রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে হতাশ ছিলেন। তিনি অপেক্ষা করছিলেন একটি বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় শক্তির জন্য। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা যখন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন, তখন ত্রিশের কোঠায় থাকা রুহুল আমিন মনে করেন অবশেষে তিনি এমন একটি দল পেয়েছেন, যাকে ভোট দিতে পারেন এবং নিজের দল বলতে পারেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এনসিপি। নেতারা ব্যাপক জনসমর্থন ও উজ্জ্বল নির্বাচনি সম্ভাবনার দাবি করেন, এমনকি ভবিষ্যতে সরকার গঠনের ইঙ্গিতও দেন। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত সামনে আসে। আন্দোলনের সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও দলটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে লড়ার মতো তৃণমূল সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে দেখা যায়, দলটির সমর্থন এক অঙ্কের নিচু পর্যায়ে ঘোরাফেরা করছে।
অবশেষে এনসিপি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে জোট বাঁধে জুনিয়র অংশীদার হিসেবে। তারা ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং জয় পায় ছয়টিতে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২ আসনে জয়ী হয়ে ভূমিধস বিজয় পায়। আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন। তবে নব প্রতিষ্ঠিত দলের এই বিজয় রুহুল আমিনের আশায় ভাটা ফেলেনি।
তিনি বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল কুষ্টিয়া থেকে আল জাজিরাকে বলেন, নতুন দল হিসেবে আমরা ভালো করেছি। এটা কেবল শুরু। আগামী কয়েকটি নির্বাচনি চক্রে এনসিপিই বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
আন্দোলন থেকে সংসদে
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে যেসব এনসিপি নেতা সামনে ছিলেন, তাদের কয়েকজন এখন সংসদ সদস্য। সমর্থকদের কাছে ছয়টি আসন একটি নবীন দলের জন্য অপ্রত্যাশিত সাফল্য। সমালোচকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে রূপান্তরের পথে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ, যিনি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন, তিনি ফলাফলকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মাত্র ১১ মাস বয়সি একটি দলের জন্য এটি খুব ভালো ফলাফল। অবশ্যই আরও ভালো হতে পারত। আমরা বেশি আশা করেছিলাম। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সন্তুষ্ট। তিনি অভিযোগ করেন, ভোট গণনায় অনিয়মের কারণে তারা আরও দুই-তিনটি আসন হারাতে পারে। যদিও প্রমাণ চাইলে তিনি বলেন, দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই আপত্তি জানিয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে আপস করতে হয়েছে। ‘প্রথমে আমরা এককভাবে লড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় প্রতিনিধিত্ব ও টিকে থাকার জন্য জোটে যেতে হয়েছে।’
এই জোটই এখন এনসিপির ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় টানাপোড়েন।
জোট রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
দেশের ধর্মভিত্তিক বৃহত্তম দল জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে শরিয়াভিত্তিক আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং নারীর অধিকার বিষয়ে রক্ষণশীল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমনকি প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে, তবু জোট ঘোষণার পর এনসিপির ভেতরে বিভাজন দেখা দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে দলটির এক ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, জামায়াতের সঙ্গে জোট এনসিপির আদর্শ ও ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ছায়া রাজনীতি করছি না। আমাদের আদর্শ জামায়াতের সঙ্গে এক নয়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি নির্বাচনি জোট, রাজনৈতিক একীভূতকরণ নয়।
বান্দরবান থেকে নির্বাচনে পরাজিত এনসিপি নেতা এসএম সুজা উদ্দিন বলেন, জোট ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘আমাদের জন্য বিকল্প ছিল সীমিত।’
অন্যদিকে, সাবেক নেতা অনিক রায়, যিনি জোট ঘোষণার আগেই পদত্যাগ করেন, তিনি মনে করেন, ‘এনসিপি এখন কাঠামোগতভাবে জামায়াতের সঙ্গে বাঁধা পড়ে গেছে।’ তার ভাষায়, ‘তারা যদি আবার স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে যায়, সেটাই তাদের দিক নির্দেশ করবে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন দলের আদর্শিক অবস্থান নিয়েও। ‘তারা যদি মধ্যপন্থি বলে দাবি করে, তবে সেটা মধ্য-ডান না মধ্য-বাম?’
তৃতীয় শক্তি কি গড়ে উঠতে পারবে?
এনসিপির রাজনৈতিক পুঁজি মূলত ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান থেকে এসেছে। সেই সময়ে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম এখন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি ঢাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বর্তমানে বিরোধী জোটের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, আন্দোলনের সময় আর দলীয় রাজনীতি এক নয়। দলীয় রাজনীতিতে সংঘাত অনিবার্য।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ও বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী মনে করেন, বাস্তবে এনসিপি স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তি হওয়ার আগ্রহ খুব কম দেখিয়েছে। নির্বাচনের পর তারা জামায়াতের ছায়াতেই স্বচ্ছন্দ ছিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, স্বতন্ত্র শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সীমিত। তবে সংসদে প্রবেশ ইতিবাচক সূচনা।
সামনে কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনসিপি এখন এক দ্ব্যর্থক অবস্থানে। তারা সংসদে আছে, একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত, কিন্তু একই সঙ্গে জোট রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় পথ খুঁজছে। ছয়টি আসন কি সত্যিই তৃতীয় শক্তির ভিত্তি হবে? সেটি নির্ভর করবে- দলটি জোট রাজনীতির বাইরে গিয়ে তৃণমূলে বিস্তার করতে পারে কি না, এবং আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে কি না তার ওপর।
রুহুল আমিন আশাবাদী। তার কাছে ছয়টি আসন শেষ নয়, বরং এটা তার কাছে প্রমাণ যে ছাত্রনেতৃত্বাধীন একটি পরীক্ষা বাংলাদেশের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তায় শুরু করেছি। এখন সংসদে। আমরা আর পেছনে ফিরব না।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানের নামে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়েছে। আসামিপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১০ আগস্ট শুনানির নতুন দিন ঠিক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানি নিয়ে রোববার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালে আজ রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা। এদিন মামলায় অভিযোগ গঠন না করার শুনানির জন্য আরও সময়ের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এ মামলায় মোট আসামি আটজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামি হলেন সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া। পলাতক আসামিরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় ও তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন। এর আগে, রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম শুনানিতে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণদের ধরে এনে জঙ্গি তকমা দিয়ে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে এনে হত্যা করা হতো। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এ সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। এসব অভিযোগ বিবেচনায় আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন জানান তিনি। গত ২১ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে প্রসিকিউশনের শুনানি শেষ হয়। তারও আগে, গত ২৯ জানুয়ারি এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ি নামক বাড়িতে ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ নামে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। সেই অভিযানে ৯ জন তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যাদের তৎকালীন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকে পরিকল্পিত ‘জঙ্গি নাটক’ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয়। ভুক্তভোগীদের পরিবারের দাবি ও বিভিন্ন তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ৪ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রোববার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এদিন ২৭ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসের উদ্দিন মোহাম্মদকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান। এরপর যুক্তিতর্কের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর। এর আগে, ২৬ জুলাই সাক্ষ্য দেন সাংবাদিক আশরাফ কায়সার। জবানবন্দিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ণনা দেন তিনি। যদিও এ মামলায় প্রথম দফায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর শেষ হয় ২৭ এপ্রিল। ওই সময় যুক্তিতর্কের জন্য দিনও ধার্য করা হয়। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের জবানবন্দি নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পুনরায় জবানবন্দি দেন তদন্ত কর্মকর্তা। ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আদালত। প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ অনুযায়ী আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহ্বান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য বলে উল্লেখ করে প্রসিকিউশন।
রাজধানীর মিরপুর-১২ নম্বরে মিছিল করার সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৭ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে মিরপুর-১২ এর মেট্রোরেলের পিলার নং-১৪০ এর পূর্ব পাশে মিছিল করার সময় তাদের গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা পুলিশ। গ্রেপ্তাররাদের মধ্যে মো. সুজন হোসেন (২৬), মো. নাসির (২৫), রবিউল ইসলাম (২০), মো. আরিফুল ইসলাম আকাশ (২১), মো. আলমগীর ইসলাম (২০), মো. বিল্লাল হোসেন (২২), মো. মনিরুজ্জামান শাওন (১৯), মো. তারেক (২০), মো. নাঈম (২০), সৈয়দ লিমন (১৯) ও মো. ইব্রাহিম (৩৫) রয়েছেন। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সকালে পল্লবী থানাধীন মিরপুর-১২ এলাকায় মেট্রোরেলের ১৪০ নম্বর পিলারের পূর্ব পাশে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের উদ্দেশ্যে মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে একটি ব্যানার, একটি ভাড়াকৃত মাইক্রোবাস এবং দুটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়। পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।