নতুন অর্থবিলে জমির মালিকদের ডেভেলপারদের কাছ থেকে পাওয়া ফ্ল্যাটসহ যেকোনো নন-ক্যাশ সুবিধার ওপরও ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত আয়কর বিধির অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ডেভেলপারদের কাছ থেকে পাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট বা অন্যান্য অ-নগদ সুবিধাকে করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচনা করে ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্সের পরিধি সম্প্রসারণ করা হবে।
বর্তমানে জমির মালিকরা ডেভেলপারদের সঙ্গে চুক্তির সময় যে নগদ অর্থ পান, তা সাইনিং মানি হিসেবে গণ্য হয় এবং এর ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স প্রযোজ্য। তবে চুক্তির অংশ হিসেবে পাওয়া ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ওপর কোনো কর আরোপ করা হয় না।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এখন থেকে জমির পরিবর্তে পাওয়া অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য নির্ধারণ করা হবে সরকার নির্ধারিত মৌজামূল্য অনুযায়ী। এরপর ওই সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য বাদ দিয়ে যে পার্থক্য থাকবে, সেটিকে ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে গণ্য করে তার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।
কীভাবে কাজ করবে প্রক্রিয়াটি:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘমেয়াদে জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বড় অঙ্কের করযোগ্য লাভ তৈরি হয়, যা এখন নন-ক্যাশ সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, কেউ ২০ বছর আগে ৫০ লাখ টাকায় জমি কিনে পরে ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করে ১০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি পেলে মোট অর্জন দাঁড়ায় ৫.৫ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৫০ লাখ টাকা বাদ দিলে ৫ কোটি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ৭৫ লাখ টাকা ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স দিতে হতে পারে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এলাকার ভিত্তিতে এই করের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে করের চাপ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
বর্তমানে দেশে মৌজামূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যায়ন করা হয়, যা সংশ্লিষ্ট কমিটি নিয়মিত হালনাগাদ করে থাকে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরে দেশে ১০ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ:
রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নতুন কর কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা বাড়তে পারে, ফলে করফাঁকির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি এম এ আউয়াল বলেন, “এই ধরনের কর আরোপ করা হলে অনেকেই প্রকৃত মূল্য গোপন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীহ বড়ুয়া বলেন, সম্পত্তির মূল্য গোপনের প্রবণতা ইতোমধ্যেই রয়েছে, নতুন কর চাপ বাড়লে তা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আবাসন ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, কর বাস্তবায়নের ফলে বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত অ্যাপার্টমেন্টের দামে প্রভাব ফেলতে পারে, যার বোঝা ক্রেতাদের ওপর পড়বে।
এনবিআরের অবস্থান:
অন্যদিকে এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, সরকারি মূল্যায়নের ভিত্তিতে হলেও এই নীতি বড় ধরনের রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা গেলে আরও বেশি রাজস্ব পাওয়া যেত।
তিনি আরও বলেন, এই কর মূলত উচ্চমূল্যের সম্পত্তি লেনদেনের ওপর প্রযোজ্য হওয়ায় সাধারণ বা স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়বে না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
নতুন অর্থবিলে জমির মালিকদের ডেভেলপারদের কাছ থেকে পাওয়া ফ্ল্যাটসহ যেকোনো নন-ক্যাশ সুবিধার ওপরও ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত আয়কর বিধির অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ডেভেলপারদের কাছ থেকে পাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট বা অন্যান্য অ-নগদ সুবিধাকে করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচনা করে ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্সের পরিধি সম্প্রসারণ করা হবে। বর্তমানে জমির মালিকরা ডেভেলপারদের সঙ্গে চুক্তির সময় যে নগদ অর্থ পান, তা সাইনিং মানি হিসেবে গণ্য হয় এবং এর ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স প্রযোজ্য। তবে চুক্তির অংশ হিসেবে পাওয়া ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ওপর কোনো কর আরোপ করা হয় না। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এখন থেকে জমির পরিবর্তে পাওয়া অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য নির্ধারণ করা হবে সরকার নির্ধারিত মৌজামূল্য অনুযায়ী। এরপর ওই সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য বাদ দিয়ে যে পার্থক্য থাকবে, সেটিকে ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে গণ্য করে তার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। কীভাবে কাজ করবে প্রক্রিয়াটি: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘমেয়াদে জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বড় অঙ্কের করযোগ্য লাভ তৈরি হয়, যা এখন নন-ক্যাশ সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, কেউ ২০ বছর আগে ৫০ লাখ টাকায় জমি কিনে পরে ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করে ১০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি পেলে মোট অর্জন দাঁড়ায় ৫.৫ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৫০ লাখ টাকা বাদ দিলে ৫ কোটি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ৭৫ লাখ টাকা ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স দিতে হতে পারে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এলাকার ভিত্তিতে এই করের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে করের চাপ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বর্তমানে দেশে মৌজামূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যায়ন করা হয়, যা সংশ্লিষ্ট কমিটি নিয়মিত হালনাগাদ করে থাকে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরে দেশে ১০ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ: রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নতুন কর কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা বাড়তে পারে, ফলে করফাঁকির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি এম এ আউয়াল বলেন, “এই ধরনের কর আরোপ করা হলে অনেকেই প্রকৃত মূল্য গোপন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।” কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীহ বড়ুয়া বলেন, সম্পত্তির মূল্য গোপনের প্রবণতা ইতোমধ্যেই রয়েছে, নতুন কর চাপ বাড়লে তা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। আবাসন ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, কর বাস্তবায়নের ফলে বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত অ্যাপার্টমেন্টের দামে প্রভাব ফেলতে পারে, যার বোঝা ক্রেতাদের ওপর পড়বে। এনবিআরের অবস্থান: অন্যদিকে এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, সরকারি মূল্যায়নের ভিত্তিতে হলেও এই নীতি বড় ধরনের রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা গেলে আরও বেশি রাজস্ব পাওয়া যেত। তিনি আরও বলেন, এই কর মূলত উচ্চমূল্যের সম্পত্তি লেনদেনের ওপর প্রযোজ্য হওয়ায় সাধারণ বা স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়বে না।
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, সার্বিক অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সরকারকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ইতোমধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা শুরু করেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণে ক্রমাগত নিন্মমুখিতা অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধার সৃষ্টি করেছে। এ বাধা দূর করতে হলে নতুন এবং আগের ধারাবাহিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বুধবার আইএমএফ-এর বাংলাদেশ আবাসিক মিশন থেকে ইস্যু করা এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এসব তথ্য উলেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, আইএমএফ-এর কাছে বাংলাদেশ সরকার নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ সহায়তা চেয়েছে। নতুন ঋণ কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে আইএমএফ-এর একটি মিশন বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। ওই সময়ে মিশনটি বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সংস্কারের নীতিগত অগ্রাধিকারের বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করবে। একই সঙ্গে তারা দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সংস্কারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলোও মূল্যায়ন করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ সরকার থেকে আইএমএফ-এর কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটির সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্ধিত ঋণ সহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) ও রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)। এ তিন কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল। পরে তা বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। বর্তমান সরকার ওই কর্মসূচিকে আর চালিয়ে নিতে চাচ্ছে না। তারা নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ চাচ্ছে। এ বিষয়ে আইএমএফ নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। কারণ, সরকার আইএমএফ-এর কাছে সংস্কারের বিষয়ে বেশকিছু অঙ্গীকার করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আগের ঋণ কর্মসূচির পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে উলেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ফলে গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করা একদিকে যেমন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, অপরদিকে আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ কর্মসূচি চালুর বিষয়ে আইএমএফ-এর সঙ্গে সরকারের নতুন একটি সমঝোতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা দুপক্ষই সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে আগ্রহী বলে সংস্থাটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি মনে করে, নতুন ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো প্রতিফলিত করবে এবং সরকারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারকে নতুন ঋণ কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করবে। এর মাধ্যমে সরকার দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক টেকসই স্তিতিশীলতা নিশ্চিত করা, শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের অংশ হিসাবে আইএমএফ-এর প্রতিশ্রুতি থাকবে। আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় সুফল মিলছে না। নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন। এজন্য সংস্কার অপরিহার্য। সংস্কারকে বাস্তবভিত্তিক ও ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এর প্রয়োগ থাকতে হবে। তবে নতুন ঋণের আকার কত হবে, এ বিষয়ে বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি। যেহেতু টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে, এ কারণে ঋণের পরিমাণও বাড়তে পারে। জুলাইয়ে আইএমএফ-এর একটি মিশন আসার কথা রয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক সংকটময় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ পুরো ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে তুলেছে। বাইরে থেকে প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল অগ্রগতি দেখা গেলেও ভেতরে জমেছে আস্থাহীনতা ও অনিশ্চয়তা। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের বড় অংশ মনে করছেন, এখনই একটি কঠোর ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে পুরো খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন অর্থের নয়, আস্থার। গত এক দশকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকা, পুনঃতফসিল সুবিধা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অনেক ব্যাংকে তারল্য সংকটও দেখা দিয়েছে, ফলে আমানতকারীরা টাকা তুলতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি পুরো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। তাই ব্যাংক দুর্বল হলে শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের পরিস্থিতি, যেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব ব্যাংকের বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিও সংকটকে আরও গভীর করেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের কিছু ধারা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কিছু বিধান অতীতের অনিয়মে জড়িতদের আবার ব্যাংক মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা সংস্কার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকও এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে তাদের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, যেখানে আস্থা ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধান কেবল ব্যাংক একীভূত করলেই হবে না। প্রয়োজন— ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ শক্তিশালী অডিট ও জবাবদিহি ব্যবস্থা সেমিনার ও আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সুশাসন ছাড়া ব্যাংকিং খাতকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন একটি সাহসী ও কঠোর সিদ্ধান্ত, যা আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে নিতে পারে।