সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূল ঋণের বাইরে প্রাথমিক কাজের জন্য ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এই ঋণ পরিশোধ শুরু করার কথা। কিন্তু রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এর বাইরে রাশিয়া থেকে অন্য কিছু কেনাকাটার দায়ও মেটানো যাচ্ছে না। মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালে। ওই ঋণ পরিশোধের কিস্তি হবে বড় অঙ্কের। এ কারণে সমস্যাটির সমাধান আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে তারা আশা করছেন, ঋণ পরিশোধ শুরু করা না গেলেও রূপপুর প্রকল্পে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার কোনো ব্যাংক পেমেন্ট নিতে পারছে না। তাদের দায় পরিশোধের জন্য বিভিন্ন বিকল্প উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানে আসা যায়নি। ফলে সোনালী ব্যাংকে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে রাশিয়ার পাওনা রাখা হচ্ছে।
সময়মতো অর্থ না পেলে জরিমানা আরোপের কথা বলেছিল রাশিয়া– এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ না করতে পারার সমস্যাটি বাংলাদেশের দিক থেকে নয়। তারাই অর্থ নিতে পারছে না। ফলে জরিমানা দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। রাশিয়াকে এমন অবস্থান জানানো হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। প্রকল্প শুরুর সময় প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে মোট ব্যয় ধরা হয় এক লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১ হাজার কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার হলো রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণ। তবে পরে ডলারের দর সমন্বয়সহ অন্যান্য খরচ বেড়ে প্রকল্পের আকার দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, রাশিয়ার বিভিন্ন দায় পরিশোধের জন্য সোনালী ব্যাংকে তিনটি ‘এসক্রো’ হিসাব খোলা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি ডলার জমা হয়েছে। এর মধ্যে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের জন্য জমা হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। রাশিয়া থেকে অন্যান্য কেনাকাটার দায় পরিশোধ বাবদ অন্য দুটি হিসাবে জমা করা হয়েছে বাকি অর্থ।
জমা থেকে প্রকল্পের স্থানীয় ঠিকাদার বিল, সরবরাহকারী দায় পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে একটি অংশ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে পরিশোধযোগ্য দায় রয়েছে ১০২ কোটি ডলারের সামান্য বেশি।
ব্যাংকাররা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকলে অন্য দেশগুলো তার সঙ্গে লেনদেন করে না। এমনকি চীনের কোনো ব্যাংকও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কায় পরিশোধ নিষ্পত্তি করে না। এর প্রধান কারণ, অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিরাপদ অর্থ লেনদেনের বার্তা পাঠানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট)। এটি বিশ্বের সর্বাধিক দেশ ও ব্যাংকের ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর কয়েক ট্রিলিয়ন অর্থ লেনদেন হয়। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর সুইফট থেকে রাশিয়াকে বাদ দেয় পশ্চিমা দেশগুলো। এ কারণেও রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সোনালী ব্যাংকের এসক্রো হিসাবে থাকা অর্থ নির্ধারিত সুদে বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়া তাতে রাজি হয়নি। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধ হলে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি হলে দেশটির পরিশোধ নিষ্পত্তি করা যাবে। এর বাইরে কোনো বিকল্প বাংলাদেশের কাছে নেই।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। এই প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নেওয়া ঋণের অর্থ পরিশোধ নিয়েই জটিলতা কাটেনি। মূল ঋণ পরিশোধের সময় যত এগিয়ে আসছে, উদ্বেগ তত বাড়ছে।
রূপপুর প্রকল্পের মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের মার্চ থেকে। অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ পরিশোধ শুরুর সময় দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের মার্চে নির্ধারণের জন্য রাশিয়ার কাছে আবেদন করে। রাশিয়া ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কিস্তি পরিশোধ শুরুর সময় নির্ধারণ করেছে। আবার প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের সব প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই তাদের দায় পরিশোধ করা হবে। যখনই সুযোগ হবে, তারা অর্থ নিতে পারবে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ২০২২ সালে রাশিয়া চিঠি দিয়ে বাংলাদেশকে তাদের সব ধরনের পরিশোধ স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছিল। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরের বছর পাওনা নিতে রাশিয়া আগ্রহ দেখায়।
সরাসরি অর্থ নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৪ সালের এপ্রিলে রূপপুরসহ বিভিন্ন পাওনা পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে পরিশোধের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে একটি প্রটোকল চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। তবে সুইফট চ্যানেলে অর্থ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত আর তা কার্যকর করা যায়নি।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হিসাব খোলার বিষয়ে গত বছরের ৫ থেকে ১০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সে দেশে যায়। সেখানে অ্যাকাউন্ট খোলার পাশাপাশি সুইফটের বিকল্প হিসেবে চীনের আন্তর্জাতিক লেনদেনের বার্তা প্রেরণের মাধ্যম দ্য ক্রসবর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমে (সিআইপিএস) যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোতে। আবার মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ থেকে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পাওনা নেওয়ার জন্য রাশিয়ার ‘এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট’-এর নামে এলসি স্থাপনকারী সোনালী ব্যাংকে কয়েকটি ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে অর্থ স্থানান্তরের প্রস্তাব দেয় রাশিয়া। প্রথমে সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে একই ব্যাংকের এফসি হিসাবে স্থানান্তর করে রাশিয়ায় নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তবে সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সব ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টই যুক্তরাষ্ট্র কিংবা দেশটির মিত্র দেশের সঙ্গে। যে কারণে এই উপায়ে পরিশোধ সম্ভব হয়নি।
রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ পুরোনো, বিশেষ করে দেশটি থেকে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনা হতো। অনেক আগে থেকেই রাশিয়ার কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও তখন দায় পরিশোধের রাস্তা খোলা ছিল। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রয়েছে– এমন সব ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বন্ধ কলকারখানা চালু এবং স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে ১৭টি ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থ দিতে সম্মত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো- সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। সে সময় এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই প্যাকেজটি মূলত একটি ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার’ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। প্রণোদনা প্যাকেজের ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে। প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য। এ তহবিল থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের (একীভূত পাঁচ ব্যাংক) গ্রাহকদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী নিজ নিজ হিসাব থেকে টাকা তুলতে পারবেন। একই সঙ্গে আমানতের মুনাফায় কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন করা হবে না— বিষয়টি গ্রাহকদের স্পষ্টভাবে অবহিত করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার সাক্ষাৎ করতে গেলে এ নির্দেশনা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সেগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। গভর্নর বলেন, জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমানতকারীদের মুনাফার ওপর কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে আমানতকারীদের মধ্যে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সব আমানতকারীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে তাদের মুনাফার ওপর কোনো ধরনের হেয়ারকাট থাকবে না। তিনি আরও জানান, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী ইতোমধ্যে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ‘আল-ওয়াদিয়াহ’ চলতি হিসাব, ‘মুদারাবা’ সঞ্চয়ী হিসাব এবং ‘মুদারাবা’ মেয়াদি আমানতের মূল অর্থ উত্তোলন করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গভর্নর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, ড. মো. কবির আহমেদ, মো. সরোয়ার হোসেন ও মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
চলতি আগস্টের প্রথম ২২ দিনে দেশে ২১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ২৬ হাজার ৪২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। রোববার (২৩ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি আগস্টের ২২ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের ১-২২ আগস্ট দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭১ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর চলতি বছরে একই সময়ে এসেছে ২১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এবার রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা প্রায় ২৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। এদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ৫০০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪১৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থবছরের শুরু থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৮১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্যাংকারদের মতে, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়ায় দেশে প্রবাসী আয় বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।