অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে কাজ করছে সরকার।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশে এসএমই খাত ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান আরও শক্তিশালী করাই নতুন এই লক্ষ্যমাত্রার মূল লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বর্তমানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন, অর্থায়নের সহজ প্রবেশাধিকার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে আগামী বছরগুলোতে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখতে পারবে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার জাতীয় এসএমই নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণের প্রবাহ বাড়ানো এবং এসএমই ক্লাস্টারগুলোতে ডিজিটাল রূপান্তরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের সহায়তা করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ সহজতর করতে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ ব্যাংক।
এসএমই ফাউন্ডেশনের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বাসস’কে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে তা কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিই বাড়াবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও শক্তিশালী করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তির ঘাটতি এবং বাজারে প্রবেশের বাধার মতো বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
তিনি জানান, এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, স্বল্প সুদে ঋণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ এসএমই খাতের চিত্র বদলে দিচ্ছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের বাজারের পরিধি ও পরিচালনা দক্ষতা বাড়াতে পারছেন। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাজার সংযোগ সৃষ্টির বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এসএমই ফাউন্ডেশন।
ফারজানা খান বলেন, নীতি সহায়তা, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে ফাউন্ডেশনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফারজানা খান আরও বলেন, একটি জাতীয় ফোকাল সংস্থা হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র ব্যবসার টেকসই উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতে অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, বছরের পর বছর ধরে ফাউন্ডেশনটি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, বৈচিত্র্যময় পণ্য কর্মসূচি, ক্লাস্টার-ভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে বাজার সংযোগের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করে আসছে।
তিনি জানান, বিশেষ করে উৎপাদন, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে ফাউন্ডেশনটি অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করছে।
এছাড়া, ব্যবসায়িক কর্মকা-ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং সহায়তা সেবার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্লাস্টার উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক পণ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে শক্তিশালী করেছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখছে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও এসএমই মালিকরা দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, সুদের উচ্চ হার, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে চলেছেন।
দেশি ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোক্তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ এবং উন্নত লজিস্টিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
রংপুরে সামান্য পুঁজিতে শুরু হওয়া একটি ক্ষুদ্র কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান এখন একটি লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে ২০ জনেরও বেশি স্থানীয় কর্মী কাজ করছেন।।
এসএমই অর্থায়ন প্রকল্পের সহায়তায় এই ব্যবসাটি এখন একাধিক জেলায় প্যাকেটজাত কৃষি পণ্য সরবরাহ করছে, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে এই খাতের সম্ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রাশেদুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এসএমই ক্লাস্টারগুলোকে শক্তিশালী করা, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন তিনি।
রাশেদুর রহমান ঢাবির ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ সেন্টারেরও নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন নীতি সহায়তা এবং ও উদ্ভাবন অব্যাহত থাকলে উন্নত অর্থনীতি হওয়ার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি হয়ে থাকবে এসএমই খাত।
এদিকে, ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এসএমই খাতকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। সেইসঙ্গে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তৃণমূল পর্যায়ের শিল্পায়নে এই খাতের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি জানান, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের নিয়ে এসএমই একটি বৈচিত্র্যময় গ্রাহক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ব্যাংকটি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চলতি মুলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল), মেয়াদী ঋণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নসহ বিভিন্ন ঋণ সুবিধার মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে সেবা প্রদান করে আসছে।
তার মতে, এসএমই অর্থায়ন কেবল একটি ব্যবসায়িক খাতই নয়, বরং এটি জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার; বিশেষ করে প্রধান শহরগুলোর বাইরে উদ্যোক্তা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং স্বল্প সুদের কর্মসূচিতে ব্যাংকের অংশগ্রহণ এই অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
তবে এসএমই অর্থায়নে দীর্ঘস্থায়ী কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঠিক আর্থিক দলিলপত্রের অভাব, জামানতনির্ভর ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং ছোট অংকের ঋণে বেশি পরিচালন ও তদারকি ব্যয় এ খাতের প্রধান সমস্যা।
তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সঠিক সহযোগিতা পেলে এসএমই খাত ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের আচরণও সন্তোষজনক।
কৌশলগত অবস্থান থেকে তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত পণ্যের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং তাদের মধ্যে আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ শৃঙ্খলা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আশা করেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তা এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের ফলে এসএমই খাত ব্যাংক ও জাতীয় অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে থাকবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
তারল্য সরবরাহ ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে নীতি সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, নীতি সুদহার কমানোর এ সিদ্ধান্ত ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। তারল্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি বিভাগ নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, বৃহস্পতিবার মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও কমিটির সভাপতি মো: মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ-এর সভাপতিত্বে বোর্ডের মিটিং রুমে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডেপুটি গভর্নর ড. মো: হাবিবুর রহমান, আইআরএনএম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী, বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফেরদৌসী নাহার, বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ড. মোহাম্মদ আক্তার হোসেন এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ইমাম আবু সাইদসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সদস্যরা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশীয় বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতিধারাসহ আন্তর্জাতিক লেনদেন ভারসাম্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক চলকসমূহের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনার পর নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারল্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা এবং সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি বিভাগ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে পুন:নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো যে টাকা ধার করবে, তার সুদহার কমবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এবার সম্প্রসারণমূলক মুদ্রা সরবরাহের পথে হাঁটছে। এছাড়া নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আভার নাইট রেপো সুদহার নীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, নীতি সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তুলনামূলক কম সুদে অর্থ ধার নিতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছেও ব্যাংকগুলো কম সুদে ঋণ দিতে পারে। এতে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ে এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। তবে অর্থের সরবরাহ ও ভোগ চাহিদা বাড়লে, পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন-অর্থনীতিবিদরা। চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্য বেশি থাকলেও তা পূরণ হয়নি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৮ শতাংশ লক্ষ্য ঠিক করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধি অর্জনের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। এদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
কার্ড থেকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ব্যক্তিগত হিসাবে ‘অ্যাড মানি’ বা টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময়সীমা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছিল, সময়সীমা পেরিয়ে গেলে ১ আগস্ট থেকে কার্ড থেকে এমএফএস হিসাবে অ্যাড মানি করার সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন নির্দেশনায় সেই সময়সীমা আরও ছয় মাস বাড়ানো হলো। ১ জানুয়ারি থেকে কঠোর ব্যবস্থা: বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সংশোধিত সময়সীমার মধ্যে কোনো ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের কার্ড থেকে এমএফএস হিসাবে অ্যাড মানি করার সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কী থাকছে নতুন নিয়মে? নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী— নিজের নামে নিবন্ধিত এমএফএস হিসাবে অন্য কোনো ব্যক্তির কার্ড ব্যবহার করে টাকা আনা যাবে না। কার্ডধারী ও এমএফএস হিসাবধারী একই ব্যক্তি হতে হবে। নামের মিল না থাকলে কার্ড সংযুক্ত করা যাবে না। প্রথমবার যুক্ত করতে হবে ‘টোকেন লেনদেন’ প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রথমবার কোনো নতুন কার্ড এমএফএস ওয়ালেটে যুক্ত করার সময় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার একটি পরীক্ষামূলক বা ‘টোকেন লেনদেন’ করতে হবে। এই লেনদেন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট কার্ডটি ওই এমএফএস হিসাবের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হবে এবং এরপর নিয়মিত লেনদেন চালু হবে। ‘মার্চেন্ট পেমেন্ট’ নয়, ‘ফান্ড ট্রান্সফার’: এতদিন কার্ড থেকে এমএফএসে টাকা আনার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে ‘মার্চেন্ট পেমেন্ট’ হিসেবে দেখানো হতো। এখন থেকে এটি সরাসরি ‘ফান্ড ট্রান্সফার’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া কোন নির্দিষ্ট এমএফএস ওয়ালেট নম্বরে টাকা জমা হচ্ছে, সেই তথ্য কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংকের কাছে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান থাকতে হবে। আগের অন্যান্য নিয়ম বহাল: বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এমএফএস ব্যক্তিগত হিসাবের মাধ্যমে অন্যান্য নিয়মিত লেনদেনের ক্ষেত্রে আগের নিয়মগুলো যথারীতি বহাল থাকবে। সংশোধিত সময়সীমা ও নতুন নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দেশের বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দরে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা কমে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১০০ টাকা কমে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ হাজার ৭৫০ টাকা কমে ১ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কমে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসেবে আজকের বাজারেও এই দামে বিক্রি হবে স্বর্ণ। বাজুস জানিয়েছে, দেশের বাজারে তেজাবি (খাঁটি) স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর আগে ২৭ জুলাই স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণালংকারের ওপর ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে গয়না কেনার সময় ক্রেতাদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট নেওয়া হবে না; এটি স্বর্ণের দামের সঙ্গেই সমন্বয় করা হচ্ছে। স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও কমেছে। নতুন দরে ২২ ক্যারেট রুপার প্রতি ভরি ৪ হাজার ৬০৭ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ২ হাজার ৮৫৭ টাকায় বিক্রি হবে।