দেশে গরুর মাংসের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের কারণে বিদেশ থেকে সরাসরি মাংস আমদানির অনুমতি চেয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সংগঠনটির দাবি, বাজারে মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়।
রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে রেস্তোরাঁ খাতের বিভিন্ন সংকট ও সমাধানে ১১ দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বাজারে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সংগঠনটির নেতাদের দাবি, পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় গবাদিপশু পালন কমে গেছে। পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাবও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরাসরি গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ খাতকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন সহজ করা, এলপিজি সংকট সমাধান এবং ভ্যাট-কর কমানোর দাবিও জানানো হয়।
ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ খাতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হলেও সম্পূরক শুল্ক, উৎসে কর ও অন্যান্য করের চাপে ব্যবসায়ীরা এখনো চাপে রয়েছেন। তাই আগামী বাজেটে উৎসে কর প্রত্যাহার এবং ক্যানটিন ও ক্যাটারিং সেবায় ভ্যাট ৫ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রেস্তোরাঁ এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধিও মানছে না। অন্যদিকে এলপিজি গ্যাসের সংকট ছোট ও নতুন রেস্তোরাঁগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পিতভাবে নতুন গ্যাস সংযোগ চালু হলে ব্যবসায়িক ব্যয় কমবে এবং এলপিজির ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে বলে মনে করেন তাঁরা।
সংগঠনটির অভিযোগ, কিছু অসাধু চক্র ট্রেড ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে রেস্তোরাঁমালিকদের ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি ও হয়রানির শিকার করছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপও দাবি করেছেন নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সহসভাপতি শাহ সুলতান খোকন, যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম, কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান, যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান চৌধুরী ও দপ্তর সম্পাদক আমির হোসেনসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
এলএনজি আমদানিতে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীনতার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনা একাধিক এলএনজি কার্গো নির্ধারিত সময়ে দেশে না আসায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে এক মাসের বেশি সময় ধরে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারছে না দেশের অনেক শিল্পকারখানা। সামনে আরও কয়েকটি কার্গো আসার কথা থাকলেও সেগুলোর সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মোটাদাগে তিনটি কারণে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিপিএমে ব্ল্যাক কিউব কোম্পানির কাছ থেকে কেনা একটি এলএনজি কার্গো ৬ সেপ্টেম্বর দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) জমা দেয়নি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি কয়েকদিন ধরে ব্ল্যাক কিউবের কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগই করছেন না। ফলে নির্ধারিত সময়ে কার্গোটি না এলে চলতি সপ্তাহজুড়ে গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘এমভি ইসটিম ফুজি’ নামের কার্গোটি বর্তমানে লোহিতসাগর হয়ে জিব্রাল্টারের দিকে যাচ্ছে। ফলে ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে সেটি পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। এখন আগের বা পরের কার্গোর সময় এগিয়ে এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর আগে ডিপিএমে কেনা জেন হু শিপিংয়ের ‘কুংপেং’ নামের একটি কার্গো ২৬ আগস্ট দেশে আসার কথা ছিল। পরে কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায়, ওই কার্গোটি রাশিয়ার এলএনজি বহন করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে সেটিও দেশে আসেনি। ওই কার্গোর ঘাটতি পূরণে তাৎক্ষণিকভাবে স্পট মার্কেট থেকে বিকল্প এলএনজি কেনা সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। ডিপিএমে একটিও কার্গো আসেনি গত ১৭, ২৩, ২৬ ও ২৯ আগস্ট এবং ৬ ও ১০ সেপ্টেম্বর ডিপিএম পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির শিডিউল করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কার্গোর একটিও নির্ধারিত সময়ে দেশে আসেনি। এর মধ্যে ২৬ আগস্টের কার্গোর ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং করতে হয়েছে। দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১০৫ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭২ কোটি ঘনফুট। এতে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ১০ সেপ্টেম্বর ডিপিএমে মেক্সওয়েলের একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। তবে সেটিও অনিশ্চিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরামকো ট্রেডিংয়ের কাছে একটি কার্গো সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। বেশি দামে এলএনজি কেনার চাপ এলএনজি আমদানিতে সময়মতো পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে সরকারকে এখন বেশি দামেও কার্গো কিনতে হচ্ছে। ৭-৮ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সৌদি আরামকো ট্রেডিংয়ের একটি কার্গো প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার এবং পসকোর একটি কার্গো ২৪ দশমিক ৬২ ডলারে কেনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত এক মাস আগে স্পট বা চুক্তিভিত্তিক কার্গোর শিডিউল নিশ্চিত করা গেলে প্রতি কার্গোয় ৫০ লাখ থেকে এক কোটি ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। বর্তমানে একটি কার্গো কিনতে ৭ থেকে ৮ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ডলার। এদিকে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সেটি পুনরায় চালু হলেও কার্গো সরবরাহের অনিশ্চয়তায় সংকট কাটেনি। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। নেপালে আকস্মিক বন্যায় চিলিমে ও ত্রিশূল বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অন্য কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম। সারা দেশে এখনও লোডশেডিং চলছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও জ্বালানি কেনা ও বকেয়া পরিশোধের জন্য অর্থের প্রয়োজন। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সরকারের কাছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। শনিবার দুপুর ২টায় সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৬১০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে এলএনজি আমদানিতে ভুল পরিকল্পনা, সময়মতো বিকল্প ব্যবস্থা না নেওয়া এবং জ্বালানি খাতে সমন্বয়হীনতার কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো মা যেন সন্তানের অপেক্ষায় এবং কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর জন্য চোখের পানি না ফেলেন—এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এর মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে নিখোঁজ করা হয় না, তার পরিবারও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা, কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘিত হয়েছে। গত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই সময়ে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করা হয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে তিনি ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম ও বন্দিত্বের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি দেশের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, গুমের মতো কর্মকাণ্ড সেই আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথাও স্মরণ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশেই হবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। গুম ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ভাষ্য, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বেছে বেছে গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। গুম ও গণহত্যার মতো অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। একটি নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকবে, তবে সেই ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিচার করা যায় না। রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক এবং নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন—তার ওপরও দেশের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে। সবশেষে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যত ক্ষমতাবানই হোক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ আমলে পাঁচ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েছিলেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। শনিবার (২৯ আগস্ট) সোনারগাঁয়ে দলীয় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, তবে সেই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি, বরং ষড়যন্ত্রকারীরা ফেঁসে গেছেন। ২০২১ সালে রয়েল রিসোর্টে মামুনুল হক এক নারীসহ অবস্থানকালে তাকে ঘেরাও করেছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থকসহ স্থানীয় একদল ব্যক্তি। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। মামুনুল হক তখন ওই নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে ওই নারী পরে মামুনুল হকের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। সেদিনের প্রসঙ্গ তুলে মামুনুল হক দলীয় সভায় বলেন, সেদিন ‘তৌহিদী জনতার’ তোপের মুখে পড়ে বাঁচার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা আকুতি-মিনতি করেছিল। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে রয়েল রিসোর্টে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক মামুনুল হককে তখন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বেশ কিছুদিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাকে। মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, তৌহিদী জনতার কণ্ঠরোধ করতে ফ্যাসিবাদী সরকার মিথ্যা মামলার পথ বেছে নিয়েছিল। বর্তমান সরকার এসব মামলা প্রত্যাহার করেছে। সোনারগাঁ উপজেলায় জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে মাওলানা ইকবাল হোসাইনের স্মরণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন মামুনুল হক। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল কাদের নদভী কাসেমীর সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, ময়মনসিংহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ উল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান।