দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এক ধাপে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাতে জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। নতুন এই মূল্যহার আগামী মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) থেকে সারা দেশে কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর স্বর্ণের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, ডলার বিনিময় হার এবং স্থানীয় চাহিদার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৪৯৯ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হবে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৯০ টাকায়। আর সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের প্রতি ভরি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৮১ টাকা।
স্বর্ণ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে সরকার আরোপিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যুক্ত করতে হবে। তবে গহনার নকশা ও মানের ওপর ভিত্তি করে মজুরির পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৪০৮ টাকা বাড়িয়ে ৫ হাজার ৯৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭১৫ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হবে ৪ হাজার ৮৯৯ টাকায়। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির রুপার প্রতি ভরি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৪ টাকা।
স্বর্ণ ও রুপার এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের গহনা বাজারে নতুন করে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সময়ে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
থানায় রক্ষা পেলেও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহাদী হাসানকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মাহাদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, ডিসি অফিসের ভেতরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আহত মাহাদী হাসানকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগের দিন বুধবার রিকশায় করে মাহাদী হাসান যাওয়ার পথে তার ওপর হামলার চেষ্টা করা হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে থানায় গিয়ে রক্ষা পান। জানা যায়, গতকাল বুধবারের হামলা চেষ্টার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের জন্য মাহাদী হাসান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদন জমা দিয়ে ফেরার পথে কতিপয় লোকজন তাকে ডিসি অফিস প্রাঙ্গণে গতিরোধ করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন। হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করলে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়িভাবে কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে গুরুতর আহত করে। এ সময় মাহাদীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন এবং দ্রুত হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠান। ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হামলার কারণ এবং জড়িতদের পরিচয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হামলার ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংগঠনের নেতারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল হক জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব মাহাদী হাসানকে লাথি, কিল, ঘুষি মারার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে৷ ডিসি অফিসের সামনে মাহাদীকে কতিপয় লোকজন মারধর করেছে৷ তাকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন আছে৷ বিষয়টি যাচাই বাছাই করে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। হামলার সঙ্গে ছাত্রদলের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ওসি জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। মাহাদী হাসান এর আগেও একাধিক ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় এক যুবককে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে ওসির কক্ষে প্রবেশ করে বিতর্কিত বক্তব্য দেন তিনি। সে সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা জুলাই আন্দোলনকারীরা সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছি। বানিয়াচং থানা আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে আমরা আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম।’ ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরদিন তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে সমর্থকদের বিক্ষোভের মুখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় বানিয়াচং থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তা এসআই সন্তোষ চৌধুরী নিহত হন। পরবর্তীতে ওই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে দেওয়া মাহাদীর বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফর শেষে দেশে ফেরার সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলা এবং বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে ওই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সর্বশেষ ডিসি অফিসে হামলার অভিযোগ এবং পরে থানায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় মাহাদী হাসানকে ঘিরে আবারও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট কমাতে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পে বড় অঙ্কের বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের জন্য মোট ১১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১-এর জন্য ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট)-এর জন্য ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় দুই প্রকল্পের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করবে, যা রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, এমআরটি লাইন-১-এর বিভিন্ন প্রাথমিক অবকাঠামোগত কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। একইভাবে এমআরটি লাইন-৫-এর নকশা, জরিপ ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে এবং ডিপো উন্নয়নকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে প্রকল্প দুটির ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ডিএমটিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, দরপত্রে প্রাপ্ত প্রস্তাব বিশ্লেষণ করলে দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে, যা প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে। তবুও রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে এই দুই পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরে চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। চাল-ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, শিশুখাদ্য, স্বর্ণ, ওষুধের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ প্রায় ৬০টি পণ্যে কর ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে এবারের বাজেটে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও একাধিক কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি হবে বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট। বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবারের বাজেটে ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, মাছ, মাংস, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর যে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর রয়েছে, তা কমিয়ে ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে। পাশাপাশি বেশ কিছু পণ্যের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহার করা হতে পারে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও কর সুবিধাও তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের ধারণা, এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়বে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি শিশুখাদ্যের দামও কমতে পারে। শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। এছাড়া সব ধরনের মসলা ও খেজুর আমদানির ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি (নিয়ন্ত্রণমূলক) শুল্ক প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও আসছে বড় ধরনের কর সুবিধা। ক্যানসারসহ বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৬৮টি কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি কাঁচামালে কর রেয়াত সুবিধাও দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী হার্টের রিং বা স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা কমতে পারে। কিডনি রোগীদের জন্যও সুখবর রয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর থাকা শুল্ক, ভ্যাট ও আগাম কর প্রত্যাহারের ফলে প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ কয়েকশ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। প্রযুক্তি খাতে মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, মনিটর, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর কর কমানো বা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি এ খাতে বিদ্যমান আগাম করও প্রত্যাহার করা হতে পারে। গৃহস্থালি পণ্যের ক্ষেত্রেও মিলতে পারে স্বস্তি। দেশে উৎপাদিত ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনারের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়াশিং মেশিন, গিজার, ডিশওয়াশার, ব্লেন্ডার ও জুসারের মতো পণ্যের কর সুবিধার মেয়াদও বাড়তে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব আসছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক এবং চার্জিং স্টেশন আমদানির ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ির নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়করও কমানো হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। স্বর্ণপ্রেমীদের জন্যও সুখবর রয়েছে। স্বর্ণ ও স্বর্ণালঙ্কার সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এছাড়া জুয়েলারি সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তন করে প্রতি ভরিতে নির্দিষ্ট কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রসাধনী পণ্যের ক্ষেত্রেও শুল্কায়ন মূল্য কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। ফলে লিপস্টিক, লোশন, ফেসক্রিম ও ফেসওয়াশের মতো পণ্যের আমদানি ব্যয় কমে যেতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের ওপর অগ্রিম আয়করও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হচ্ছে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সব খাতে স্বস্তির বার্তা থাকছে না। রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে রড, সিগারেট ও মদের ওপর কর বৃদ্ধি এবং এর ফলে দাম বাড়ার প্রস্তাবও থাকতে পারে এবারের বাজেটে। সংশ্লিষ্টদের মতে, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহের কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবারের বাজেটে কর ছাড় ও প্রণোদনার এই প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা করছে সরকার।