ফের পরিবর্তন হলো অমর একুশে বইমেলার তারিখ। ঘোষণা অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরুর কথা থাকলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে বইমেলা, যা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এ ছাড়া এবারের মেলায় কোনো প্যাভিলিয়ন থাকছে না বলে জানিয়েছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাংলা একাডেমি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। এছাড়া প্যাভিলিয়নপ্রাপ্ত প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্যাভিলিয়ন ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দে অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে তিন শতাধিক প্রকাশনা সংস্থার প্ল্যাটফর্ম ‘প্রকাশক ঐক্য’ মেলায় অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানায়। তারা বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণাও দেয়। এ পরিস্থিতিতে রোববার রাতে জরুরি বৈঠকে বসেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন একাডেমি কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশকদের প্রতিনিধিরা।
বৈঠক শেষে জানানো হয়, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)-এর সহায়তায় প্যাভিলিয়নপ্রাপ্ত প্রকাশকরা নিজ নিজ প্যাভিলিয়ন সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি যারা স্টলের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের স্টল বিন্যাসের লটারি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে স্টল নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. মো. সেলিম রেজা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় বইমেলার উদ্বোধন করবেন।
মেলা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানার ‘বিডিআর বিদ্রোহের’ বর্ষপূর্তি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী বইমেলা ২৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করবেন। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলা একদিন পিছিয়ে সময় দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমে ডিসেম্বর মাসে (২০২৫) বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারি মাসে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তবে বিভিন্ন দাবি-আপত্তির প্রেক্ষাপটে এবারও পরিবর্তন এলো বইমেলার সূচিতে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দেশের গুণীজনদের হাতে একুশে পদক তুলে দেবেন বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি)। একই দিন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন করবেন তিনি। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার একযোগে অনুষ্ঠিত হবে একুশে পদক প্রদান ও বইমেলা উদ্বোধন। প্রধানমন্ত্রী ওইদিন সকালে একুশে পদক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এরপর বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গুণীজনদের হাতে একুশে পদক তুলে দেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অনুষ্ঠানটি দেশের সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতা প্রচারে নতুন প্রাণ যোগ করবে। জানা গেছে, এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্টল ভাড়া মওকুফ করা সিদ্ধান্ত প্রকাশকদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে ধরা হচ্ছে। অনুষ্ঠান দুটির জন্য ইতোমধ্যে সব প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের একুশে পদকপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করে। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই বছর ৯ ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে একুশে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়। এবারের একুশে পদকের জন্য মনোনীত ব্যক্তিরা হলেন, চলচ্চিত্রে ফরিদা আক্তার ববিতা, চারুকলায় অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাশ্যুম, সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ। এ ছাড়া সংগীত দল হিসেবে ব্যান্ড ওয়ারফেজকে এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। একুশে পদক রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতি বছর দেশের গুণীজন এবং প্রতিষ্ঠানকে এই পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, মনোনীত প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এককালীন নগদ চার লাখ টাকা, ৩৫ গ্রাম ওজনের স্বর্ণপদক, রেপ্লিকা এবং সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়। এ বছর সাহিত্য বিভাগে একুশে পদকের জন্য কোনো মনোনয়ন প্রকাশ করা হয়নি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি একুশে পদকের জন্য মনোনীত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়। গত বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে একুশে পদক ২০২৬-এর জন্য মনোনয়ন আহ্বান করে সরকার। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর ছিল মনোনয়ন জমার শেষ দিন।
চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি বলেছেন, যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কেউ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা মাদক সংক্রান্ত অপরাধে জড়ালে দলমত নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকালে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব পুলিশ ইউনিট প্রধান, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল সভায় আইজিপি এই নির্দেশনা দেন। আইজিপি বাহারুল আলম সভায় স্পষ্ট করে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন কোনো রাজনৈতিক দলের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ যদি জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তবে ছাড় না দিয়ে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে আইজিপি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে মহাসড়কে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকেও সমন্বিতভাবে কাজ করার এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। সভায় পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আইজিপিরা উপস্থিত ছিলেন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়।
রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এসব চাঁদাবাজির পেছনে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা জড়িত। সারা দেশ থেকে যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই অর্থের বেশিরভাগই ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আদায় করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি নেই-আমি একথা কিন্তু বলিনি। আমি বলেছি-একটা হলো চাঁদা, আর একটা হলো চাঁদাবাজি। চাঁদা হলো-স্বেচ্ছায় এবং চাঁদাবাজি হলো জোরপূর্বক। আমি তো চাঁদাবাজিকে সমর্থন করিনি বা করছিও না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি একটা ফৌজদারি অপরাধ। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমবায় মন্ত্রণালয় এবং আমার মন্ত্রণালয়ে মিলে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কোথাও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে। কোথাও আবার পৌর টোলের সঙ্গে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে দায়িত্বপালন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং থানা পুলিশের এক শ্রেণির অসাধু সদস্য এসব চক্রের সঙ্গে যুক্ত। নিরুপায় হয়ে পরিবহণ চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এসব চাঁদা পরিশোধ করে যাচ্ছেন। তারা জানান, পরিবহণে চাঁদাবাজির ফলে পরিবহণ ভাড়াও বাড়ে। সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর দাম হয়ে যায় আকাশছোঁয়া। দিনশেষে সব গিয়ে পড়ে জনগণের ঘাড়ে। সমঝোতা সিস্টেমের নামে চাঁদাবাজির খেসারত দিতে হয় আমজনতাকে। এর ফলে সমাজের মধ্যবিত্তের যাপিত জীবন আরও দুঃসহ হয়ে ওঠে। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই চাঁদাবাজি আর বন্ধ হয় না। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের সদস্যদের কল্যাণের নামে এভাবে চাঁদা আদায় করা হলেও বাস্তবে যা হচ্ছে তা স্রেফ চাঁদাবাজি। এসব চাঁদার ৯০ ভাগ চালক-কন্ডাকটরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নেওয়া হয়। চাহিদামাফিক চাঁদার টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর করা ছাড়াও মারধরও করা হয়। এছাড়া মাঠপর্যায়ে থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদার টাকা কত হাত ঘুরে কোথায় যায় এবং কারা এর ভাগ পায়-সে বিষয়ে কেউ মুখে খুলতে চান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ সেক্টরের সাধারণ মালিক-শ্রমিকদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, মূলত এসব চাঁদার টাকার ওপর ভর করে স্বাধীনতার পর এক শ্রেণির মালিক-শ্রমিক নেতারা জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীও হতে পেরেছেন। সরকার বদল হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এসব প্রভাবশালী নেতা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের আপস করে চলেন। সারা দেশে এ সেক্টরের লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিকদের পুঁজি করে রাজনীতির হাত শক্তিশালী করাসহ রাজনীতিকে জিম্মি করা হয়। বিপরীতে সাধারণ পরিবহণ শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। তাদের রাত-দিনের ঘামঝরা অমানুষিক পরিশ্রমকে পুঁজি করে বেশির ভাগ নেতা রাজকীয় জীবনযাপন করেন। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এসব প্রভাবশালীরা কঠোর আইন করতেও বাধা দেন। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নানা কারণে এ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এ কারণে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা কখনো নেওয়া হয় না। বিপরীতে সমঝোতার নামে চাঁদা নেওয়া হয় বলে এক ধরনের বৈধতা দিয়ে দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক মতবিনিময় সভা শেষে পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহণ ও সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহণের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো।’ এদিকে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সিটি বাসের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এসব বাস থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। এ হিসাবে সিটি বাস থেকে দৈনিক মোট চাঁদা আদায় হয় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। আর দূরপাল্লার বাস চলাচল করে ৬০ হাজারের বেশি। এসব বাস থেকে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। অর্থাৎ এ খাত থেকে দৈনিক মোট চাঁদা আদায় করা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে ১৮ হাজার। এসব থেকে দৈনিক গড়ে চাঁদা তোলা হয় ১৫০ টাকা। এ হিসাবে ঢাকার সিএনজি অটোরিকশা থেকে দৈনিক মোট চাঁদা তোলা হয় ২৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে ১৫ হাজার। সেসব রিকশা থেকে দৈনিক গড়ে চাঁদা আদায় করা হয় ৮০ টাকা করে। এ হিসাবে সেখান থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় হয় ১২ লাখ টাকা। একইভাবে চাঁদা আদায় করা হয় রাজধানী ঢাকায় চলাচল করা প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে। দৈনিক গড়ে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। অর্থাৎ এ খাত থেকে দৈনিক ১৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে দেশজুড়ে চলাচল করে আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব অটোরিকশা থেকে গড়ে ৮০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ হিসাবে দৈনিক ৪০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় ট্রাক থেকে। সারা দেশে দৈনিক চলাচলকারী ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। দৈনিক গড়ে ১ হাজার টাকা করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া টেম্পো, লেগুনাসহ এই শ্রেণির যানবাহন রয়েছে ৮ হাজারের বেশি। এসব পরিবহণ থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। যা থেকে আসে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সব খাত মিলিয়ে প্রতিদিন পরিবহণ সেক্টর থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, ‘চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটোই রয়েছে সড়কে। যেহেতু সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি কাজ করেন-এজন্য এ বিষয়ে তার সংগঠন এবং ব্যক্তিগতভাবে তার নিজের যথেষ্ট স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে।’ তিনি জানান, সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন নামে-বেনামে চাঁদা আদায় করছে। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও চাঁদা আদায় করে থাকেন।’ তিনি আরও জানান, ‘সব পরিবহণে চাঁদাবাজি হয় এমনটা বলা যাবে না। কোনোটিতে হচ্ছে, কোনোটিতে হচ্ছে না। সবমিলিয়ে গড় হিসাব করে যাত্রীকল্যাণ সমিতি বিভিন্ন সময় চিত্র প্রকাশ করেছে। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন বেশির ভাগ পরিবহণকে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়। এক জায়গায় নয়, নানা খাতে তাদের চাঁদা দিতে হয়। সব কথা সাহস করে বলতে পারেন না তারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ সিস্টেম ও ডিজিটাল মামলা (ক্যামেরা দেখে মামলা) পদ্ধতি চালু করলে সড়কে পরিবহণের চাঁদাবাজি থাকবে না। বিগত সরকারগুলোকে তিনি এ বিষয়ে বারবার বললেও তারা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখেনি। উলটো তাকে নানাভাবে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হয়রানি করেছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, পরিবহণ খাত থেকে সমঝোতার নামে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে, না চাঁদার নামে চাঁদাবাজি চলছে-সেটি সরকার তথা সড়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে তদন্ত করে দেখা। যারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করে আনতে পারবে-তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এরপর কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করাসহ চাঁদাবাজির প্রমাণ পেলে সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে হবে। এছাড়া তিনি মনে করেন, বর্তমান সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যেহেতু নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন, সেহেতু এ বিষয়ে এখন তার কোনো দায় নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে নিকট ভবিষ্যতে তার ওপর চাঁদাবাজির দায় এসে বর্তাবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু যুগান্তরকে বলেন, ২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে শ্রমিক ফেডারেশনের নামে সরাসরি কোনো চাঁদা আদায় করা হয় না। তবে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি এখনো চাঁদা তুলছে।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিক ফেডারেশন শ্রমিক সংগঠন পরিচালনা ও শ্রমিকদের কল্যাণের নামে আগে চাঁদা তুলত, এখন তা নেওয়া হচ্ছে না। তবে নানা নামে, নানা খাতে চাঁদা নেওয়া তো বন্ধ হয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন খাতে পরিবহণ মালিকদের চাঁদা দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ তার মতে, ‘এটা সেদিনই বন্ধ হবে, যেদিন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠবে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, পরিবহণ মালিক সমিতি টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার জন্য সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে কিছু টাকা আদায় করে থাকে। যেটা পরিবহণ মালিকরা স্বেচ্ছায় দিয়ে যাচ্ছেন। ওই টাকা টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ বহন করা হয়। এটাকে আমরা চাঁদা বলি না, এটা ব্যবস্থাপনা খরচ। সড়ক পরিবহণমন্ত্রীও এভাবে টাকা নেওয়াকে চাঁদা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি তো আলোচনার ভিত্তিতে টাকা নিচ্ছে। পরিবহণ মালিকরা তা স্বেচ্ছায় পরিশোধ করছেন। যারা সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদেরও পরিবহণ রয়েছে। তবে এর বাইরেও সড়কে পদে পদে পরিবহণগুলোকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কাছ থেকে পৌরকরের পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা জোরপূর্বকভাবে আদায় করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি (হাইওয়ে পুলিশ) মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা যুগান্তরকে বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এজন্য গত দেড় বছরে মহাসড়কে চাঁদাবাজি নেই বললেই চলে। তারপরও কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে পুলিশ। তবে এখন মহাসড়ক নয়, টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে শোনা যায়।