সরকারি চাকরিতে সবচেয়ে লোভনীয় ও সম্মানজনক অবস্থান ‘ক্যাডার সার্ভিস’। লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় সবারই স্বপ্ন থাকে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পছন্দের ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পাওয়া। তা না হলে নিদেনপক্ষে যে কোনো ক্যাডারে যোগদান। বিপত্তি ঘটলে পরের পছন্দ থাকে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে প্রবেশ।
অথচ ‘সোনার হরিণ’ নামক এই চাকরিতে কেউ কেউ মেধা ও যোগ্যতা ছাড়াই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করেই নিয়োগ পেয়েছেন, যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য এবং অনেকের কাছে কল্পনার বাইরে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) একটি সংঘবদ্ধ চক্র অনেক আগে থেকে ভয়াবহ এই অপকর্মে হাত পাকিয়েছে।
একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আমলার ছত্রছায়ায় তারা অনেকটা নির্বিঘ্নে এই অপরাধ করেও পার পেয়েছেন। আর এই সিন্ডিকেটের হোতা আবার পিএসসির একজন সাধারণ গাড়িচালক। নাম আবেদ আলী জীবন। মূলত যিনি ছিলেন বহুল আলোচিত প্রশ্নফাঁসচক্রের ড্রাইভিং সিটে।
সম্প্রতি এর আদ্যোপান্ত বেরিয়ে এসেছে এ সংক্রান্ত মামলার চার্জশিটে। দীর্ঘ তদন্তের ভিত্তিতে ১৮ মে আদালতে জমা দেওয়া ৪১ পৃষ্ঠার চার্জশিটের পরতে পরতে রয়েছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। আলোচিত মামলাটি ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা হয়।
তদন্তে দেখা যায়, চক্রটি শুধু প্রশ্নফাঁসেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রশ্ন-অর্থ ও প্রার্থী সংগ্রহকারী এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরের তথ্যদাতাদের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
তদন্তে ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পুলিশ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, এ তালিকায় অনেকেই আছেন, যারা ছিলেন সরাসরি পরীক্ষার্থী।
৫৫ সদস্যের চক্রে যারা: চার্জশিটে প্রশ্নফাঁসচক্রের মূল হোতা হিসাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনকে। তার নেতৃত্বে পরিচালিত ৫৫ সদস্যের চক্রে ছিলেন পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ছাত্র এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালচক্রের সদস্যরা।
এর মধ্যে গ্রেফতার ৩৬ আসামি হলেন-পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী, মো. নোমান সিদ্দিক, মো. খলিলুর রহমান, পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, এসএম আলমগীর কবীর, প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়, মো. জাহিদুল ইসলাম, পিএসসির উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু জাফর, মো. শাহাদত হোসেন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মামুনুর রশিদ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান, ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাইম হোসেন, ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী লিটন সরকার, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, মো. শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, দীপক বণিক, মো. খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, মো. মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, মো. আসলাম হোসেন, কৌশিক দেবনাথ, মোজাহিদুল ইসলাম, মজনু মিয়া, মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, মো. আব্দুল আজিম, রুপন চন্দ্র দাস ও মাহামুদ হাসান মান্না।
পলাতক ১৯ আসামি হলেন-সুমন কুমার বসু, বিপাশ চাকমা, মো. দেলোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দিপু, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আল মামুন, মো. আনিছুর রহমান, মো. ওয়াসিম খান, মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফেরদৌস আহম্মদ, মো. মান্নান উদ্দিন, মো. আশরাফুল আলম, জাহিদুল সরদার, মো. সোহেল পারভেজ, মো. জুয়েল আল মামুন, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. রুবেল শরীফ, শাকের আহমেদ আল-আমিন এবং এম এম নাজমুল হাসান। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকায় চার্জশিটে ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পলাতক আসামি মো. গোলাম হামিদুর রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম এবং আজাদ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা যায়নি।
তদন্তে উঠে এসছে, পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছে প্রশ্নসহ উত্তর পৌঁছে দেওয়া হতো। প্রার্থীদের নির্দিষ্ট স্থানে এনে প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানো হতো। এরপর পরীক্ষার দিন তাদের কেন্দ্রে পাঠানো হতো। বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের টাকা আগাম নিয়ে নিতেন। চক্রটির বিস্তার ছিল দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে সরকারি চাকরিজীবী, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কটি বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি এনজিও পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তার মতে, প্রশ্নফাঁস কার্যক্রম পরিচালনায় সংঘবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিল এবং তারা পরীক্ষার গোপনীয়তা ভেঙে রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চার্জশিটে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩-এর ১১ ও ১৫ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এই আইনে।
চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সেই সম্পদের উৎস যাচাই এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের অনুসন্ধানে পৃথক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু হলে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের আর্থিক পরিধি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, এ চক্রের কর্মকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ। আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে থাকা আরও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
কয়েকটি ধাপে কাজ করত চক্রটি : প্রথমে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী খুঁজে বের করতেন। মূলত যারা যে কোনো মূল্যে চাকরি পেতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। এরপর পরীক্ষাভেদে কয়েক লাখ টাকায় চুক্তি করা হতো। পরবর্তী ধাপে প্রশ্ন সংগ্রহ করা হতো। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও প্যাকেজিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রশ্ন বাইরে বের করে আনার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট প্রার্থীদের ঢাকায় এনে নিরাপদ স্থানে থাকার ব্যবস্থা করতেন চক্রের সদস্যরা।
পরীক্ষার আগের রাতে তাদের হাতে প্রশ্ন ও উত্তর তুলে দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে উত্তর মুখস্থ করানোর জন্য আলাদা তদারকি টিমও থাকত। সবশেষে পরীক্ষার দিন ভোরে প্রার্থীদের নিজ নিজ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তদন্তে বলা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং স্তরভিত্তিক। একেকজন একেক দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে চক্রের মূল নেতৃত্বকে শনাক্ত করা দীর্ঘ সময়ের তদন্ত ছাড়া সম্ভব ছিল না।
বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন বের করার ভয়ংকর কৌশল : তদন্তে উঠে এসেছে, বিজি প্রেসে কর্মরত মোহাম্মদ আকরাম হোসেন মন্ডল প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের সময় তিনি কখনো প্রশ্নপত্র বাথরুমে নিয়ে গিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তুলতেন। পরে সেই কাগজ কমোডে ফ্লাশ করে দিতেন। আবার কখনো প্রশ্নপত্র অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে বাইরে নিয়ে যেতেন। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিজি প্রেসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মজনু মিয়াও পরবর্তী সময়ে এ কাজে যুক্ত হন। তারা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার সব সেটের প্রশ্ন সংগ্রহ করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে সরবরাহ করতেন।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসচক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর ছিল এ অংশ। কারণ, প্রশ্ন বাইরে বের না হলে পুরো নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে পড়ত।
এনজিও আবাসনে ‘প্রশ্নফাঁস ক্যাম্প’ : তদন্তে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি হলো মোহাম্মদপুরের দুটি আবাসনকেন্দ্র।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, পলাতক আসামি আল মামুন ‘ইউএসটি’ ও ‘পদক্ষেপ’ নামের দুটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের আবাসন ভাড়া নিতেন। সেখানে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার দুই দিন আগে এনে রাখা হতো।
জব্দ করা রেজিস্টার, মানি রিসিট, ব্যাংক স্লিপ এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, পরীক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া এবং গোপন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আবাসন ও খাবার বাবদ ৪ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য একটি ঘটনায় পাওয়া গেছে ৫০ হাজার টাকার লেনদেনের প্রমাণ।
বিসিএসসহ সব পরীক্ষায়ই ছিল একই কৌশল : তদন্তে উঠে এসেছে, সব পরীক্ষাতেই একই কৌশল অবলম্বন করত চক্রটি। চার্জশিটে বলা হয়েছে, ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগেও প্রার্থীদের আবাসনে এনে রাখা হয়েছিল। তাদের প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করা হয়েছিল বলে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে একাধিক পরীক্ষার্থীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছে সিআইডি। জব্দ করা রেজিস্টারে তাদের অবস্থানের তথ্যও মিলেছে। তদন্তকারীদের মতে, এ তথ্য প্রমাণ করে যে চক্রটি দীর্ঘদিন বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাকে লক্ষ্য করে কাজ করেছে।
চালক থেকে ‘নিয়োগ বাণিজ্যের সম্রাট’ আবেদ আলী : তদন্তে সরাসরি ৫৫ জনের নাম এলেও কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সৈয়দ আবেদ আলী জীবন। বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের সমন্বয়, প্রার্থী সংগ্রহ, অর্থ বণ্টন এবং প্রশ্ন সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। প্রশ্নফাঁস থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ও তার সহযোগীরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। প্রশ্নফাঁসচক্রের আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এখন আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বৈধ খাতে স্থানান্তর এবং সম্পদে রূপান্তরের অভিযোগে অন্তত ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান চলছে। সিআইডির আবেদনের পর এ বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, প্রশ্নফাঁস থেকে অর্জিত অর্থ কোথায় গেছে, কার নামে সম্পদ হয়েছে, ব্যাংক হিসাবে কী ধরনের লেনদেন হয়েছে এবং অর্থ বিদেশে পাচারের কোনো তথ্য রয়েছে কি না। তদন্তসূত্রের দাবি, প্রশ্নফাঁস মামলার চেয়েও বড় তথ্য আসতে পারে এ অনুসন্ধান থেকে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পকে উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক খাতে রূপান্তরে বড় সম্ভাবনা দেখছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো। এ জন্য কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার), ফাংশনাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্বয়ংক্রিয় সেলাই যন্ত্রপাতি এবং গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী তারা। সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি (কোটরা) ঢাকার উপ-পরিচালক লি সুং-হুন (ড্যানিয়েল লি) এসব কথা বলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের রূপান্তর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে লি সুং-হুন বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতকে শুধু পরিমাণভিত্তিক উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে পরিণত করতে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে এ খাত এখনো মূলত প্রাকৃতিক তন্তুনির্ভর এবং গড় মূল্য সংযোজনের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। কোটরার এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মূল্য শৃঙ্খলে আরও উপরে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কৃত্রিম তন্তু, ফাংশনাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল উৎপাদনে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনে এমএমএফের ব্যবহার বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি স্বাভাবিক ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন শুধু সাধারণ পোশাক নয়, ফাংশনাল ফ্যাব্রিক, পারফরম্যান্স ওয়্যার এবং টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রযুক্তি ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই ব্যবস্থা, গার্মেন্টস ও ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। লি সুং-হুন জানান, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আধুনিকায়নে তারা তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন— পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং উদীয়মান পরিবেশগত ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক তন্তু থেকে কৃত্রিম তন্তু ও ফাংশনাল উপকরণভিত্তিক উৎপাদনে স্থানান্তর বাংলাদেশের পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। এ ক্ষেত্রে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা যৌথ উদ্যোগ ও প্রযুক্তি অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করতে পারে। লি আরও জানান, বাংলাদেশের টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগও ধীরে ধীরে বাড়ছে। কোরিয়ান নির্মাতারা বাংলাদেশে স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী কারখানা ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির চাহিদা বাড়তে দেখছেন। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের কাছেও কোরিয়ান যন্ত্রপাতি গুণগত মান ও দামের ভারসাম্যের কারণে জনপ্রিয়। ইউরোপীয় বাজারের নতুন নিয়মের প্রসঙ্গ তুলে লি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, পরিবেশবান্ধব নকশা (ইকো-ডিজাইন) এবং কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত কঠোর বিধিমালা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) ভবিষ্যতে রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড হয়ে উঠবে। এ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারকদের সহায়তা করতে কোরিয়ার আইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে কোটরা। লি বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা রয়েছে। তবে এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই পরিবেশগত অর্জনকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। কোটরা বাংলাদেশি কারখানাগুলোকে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বর্জ্যপানি শোধনব্যবস্থা উন্নয়নে সহযোগিতা করছে। কারণ বর্তমানে উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশগত সক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে কোটরা’র এই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশে কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ১৯৭৮ সালে ডেইউর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রায় দক্ষিণ কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওই সময় বাংলাদেশি কর্মীদের কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা দেশে ফিরে এসে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। লি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের প্রায় ৭০ শতাংশই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে কেন্দ্রীভূত। এ কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দুই দেশের জন্যই একটি অভিন্ন অগ্রাধিকার। তবে পোশাক শিল্পের বাইরেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি, ভোগ্যপণ্য, অবকাঠামো, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। লি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আগামী দিনে দ্রুত সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), ক্যানসারের ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং বায়োলজিকস উৎপাদনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ভোগ্যপণ্যের বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সম্প্রসারণের ফলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কোরিয়ান সৌন্দর্যপণ্য (কে-বিউটি)-এর চাহিদা বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে কোরিয়ান উৎপাদকরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড উন্নয়নে আগ্রহী। তিনি বলেন— স্মার্ট অবকাঠামো, বুদ্ধিমান পরিবহণ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সম্প্রতি কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) চুক্তি স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে লি বলেন, এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা সম্প্রসারণে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, সিইপিএ আলোচনা সম্পন্ন হওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি— এসব বিষয় আগামী কয়েক বছরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বাংলাদেশকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে লি বলেন, দেশের বিপুল তরুণ কর্মশক্তি, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার, বিশ্বমানের তৈরি পোশাক খাত এবং প্রায় পাঁচ দশকের কোরিয়ান ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়াতে কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক নীতির ধারাবাহিকতা, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নিজ দেশে নেওয়ার সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করা। লি বলেন, এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সিইপিএ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি আগামী দিনে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার) ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নামে জাল ডিও (ডেমি-অফিশিয়াল) লেটার তৈরি করে সরকারি বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগে বরগুনা সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাওন মজুমদার সুমনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ অধিশাখা-১-এর পরিচালক মো. মনির হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। অভিযোগ যা বলছে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ জুলাই জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবের মাধ্যমে বাদী জানতে পারেন যে, আসামি শাওন মজুমদার সুমন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নামে একটি জাল ডিও লেটার তৈরি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চিঠিতে ডেপুটি স্পিকারের স্বাক্ষর, সরকারি লেটারহেড এবং অফিসিয়াল পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারি বদলি আদেশে অবৈধ প্রভাব বিস্তার করে নিজের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নিশ্চিত করা। বদলি ঠেকাতে জালিয়াতির অভিযোগ এজাহারে বলা হয়েছে, বরগুনা সদর উপজেলা থেকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় শাওন মজুমদার সুমনের বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলায় পদায়নের সুপারিশ জানিয়ে ওই ভুয়া ডিও লেটার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে জাতীয় সংসদ সচিবালয় নিশ্চিত হয় যে, কথিত ডিও লেটারটি তাদের দপ্তর থেকে ইস্যু করা হয়নি। যাচাইয়ে মিলল জালিয়াতির প্রাথমিক প্রমাণ মামলার এজাহার অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নথিটি পরীক্ষা করে দেখেন, এতে ব্যবহৃত ডেপুটি স্পিকারের স্বাক্ষর, ভাষার ধরন, পত্রের বিন্যাস এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব কারণে প্রাথমিকভাবে নথিটিকে জাল বলে শনাক্ত করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, এই জালিয়াতির মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সাংবিধানিক পদমর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করারও অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ এজাহারে আরও বলা হয়েছে, এ ঘটনার পেছনে একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র জড়িত থাকতে পারে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের স্বার্থে অভিযুক্তদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ই-মেইল, প্রিন্টিং উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং যোগাযোগের তথ্য তদন্তের পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষারও অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেসব ধারায় মামলা মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৬৫ (জালিয়াতি), ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪২০ এবং ১২০-বি (ষড়যন্ত্র) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া মামলার সঙ্গে আলামত হিসেবে কথিত জাল ডিও লেটারের কপি এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রকৃত অফিসিয়াল প্যাডের নমুনাও সংযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে নগরের দুই নম্বর গেট এলাকার চশমা হিলে অবস্থিত বাসভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বাসভবনটি চট্টগ্রাম সিটি প্রয়াত সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পারিবারিক বাড়ি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানা যায়নি। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাত ২টার দিকে হামলা ও অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। কারা জড়িত, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওসি আরও জানান, সাত জন দুর্বৃত্ত এসে আগুন ধরানোর চেষ্টা করে। পরে পাইপলাইনে আগুন ধরে। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। এ হামলায় কেউ হতাহত হয়েছেন কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য জানাতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। স্থানীয়দের ধারণা, এই ঘটনার জেরে নওফেলের বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়েছে।