এম ইমরান
বিশ্লেষক ও গবেষক
বাঙালির আবেগ এক বিচিত্র সমীকরণ। একই মানুষকে আজ আমরা দেবতার আসনে বসিয়ে পূজা করি, আবার কালই তাকে টেনে হিঁচড়ে ধুলোয় নামাতে আমাদের হাত কাঁপে না। এই যে মুহূর্তের মধ্যে ‘নায়ক’ থেকে ‘খলনায়ক’ বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, এটি কি কেবল আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের বিশেষ কোনো মনস্তত্ত্ব? পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্য কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের এই ঘন ঘন ‘টেস্ট’ বা রুচি পরিবর্তন কেন এত প্রকট?
মনস্তাত্ত্বিক ভিন্নতা: পশ্চিম বনাম বাংলাদেশ:
বাংলাদেশি মানুষের মনস্তত্ত্বের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান পার্থক্যটি হলো ‘ব্যক্তিনির্ভরতা’ বনাম ‘প্রতিষ্ঠানিকতা’। পশ্চিমা বিশ্বে একজন মানুষের কাজের মূল্যায়ন হয় তার দক্ষতা বা লং-টার্ম কন্ট্রিবিউশনের ভিত্তিতে। সেখানে ‘হিরো ওরশিপ’ বা বীর পূজা থাকলেও, তা সাধারণত নির্দিষ্ট নৈতিক বা পেশাদার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
অন্যদিকে, বাঙালির আবেগ অত্যন্ত ‘এক্সট্রিম’ বা চরমপন্থী। আমরা কোনো মানুষকে পছন্দ করলে তার সব দোষ ভুলে যাই, আর অপছন্দ করলে তার সব গুণ অস্বীকার করি। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, একে বলা হয় 'Splitting' বা ‘সব-ভালো-অথবা-সব-মন্দ’ ধারণা। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে যেখানে গ্রে-শেড বা ধূসর এলাকা মেনে নেওয়ার মানসিকতা রয়েছে, বাঙালির কাছে পৃথিবীটা হয় সাদা, নয়তো কালো।
কেন আমাদের পছন্দ দ্রুত বদলে যায়?
বাংলাদেশি মানুষের পছন্দের মানুষ কেন দ্রুত অপছন্দনীয় হয়ে ওঠে, তার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:
অবাস্তব প্রত্যাশা: আমরা যখন কাউকে পছন্দ করি, তাকে অতিমানবীয় ভেবে বসি। আমরা আশা করি তিনি কখনও ভুল করবেন না। যখনই সেই রক্ত-মাংসের মানুষটি কোনো ভুল করেন, তখন আমাদের সেই অবাস্তব প্রত্যাশার বেলুন ফেটে যায় এবং আমরা তীব্র ক্ষোভে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করি।
আবেগীয় অস্থিতিশীলতা: আমাদের সংস্কৃতিতে যুক্তি ও বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগের স্থান অনেক ওপরে। আবেগ যেমন দ্রুত জোয়ারের মতো আসে, ভাটায় তেমনি দ্রুত নেমে যায়। পশ্চিমা বিশ্বে রুচি বা পছন্দ গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে, তাই তা সহজে ভাঙে না।
সামষ্টিক হুজুগ (Crowd Psychology): বাঙালি সমাজে ‘হুজুগ’ একটি বড় নিয়ামক। একা কেউ কাউকে অপছন্দ করার চেয়ে, দলবদ্ধভাবে কাউকে ঘৃণা করার মধ্যে আমরা এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ খুঁজে পাই। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
প্রতিবেশী দেশের সাথে তুলনা: ভারত ও পাকিস্তান:
ভৌগোলিক নৈকট্য থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় ভারত বা পাকিস্তানের সাথে আমাদের সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।
• ভারত: ভারতের জনমানসেও বীর পূজা আছে, তবে সেখানে ‘লয়াল্টি’ বা আনুগত্যের সময়কাল অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ ভারতের রাজনীতি বা বলিউডের অমিতাভ বচ্চন-শাহরুখ খানদের কথা ভাবা যেতে পারে। তারা কয়েক দশক ধরে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। এমনকি তাদের ব্যর্থতাকেও ভক্তরা পরম মমতায় গ্রহণ করে।
• পাকিস্তান: পাকিস্তানের মনস্তত্ত্ব অনেকাংশেই সামরিক বা ধর্মীয় আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে বীরত্বের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ।
কিন্তু বাংলাদেশে লয়্যাল্টি অত্যন্ত ভঙ্গুর। এখানে আজ যাকে নিয়ে মিছিল হয়, কাল তাকে নিয়ে ট্রল করা হয়। এই ‘ভঙ্গুর আনুগত্য’ আমাদের জাতিগত অস্থিরতারই প্রতিফলন।বাঙালির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে 'হিরো' বা 'ত্রাতা' খোঁজার এক সহজাত প্রবণতা আছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই জাতি তার ত্রাতাকে যত দ্রুত সিংহাসনে বসায়, ঠিক তত দ্রুতই তার পেছনে সন্দেহের তীর ছুড়তে শুরু করে।
জিয়াউর রহমানের উত্থান:
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যখন এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দিকভ্রান্ত অবস্থা বিরাজ করছিল, তখন জিয়াউর রহমান দৃশ্যপটে আসেন। ১৯৭১ সালের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন এক বিশাল জনপদকে আশান্বিত করেছিল, তেমনি ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে তাঁর 'নব্য জাতীয়তাবাদ' সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে একধরণের বীরত্বের ইমেজ তৈরি করে। মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের দুর্ভিক্ষ আর বিশৃঙ্খলার পর জিয়াউর রহমানের মধ্যে একধরণের 'অর্ডার' বা শৃঙ্খলা খুঁজে পেয়েছিল।
কেন জনমানস দ্রুত বিমুখ হয়?
জিয়াউর রহমান যখন গ্রাম-গঞ্জে ঘুরতেন, খাল খনন কর্মসূচি করতেন, তখন তাঁর জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা রূপটি আমরা দেখি। কিন্তু বাঙালি মনস্তত্ত্বের সেই চিরন্তন বৈশিষ্ট্য এখানেও কাজ করেছে:
• অবাস্তব প্রত্যাশার বোঝা: মানুষ মনে করেছিল জিয়াউর রহমান একাই ম্যাজিকের মতো সব দারিদ্র্য দূর করে দেবেন। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি, সামরিক ক্যু-এর ঘনঘটা এবং রাজনৈতিক জটিলতা যখন বাড়তে শুরু করল, তখন সেই একই মানুষরা তাঁর কঠোরতা নিয়ে সমালোচনা শুরু করে।
• ষড়যন্ত্রের প্রতি নির্লিপ্ততা: জিয়াউর রহমানের সময়কাল জুড়ে অন্তত ২১টি সামরিক ক্যু বা অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়েছিল। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে যখন তাঁকে হত্যা করা হয়, তখন তৎক্ষণাৎ রাজপথে সাধারণ মানুষের সেই প্রতিরোধের ঢেউ দেখা যায়নি, যা তাঁর জনপ্রিয়তার দাবির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। মানুষ যেন একধরণের 'অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ' (Wait and See) নীতিতে চলে গিয়েছিল।
মৃত্যুর পর ‘মহামানব’ হয়ে ওঠা: এক বৈপরীত্য:
সিরাজউদ্দৌলা বা জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রেও বাঙালির এক অদ্ভুত আচরণ লক্ষ্য করা যায়। জীবিত অবস্থায় যে নেতার শাসনের ভুলভ্রান্তি নিয়ে চায়ের দোকানে ঝড় উঠত, তাঁর জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল। মানিক মিয়া এভিনিউতে তাঁর জানাজা ছিল তৎকালীন ইতিহাসের বৃহত্তম জমায়েত।
বিশ্লেষণ: এটি প্রমাণ করে যে, বাঙালি জাতি কোনো নেতাকে জীবিত অবস্থায় মূল্যায়ন করার চেয়ে তার মৃত্যুর পর শোকের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করতে বেশি পছন্দ করে। এই ‘পোস্ট-মর্টেম লয়্যাল্টি’ বা মৃত্যু-পরবর্তী আনুগত্যই বাঙালির বড় মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমা ও প্রতিবেশী দেশের সাথে তুলনা :
• পশ্চিমের দীর্ঘস্থায়ী সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রেগান বা মার্গারেট থ্যাচার যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের অর্থনৈতিক পলিসি নিয়ে তুমুল সমালোচনা হলেও তাদের সমর্থক গোষ্ঠী কখনও তাদের ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা বা বর্জন করেনি।
• প্রতিবেশী দেশ: ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার পর তাঁর পতন ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু মানুষ দ্রুতই আবার তাঁকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল। অর্থাৎ সেখানে সমর্থনের একটি ‘বেস’ বা ভিত্তি স্থায়ী থাকে।
• বাংলাদেশি বাস্তবতা: বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর দল জনপ্রিয় থাকলেও, যে মানুষগুলো তাঁকে 'মসিহা' মনে করত, তাদের বড় একটি অংশই খুব দ্রুত নতুন সামরিক শাসক এরশাদের শাসনামলে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। এই যে দ্রুত ‘খাপ খাইয়ে নেওয়া’ এবং পুরনো নেতাকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, এটিই পশ্চিমা বিশ্বের রুচির চেয়ে আমাদের আলাদা করে।
পশ্চিমা সভ্যতার স্থিরতা বনাম আমাদের অস্থিরতা:
পশ্চিমা সভ্যতায় (যেমন- ব্রিটেন বা আমেরিকা) একজন নেতা বা সেলিব্রিটির প্রতি জনসমর্থন হুট করে পড়ে যায় না। রিচার্ড নিক্সন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদেরও একটি বিশাল ও স্থায়ী ‘বেস’ বা সমর্থক গোষ্ঠী থাকে যারা আমৃত্যু তাদের সমর্থন দিয়ে যায়। এর কারণ হলো, তারা ব্যক্তির চেয়ে ‘আইডিওলজি’ বা আদর্শকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আমাদের দেশে আইডিওলজি বা আদর্শের চেয়ে ‘ব্যক্তি’ বড়। আর ব্যক্তি যেহেতু পরিবর্তনশীল ও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়, তাই আমাদের পছন্দও বালির বাঁধের মতো ক্ষণস্থায়ী।
বাঙালির এই দ্রুত পরিবর্তনশীল মনস্তত্ত্ব এবং পছন্দের মানুষের প্রতি হঠাৎ বিমুখ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা কেবল কোনো আকস্মিক আবেগ নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারণ। কেন আমরা দ্রুত কাউকে মাথায় তুলি আবার দ্রুতই তাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করি, তার একটি সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ নিচে তুলে ধরা হলো:
‘দাতা’ ও ‘গ্রহীতা’র মনস্তত্ত্ব (Patron-Client Relationship):
বাংলাদেশি সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই একটি 'পেট্রন-ক্ল্যায়েন্ট' কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। গ্রামীণ সমাজ থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনীতি পর্যন্ত, সাধারণ মানুষ কোনো নেতাকে কেবল নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন ‘দাতা’ বা ‘ত্রাতা’ হিসেবে দেখে।
• অর্থনৈতিক কারণ: আমাদের দেশের মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি দীর্ঘকাল ধরেই ছিল ভঙ্গুর। ফলে মানুষ সবসময় এমন কাউকে খুঁজেছে যে তাকে অভাব থেকে মুক্তি দেবে।
• আস্থার সংকট: যখনই কোনো নেতা (যেমন বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমান) ক্ষমতায় আসেন, সাধারণ মানুষ আশা করে তাদের ব্যক্তিগত ভাগ্য রাতারাতি বদলে যাবে। কিন্তু সামষ্টিক উন্নয়নের ধীর গতির কারণে যখন ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ হয় না, তখন গ্রহীতা (জনগণ) দাতার (নেতা) ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা বিশ্বে মানুষ রাষ্ট্রকে একটি ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ মনে করে, কোনো জাদুকর নয়। ফলে সেখানে মোহভঙ্গ এত দ্রুত হয় না।
মধ্যবিত্তের অস্থিরতা ও সুবিধাবাদ
বাঙালির রুচি পরিবর্তনের প্রধান কারিগর হলো এদেশের ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণী। সমাজবিজ্ঞানী আহমদ ছফা বা বিনয় ঘোষের লেখায় বাঙালির এই দোদ্যুল্যমান চরিত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়।
• সুবিধাবাদ: মধ্যবিত্ত সবসময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়। যখনই ক্ষমতার হাওয়া বদলায়, তখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা পুরনো আদর্শকে ত্যাগ করে নতুন আদর্শের জয়গান গাইতে শুরু করে।
• সামাজিক কারণ: আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী নয়। ফলে মানুষ কোনো আদর্শের সাথে যুক্ত হওয়ার চেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তির সাথে যুক্ত হওয়াকে নিরাপদ মনে করে। যখন সেই ব্যক্তি দুর্বল হয়ে পড়েন, মানুষ তার পাশ থেকে সরে দাঁড়ায়।
শিক্ষার ধরন এবং সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব (Critical Thinking):
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত মুখস্থনির্ভর এবং আবেগকেন্দ্রিক। পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থায় শৈশব থেকেই কোনো বিষয়কে যুক্তি দিয়ে বিচার করার (Analytical approach) শিক্ষা দেওয়া হয়।
• তুলনামূলক বিশ্লেষণ: পশ্চিমা একজন মানুষ যখন কোনো নেতাকে পছন্দ করেন, তিনি তার নীতির ভালো-মন্দ দুটোই জানেন। ফলে নেতার কোনো একটি ব্যর্থতায় তিনি পুরো মানুষটিকে ঘৃণা করেন না।
• বাঙালি প্রেক্ষাপট: আমরা কাউকে ভালো বললে তাকে 'ফেরেশতা' বানিয়ে ফেলি, আর খারাপ বললে 'শয়তান'। এই চরমপন্থি মানসিকতা আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। ফলে আমাদের পছন্দগুলো হয় হুজুগে এবং ক্ষণস্থায়ী।
দীর্ঘস্থায়ী পরাধীনতা ও 'ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স':
হাজার বছরের পরাধীনতা বাঙালির মনে এক ধরণের অবদমিত ক্ষোভ তৈরি করে রেখেছে। ঐতিহাসিক নিহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থে দেখা যায়, এই জাতি বারবার বিদেশি শক্তির কাছে পরাস্ত হয়েছে।
• ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ: পরাধীন জাতি সাধারণত নিজেদের ভেতরকার বীরদের প্রতি খুব নিষ্ঠুর হয়। নিজেদের অপ্রাপ্তি বা হীনম্মন্যতার দায় তারা নেতার ওপর চাপিয়ে দিয়ে এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি খোঁজে। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Defense Mechanism), যেখানে নিজের ব্যর্থতার জন্য নেতাকে দায়ী করে তাকে সমাজচ্যুত করা হয়।
তথ্য প্রবাহ ও গুজবের প্রভাব (Societal Rumors):
বাংলাদেশের সমাজ 'ওরাল ট্র্যাডিশন' বা মুখে মুখে ছড়ানো কথার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল।
• ঐতিহাসিক উদাহরণ: নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে লর্ড ক্লাইভ বা মীর জাফররা যে অপপ্রচার চালিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষ তা যাচাই না করেই বিশ্বাস করেছিল। একইভাবে বঙ্গবন্ধু বা জিয়ার বিরুদ্ধেও নানা মুখরোচক গুজব খুব দ্রুত ডালপালা মেলেছিল।
• বর্তমান প্রেক্ষাপট: এখনকার সোশ্যাল মিডিয়া এই গুজবকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করার যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে, আমাদের দেশে তা অনুপস্থিত। ফলে নেতিবাচক প্রচারণা খুব সহজেই দীর্ঘদিনের ভালোবাসাকে ঘৃণায় রূপান্তর করতে পারে।
বর্তমান সময়ে বাঙালির এই দ্রুত পরিবর্তনশীল মনস্তত্ত্ব এবং পছন্দের মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার প্রবণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Social Media)। আগে যেখানে একটি গুজব ছড়াতে দিনের পর দিন সময় লাগত, এখন তা কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার মাত্র।
ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের এই যুগে বাঙালির ‘হুজুগে’ চরিত্র এক নতুন এবং ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
‘ক্যান্সেল কালচার’ এবং গণ-বিচার (Trial by Media):
বাঙালির সহজাত প্রবৃত্তিতে আগে থেকেই ‘দলাদলি’ বা ‘একঘরে’ করে দেওয়ার একটি মানসিকতা ছিল। সোশ্যাল মিডিয়া একে 'Cancel Culture'-এ রূপান্তর করেছে। আজ যাকে নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ‘লাভ’ রিয়্যাক্ট দিচ্ছে, কাল তার একটি কথা বা কাজ পছন্দ না হলেই সবাই মিলে ‘অ্যাংরি’ রিয়্যাক্ট দিয়ে তাকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেয়। এই যে গণহারে কাউকে বয়কট করার পৈশাচিক আনন্দ, এটি বাঙালির সেই অস্থির মনস্তত্ত্বেরই ডিজিটাল প্রকাশ।
অ্যালগরিদম এবং ‘ইকো চেম্বার’ (Echo Chamber):
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম মানুষকে কেবল তা-ই দেখায় যা সে দেখতে চায়। ফলে কোনো নেতার বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়, তবে মানুষ কেবল সেই নেতিবাচক খবরগুলোই বারবার দেখতে থাকে। এতে করে তার মনে ওই ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা বদ্ধমূল হয়। পশ্চিমা বিশ্বে তথ্যের সূত্র যাচাই করার (Fact-check) প্রবণতা বাড়লেও, আমাদের দেশে ‘শেয়ার’ করার প্রবণতা যাচাই করার চেয়ে অনেক বেশি।
‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশা ও রুচির বিকৃতি:
বাঙালি এখন খুব দ্রুত কাউকে হিরো বানায় কেবল সে ‘ভাইরাল’ হয়েছে বলে। হিরো আলম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের বিতর্কিত ব্যক্তিদের উত্থান এর প্রমাণ। কিন্তু যেহেতু এই পছন্দের ভিত্তি কোনো গুণ বা আদর্শ নয়, কেবল সাময়িক বিনোদন, তাই বিনোদনের খোরাক শেষ হওয়া মাত্রই ওই একই মানুষরা তাকে নিয়ে ট্রল বা উপহাস শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বে একজন শিল্পী বা নেতা বছরের পর বছর সাধনা করে তার অবস্থান তৈরি করেন, তাই তাদের ভিত শক্ত থাকে। কিন্তু আমাদের ‘ভাইরাল হিরো’দের ভিত বালির বাঁধের মতো।
ডিহিউম্যানাইজেশন বা অমানবিকীকরণ:
সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে আমরা যখন কাউকে দেখি, তখন তাকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। এর ফলে কোনো সম্মানিত ব্যক্তি বা জাতীয় নেতার সামান্য বিচ্যুতিতে তাকে চরমভাবে অপমান করতে আমাদের হাত কাঁপে না। এই যে পর্দার আড়ালে থেকে কাউকে আক্রমণ করার সাহস, এটি বাঙালির সেই ঐতিহাসিক ‘পিছন থেকে ছুরি মারা’ বা ‘ষড়যন্ত্রের’ মানসিকতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
গুজব ও চরিত্র হনন (Character Assassination):
ইতিহাসে আমরা দেখেছি সবার ক্ষেত্রেই গুজব একটি বড় অস্ত্র ছিল। বর্তমান সময়ে ‘ডিপ ফেক’ বা এডিটেড ভিডিওর মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কোনো ব্যক্তির চরিত্র হনন করা সম্ভব। বাঙালি জাতি যেহেতু হুজুগে এবং আবেগপ্রবণ, তাই তারা এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডাগুলোকে সত্য বলে ধরে নেয় এবং তাদের দীর্ঘদিনের পছন্দকে মুহূর্তেই ঘৃণায় বদলে ফেলে।
উপসংহার:
বাঙালির এই দ্রুত রুচি পরিবর্তনের পেছনে শিক্ষা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের পরাধীনতার গ্লানি কাজ করে। আমরা সবসময় একজন ‘ত্রাতা’ খুঁজি যে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। আর যখনই সেই মানুষটি আমাদের অলৌকিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন, আমরা তাকে ছুড়ে ফেলি।
পশ্চিমা বিশ্বের মতো স্থিতিশীল রুচি বা আনুগত্য তৈরি করতে হলে আমাদের আবেগের চেয়ে যুক্তিকে এবং ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখতে হবে। নয়তো ইতিহাসের এই চক্রাকার আবর্তে আমরা বারবার বীর তৈরি করব আর নিজ হাতেই তাদের ধ্বংস করব।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।