মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যখন ইরানের ওপর হামলা শুরু করলেন, তখন তিনি একে একটি ‘এক্সকার্শন’ বা ছোটোখাটো ‘সামরিক ভ্রমণ’ হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন, যার মেয়াদ হবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ।
কিন্তু ছয় মাস পর, সেই সামরিক অভিযান কেবল পশ্চিম এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
ইরানের জনগণের জন্য, পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জন্য এবং বিশ্বজুড়ে বাড়তি খরচের চাপে থাকা ভোক্তাদের জন্য একটি বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এ যুদ্ধ।
তবু ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো অপূর্ণই রয়ে গেছে, যদিও সেই লক্ষ্য বারবার বদলে যেতে দেখা গেছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন, তার ছেলে গুরুতর আহত হন। সেই চরম আঘাতের পরও ইরানের সরকার এখন পর্যন্ত টিকে আছে এবং তারা বিশ্বাস করে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরানে নিজেদের তৈরি করা এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় নিজেদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করছে।
জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা এখন একটি বিষয়ে মোটামুটি একমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের ফলে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটবে না, কিংবা ওয়াশিংটন কোনো চূড়ান্ত ও সুস্পষ্ট বিজয়ও পাবে না।
বরং এই যুদ্ধ এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা এবং একে অপরকে দুর্বল করার এক দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক এইচ এ হেলিয়ার আল জাজিরাকে বলেন, “আগামী ছয় মাসের মধ্যে তেহরান সরকারের পতনের কোনো সম্ভাবনাই নেই। যদি অর্থনৈতিক চাপ এভাবেই চলতে থাকে, তবে কয়েক বছর পর হয়ত রাষ্ট্রে একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে নয়।"
যুদ্ধের লক্ষ্য বদলে গেল যেভাবে
ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কীভাবে সময়ে সময়ে বদলে গেছে, তা এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে সিএনএন।
শুরুতে ইরানকে সম্পূর্ণ পরাভূত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, সেখানে শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো এবং তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চিরতরে মুছে ফেলার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।
সেসব লক্ষ্য এখন শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরার দাবিতে নেমে এসেছে।
এই পরিবর্তন যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বড় সুবিধা থাকলেও সেই শক্তিকে রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের তেল বিক্রি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা আর্থিক পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নৌ অবরোধ তেহরানের তেল রপ্তানি ও বিদেশি মুদ্রা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। কয়েক দশক ধরে তেহরান নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। ফলে নতুন চাপ যতই বাড়ুক, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারবে কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
অবরোধের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে হরমুজ
ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালি, যার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কার্যত ইরানের হাতে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা এবং ইরানি বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে হরমুজে বাণিজ্যিক চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় একেবারেই কমে গেছে।
এর সরাসরি চাপ পড়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাসের আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
তারা একই সঙ্গে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার এবং নিজেদের দেশকে বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিল। যুদ্ধ সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
অস্থির তেলের বাজার বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান অর্থনীতিবিদ জন স্ফাকিয়ানাকিস প্রশ্ন তুলেছেন, এই পরিস্থিতি আরও ছয় মাস চলবে কি না, কিংবা আরও দীর্ঘ হবে কি না।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনো দেশ যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক নৌপথকে রাজনৈতিক বা সামরিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, হরমুজের ঘটনা তার জন্য একটি নজির হয়ে উঠতে পারে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য ও সার পরিবহন—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব কত দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন হিসাব
যুদ্ধ শুধু অর্থনীতির হিসাব বদলায়নি, নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দেশগুলো আগে থেকেই তাদের অর্থনীতি বহুমুখী করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বাইরে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব বাড়ানোর কথা ভাবছিল। যুদ্ধ সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত করেছে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের ভাষায়, যুদ্ধ এমন কোনো প্রবণতা তৈরি করেনি যা আগে ছিল না; বরং বিদ্যমান প্রবণতাগুলোকে ত্বরান্বিত করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো যে আগে থেকেই প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছিল, তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের সামরিক অংশীদারত্ব এই অঞ্চলে আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ যুদ্ধের একটি দীর্ঘমেয়াদি ফল হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছিল এই কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি।
এখন আঞ্চলিক দেশগুলো সেই নির্ভরতার পাশাপাশি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও বিকল্প অংশীদারত্ব বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।
শত চাপেও টিকে আছে ইরান
যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর চাপ পড়েছে ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে দেশটির বামূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগের তুলনায় ভোক্তা মূল্য বেড়েছে ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ। খাদ্যের দাম বেড়েছে ১২৮ শতাংশ।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের সমস্যা কয়েক গুণ বেড়েছে, একই সঙ্গে আয় কমেছে।
অর্থনৈতিক সংকট অবশ্য ইরানে নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের একটি মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানের মানুষের অসন্তোষ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সেই অসন্তোষ যে সরকারের পতনে রূপ নেবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
বরং ইরানকে অতীতেও নানামুখী চাপ সামলে টিকে থাকার উপায় বের করে নিতে দেখা গেছে।
ফলে নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধের মেয়াদও দীর্ঘ করতে পারে।
চীন ও ভারতের ভূমিকা
ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা কৌশলের আরেকটি বড় প্রশ্ন হল—ইরানের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা দেশগুলো কতটা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে চলবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা তৃতীয় পক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু তেহরান মনে করছে, তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের মত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করা ওয়াশিংটনের জন্য সহজ হবে না।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, চীনের মত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করবে না বলেই তাদের বিশ্বাস।
এই বাস্তবতা যুদ্ধকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বা ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারসাম্যের খেলা কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সেই চাপ এমন পর্যায়ে নেওয়া যাবে না, যাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম আরও বাড়ে এবং মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেইনে
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার বাইরে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ইউক্রেইন যুদ্ধে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর ফলে ইউক্রেইনের জন্য নির্ধারিত কিছু গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পশ্চিম এশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সিএনএনকে বলেছেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে প্রয়োজনের মাত্র এক-দশমাংশ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তার দেশের হাতে ছিল।
সিএনএন লিখেছে, এর ফল হয়েছে মারাত্মক। ২০২২ সালের মে মাসের পর চলতি গ্রীষ্মে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময় পার করেছে ইউক্রেইনের বেসামরিক মানুষ।
অন্যদিকে হরমুজ সংকট রাশিয়ার জন্য কিছু অপ্রত্যাশিত সুবিধা তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় মস্কোর জ্বালানি বিক্রির সুযোগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এর ফলে ইউক্রেইন যুদ্ধ চালাতে বাড়তি অর্থের যোগানা পাচ্ছে রাশিয়া।
অর্থাৎ, ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের একটি অংশ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সামনে কী?
ছয় মাসের হিসাব বলছে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—কোনো পক্ষই এখনো এমন ফল অর্জন করতে পারেনি, যা দিয়ে সংঘাতের একটি পরিষ্কার সমাপ্তি টানা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করুক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি আর কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে না পারুক।
ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার হোক, কিন্তু এমনভাবে নয়, যাতে সেটিকে তেহরানের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা যায়।
উপসাগরীয় দেশগুলো চায় যুদ্ধ থামুক, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো ফলও চায় না যাতে ইরান নিজেকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করতে পারে এবং হরমুজে চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রাখে।
এই তিনটি অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার জায়গা খুবই সংকীর্ণ।
রয়টার্স লিখেছে, এটি একটি ‘বিপজ্জনক অচলাবস্থা’। কারণ সামরিক সংঘাতের তীব্রতা কমলেও রাজনৈতিক সমাধানের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানের জন্য কৌশলটি তুলনামূলকভাবে সরল—টিকে থাকা। দেশটির নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, সময় যত গড়াবে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্যও বাড়বে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সামনে প্রশ্ন হল, ঠিক কোন ফলকে ‘যথেষ্ট’ বলে মেনে নিয়ে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
যদি লক্ষ্য হয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ চালিয়ে যেতে হবে।
আর যদি লক্ষ্য হয় পারমাণবিক কর্মসূচিকে এমন পর্যায়ে দুর্বল করা, যাতে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে সীমিত সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সেই পথও সহজ নয়। কারণ যুদ্ধের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় নিরাপত্তা, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন।
জয়-পরাজয়ের বাইরে
যুদ্ধের এই ছয় মাসে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, আর তা হল আধুনিক যুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আর রাজনৈতিক বিজয় এক জিনিস নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা ইরানের সক্ষমতার ওপর বড় আঘাত করেছে—এমন দাবি ওয়াশিংটন করছে।
কিন্তু একই সময়ে ইরানের সরকার টিকে আছে এবং যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও ধরে রেখেছে।
ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে, জনগণের ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট এখনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটায়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধের মধ্যে পড়ে নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। চীন ও ভারতের মত শক্তির সঙ্গে সম্পর্কও এই নতুন সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এটি এমন একটি সংঘাতে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিটি অতিরিক্ত দিন শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নয়, পশ্চিম এশিয়া এবং তার বাইরের দেশগুলোর অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও নতুন খরচ চাপাচ্ছে।
তাই ‘কে জিতছে’ তা এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়।
বড় প্রশ্ন হল, কে কত দিন এই অচলাবস্থার খরচ বহন করতে পারবে, এবং শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ আগে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, যাকে নিজের পরাজয় বলে মনে হবে না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
আলোচিত মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে আলোচনার মধ্যে এ বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, তারা সব ঘটনার ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছেন। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নয়া দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। তিনি বলেন, প্রথমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ওই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও ওই চুক্তিকে ইতিবাচক বর্ণনা করে বলেন, এ চুক্তি যদি বিস্তৃত হয়-এটা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এটা মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা নিয়ে কারও-অন্যদের উদ্বেগের অবকাশ নেই। মক্কা চুক্তি সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ প্যাক্টকে আমরা ইতিবাচক হিসাবে দেখছি। এতে যোগদান বা যোগদান না করার বিষয়টি এখনো আসেনি। কারণ, এটি নির্ভর করছে প্যাক্টের সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর। তারা যদি বাংলাদেশকে এ প্যাক্টে নেওয়ার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই এটিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব। মক্কা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের বিষয়ে ভারতের ভাবনা জানতে চান ওই সাংবাদিক। জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা সব ঘটনার ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছি। বিশেষ করে তা যদি ভারতের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় হয়। নিরাপত্তা সুরক্ষায় আমরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকি।’ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক হামলা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। সম্প্রতি দুটি পরিবার আক্রান্ত হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বা নিয়েছে কি না, উল্লেখ করে ওই সাংবাদিক জানতে চান, এটা ভারতের কাছে উদ্বেজনক কি না। জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু বলেন, আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব তাদের পালন করা উচিত।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই একই এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন একটি ‘ব্যারিয়ার হ্রদ’ তৈরি হওয়ায় সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় তিব্বতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে চীন। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছে নতুন একটি ব্যারিয়ার হ্রদের সন্ধান পাওয়া গেছে। যেকোনো সময় হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আগামী তিন দিন তিব্বতে উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে নদী বা জলপ্রবাহের পথ কোনো ধরনের বাধায় আটকে গেলে যে জলাধার তৈরি হয়, তাকে ব্যারিয়ার হ্রদ বলা হয়। গত বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়, তার পেছনেও এমন একটি হ্রদের ভূমিকা ছিল। জানা গেছে, তুষারধসের কারণে নেপাল-চীন সীমান্তের ভোতি কোশি নদীর একটি শাখা লেহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে ব্যারিয়ার হ্রদ তৈরি হয়েছিল। পরে পানির প্রবল চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যায়। এতে বিপুল পরিমাণ পানি লেহেন্দে নদী হয়ে ভোতি কোশিতে প্রবেশ করলে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নেপালের রাসুয়া এবং তিব্বতের গিরং এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। ওই বন্যায় রাসুয়া ও গিরং এলাকায় প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখনো প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৮৬৫ জন বিদেশি নাগরিক। বন্যার পানির সঙ্গে আসা বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে বিভিন্ন এলাকা চাপা পড়ায় নেপালে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এদিকে নতুন শনাক্ত হওয়া ব্যারিয়ার হ্রদটি আগের হ্রদটির আরও উজানে অবস্থিত। তিব্বতের ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে এর অবস্থান বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা, নতুন হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। ইতোমধ্যে হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় হ্রদের পানির স্তর এবং আশপাশের ভৌগোলিক পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীনের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কয়েকটি গ্রাম এরই মধ্যে খালি করা হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বেইজিং ও চেংদু থেকে বিশেষ দলও পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নতুন হ্রদটির ওপর নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রাখবে চীন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুর ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত দেশটির আটটি জেলা থেকে ৩৩২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে বিষয়টি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন। এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে ২৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানানো হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই মৃতের সংখ্যা আরও ৪৩ জন বেড়েছে। বুধবার সকালে উজান থেকে হঠাৎ নেমে আসা প্রবল ঢলে রাসুয়া এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। ত্রিশূলি ও নারায়ণী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ভোটেকোশি নদীতেও পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। প্রবল স্রোতে নদীর আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে—এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকেও মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে। নেপালের পাশাপাশি চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতও এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে অন্তত ৩০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতে তিনজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল। উদ্ধারকারী দলগুলো বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে তৎপর রয়েছে। দুর্গম অঞ্চল ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট