বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার আড়াই মাসের মাথায় প্রথমবারের মতো চীন সফরে গেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে দু'দেশের মধ্যে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে তিস্তা ইস্যুটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত ইস্যু। সমস্যাটি সমাধানে ২০১১ সালে দেশ দু'টির মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা হলেও গত দেড় দশকে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি আটকে রাখায় নদীর বাংলাদেশ অংশে প্রায় প্রতিবছরই খরা দেখা যাচ্ছে, সেইসঙ্গে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও নদী ভাঙনের মতো সমস্যা।
এ নিয়ে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ তিস্তা তীরবর্তী জেলাগুলোয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা গেছে।
এমন অবস্থায় বেশ কয়েক বছর আগে চীনের সহায়তায় একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয় ঢাকা। এ বিষয়ে প্রাথমিক একটি সমীক্ষাও করে বেইজিং। কিন্তু ভারতের আপত্তির মুখে প্রকল্পটি মূলপর্বের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এখন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে চায় তারেক রহমানের সরকার।
"এটা আমাদের ওই অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়...এটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার সেই অঞ্চলের সমস্যা সুরাহা করার এবং এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার আমরা পূরণ করবো এবং চীন সফরে এই বিষয়টা আমরা নিশ্চয়ই আলোচনা করবো," মঙ্গলবার চীনে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
কী আছে মহাপরিকল্পনায়?
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি ভারতের সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি'র মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতীয় অংশে এই নদীর ওপর একাধিক ব্যারেজ বা বাঁধ তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে ওইসব বাঁধে পানি ধরে রাখার ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা শুকিয়ে যায়। ফলে নদী তীরবর্তী ফসলের মাঠে চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে একসঙ্গে সবগুলো ব্যারেজ খুলে দেওয়ার ফলে হঠাৎ বন্যা ও নদী ভাঙন দেখা দেয়।
"শুকনো মৌসুমে যখন আমাদের পানি দরকার, তখন ভারত পানি ছাড়ে না। আবার বর্ষাকালে একসঙ্গে এতবেশি পানি ছাড়ে যে, মানুষের ভিটে-বাড়ি, ফসলের মাঠ সব হয় পানিতে তলিয়ে যায়, না হয় নদী ভাঙনের শিকার হয়," বলছিলেন 'তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার।
দীর্ঘমেয়াদি এ পরিকল্পনার পুরো নাম 'কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট'। সমীক্ষার মাধ্যমে ২০১৬ সালে এর প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। সমীক্ষা শেষে ২০২৩ সালে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
মহাপরিকল্পনাটির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ অংশের উজানে একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ। সেইসঙ্গে, ১০২ কিলোমিটার নদীখনন করে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধি, নদীর দু'পাশে ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙন রোধ, ১৭১ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীর দুই তীরে স্যাটেলাইট শহর, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ১৫০ মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুতের প্ল্যান্ট তৈরিসহ পুরো এলাকাকে একটি পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই আসবে ঋণের অর্থ থেকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই নিজেদের অর্থে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ দেখিয়ে আসছে চীন।
এ প্রকল্প যাচাই করতে বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়না যৌথভাবে প্রায় তিন বছর ধরে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে।
থমকে গেল কেন?
সমীক্ষা শেষে চীন যখন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, তখন তিস্তা প্রকল্পে ভারতও আগ্রহ দেখায়। ২০২৪ সালের মে মাসে বিষয়টি আলোচনা করতে ঢাকা আসেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা।
এরপর জুনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে দিল্লি। প্রকল্পের সমীক্ষা করতে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুতই ঢাকায় সফর করবেন বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তখন জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এরপর ঢাকায় ফিরে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বলেন, "তিস্তার পানির দাবিটা অনেক দিনের। তো ভারত যদি আমাদের তিস্তার প্রজেক্টটা করে দেয়, তাহলে আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। সেটাই আমার জন্য বেশি সহজ হলো না?"
শেখ হাসিনার এমন বক্তব্য এবং দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিবেচনা করে তখন বিশ্লেষকদের অনেকে ধারণা করছিলেন যে, তিস্তা প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত হয়তো ভারতই বাস্তবায়ন করবে।
কিন্তু মাসখানেকের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে চীনের সামনে আবারও সুযোগ তৈরি হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে যান। তখন সরকারের তরফে বলা হয়, তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি চীনের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হবে।
এদিকে, তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তরবঙ্গে একাধিক কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
গত নির্বাচনের আগে দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় গেলে তারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। সেটিরই অংশ হিসেবে এখন চীনের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু তাতে কতটা ভরসা পাচ্ছেন বন্যা, খরা ও নদী ভাঙনের ভুক্তভোগি তিস্তাপারের বাসিন্দারা?
"এ ধরনের আলোচনা আমরা আগেও বিভিন্ন সময় দেখেছি। কিন্তু যতক্ষণ না প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হচ্ছে বা এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আশ্বস্ত হতে পারছি না," বলেন 'তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদে'র সভাপতি হক্কানী।
চীন-ভারতের আগ্রহের কারণ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা নিয়ে চীন ও ভারতের আগ্রহ মূল কারণ কৌশলগত। এর মধ্যে চীনের আগ্রহী হয়ে ওঠার বড় একটি কারণ 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' বা বিআরআই প্রজেক্ট বলে মনে করেন কেউ কেউ।
বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশকে একই সুতোয় গাঁথতে চাইছে। চীনের বিআরআই প্রকল্পের আওতাধীন বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর।
প্রস্তাবিত এই করিডোরের মাধ্যমে চীন তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত করতে চায়।
এজন্য তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পকে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
"অন্য কোনোভাবে এই করিডোরগুলো বা এই ধরনের কানেক্টিভিটি প্ল্যানগুলো চরিতার্থ করা যায় কি না সেটা অবশ্যই চীনের উদ্দেশ্য তো থাকবেই," ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ভারতের গবেষণা সংস্থা 'অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক অনুসূয়া বসু রায় চৌধুরী।
সেই কারণে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহকে ভারত বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। ভারত মনে করে, চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে চায়।
সেজন্য তিস্তা প্রকল্পে চীনকে হটিয়ে ভারত নিজেই যুক্ত হতে চায় বলে মনে করেন মিজ চৌধুরী।
যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে চীনের সেভাবে কোনো ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নেই।
"তিস্তা নদীতে এটি বাংলাদেশের প্রকল্প, এটি চীনের কোনো প্রকল্প নয়। চীন শুধু এখানে অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে। কারণ অন্যরা সে অর্থ দিতে পারছে না," বলেন ড. আহমেদ।
ভারতকে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটি শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
"ভারতই তো তিস্তার সমস্যার জন্য দায়ী। তারাই তো পানি আটকে রাখে, আবার যখন দরকার থাকে না তখন ছেড়ে দেয়। তারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে আদৌ আন্তরিক কি-না, সেটাও ভেবে দেখার দরকার আছে," বলছিলেন হক্কানী।
'বসে থাকা চলবে না'
তিস্তায় যে মহাপরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, সেটির সুফল পাওয়ার জন্য তিস্তার পানির হিস্যা নিশ্চিত করাটা জরুরি বলে মনে করে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ।
"মহাপরিকল্পনাটা মূলত একটা ইন্টারনাল নদী ব্যবস্থাপনা। সেটার সঙ্গে পানির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী হিসেবে তিস্তার পানি যতটুকু আমাদের পাওয়ার কথা ভারতের কাছ থেকে, সেই হিস্যাটাও নিশ্চিত করতে হবে," বলেন পরিষদের সভাপিত হক্কানী।
তিস্তার পানি ভাগাভাগির জন্য ২০১১ সালে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়ে একমত হয়েছিল বাংলাদেশ। বিষয়টি পরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে সেটি শেষ পর্যন্ত করা যায়নি না বলে জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার।
সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে মিজ ব্যানার্জি পরাজিত হয়েছেন। এর বিপরীতে বড় জয় পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে বিজেপি।
"কাজেই এখন পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিকভাবে জোরালো প্রচেষ্টা চালানো উচিত," বলেন হক্কানী।
কিন্তু বিজেপি জয় পেলেও চুক্তির বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে চুক্তির জন্য তিস্তার কাজ ফেলে রাখতে চায় না বাংলাদেশ সরকার।
"তাদের মাইন্ড রিড করার কাজ আমার না। তবে প্রত্যাশা থাকবে, যাতে করে এই চুক্তিটা যেটা হয়েছিল তখন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা কনসিডার করতে পারি কি-না। কিন্তু সে জন্য তো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে," সাংবাদিকদের বলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রহমান।-বিবিসি বাংলা
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মোহাং শওকত রশীদ চৌধুরীকে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এই নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। অপরদিকে, একইদিন পৃথক আরেক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব (চুক্তিভিত্তিক) রাফকুল আই মোহাম্মদকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব (চুক্তিভিত্তিক) নিযুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারি করা এসব আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে শপথ পড়ান। এর আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এখন পূর্ণমন্ত্রী হওয়ায় তার মন্ত্রণালয় অপরিবর্তিত থাকবে, নাকি পরিবর্তন করা হবে-এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির পর জানা যাবে।
বান্দরবানের বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সন্তান সাচিং প্রু জেরী। রাজনীতিতে এসে ১৯৯৬ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বান্দরবান সদর উপজেলা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হলেন এই রাজনীতিক। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে মন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ান। রাষ্ট্রপতির শপথের পরপরই নতুন মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। সাচিং প্রু জেরী অং শৈ প্রু চৌধুরীর ছেলে। তার বাবা ছিলেন বান্দরবানের বোমাং সার্কেলের ১৫তম রাজা এবং রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাচিং প্রু জেরীর মামি মা ম্যা চিংও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাচিং প্রু জেরী বোমাং সার্কেলের রাজপুত্র। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য বান্দরবান আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বান্দরবান আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বান্দরবান সদর উপজেলা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। হলফনামায় সম্পদের চিত্র ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হলফনামা ও আয়কর সনদ অনুযায়ী, সাচিং প্রু জেরীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি এবং পেশা ব্যবসা। ২০২৫-২৬ করবর্ষে তার নিজস্ব বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যার মূল উৎস ব্যবসা। তার ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। তার মোট প্রদর্শিত নিট সম্পদের পরিমাণ ৩৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। আয়কর হিসেবে তিনি ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। হলফনামায় সাচিং প্রু জেরী জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে বা অতীতে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। তার বা তার পরিবারের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ বা খেলাপি ঋণও নেই। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নিজের নামে ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকা নগদ অর্থ দেখিয়েছেন সাচিং প্রু। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ১৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং নির্ভরশীলদের নামে ১৩ লাখ ৩ হাজার টাকা নগদ অর্থ। স্ত্রীর নামে একটি প্রাডো, একটি ট্রাক ও একটি ভলভো গাড়ি রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ১৫ লাখ টাকা। নির্ভরশীলদের নামে রয়েছে ৩ লাখ টাকা মূল্যের দুটি মোটরসাইকেল। এছাড়া সাচিং প্রু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে স্বর্ণালঙ্কার ও আসবাবপত্র রয়েছে। স্থাবর সম্পদের হিসাবে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার রামপুরা মৌজায় তার ১০ একর কৃষিজমি রয়েছে। এর অর্জনকালীন মূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া বান্দরবান সদর, আলেক্ষ্যং ও সুয়ালক মৌজায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে অকৃষি জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। নিজের নামে এসব স্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর নামে ১৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য নিজের ব্যবসা থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন সাচিং প্রু জেরী। এর পাশাপাশি স্ত্রী মমচিংয়ের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার ছেলে উ উইন প্রু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান হিসেবে তাকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। চার নতুন পূর্ণমন্ত্রী সাচিং প্রু জেরীর সঙ্গে শুক্রবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আরও তিনজন। তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, জামালপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। রশিদুজ্জামান মিল্লাট এতদিন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। পদোন্নতি পেয়ে তিনি পূর্ণমন্ত্রী হলেন। তিনি বিএনপির কোষাধ্যক্ষও। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে শপথ পড়ান। রাষ্ট্রপতির শপথের পরপরই নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। শপথ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পার্বত্য বান্দরবানে পারিবারিক পরিচিতি এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে অভিজ্ঞতার পর এবার পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে সরকারের দায়িত্বে যুক্ত হলেন সাচিং প্রু জেরী। তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে বোমাং রাজপরিবারের এই রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়।