জাতীয়

সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল, গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে ওঠে - ইকবাল করিম ভূঁইয়া

আক্তারুজ্জামান ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২৬

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ ইকবাল করিম এই জবানবন্দি দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১–এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো.মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

 

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি অসমাপ্ত রয়েছে। আগামীকাল সোমবার তাঁর আবার জবানবন্দি দেওয়ার কথা। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দেওয়া প্রথম দিনের জবানবন্দির পূর্ণ বিবরণ এখানে দেওয়া হলো—

 

‘আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সেনাপ্রধান। আমি ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলাম। আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে র‍্যাব সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি।’

 

সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নিই যে ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে, তবে সেটা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে এবং আইন প্রয়োগ করে সেগুলোকে নিয়মিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে। যেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে নিয়ে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

 

সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হচ্ছে বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়–সময় মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া দুর্যোগকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। এমনকি নির্বাচনকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, অধিনায়কদের মনে একটি সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারবে না। এ জন্য প্রশিক্ষণকালে সেনাসদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে, যখন র‍্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনাসদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র‍্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। র‍্যাব গঠনের পূর্বে অপারেশন ক্লিনহার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। বস্তুত এই ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।

 

২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ছিলেন। তাঁরা বিএনপির জনাব তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে। এ সময় থেকে বস্তুত বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখার সেলের মধ্যে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে যা কিছুই তারা করুক না কেন শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। জরুরি অবস্থায় সেনাসদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং উপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা জন্ম হয়।

 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরে বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরিণ করা হয় এবং সেখানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে পিলখানায় (বিডিআর সদর দপ্তর) র‍্যাব ও সামরিক সদস্য দ্বারা নির্যাতনের কারণে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্য মৃত্যুবরণ করেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়। পরে দায়রা আদালত কর্তৃক ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ অনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের এক পাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।

 

পরে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের শাসন আমলের দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন। এ জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।

 

এ সময় তিনি তাঁর আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট হন। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে চারটি চক্রের উদ্ভব ঘটে। প্রথম চক্রটি হচ্ছে অপরাধ চক্র, যেটি ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব ও এনটিএমসিকে নিয়ে তিনি পরিচালনা করতেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট। এটি তিনি পরিচালনা করতেন এমএসপিএম (প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব), ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি তিন বাহিনী সম্পর্কে সব নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে সংযুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি, বাহিনী প্রধান ইত্যাদি। এই চক্রের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করতেন। চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। এটি ছিল অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস।

 

এবার র‍্যাবের কথা বলছি। সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্ব থেকেই অন্য সামরিক সদস্যদের মতোই র‍্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই আমি র‍্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তী সময় লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তী কিছুদিন আমি পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন বেনজীর আহম্মেদ র‍্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান তিনি কথা বলেছেন কিন্তু কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছ থেকে পাননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে জানান কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর মাথা ইট ও পাথরের টুকরা দিয়ে ঠাসা। পরে আমাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল জানায় জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। তাকে সামরিক কোয়ার্টারে থাকার নিয়মকানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়। পরে জিয়াউল আহসান, মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রচ্ছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে। দুজন অফিসারকে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শান্তি দেওয়ার জন্য র‍্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও সে তাদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। আমি জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি। এটি কার্যকরী করার জন্য লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দেই। পরে তিনি বিষয়টি মেজর জেনারেল তারেক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে না জানানোর জন্য তার বিরাগভাজন হন। অচিরেই আমি এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জিয়াউল আহসানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে নেওয়ার জন্য। আমি না বলেছি। আমাকে তখন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন জিজ্ঞাসা করেন কোনো চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা কি বিশেষ পদক্ষেপ? আমি বলি হ্যাঁ, এটি বিশেষ পদক্ষেপ এবং তুমি যদি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করো, তাহলে তোমারও একই অবস্থা হবে। দুদিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য আমি নিজে থেকেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই।

 

আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র‍্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র‍্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র‍্যাবে যেত তাদের আমি এই বলে মোটিভেট করতাম যে নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে। একজনকে হাত–পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত–পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র‍্যাব সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করলেন র‍্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

 

পরে আমি ইন্টারভিউতে আসা অফিসারদের এই বলে সাহস জোগালাম যদি কাউকে কোনো কিলিং মিশনের জন্য বলা হয়, সে যেন আমাকে সরাসরি ফোন করে। আমি তাদের সেনাবাহিনীতে সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিয়ে আসব এবং পুনর্বাসিত করব। আমার পাশাপাশি যারা র‍্যাবে নতুন যাচ্ছেন, তাঁদের মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আনোয়ার, ডিএমআই এবং আমার পিএস কর্নেল সাজ্জাদও (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মোটিভেট করতে থাকেন। কিছুদিন পর ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল আমাকে এসে জানান, আমাদের মোটিভেশনে কোনো কাজ হচ্ছে না। র‍্যাবে যোগদানের পরে অফিসারদের ডিমোটিভেট করা হচ্ছে। তবুও দুজন অফিসারকে যখন প্রথম রাত্রেই কিলিং মিশনে যেতে বলা হয়, তাঁরা ওখান থেকে চলে এসে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেন। আমি তাঁদের সসম্মানে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করি।

 

এর মধ্যে ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরাগভাজন হন। তাঁকে মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দীকি ডিএমআই পদ থেকে সরিয়ে দেন। সাধারণত ডিএমআই সেনাপ্রধানের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে থাকেন এবং তাঁকে সেনাপ্রধানই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলি করে দেওয়া হয়, যা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার ফজলকেও বদলি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমার প্রবল বিরোধিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়।

Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কৃষি ব্যাংকে ভুয়া সিবিএ নেতাদের কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি

অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।  

ছবি: সংগৃহীত
আমরা একটা রাজনৈতিক সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ চাই - প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তার জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।   শনিবার সকালে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা বিএনপির আয়োজনে দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।   প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করা গেলে উন্নয়ন আরও দ্রুত সম্ভব হবে।   তিনি আরও বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি ঘর দখল, জমি দখল বা চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।   প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্থানীয় পর্যায়ের সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, এলাকায় শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি এবং কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা নিজ দায়িত্বেই বিপদ ডেকে আনবে।   তিনি আরও মন্তব্য করেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় ইস্যুতে ঐক্য থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিসরে সবাইকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে এবং দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।   সভায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করেন এবং তার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

আক্তারুজ্জামান মে ৩১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ও নিরাপদ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে জাফলং: মন্ত্রী আরিফুল হক

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে চা-বাগান ভ্রমণে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই তরুণ নিহত

ছবি: সংগৃহীত

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ, আহত কয়েকজন

ছবি: সংগৃহীত
ভোলায় ধর্ষণের, আত্মরক্ষায় অভিযুক্তের গোপনাঙ্গ কেটে দিলেন ভুক্তভোগী

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে ইমাম সর্দার (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে ভুক্তভোগী নারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে অভিযুক্তকে গুরুতর আহত করেন।   শনিবার (৩০ মে) ভোরে উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার নজরুল নগর ইউনিয়নের চর কলমি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ।   গ্রেপ্তার হওয়া ইমাম সর্দার একই এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান।   পুলিশ ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে ভুক্তভোগী নারী নিজ বাড়িতে অবস্থানকালে অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার জন্য নারী তার হাতের কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করলে অভিযুক্ত আহত হয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।   পরে খবর পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে আটক করে এবং চিকিৎসার জন্য চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। বর্তমানে পুলিশি পাহারায় তার চিকিৎসা চলছে।   এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে দক্ষিণ আইচা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছেন।   স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি পূর্বপরিচিত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ওই নারীকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।   দক্ষিণ আইচা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসান কবির জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।   তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত ও অন্যান্য আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আক্তারুজ্জামান মে ৩১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতির সঙ্গে জড়ালে জেলে যেতে হবে - মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

ঈদের ছুটিতে পর্যটকের ভিড়ে প্রাণ ফিরে পেল রাঙামাটি

ছবি : সংগৃহীত

জিয়াউর রহমানের ২০ ঐতিহাসিক মাইলফলক তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

ছবি : সংগৃহীত
হাম প্রতিরোধে সচেতনতা ও টিকা সম্প্রসারণ জরুরি

ভোরের ম্লান আলোয় ঢাকার শিশু হাসপাতালের করিডোরে বসে ছিলেন এক মা। কোলে তার তিন বছরের শিশু ছেলে। ছেলেটির গা জ্বরে পুড়ছে, সারা শরীরে লালচে দাগ। মাঝে মাঝে খিঁচুনির মতো কেঁপে উঠছে ছোট্ট শরীরটা। মা বারবার ভেজা কাপড় কপালে চেপে ধরছেন, আর ফিসফিস করে বলছেন, ‘বাবা, একটু চোখ খোল, মা এখানে আছে’।   পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শিশুটির বাবা। দিনমজুর মানুষ। গত তিন দিন কাজে যেতে পারেননি। চিকিৎসার খরচ জোগাতে একমাত্র গাভিটাও বিক্রি করে দিয়েছেন। তবুও ডাক্তারদের মুখে আশার আলো কম। রাতভর হাসপাতালের বারান্দায় বসে তিনি শুধু একটি কথাই বারবার বলছিলেন—‘একটা টিকা যদি সময়মতো পাইতাম!’   হঠাৎ করিডোরজুড়ে কান্নার শব্দ। আরেকজন মা বুক চাপড়ে চিৎকার করছেন। তার শিশুটি আর নেই। কয়েক মিনিট আগেও যে ছোট্ট মুখটি নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, এখন সেটি নিথর।   হাসপাতালের দেয়াল যেন সেই আর্তনাদ শুনেও নীরব। চারপাশের মানুষ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর আবার নিজ নিজ ব্যস্ততায় ফিরে যায়। যেন এই মৃত্যু এখন খুব স্বাভাবিক ঘটনা।   এভাবেই প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিন কোনো না কোনো দরিদ্র মা তার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে বুকে নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকেন শেষ আশায়। কেউ সন্তান হারিয়ে নির্বাক হয়ে যান, কেউ বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ নিঃশব্দে হাসপাতালের বারান্দা ছেড়ে বাড়ি ফিরে যান একটি ছোট্ট কাফনের বোঝা নিয়ে।   কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই চোখের জলের কি কোনো মূল্য নেই? গরিব অসহায় মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ কি আমাদের বিবেককে আর স্পর্শ করে না? কেন আমরা এত নির্লিপ্ত? কেন প্রতিদিনের এই মৃত্যু আমাদের কাঁপিয়ে দেয় না? মনে হয় যেন আমরা ধীরে ধীরে আবেগহীন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি।   শিশু মৃত্যুর সংবাদ এখন আর আমাদের চমকে দেয় না। টেলিভিশনের স্ক্রল, পত্রিকার ছোট্ট কলাম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্টে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে শত শত পরিবারের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। অথচ প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি মায়ের বুকভাঙা কান্না, একটি বাবার অসহায়ত্ব, একটি স্বপ্নের নির্মম সমাপ্তি।   আজ বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি আমাদের মানবিকতা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতারও কঠিন পরীক্ষা। কয়েক মাস ধরেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিশুদের হাম আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট, টিকাদান ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, গ্রামাঞ্চলে আতঙ্ক এবং প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন আর সাধারণ সংক্রামক রোগের পর্যায়ে নেই। এটি কার্যত একটি জাতীয় স্বাস্থ্য দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে।   কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এখনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মহামারি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেনি। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন? হাম কোনো সাধারণ জ্বর নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি।   একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু আগেই সতর্ক করেছিল, টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশে আজ সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।   দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন তথ্য, হাসপাতাল সূত্র এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে, চলতি বছরে দেশে কয়েক হাজার শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।   বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। কারণ গ্রামের বহু পরিবার এখনো হাসপাতালে আসে না, অনেক মৃত্যু নথিভুক্তও হয় না।   সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে—এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, টিকা সংগ্রহে অবহেলা, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার ফলেই আজকের এই বিপর্যয়।   বাংলাদেশ একসময় টিকাদানে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল ছিল। হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশের অগ্রগতিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই সফলতা কোথায় হারিয়ে গেল?   এখানেই আসে বিগত ইউনুস সরকারের প্রসঙ্গ। স্বাস্থ্যখাতের বহু কর্মকর্তার অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ছিল, সময়মতো পর্যাপ্ত এমআর টিকা সংগ্রহ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকার সংকট শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ক্রয়াদেশ দেওয়া যেত। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তা করা হয়নি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে। টিকা মজুদের পরিমাণ কমতে কমতে যখন বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছায়, তখনও দৃশ্যমান কোনো জরুরি উদ্যোগ দেখা যায়নি।   এই অবহেলা কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা? নাকি এর পেছনে ছিল আরও গভীর কোনো রাজনৈতিক হিসাব?   অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি নিছক অদক্ষতা নয়। বরং একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশলের অংশও হতে পারে। কারণ, একটি নির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে জনগণের আস্থা। আর স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয় তৈরি করা গেলে খুব সহজেই সেই আস্থাকে নষ্ট করা যায়। যখন শিশুমৃত্যু বাড়ে, স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ে, মানুষ আতঙ্কিত হয়—তখন জনগণের ক্ষোভ সরাসরি সরকারের দিকে যায়। ফলে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার একটি নীলনকশা হিসেবেও টিকা সংকটকে দেখা অমূলক নয়।   বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেখা গেছে, নির্বাচিত সরকারকে জনরোষের মুখে ঠেলে দিতে বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। কখনো জ্বালানি, কখনো খাদ্য, কখনো আইনশৃঙ্খলা, আবার কখনো স্বাস্থ্যখাতকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। হাম পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।   কারণ বাস্তবতা হলো—একটি রাষ্ট্রে হঠাৎ করে লাখ লাখ শিশুর টিকা কাভারেজ কমে যাওয়া কেবল ‘দুর্ঘটনা’ হতে পারে না। এর পেছনে পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা ছিল, আর সেই ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিকভাবেও এড়ানোর সুযোগ নেই।   বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে অনেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হওয়ায় অনেক শিশু চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে এক থেকে তিনজন মারা যেতে পারে। অপুষ্টি থাকলে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেখানে এখনো বহু শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, সেখানে হাম মহামারি জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত বাস্তব।   এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল অবিলম্বে জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করা। কিন্তু এখনো সেই দৃঢ়তা দৃশ্যমান নয়। অথচ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হতো।   প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে টিকা আমদানি সহজ হতো। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে সারাদেশে বিশেষ টিকাদান অভিযান চালানো যেত। তৃতীয়ত, গণসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হতো। চতুর্থত, সীমান্ত ও বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেত। পঞ্চমত, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত।   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—জরুরি অবস্থা ঘোষণা জনগণকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিত যে সরকার পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করছে। এখনো সময় আছে। সরকার চাইলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।   বাংলাদেশের টিকাদান অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। মাঠপর্যায়ে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সক্ষমতাও আছে। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কঠোর সমন্বয়।   এই মুহূর্তে কিছু জরুরি পদক্ষেপ অপরিহার্য— প্রথমত, সারাদেশে বিশেষ ‘হাম জরুরি টিকাদান সপ্তাহ’ ঘোষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, মাদ্রাসা ও গ্রামভিত্তিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, টিকা ঘাটতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তদন্ত করতে হবে। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও টিকাবিরোধী প্রচারণা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। পঞ্চমত, আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠত, সীমান্তবর্তী এলাকায় স্বাস্থ্য নজরদারি বাড়াতে হবে। সপ্তমত, জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সব মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজে নামাতে হবে।   একটি রাষ্ট্রের শক্তি বোঝা যায় সংকট মোকাবিলার সক্ষমতায়। আজ বাংলাদেশ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। যদি এখনো অবহেলা করা হয়, তাহলে এই হাম সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।   ইতিহাস সাক্ষী, মহামারি কখনো শুধু স্বাস্থ্য সংকট থাকে না; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক স্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও ধ্বংস করে দেয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, করোনা—সবকিছু পেরিয়ে এই জাতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকেও যদি শিক্ষা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।   হাম পরিস্থিতি এখন আর শুধু চিকিৎসকদের উদ্বেগ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। শিশুর জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, প্রশাসনিক অবহেলা কিংবা ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের কাছে শিশুদের জীবন জিম্মি হতে পারে না।   সুতরাং সময় এসেছে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অবিলম্বে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে হাম মোকাবিলায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করতে হবে। কারণ আজকের বিলম্ব আগামীকালের হাজারো শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কখনো সেই অপরাধের বোঝা বহন করতে পারে না।

মো: দেলোয়ার হোসাইন মে ৩০, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত

কালশী বস্তির অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আনসার-ভিডিপি

ছবি : সংগৃহীত

ঈদের ছুটিতে বিএমইউ'র বহির্বিভাগে ৭ শতাধিক রোগীকে সেবা প্রদান

ছবি : সংগৃহীত

জাতির ক্রান্তিকালে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন জিয়াউর রহমান : রিজভী

0 Comments