নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সালে তা বেড়ে হয় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
ওই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ২০২৪ সালে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলারে। অন্তর্বর্তী সরকার ডলার–সংকট মেটাতে ঋণ নেয়। ফলে ২০২৫ সালে বিদেশি ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
অর্থাৎ দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৯.৯২ শতাংশ নিয়েছে আ.লীগ সরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ২০০৯ সালের শুরুতে ডলারের দাম ছিল ৬৯ টাকা। তবে ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ টাকা। এমনকি ব্যাংকে ১৩২ টাকা দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও।
২০০৯ সালের শুরুতে বৈদেশিক ঋণের সুদহার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ। কোনো কোনো খাতে আরো কম। এখন ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২৪ সালে বৈশ্বিক মন্দার সময়ে এ হার আরও বেশি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী মোট ঋণের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ঋণের সুদ ও বিনিময় হারই বাজারভিত্তিক হবে। অর্থাৎ ঋণ যখন পরিশোধ করা হবে তখন বাজারে যে সুদহার ও ডলারের দাম যা থাকবে ওই হারে পরিশোধ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৫১ টাকা। এতে সমান হারে টাকার মান কমেছে। ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে নিয়মিত বাড়তি সুদের পাশাপাশি দণ্ড সুদ বা সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। মোট ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশ চড়া সুদ ও কঠিন শর্তের ঋণ। এসব শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াতে হয়েছে। এসব মিলে বৈদেশিক ঋণের অর্থ অপব্যবহারের ফলে সব চাপ পড়েছে জনগণের ওপর।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেপরোয়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার কারণে এখন ওই সব ঋণ পরিশোধের চাপও বেশি। সরকারি বা বেসরকারি খাতের প্রতিটি ঋণের বিপরীতেই রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্যারান্টি রয়েছে। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতা এখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বা জেলে থাকলেও ওইসব ঋণ এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পরিশোধ করতে হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রাহকের নামে ফোর্স লোন সৃষ্টি করে বাজার থেকে চড়া দামে ডলার কিনে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সূত্রমতে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৮ শতাংশই নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাকি ২২ শতাংশ নেওয়া হয়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঋণের প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত শুধু সরকারি খাতেই ৪০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হবে। এরপর থেকে ঋণ পরিশোধ কমতে থাকবে। সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ শোধ করার নিয়ম হচ্ছে রাজস্ব আয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে টাকা দেবে সরকার। ওই অর্থ দিয়ে ডলার কিনে ঋণ শোধ করা হবে। এখন অর্থনৈতিক মন্দায় রাজস্ব আয় কম হওয়ায় বৈদেশিক ঋণ শোধের জন্য টাকার জোগান রাজস্ব আয় থেকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে ডলার কিনে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে ছিল ১৬৯ ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪৩৮ ডলার। মাথাপিছু মোট বৈদেশিক ঋণের ৭০ দশমিক ৫১ শতাংশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেড়েছে। বাকি ২৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাথাপিছু বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৭ ডলারে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থাৎ ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। আলোচ্য সময়ে দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার।
সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপে পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ যুদ্ধের অজুহাতে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে এখন রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশি ঋণ ও অনুদান বাবদ যেসব বৈদেশিক মুদ্রা আসে তা দিয়ে আমদানি ব্যয়, সেবা খাতের ব্যয়, বেসরকারি খাতের ঋণ পরিশোধ করার পর বাড়তি ডলার থাকছে না। ফলে রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে সরকারি খাতের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভে চাপ বেড়েছে। অথচ আগে দৈনন্দিন আসা ডলার থেকে ওইসব ব্যয় মিটিয়ে যা উদ্বৃত্ত থাকত তা দিয়ে সরকারি খাতের ঋণ শোধ করা হতো।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়েও বছরে বৈদেশিক ঋণ বাবদ পরিশোধ করা হতো ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলার। এখন পরিশোধ এত বেড়েছে যে, শুধু গত অর্থবছরেই পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে পরিশোধের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সে অনুপাতে দেশের রিজার্ভ না বাড়ায় এখন ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত একেবারেই কম। এ অনুপাত এখন ২৩ শতাংশে নেমেছে। ২০২০ সালে যা ছিল ৬০ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর গবেষক হেলাল আহমেদ জনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সেগুলো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করলে কিছুটা সুফল মিলত। কিন্তু ঋণের টাকার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ঋণের টাকায় দেশে কিছুই করা হয়নি। বরং দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ায় দেশের দায় বেড়েছে। সাধারণত বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তা যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়-এমন সব প্রকল্পে ব্যয় করা হলে তাহলে পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে তার প্রায় সবই খরচ করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রা নির্ভর প্রকল্পে। ফলে দুভাবে ওইসব ঋণ অর্থনীতিতে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
এক. পাচার করে ও দুই. স্থানীয় অর্থ আয় নির্ভর প্রকল্পে ব্যয় করে। যে কারণে এখন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী রিজার্ভ বাড়ানো যাচ্ছে না। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ নেতিবাচক প্রভাব আরো বেড়েছে। যার সরাসরি দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বন্ধ ও আংশিক চালু শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারবে। নতুন এই স্কিমের আওতায় ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ, যেখানে বর্তমানে ব্যাংক খাতে ঋণের সুদহার ১৪ শতাংশেরও বেশি। ফলে প্রচলিত বাজারদরের প্রায় অর্ধেক সুদে চলতি মূলধনের ঋণ নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম জোরদার করার সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত–সহায়ক প্রাক্-অর্থায়ন স্কিম’ নীতিমালা ঘোষণা করে। এর আগে, গত ২৩ মে দেশের অর্থনীতি চাঙা করতে এবং বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ তহবিল ঘোষণার কথা জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এবার ২০ হাজার কোটি টাকার এ বিশেষ তহবিলের নীতিমালা ঘোষণা করা হলো। এই নীতিমালা অনুযায়ী, বন্ধ ও আংশিক সচল কারখানা পুরোপুরি চালু করতে একটি কোম্পানি বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন ঋণ নিতে পারবে। এতে সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। চলতি মূলধন নেওয়া কোম্পানিতে প্রতিনিধি বসাতে পারবে ব্যাংক। স্কিমের আওতায় ঋণের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা কোম্পানি ও ব্যাংক পাবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। মূলত ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রাক্-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে টাকা নিয়ে ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। দেশের সব ব্যাংক এই তহবিল থেকে টাকা নিতে পারবে। কারা ঋণ পাবে নীতিমালায় বলা হয়েছে, তহবিলের প্রধান লক্ষ্য বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করা, যারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও শুধু চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন বা সেবা দিতে পারছে না। এই সহায়তার মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ যে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার চালু হতে সক্ষম, তারা এই সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ও প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও ঋণ পাবে। কোনো দক্ষ প্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ থাকা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে সচল করার উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করে বা ইজারা নেয়, তবে তারাও এই সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। ঋণগ্রহীতাকে অবশ্যই ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) অনুযায়ী খেলাপি হওয়া যাবে না এবং ইতিপূর্বে অর্থ পাচার বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের কোনো রেকর্ড থাকা চলবে না। ঋণের ব্যবহার একটি একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর, যা ব্যবহারের ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে ঋণ পাবে। গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। গ্রাহকদের জন্য ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা থাকবে, অর্থাৎ প্রথম ৬ মাস পর থেকে সুদের কিস্তি আদায় শুরু হবে। শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য পরিষেবা বিল পরিশোধ এবং উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যয় করা যাবে। শ্রমিকদের বেতন সরাসরি তাঁদের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার হিসাবে দিতে হবে। কোনোভাবেই নগদ লেনদেন করা যাবে না। এই ঋণ দিয়ে আগের কোনো ঋণের দায় সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না। আদায় ও তদারকি ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে টাকা কেটে নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ হবে। ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলো গ্রাহক থেকে সাপ্তাহিক বিক্রয় বা রাজস্ব রিপোর্ট সংগ্রহ করবে। ব্যাংকের প্রতিনিধিরা প্রতি তিন মাস অন্তর কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও যেকোনো সময় সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঋণের ব্যবহার যাচাই করতে পারবে। গ্রাহকের সব ব্যবসায়িক আয়-ব্যয় একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। শ্রমিকদের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক। নীতিমালার সফল বাস্তবায়নে বড় অবদান রাখা গ্রাহক ও ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হবে।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনের আহ্বান জানালেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছেন। কোনো কর্মকর্তা গ্রাহক সেবা না দিলে তার বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসাইন। ইসলামী ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী কর্মবিরতি পালন করছে না বলেও জানানো হয়। গ্রাহক সেবা দিতে সব কর্মকর্তা প্রস্তুত। কেউ সেবা না দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে সকালে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আন্দোলন করে সচেতন গ্রাহক ফোরাম। এসময় তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি ও স্লোগান দেয়া হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চারজন কমিশনার ও একজন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের নাম সবাই জানতে পারবেন।’ আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬–২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ কথা জানান। সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও বাংলাদেশ বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। এরপর আর্থিক খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয় সরকার। তবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আনেনি সরকার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ দেওয়া কমিশনের নেতৃত্বে চলছে সংস্থাটি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি করে আসছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীসহ বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এমনকি গত কয়েক মাসে একাধিক দফায় বিএসইসি নেতৃত্ব বদলেরও নানা গুজব ছড়ায় বাজারে। এমন পরিস্থিতিতে বিএসইসির নেতৃত্ব বদলের বিষয়ে আজ ইআরএফের সেমিনারে আনুষ্ঠানিক সময়সূচির ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। সেমিনারে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসিতে এবার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ও পেশাজীবীদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা পুঁজিবাজার বোঝেন। চারজন কমিশনার ও একজন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। তাঁদের হাত ধরে শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তন (টার্ন অ্যারাউন্ড) আসবে। এ সময় অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আইনকানুন পরিবর্তনের ফলে অনেক ভালো কোম্পানি এখন শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেক বড় কোম্পানি এখন আমাকে বলছে, “খসরু ভাই, আমরা এত দিন লিস্টেড হতে চাইনি। কারণ, আমরা কোনো ক্যাসিনোতে লিস্টেড হতে চাই না, স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হতে চাই।” ইনশা আল্লাহ এবার বাজারে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবেন।’ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিগত দিনে বারবার লুটপাট করে শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের বড় সংকট হলো, অনেকগুলো ব্যাংক আন্ডার-ক্যাপিটালাইজড (প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব) হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে টাকা লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের পাশাপাশি ডলারের অবমূল্যায়ন এবং বিভিন্ন লোকসানের কারণে দেশের অনেক বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এখন পুঁজিসংকটে ভুগছে।’