বাংলাদেশে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আর্থিক স্থায়িত্ব রক্ষা এবং সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে সুশাসন জোরদার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য উন্নয়নের লক্ষ্যে মধ্যমেয়াদে সমন্বিত ও ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও সংস্থাটি জোর দিয়েছে।
আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর এ অভিমত প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার পর ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হয়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আইএমএফ জানায়, দুর্বল কর রাজস্ব সংগ্রহ এবং আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক-আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সাহসী রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে উল্লেখযোগ্য নিম্নমুখী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিতে গত ২৬ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড বাংলাদেশের জন্য আর্টিকেল-৪ পরামর্শ সম্পন্ন করে। এ সংক্রান্ত স্টাফ রিপোর্ট প্রকাশে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সম্মতি দিয়েছে। আইএমএফের আর্টিকেল অব এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, সদস্য দেশসংক্রান্ত নথি প্রকাশ স্বেচ্ছাসেবী এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্প্রতি শ্লথ হয়ে পড়েছে, যদিও মুদ্রাস্ফীতি এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩ অর্থবছরের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৪ অর্থবছরের ৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে কমে ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় উৎপাদন বিলম্ব, কঠোর নীতিমালা এবং বিনিয়োগের মন্থর গতি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরের শুরুতে মুদ্রাস্ফীতি দ্বিঅঙ্কের ঘর থেকে কমলেও অক্টোবরে তা আবারও ৮ দশমিক ২ শতাংশে (বার্ষিক ভিত্তিতে) অবস্থান করে। একই সময়ে কর রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও মূলধন ও সামাজিক খাতে ব্যয় কম হওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।
চলতি হিসাবের উন্নতির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন শুরু হয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যমেয়াদে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে যাবে। কর রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবেলায় কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাবে এবং মধ্যমেয়াদে তা প্রায় ৬ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে ২০২৬ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশে থাকার পর ২০২৭ অর্থবছরে ধীরে ধীরে প্রায় ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
নির্বাহী বোর্ডের মূল্যায়ন: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রশংসা করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্বাহী পরিচালকরা। তবে তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
নির্বাহী পরিচালকরা বলেন, দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, নতুন বিনিময় হার কাঠামোর অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা একটি অসম কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এ প্রেক্ষাপটে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সিদ্ধান্তমূলক, টেকসই নীতিগত পদক্ষেপ এবং সাহসী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন পরিচালকরা। তারা বলেন, নতুন প্রশাসনের কর্মসূচির পূর্ণ মালিকানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কর্মীদের সঙ্গে প্রাথমিক ও সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং অংশীজনদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাহী পরিচালকরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজস্ব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, সাহসী কর নীতি সংস্কার, কর কাঠামো সরলীকরণ এবং কর প্রশাসন ও সম্মতি জোরদারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকি যুক্তিসঙ্গতকরণ, প্রবৃদ্ধিবর্ধক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার প্রদান, সামাজিক সুরক্ষা জাল সম্প্রসারণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারি আর্থিক ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল দ্রুত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন পরিচালকরা। এ ধরনের কৌশলে স্বল্প মূলধনীকরণের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ, আর্থিক সহায়তার পরিধি নির্ধারণ এবং আইনি ভিত্তিতে শক্তিশালী পুনর্গঠন ও সমাধান পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলেন তারা। একই সঙ্গে সব পদ্ধতিগত ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং শাসনব্যবস্থা ও ব্যালেন্স শিটের স্বচ্ছতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
পরিচালকরা একমত হন যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি কঠোর ও সমন্বিত নীতি মিশ্রণ বজায় রাখা জরুরি। তারা বিনিময় হার সংস্কার এবং অধিক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার পূর্ণ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন এবং দুর্বল ব্যাংকে অনিরাপদ তারল্য সরবরাহের বিষয়ে সতর্ক করেন।
তারা বলেন, মুদ্রাস্ফীতি দৃঢ়ভাবে নিম্নমুখী ধারায় না আসা পর্যন্ত মুদ্রানীতি যথাযথভাবে কঠোর রাখা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে মুদ্রানীতি কাঠামোর আধুনিকীকরণ অব্যাহত রাখতে হবে। নির্বাহী পরিচালকরা আরও উল্লেখ করেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা জোরদার, দুর্নীতি দমন, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (এএমএল/সিএফটি) কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তারা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি—বিশেষ করে তরুণদের জন্য—এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের সক্ষমতা উন্নয়ন ও মানোন্নয়নকে অপরিহার্য বলে মত দেন পরিচালকরা।
আরএসএফ ব্যবস্থার আওতায় সংস্কারের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অর্থায়ন সমন্বয়ে সহায়ক হতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
আইএমএফের চুক্তির ধারা-৪ অনুযায়ী, সংস্থাটি সাধারণত প্রতি বছর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে থাকে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি দল বাংলাদেশ সফর করে অর্থনৈতিক ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিমালা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে। পরবর্তীতে সদর দপ্তরে ফিরে কর্মীরা একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে, যা নির্বাহী বোর্ডের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আলোচনা শেষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডের সভাপতি হিসেবে নির্বাহী পরিচালকদের মতামতের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
চড়া মূল্যস্ফীতি, কম মজুরি এবং কর্মসংস্থান সংকটে বিপাকে সাধারণ মানুষ। এসব সূচকে উন্নতির ওপরই বাজেটের সফলতা নির্ভর করছে বলে মনে করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। সোমবার রাজধানীর মহাখালীতে আলোচনা সভায় ড. দেবপ্রিয় বলেন, আর্থিক সক্ষমতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নেওয়া কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে মজুরি বৃদ্ধির হার যখন ৮.১৩ ভাগ, তখন মূল্যস্ফীতি প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। এই দুই সূচকেই বোঝা যায়, নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন কেমন চাপে। গত ৩ বছরে জাতীয় সঞ্চয় হার ২৫ দশমিক ৭ থেকে নেমেছে ২১ শতাংশের ঘরে। এমন অবস্থায় প্রস্তাবিত বাজেটে প্রান্তিক মানুষের প্রাপ্তি মূল্যায়ন করেছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আলোচনা সভায় বলা হয়, ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণে ৫৯ ভাগই ভ্যাট, শুল্ক থেকে আসবে। এতে সব শ্রেণির মানুষের ওপরই চাপ বাড়বে, যা কর ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে তথ্য ব্যবহারে অপূর্ণতা, অমনোযোগ এবং ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের মতো বর্তমান সরকারও যদি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো, মূল্যস্ফীতি কম দেখানো বা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার পথে হাঁটে, তাহলে তা দুঃখজনক হবে।' অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্তনির্ভর পরিকল্পনার তাগিদ দেন আলোচকরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ সুরক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বজায় রাখা এবং সুষম কর কাঠামো প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সম্প্রতি বিএবির নির্বাহী কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার ঘোষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ (রিক্যাপিটালাইজেশন) কর্মসূচি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের অঙ্গীকার এবং কর্পোরেট ও মিউনিসিপ্যাল বন্ড বাজার উন্নয়নের উদ্যোগকে সংগঠনটি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। বিএবি জানায়, সরকারের সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবে। তবে একই সঙ্গে দ্রুত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আত্মসাৎকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে কর কাঠামোর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমানতের ওপর আবগারি কর অব্যাহতির সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীতকরণ, একটি ঋণ সুবিধার বিপরীতে একবার মাত্র আবগারি কর আরোপ, ছয় শতাংশ সুদ ভর্তুকিসহ ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন, সহজীকৃত বাণিজ্য প্রক্রিয়া ও ওয়ান-স্টপ বিনিয়োগ সেবাসহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি। তবে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএবি। এর মধ্যে রয়েছে আত্মসাৎকৃত সম্পদ দ্রুত পুনরুদ্ধার, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, অনিয়মিত শেয়ারহোল্ডিংয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংকের দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন। সংগঠনটির মতে, প্রস্তাবিত ব্যাংক রেজোলিউশন কাঠামোতে এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না পান। বিএবি আরও উল্লেখ করে, ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সরকারি ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সরকারি ঋণ গ্রহণে সতর্কতা এবং বন্ড বাজারের দ্রুত বিকাশ জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলককরণ ও কর-ব্যাংকিং তথ্যভান্ডার সংযুক্তির বিষয়টি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, এতে ক্ষুদ্র ও গ্রামীণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা পাবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হবে না। কর ব্যবস্থার বিষয়ে বিএবি বলেছে, তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর জন্য বিদ্যমান ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ করহার পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কর রেয়াত এবং তালিকাভুক্ত শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ আয়ে কর অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর শুল্ক ও কর অব্যাহতিরও আহ্বান জানানো হয়। বিএবি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করে, শক্তিশালী ব্যাংক ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়, আর বিশ্বাস ছাড়া শক্তিশালী ব্যাংকও সম্ভব নয়। সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সংস্কারের সূচনা নয়, তার পূর্ণ বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব, বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি এবং শ্রমিক আন্দোলনের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও রেকর্ড গড়ার পথে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বন্দরে ৩২ লাখ ২০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডেলিং এবং ৯ কোটি ৯৫ লাখ টন কার্গো খালাস হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২ লাখ ২০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার, ৯ কোটি ৯৫ লাখ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৩ হাজার ৯৫২টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। এছাড়া অর্থবছর শেষে ৩৫ লাখ ৪২ হাজার কনটেইনার, ১০ কোটি ৬৯ লাখ মেট্রিক টন কার্গো পণ্য এবং ৪ হাজার ৩১৭টি জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্য অর্জিত হলে এটি হবে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, ৪ হাজার ৩০০টির বেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে বলে আশা করছি। কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং-এই তিন ক্ষেত্রেই অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়া সম্ভব হবে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া অস্থিতিশীলতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের ধর্মঘটও হয়েছে। তারপরও দেশের আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকায় বন্দরের এ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, কোনো অবস্থাতেই বন্দর এক মিনিটের জন্যও বন্ধ রাখা উচিত নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু আমদানিনির্ভর, তাই আমদানি-রফতানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে বন্দরকে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৭ দিন সচল রাখতে হবে। এদিকে, চলতি অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং জাহাজ আগমনে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আকতার পারভেজ বলেন, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি স্থিতিশীল সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি হওয়া। এই স্থিতিশীলতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। আর সে কারণেই আমদানি-রফতানি খাতে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০ বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান বর্তমানে ৬৮তম। তবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি বন্দরের অবস্থান আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বন্দরে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।