রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে হতাশ ছিলেন। তিনি অপেক্ষা করছিলেন একটি বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় শক্তির জন্য। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা যখন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন, তখন ত্রিশের কোঠায় থাকা রুহুল আমিন মনে করেন অবশেষে তিনি এমন একটি দল পেয়েছেন, যাকে ভোট দিতে পারেন এবং নিজের দল বলতে পারেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এনসিপি। নেতারা ব্যাপক জনসমর্থন ও উজ্জ্বল নির্বাচনি সম্ভাবনার দাবি করেন, এমনকি ভবিষ্যতে সরকার গঠনের ইঙ্গিতও দেন। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত সামনে আসে। আন্দোলনের সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও দলটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে লড়ার মতো তৃণমূল সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে দেখা যায়, দলটির সমর্থন এক অঙ্কের নিচু পর্যায়ে ঘোরাফেরা করছে।
অবশেষে এনসিপি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে জোট বাঁধে জুনিয়র অংশীদার হিসেবে। তারা ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং জয় পায় ছয়টিতে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২ আসনে জয়ী হয়ে ভূমিধস বিজয় পায়। আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন। তবে নব প্রতিষ্ঠিত দলের এই বিজয় রুহুল আমিনের আশায় ভাটা ফেলেনি।
তিনি বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল কুষ্টিয়া থেকে আল জাজিরাকে বলেন, নতুন দল হিসেবে আমরা ভালো করেছি। এটা কেবল শুরু। আগামী কয়েকটি নির্বাচনি চক্রে এনসিপিই বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
আন্দোলন থেকে সংসদে
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে যেসব এনসিপি নেতা সামনে ছিলেন, তাদের কয়েকজন এখন সংসদ সদস্য। সমর্থকদের কাছে ছয়টি আসন একটি নবীন দলের জন্য অপ্রত্যাশিত সাফল্য। সমালোচকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে রূপান্তরের পথে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ, যিনি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন, তিনি ফলাফলকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মাত্র ১১ মাস বয়সি একটি দলের জন্য এটি খুব ভালো ফলাফল। অবশ্যই আরও ভালো হতে পারত। আমরা বেশি আশা করেছিলাম। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সন্তুষ্ট। তিনি অভিযোগ করেন, ভোট গণনায় অনিয়মের কারণে তারা আরও দুই-তিনটি আসন হারাতে পারে। যদিও প্রমাণ চাইলে তিনি বলেন, দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই আপত্তি জানিয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে আপস করতে হয়েছে। ‘প্রথমে আমরা এককভাবে লড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় প্রতিনিধিত্ব ও টিকে থাকার জন্য জোটে যেতে হয়েছে।’
এই জোটই এখন এনসিপির ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় টানাপোড়েন।
জোট রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
দেশের ধর্মভিত্তিক বৃহত্তম দল জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে শরিয়াভিত্তিক আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং নারীর অধিকার বিষয়ে রক্ষণশীল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমনকি প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে, তবু জোট ঘোষণার পর এনসিপির ভেতরে বিভাজন দেখা দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে দলটির এক ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, জামায়াতের সঙ্গে জোট এনসিপির আদর্শ ও ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ছায়া রাজনীতি করছি না। আমাদের আদর্শ জামায়াতের সঙ্গে এক নয়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি নির্বাচনি জোট, রাজনৈতিক একীভূতকরণ নয়।
বান্দরবান থেকে নির্বাচনে পরাজিত এনসিপি নেতা এসএম সুজা উদ্দিন বলেন, জোট ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘আমাদের জন্য বিকল্প ছিল সীমিত।’
অন্যদিকে, সাবেক নেতা অনিক রায়, যিনি জোট ঘোষণার আগেই পদত্যাগ করেন, তিনি মনে করেন, ‘এনসিপি এখন কাঠামোগতভাবে জামায়াতের সঙ্গে বাঁধা পড়ে গেছে।’ তার ভাষায়, ‘তারা যদি আবার স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে যায়, সেটাই তাদের দিক নির্দেশ করবে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন দলের আদর্শিক অবস্থান নিয়েও। ‘তারা যদি মধ্যপন্থি বলে দাবি করে, তবে সেটা মধ্য-ডান না মধ্য-বাম?’
তৃতীয় শক্তি কি গড়ে উঠতে পারবে?
এনসিপির রাজনৈতিক পুঁজি মূলত ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান থেকে এসেছে। সেই সময়ে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম এখন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি ঢাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বর্তমানে বিরোধী জোটের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, আন্দোলনের সময় আর দলীয় রাজনীতি এক নয়। দলীয় রাজনীতিতে সংঘাত অনিবার্য।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ও বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী মনে করেন, বাস্তবে এনসিপি স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তি হওয়ার আগ্রহ খুব কম দেখিয়েছে। নির্বাচনের পর তারা জামায়াতের ছায়াতেই স্বচ্ছন্দ ছিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, স্বতন্ত্র শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সীমিত। তবে সংসদে প্রবেশ ইতিবাচক সূচনা।
সামনে কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনসিপি এখন এক দ্ব্যর্থক অবস্থানে। তারা সংসদে আছে, একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত, কিন্তু একই সঙ্গে জোট রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় পথ খুঁজছে। ছয়টি আসন কি সত্যিই তৃতীয় শক্তির ভিত্তি হবে? সেটি নির্ভর করবে- দলটি জোট রাজনীতির বাইরে গিয়ে তৃণমূলে বিস্তার করতে পারে কি না, এবং আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে কি না তার ওপর।
রুহুল আমিন আশাবাদী। তার কাছে ছয়টি আসন শেষ নয়, বরং এটা তার কাছে প্রমাণ যে ছাত্রনেতৃত্বাধীন একটি পরীক্ষা বাংলাদেশের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তায় শুরু করেছি। এখন সংসদে। আমরা আর পেছনে ফিরব না।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা সাঈদ উদ্দিন আহমদ হানজালা। একই সঙ্গে যারা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ নবী হিসেবে স্বীকার করে না, তাদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করে আইন প্রণয়নেরও দাবি জানান তিনি। বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তৃতার শুরুতে নিজের নির্বাচনী এলাকা শিবচরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হানজালা। তিনি বলেন, জনগণ “ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ” সংসদে তুলে ধরার জন্য তাকে নির্বাচিত করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আজিজুল হক ও বর্তমান আমির মামুনুল হকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। তিনি বলেন, বিরোধী দলের ভূমিকা শুধু বিরোধিতা করা নয়; ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুলের সমালোচনা—দুইই করা হবে। সংসদে আরবি ক্যালিগ্রাফি ও ধর্মীয় বাক্য প্রদর্শনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব বিষয় তাদের অনুভূতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। পরে ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের লাখ লাখ আলেম-ওলামার প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব তারা অনুভব করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ নবী উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দেশে এমন একটি গোষ্ঠী রয়েছে যারা এ বিশ্বাসের বাইরে অবস্থান করে। এই প্রসঙ্গে আইনি অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা নবীকে অস্বীকার করে, তাদের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত থাকা উচিত। নবী অবমাননার শাস্তি প্রসঙ্গে তিনি কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, কটূক্তিকারীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, “নবীকে কটূক্তি করলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।” বক্তৃতায় তিনি আরও একটি ঘটনার বিচার দাবি করেন এবং অভিযোগ করেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার এক তরুণকে হত্যা করা হয়েছে, যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন। এ ছাড়া নিজ এলাকার মাদক সমস্যা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হানজালা। তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন এবং জামিনে মুক্ত হয়ে আসা অপরাধীরা আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শেষে তিনি আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মাদকবিরোধী আইন আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
রাত ২টা পর্যন্ত রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ির জন্য তেল (জ্বালানি) পাইনি বলে অভিযোগ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামাল হোসেন। বুধবার (১৫ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। জাতীয় সংসদে রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘গত রাতে আমাকে ২টা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আমি তেল পাইনি। তেল শুধু মহান সংসদে, এত পরিমাণ তেল এখানে অপচয় হচ্ছে। বাইরের তেল অলরেডি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আরও বলেন, এখানে যত্রতত্র লিজ দেওয়া হচ্ছে, মেইন রাস্তা লিজ দেওয়া হচ্ছে। তার কারণে চাঁদা তোলা হচ্ছে—জানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মাদক, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস— এখানে উন্নয়নের অন্যতম বাধা। গত ফ্যাসিবাদের সময়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি। অনেক মানুষ এখানে খুনের শিকার হয়েছেন। এই সরকার ক্ষমতা আসার পরও আমাদের এই চাঁদার বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে নূরে আলম খাইরুলকে শহীদ হতে হয়েছে। আমি ধিক্কার জানাই। স্পিকারের উদ্দেশে কামাল হোসেন বলেন, আমি আপনার মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি— যেখানে ৭২ জন শিক্ষক দরকার সেখানে ১৪২ জন শিক্ষক কীভাবে থাকতে পারে? আমরা মনে করি উন্নয়ন কোনো দলীয় বিষয় নয়, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের অধিকার। আমার এলাকার জনগণের অধিকার। কামাল হোসেন আরও বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার কারণে আমাকে ৮৫৩ দিন জেলে থাকতে হয়েছে, ৯ বার জেলে যেতে হয়েছে। দ্বিতীয়বার যেন আর এ ধরনের ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি না হই। এই কারণে আমাদের গণভোট। আপনারা জানেন, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ৩০ মে ১৯৭৭ সালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ১৯৭৮ সালে সেই গণভোট আপনার সংবিধানের সামনে স্বীকৃত হয়েছে, বিএনপি গণভোট শুরু করেছে আর ২০২৬ সালে বিএনপি, আজ গণভোট অস্বীকার করছে। এই সংসদ সদস্য বলেন, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন গণভোট বৈধ। বৈধ যদি হয়, তাহলে অবশ্যই আপনারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। এই সংস্কার অধিবেশন ১৮০ দিন মেয়াদ। যদি এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বান না করেন, আপনি (স্পিকার) আইনের অন্যতম বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। এই মহান সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদে আহ্বান না করা হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার অস্ত্র বিক্রেতা মো. মাজেদুল হক হেলালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (১৫ এপ্রিল) তাকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাদির ভূঞা সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তবে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। আসামির কোনো বক্তব্য আছে কি না জানতে চাইলে হেলাল কোনো বক্তব্য দেননি। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে, মো. মাজেদুল হক হেলালকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি চট্টগ্রামের ‘হামিদুল হক আর্মস অ্যান্ড কোং’ নামের একটি অস্ত্রের দোকানের মালিক। মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, হাদি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি নরসিংদী থেকে উদ্ধার করা হয়। মাইক্রো অ্যানালাইসিস পরীক্ষার মাধ্যমে অস্ত্রটির সিরিয়াল নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তদন্তে উঠে আসে, ২০১৭ সালে আমদানি করা ওই পিস্তলটি রাজধানীর পুরানা পল্টনের ‘এম আইচ আর্মস কোং’ থেকে চকবাজারের ‘ইসলাম উদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড সন্স’-এর কাছে বিক্রি করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখান থেকে অস্ত্রটি চট্টগ্রামের ‘হামিদুল হক আর্মস অ্যান্ড কোং’-এর কাছে যায়। তদন্তে আরও জানা গেছে, ওই দোকানের মালিক হেলালের অস্ত্র লাইসেন্স (নম্বর ৪৫/৪৮) পূর্বে তার বাবা হামিদুল হকের নামে ছিল। ২০০০ সালে তিনি নিজের নামে লাইসেন্সটি হস্তান্তর করেন। তবে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের পর লাইসেন্সটি আর নবায়ন করা হয়নি। লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই তিনি অস্ত্রটি ক্রয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, হেলালের কাছ থেকে অস্ত্রটি কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের হাতে পৌঁছায়, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটনের জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাচ্ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে পল্টন মডেল থানাধীন বক্স কালভার্ট এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।