আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে (ভার্চুয়ালি) যুক্ত ছিলেন আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী।
তিনি বলেন, “চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং তথ্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কুয়েটের এই আয়োজন তরুণ গবেষকদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে”।
এতে চিফ প্যাট্রন ও কুয়েটের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. মাকসুদ হেলালী বলেন, “বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এই কনফারেন্সে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আমাদের দেশের শিল্প খাতের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে”।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে (ভার্চুয়ালি) বক্তব্য রাখেন ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইইই) বাংলাদেশ সেকশনের চেয়ার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইমামুল হাসান ভূঁইয়া।
সম্মেলনের কারিগরি কমিটির চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কুয়েটের ইইই বিভাগের প্রফেসর ড. মুহা. রফিকুল ইসলাম এবং কনফারেন্স চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. রফিকুল ইসলাম।
অর্গানাইজিং চেয়ার হিসেবে যুক্ত ছিলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. কাজী মোঃ রকিবুল আলম।
পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও ব্যবস্থাপনায় ছিলেন অর্গানাইজিং সেক্রেটারি ও সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ ইমরান হোসেন।
১৮ থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইলেকট্রিক্যাল ও আইসিটি খাতের আধুনিক গবেষণা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করবেন।
ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইইই)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশ-বিদেশের কয়েকশ গবেষক তাদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন।
তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে বিশ্বের ১৫টি দেশ থেকে ১০৪২টি টেকনিক্যাল পেপার থেকে বাছাইকৃত ১৪২টি টেকনিক্যাল পেপার মোট ২৫টি টেকনিক্যাল সেশনে উপস্থাপন করা হবে।
সম্মেলনে আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপান, কানাডা, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত ও বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের গবেষক, শিক্ষক, স্বনামধন্য প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা অংশগ্রহন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, রেজিস্ট্রার, বিভাগীয় প্রধানগণ, আমন্ত্রিত অতিথি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং দেশি-বিদেশি গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, শুক্রবার সন্ধ্যায় কনফারেন্সের আনুষ্ঠানিক সমাপণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র সচিব (ইন্টারগভর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশনস অ্যান্ড কনস্যুলার অ্যাফেয়ার্স) এম. ফরহাদুল ইসলাম।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
অবিলম্বে নবম জাতীয় পে স্কেলের সুপারিশ পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরামের নেতারা। মঙ্গলবার (৯ জুন) একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন। এতে বলা হয়, প্রায় ১১ বছর আগে, ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেলের নোটিফিকেশন অনুযায়ী সব গ্রেডের ক্ষেত্রে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ হওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনমান, জীবনধারণ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যৌক্তিক হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়নি। এ ছাড়া একজন কর্মচারী বেতন গ্রেডের শেষ ধাপে উন্নীত হওয়ার পর পরবর্তী পদোন্নতি না হলে তার বেতন বৃদ্ধির আর কোনো সুযোগ নেই। গত এক যুগে ৫০ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি হওয়ায় একজন সরকারি কর্মচারীর মৌলিক চাহিদার খাদ্যসামগ্রীর মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা ব্যয়, স্বাস্থ্য ব্যয় ও আনুষঙ্গিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৯ লাখ ১৯ হাজার ১১১ জন কর্মচারী রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন ও অংশীজনের সঙ্গে প্রায় ১৮৪টি সভা ও ২ হাজার ৫৫২ জনের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে চূড়ান্ত সুপারিশ গত ২১ জানুয়ারি সরকারের নিকট দাখিল করে। অদ্যাবধি বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় কর্মচারীদের মাঝে হতাশা ও দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে। সরকারি কর্মচারীরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছে যে, সম্প্রতি ‘নবম জাতীয় পে স্কেল’ বাস্তবায়নের যৌক্তিক দাবির বিপক্ষে কিছু বিভ্রান্তিকর ও নেতিবাচক মন্তব্য বিভিন্ন যোগাযোগ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এক যুগ পর এসে সিপিডি বলতে চেয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে তা বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে তুলবে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে তাদের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি ম. নূরুল ইসলাম বলেন, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বর্তমান সরকার কার্যকর করতে খুবই আন্তরিক। তার আন্তরিক বলেই বিষয়টিতে সক্রিয় বিবেচনা করছে। এ পর্যায়ে এসে এ ধরনের বক্তব্য প্রদান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। কর্মচারীদের দাবিকে অযৌক্তিক বা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা মোটেও কাম্য নয়। এতে কর্মচারীদের মনোবল ভেঙে পড়ে। আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গত ১১ বছর ২০১৫ সালের পর থেকে আজ অবধি নতুন কোনো পে স্কেল না হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হওয়ায় নির্দিষ্ট বেতনের সরকারি কর্মচারীরা তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য, সন্তানের শিক্ষা, জীবনধারণ, জীবনমান, বাসস্থান, যাতায়াতসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছেন, যা পূর্বের ও বর্তমানের বাজারের সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল পূর্ব বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাতটি দোকান পুড়ে গেছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। বুধবার (১০ জুন) ভোর ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের প্রাথমিক ধারণা, বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পর দ্রুত তা আশপাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভাতের হোটেল, মিষ্টির দোকান, সেলুন, ইলেকট্রনিকস ও মনোহারি দোকানসহ মোট সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার কাজে অংশ নেন। প্রায় এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও এর আগেই দোকানগুলোর অধিকাংশ মালামাল পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী লাল মিয়া জানান, তার ভাতের হোটেল ও মিষ্টির দোকান মিলিয়ে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, “দোকানের সব মালামাল, চাল, ফ্যান ও মিষ্টি পুড়ে গেছে। আমরা সরকারি সহায়তা চাই।” আরেক ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, তার মনোহারি দোকানের মালামালের পাশাপাশি বিকাশের নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও আগুনে পুড়ে গেছে। তার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। কামারখন্দ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করা হয়। আগুনের কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ তদন্ত শেষে জানানো হবে।
বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে সঙ্গীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা প্রায় ৪.৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়—২০২৩ সালের একটি বৈশ্বিক গবেষণার এই চাঞ্চল্যকর তথ্যই এখন বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক নির্মম সত্য হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ভ্যাপসা ও চরম গরম আবহাওয়া বিরাজ করে। এই সময়ে সাধারণ মানুষকে তীব্র দাবদাহ, নিরবচ্ছিন্ন লোডশেডিং, নির্ঘুম রাত এবং গণপরিবহনে অসহনীয় ভিড়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। তবে গরমের এই চাক্ষুষ অস্বস্তির আড়ালে দেশের অপরাধ চিত্রে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; পুলিশের নথিপত্র ও পরিসংখ্যান বলছে, গ্রীষ্মের এই সময়ে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মৌসুমভিত্তিক (সিজনাল) হারে মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশ পুলিশের ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দীর্ঘ মেয়াদের মাসিক অপরাধের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশু পাচার, যৌতুকের কারণে নির্যাতন এবং বাল্যবিবাহের মতো গুরুতর অপরাধগুলো একটি নির্দিষ্ট ঋতুচক্রে আবর্তিত হয়। প্রতি বছর মার্চ বা এপ্রিল মাসের দিকে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মামলাগুলোর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে, যা পুরো গ্রীষ্ম ও বর্ষার মাসগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। পরবর্তীতে বছরের শেষ দিকে শীতের আমেজ শুরু হলে এবং তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের এই হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৯৭টি, যা জুনের তীব্র গরমে এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৬৮টিতে; অথচ ওই বছরেরই ডিসেম্বরে শীতের সময় তা কমে ১ হাজার ৪২৬টিতে নেমে আসে। ২০২২ সালেও একই ধারায় ফেব্রুয়ারির ১ হাজার ৪৫৪টি মামলা আগস্টের গরমে ২ হাজার ২১৫টিতে পৌঁছায়। ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও এই একই ধারা অব্যাহত ছিল। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসের প্রবণতাও আগের বছরগুলোর এই মৌসুমভিত্তিক হারবৃদ্ধির চিত্রকে আরও নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি মামলা রেকর্ড হওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে তা সামান্য কমে ১ হাজার ১৮১টি হয়। কিন্তু মার্চে গরম পড়তে শুরু করলেই মামলা বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৮৫টি এবং এপ্রিল মাসে তা এক লাফে ৩৫.৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১১টিতে পৌঁছায়, যা বছরের শুরুর দিকের মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। উল্লেখ্য, গত সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ২৬৮টি মামলা রেকর্ড হয়েছিল ২০২১ সালের জুনে এবং সবচেয়ে কম ১ হাজার ৪৩টি মামলা হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। আমাদের দেশীয় এই অপরাধচিত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণার হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত গরমের কারণে মানুষের মানসিক চাপ, শারীরিক উত্তেজনা, খিটখিটে মেজাজ এবং নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বহুলাংশে কমে যায়, যা পারিবারিক ও আন্তব্যক্তিক সংঘাতের জন্ম দেয়। বিশেষ করে যেসব দরিদ্র পরিবারে ঘর ঠান্ডা রাখার পর্যাপ্ত যান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই, সেখানে এই প্রবণতা বেশি। 'জ্যামা সাইকিয়াট্রি' জার্নালে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ—ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার নারীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তীব্র তাপমাত্রার সময় নারীদের ওপর শারীরিক সহিংসতা ৮ শতাংশ এবং যৌন সহিংসতা ৭.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একইভাবে ২০২৪ সালের 'এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পার্সপেক্টিভস'-এ প্রকাশিত ৮৩টি গবেষণার একটি মেটা-অ্যানালিসিস জানায়, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে সাধারণত সহিংসতার সামগ্রিক ঝুঁকি ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, তাপমাত্রাই সহিংসতার একমাত্র কারণ নয়, এটি মূলত সমাজে আগে থেকে বিদ্যমান সামাজিক ও আচরণগত সমস্যাগুলোকে আরও উসকে দেয়। বাংলাদেশে গরমের সময় এই সংকট ঘনীভূত হওয়ার পেছনে মৌসুমভিত্তিক অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং চরম আবহাওয়ার কারণে তৈরি হওয়া মানসিক চাপকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনারারি অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ জানান, তীব্র গরমে দিনমজুর, কৃষক ও রিকশাচালকেরা ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। এই আকস্মিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন খুব দ্রুত মানসিক চাপে রূপ নেয়, যা পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল সদস্য অর্থাৎ নারী ও শিশুদের ওপর এসে পড়ে। আর্থিক সংকট থেকে বাঁচতে অনেক পরিবার শিশুদের শিশুশ্রম বা বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া দাবদাহের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুরা সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু কাঠামোগত প্রভাবক। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, ফসল কাটার মূল মৌসুমের বাইরে কৃষি ও অন্যান্য কায়িক শ্রমে যুক্ত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং গ্রীষ্মকালে জীবনযাত্রার ব্যয়ও শীতকালের তুলনায় বৃদ্ধি পায়, যা পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মামলার দীর্ঘ জট, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার (ভিকটিম-ব্লেমিং) প্রথাগত মানসিকতা। অধ্যাপক মাহবুব আরও উল্লেখ করেন, গ্রাম থেকে শহরে দ্রুত স্থানান্তরের কারণে প্রথাগত অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়েছে, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমাজবিজ্ঞানীরা জৈবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু অভ্যাসে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন, তীব্র গরমের সময় খিটখিটে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার ও রেড মিট পরিহার করা এবং আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজের পরিবেশের পোশাক সংস্কার করা (যেমন আইনজীবীদের ভারী কালো কোট পরা পরিহার করা)। এদিকে, আবহাওয়া ও তাপমাত্রার সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতনের এই সংবেদনশীল সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বিষয়টির তাৎপর্য স্বীকার করে জানিয়েছেন, পুলিশ আগে কখনো মৌসুমভিত্তিক আবহাওয়ার সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক গবেষণা না করলেও, এর একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গভীর মূল্যায়ন হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন এবং অদূর ভবিষ্যতে পুলিশ এই বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করবে।