হামের সংক্রামণ ও মৃত্যু ঠেকাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করাসহ দালালের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।’
শুক্রবার (১৫ মে) বিকেলে রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এখন হামের চেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে নিউমোনিয়া। সংক্রামণ এবং মৃত্যু ঠেকাতে সরকার দ্রুত হামের টিকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে টিকার সুফল পেতে সময় লাগছে।’
তিনি বলেন, ‘রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করছি। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা এবং দালালের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি করছি।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি অবনতি হলে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। হাসপাতালের প্রয়োজনে যে কোনো যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হবে। যেসব হাসপাতালে ভেন্টিলেশন সংকট ছিল, সেই জায়গাগুলোতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
শিশুদের নিজেদের প্রতিভা ও গুণাবলি বিকাশের সুযোগ করে দিতে পারলে দেশের ভিত্তি আরও মজবুত হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি পরিবারের ভিত্তি যেমন সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করে শিশুদের সঠিক বিকাশের ওপর। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আয়োজনটি মূলত শিশুদের নিয়ে। তাই বড়দের বক্তব্যের চেয়ে শিশুদের কথা শোনাই হওয়া উচিত এ অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।’ নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘শিশু একাডেমির কার্যক্রম শুরুর সময় তিনিও শিশু হিসেবে সেখানে এসেছিলেন।’ তারেক রহমান বলেন, ‘আজ তোমরা শিশু হিসেবে এখানে উপস্থিত হয়েছ। একদিন আমিও এই শিশু একাডেমিতে এসেছিলাম। শিশু হিসেবেই এসেছিলাম।’ শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, শিশু একাডেমির ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে তার ও তার ছোট ভাইয়ের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত বোর্ডে নিজের একটি গল্প ও ছোট ভাইয়ের লেখা দেখে পুরোনো স্মৃতি ফিরে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শিশুদের শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে পড়ালেখার কথা বলব না। তোমাদের আজকে আমি বলব, তোমাদের খেলাধুলা করতে হবে।’ শিশুদের বিভিন্ন প্রতিভার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘কেউ ভালো ছবি আঁকে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ গান, নাচ কিংবা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে। প্রত্যেক শিশুর ভেতরে কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। সেই গুণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন যথাযথ সুযোগ।’ নিজের গিটার ও কি-বোর্ড শেখার আগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা গিটার, হারমোনিয়াম, বাঁশি বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে, তাদের ভালোভাবে শেখা উচিত। গান বা নাচের প্রতি আগ্রহ থাকলে সেই প্রতিভা বিকাশেও মনোযোগ দিতে হবে। একইভাবে যারা কেরাত ও কোরআন তেলাওয়াত পছন্দ করে, তাদেরও তা সুন্দরভাবে রপ্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। শিশুদের প্রতিভা বিকাশে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে সারা দেশে ২২ লাখ শিশু—১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে-ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা গেলে এখান থেকেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। শিশুদের প্রতিভা বিকাশে ‘নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্রীড়া কার্যক্রমও নতুন করে চালু করার কথা জানান তারেক রহমান। সিলেট থেকে শুরু করে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত ক্রীড়া আয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের শুধু সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চায় নয়, খেলাধুলাতেও পারদর্শী করে তুলতে হবে। একটি শিশুর শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার অন্তত একটি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে সন্তানদের এসব সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও যেন শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার সুযোগ পায়, সে জন্য স্কুল পর্যায় থেকে এসব সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিটি বাচ্চার মধ্যে কোনো না কোনো কোয়ালিটি আছে। আমাদের দরকার শুধু তাকে সেই সুযোগটা করে দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজেকে বিকশিত করতে পারবে।’ এ সংক্রান্ত কাজগুলো মোটামুটি গুছিয়ে আনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল থেকে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র ও খেলাধুলার বিভিন্ন ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের প্রস্তুত করতে স্কুল পর্যায় থেকে অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান, জাপানিজসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষার মধ্য থেকে শিশুরা নিজেদের পছন্দের একটি ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। শিশুদের শুধু পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা ভাষাজ্ঞান অর্জন করলেই হবে না; তাদের মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘তোমাদের কিন্তু মানবিক হতে হবে। তোমাদেরকে এই দেশের প্রকৃতি, এই দেশের পশুপাখির প্রতিও মানবিক হতে হবে।’ শিশুদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়ি, স্কুল কিংবা আশপাশের এলাকার গাছের যত্ন নিতে হবে। পশুপাখির প্রতিও সদয় হতে হবে। প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরে মন্তব্য করার অভিযোগে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার এক সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কথোপকথনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ প্রশাসন এ ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন চুনারুঘাট থানায় এএসআই হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই তাকে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে চুনারুঘাট উপজেলার রানীগাঁও বাজারে এক ব্যবসায়ীর করা মামলার তদন্তে যান এএসআই ইলিয়াস। সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের সামনে ঘুষ নেওয়া নিয়ে তার একটি বক্তব্য মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে। পরে ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘুষ গ্রহণের সঙ্গে পুলিশের পোশাক পরার বিষয়টি যুক্ত করে মন্তব্য করতে শোনা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি জানার পর ওই রাতেই এএসআই ইলিয়াসকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তদন্তের পর তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাধবপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাফিউর রহমান বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে। পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিডিওটি কীভাবে ধারণ করা হয়েছিল এবং তার বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নরসিংদীর সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকার আলতাফ হোসেন। স্থানীয়ভাবে তিনি দুঃখু মিয়া নামে পরিচিত। জন্ম থেকেই তার দুই হাত নেই। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। পা দিয়েই লেখাপড়া শিখেছেন, ডিগ্রি পাস করেছেন এবং চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেছেন। চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের পৈতৃক জমিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে সেই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে ১৪৫ শিশু। ১৯৬২ সালে জন্ম নেওয়া আলতাফ হোসেনের বাবা ছিলেন মৃত তমিজ উদ্দিন। জন্মের পর থেকেই দুই হাত না থাকায় পরিবারকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। ছোটবেলায় তার তিন ভাইও মারা যায়। এরপর দাদা আদর ও আক্ষেপ মিশিয়ে তার নাম রাখেন ‘দুঃখু মিয়া’। পা দিয়েই শুরু লেখাপড়া পাঁচদোনা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লেখার অনুশীলন করেন তিনি। তার বাবা বিশেষ কৌশলে তাকে লেখার অভ্যাস করান। দুঃখু মিয়ার ভাষ্য, পাতিলের কালি ও পানি মিশিয়ে কলাপাতার ওপর লিখতে দেওয়া হতো। দুই পায়ের আঙুলের মাঝখানে কঞ্চি ধরে ধীরে ধীরে লেখার অভ্যাস তৈরি করেন তিনি। সেই অভ্যাসই পরবর্তীতে তার শিক্ষাজীবনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। পা দিয়ে লিখেই ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক, ১৯৮৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন তিনি। দুঃখু মিয়া বলেন, জীবন তার কাছে একটি যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে টিকে থাকতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। কারও কাছে হাত না পেতে নিজের চেষ্টায় এগিয়ে যাওয়াকেই তিনি জীবনের সাফল্য মনে করেন। চাকরির চেষ্টা, বারবার হতাশা শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করেন আলতাফ হোসেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভায় গিয়ে বারবার বাদ পড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি। চাকরির আশায় বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তার কাছেও গিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চাকরি পাননি। একসময় হতাশা এলেও থেমে যাননি তিনি। টিউশনি ও কোচিং করিয়ে অর্থ সঞ্চয় শুরু করেন। পরে বাবার দেওয়া জমিও বিক্রি করেন। সেই অর্থ দিয়ে ২০০৭ সালে নিজের পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। এখন ১৪৫ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় বিদ্যালয়টিতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক ১৪৫ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। রয়েছেন আরও দুজন কর্মচারী। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেড ভবনের শ্রেণিকক্ষে পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন দুঃখু মিয়া। কখনো গল্পের মাধ্যমে, আবার কখনো হাসিমুখে শিক্ষার্থীদের পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। দুই হাত না থাকা তার পাঠদানের পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। শৈশবের বঞ্চনাই হয়ে উঠেছে প্রেরণা দুঃখু মিয়ার জীবনের অন্যতম বেদনাদায়ক স্মৃতি তার শৈশবের। ছোটবেলায় বাবা তাকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুই হাত না থাকায় পা দিয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে হবে—এমন কারণ দেখিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়নি বলে জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে সেই বঞ্চনাই তার জীবনের লক্ষ্যকে আরও দৃঢ় করে। যে সমাজে তিনি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতে বাধার মুখে পড়েছিলেন, সেই সমাজের শিশুদের জন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। দুঃখু মিয়া বলেন, এলাকার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যেতে চান তিনি। তার প্রত্যাশা, কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন শিক্ষা নিতে এসে তার মতো অবহেলা বা হেয়প্রতিপন্নতার শিকার না হয়। সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছেন দুঃখু মিয়া। অনেক সময় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রত্যাশিত সম্মানীও দিতে পারেন না। তারপরও সহানুভূতিশীল শিক্ষকরা তার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিকে একটি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন রয়েছে তার। প্রতিষ্ঠানটি বড় পরিসরে গড়ে তুলে একদিন এর দায়িত্ব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিতে চান তিনি। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা করলেও এখনো সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে দুঃখু মিয়ার। তার দাবি, বিদ্যালয়টির জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা তিনি পাননি। বাবার স্বপ্নের বিদ্যালয়ে ছেলেও শিক্ষক দুঃখু মিয়ার সংগ্রামের পাশে রয়েছেন তার ছেলে মোহাইমিনুল ইসলাম। বাবার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মোহাইমিনুল বলেন, নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তার বাবা সমাজে শিক্ষার প্রসারে কাজ করছেন। বাবার এই উদ্যোগের অংশ হতে পারা তার জন্য গর্বের। স্থানীয় বাসিন্দা করিমের মতে, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও দুঃখু মিয়া যেভাবে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন, তা প্রশংসনীয়। তার এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম দুঃখু মিয়া বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কাওছার জানায়, তাদের শিক্ষক পা দিয়ে লেখেন। তার হাতের লেখার চেয়েও দুঃখু মিয়ার পায়ের লেখা সুন্দর বলে মনে করে সে। শিক্ষক অত্যন্ত যত্ন নিয়ে পড়ান বলেও জানায় কাওছার। সহকারী শিক্ষক আসমা বেগমের কাছে দুঃখু মিয়া সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার জীবন সবাইকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয় বলে মনে করেন তিনি। একসময় শিক্ষা ও চাকরির সুযোগের জন্য যে সমাজের বিভিন্ন দরজায় ঘুরেছেন আলতাফ হোসেন, আজ সেই সমাজের শিশুদের হাতেই তুলে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো। দুই হাত না থাকলেও থেমে নেই তার লড়াই। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা প্রতিটি অক্ষর যেন তার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প; আর বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী তার সেই সংগ্রামের একেকটি অর্জন।