সরকারি চাকরিতে সবচেয়ে লোভনীয় ও সম্মানজনক অবস্থান ‘ক্যাডার সার্ভিস’। লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় সবারই স্বপ্ন থাকে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পছন্দের ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পাওয়া। তা না হলে নিদেনপক্ষে যে কোনো ক্যাডারে যোগদান। বিপত্তি ঘটলে পরের পছন্দ থাকে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে প্রবেশ।
অথচ ‘সোনার হরিণ’ নামক এই চাকরিতে কেউ কেউ মেধা ও যোগ্যতা ছাড়াই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করেই নিয়োগ পেয়েছেন, যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য এবং অনেকের কাছে কল্পনার বাইরে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) একটি সংঘবদ্ধ চক্র অনেক আগে থেকে ভয়াবহ এই অপকর্মে হাত পাকিয়েছে।
একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আমলার ছত্রছায়ায় তারা অনেকটা নির্বিঘ্নে এই অপরাধ করেও পার পেয়েছেন। আর এই সিন্ডিকেটের হোতা আবার পিএসসির একজন সাধারণ গাড়িচালক। নাম আবেদ আলী জীবন। মূলত যিনি ছিলেন বহুল আলোচিত প্রশ্নফাঁসচক্রের ড্রাইভিং সিটে।
সম্প্রতি এর আদ্যোপান্ত বেরিয়ে এসেছে এ সংক্রান্ত মামলার চার্জশিটে। দীর্ঘ তদন্তের ভিত্তিতে ১৮ মে আদালতে জমা দেওয়া ৪১ পৃষ্ঠার চার্জশিটের পরতে পরতে রয়েছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। আলোচিত মামলাটি ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা হয়।
তদন্তে দেখা যায়, চক্রটি শুধু প্রশ্নফাঁসেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রশ্ন-অর্থ ও প্রার্থী সংগ্রহকারী এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরের তথ্যদাতাদের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
তদন্তে ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পুলিশ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, এ তালিকায় অনেকেই আছেন, যারা ছিলেন সরাসরি পরীক্ষার্থী।
৫৫ সদস্যের চক্রে যারা: চার্জশিটে প্রশ্নফাঁসচক্রের মূল হোতা হিসাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনকে। তার নেতৃত্বে পরিচালিত ৫৫ সদস্যের চক্রে ছিলেন পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ছাত্র এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালচক্রের সদস্যরা।
এর মধ্যে গ্রেফতার ৩৬ আসামি হলেন-পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী, মো. নোমান সিদ্দিক, মো. খলিলুর রহমান, পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, এসএম আলমগীর কবীর, প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়, মো. জাহিদুল ইসলাম, পিএসসির উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু জাফর, মো. শাহাদত হোসেন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মামুনুর রশিদ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান, ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাইম হোসেন, ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী লিটন সরকার, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, মো. শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, দীপক বণিক, মো. খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, মো. মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, মো. আসলাম হোসেন, কৌশিক দেবনাথ, মোজাহিদুল ইসলাম, মজনু মিয়া, মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, মো. আব্দুল আজিম, রুপন চন্দ্র দাস ও মাহামুদ হাসান মান্না।
পলাতক ১৯ আসামি হলেন-সুমন কুমার বসু, বিপাশ চাকমা, মো. দেলোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দিপু, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আল মামুন, মো. আনিছুর রহমান, মো. ওয়াসিম খান, মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফেরদৌস আহম্মদ, মো. মান্নান উদ্দিন, মো. আশরাফুল আলম, জাহিদুল সরদার, মো. সোহেল পারভেজ, মো. জুয়েল আল মামুন, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. রুবেল শরীফ, শাকের আহমেদ আল-আমিন এবং এম এম নাজমুল হাসান। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকায় চার্জশিটে ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পলাতক আসামি মো. গোলাম হামিদুর রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম এবং আজাদ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা যায়নি।
তদন্তে উঠে এসছে, পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছে প্রশ্নসহ উত্তর পৌঁছে দেওয়া হতো। প্রার্থীদের নির্দিষ্ট স্থানে এনে প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানো হতো। এরপর পরীক্ষার দিন তাদের কেন্দ্রে পাঠানো হতো। বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের টাকা আগাম নিয়ে নিতেন। চক্রটির বিস্তার ছিল দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে সরকারি চাকরিজীবী, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কটি বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি এনজিও পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তার মতে, প্রশ্নফাঁস কার্যক্রম পরিচালনায় সংঘবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিল এবং তারা পরীক্ষার গোপনীয়তা ভেঙে রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চার্জশিটে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩-এর ১১ ও ১৫ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এই আইনে।
চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সেই সম্পদের উৎস যাচাই এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের অনুসন্ধানে পৃথক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু হলে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের আর্থিক পরিধি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, এ চক্রের কর্মকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ। আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে থাকা আরও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
কয়েকটি ধাপে কাজ করত চক্রটি : প্রথমে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী খুঁজে বের করতেন। মূলত যারা যে কোনো মূল্যে চাকরি পেতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। এরপর পরীক্ষাভেদে কয়েক লাখ টাকায় চুক্তি করা হতো। পরবর্তী ধাপে প্রশ্ন সংগ্রহ করা হতো। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও প্যাকেজিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রশ্ন বাইরে বের করে আনার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট প্রার্থীদের ঢাকায় এনে নিরাপদ স্থানে থাকার ব্যবস্থা করতেন চক্রের সদস্যরা।
পরীক্ষার আগের রাতে তাদের হাতে প্রশ্ন ও উত্তর তুলে দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে উত্তর মুখস্থ করানোর জন্য আলাদা তদারকি টিমও থাকত। সবশেষে পরীক্ষার দিন ভোরে প্রার্থীদের নিজ নিজ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তদন্তে বলা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং স্তরভিত্তিক। একেকজন একেক দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে চক্রের মূল নেতৃত্বকে শনাক্ত করা দীর্ঘ সময়ের তদন্ত ছাড়া সম্ভব ছিল না।
বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন বের করার ভয়ংকর কৌশল : তদন্তে উঠে এসেছে, বিজি প্রেসে কর্মরত মোহাম্মদ আকরাম হোসেন মন্ডল প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের সময় তিনি কখনো প্রশ্নপত্র বাথরুমে নিয়ে গিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তুলতেন। পরে সেই কাগজ কমোডে ফ্লাশ করে দিতেন। আবার কখনো প্রশ্নপত্র অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে বাইরে নিয়ে যেতেন। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিজি প্রেসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মজনু মিয়াও পরবর্তী সময়ে এ কাজে যুক্ত হন। তারা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার সব সেটের প্রশ্ন সংগ্রহ করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে সরবরাহ করতেন।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসচক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর ছিল এ অংশ। কারণ, প্রশ্ন বাইরে বের না হলে পুরো নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে পড়ত।
এনজিও আবাসনে ‘প্রশ্নফাঁস ক্যাম্প’ : তদন্তে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি হলো মোহাম্মদপুরের দুটি আবাসনকেন্দ্র।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, পলাতক আসামি আল মামুন ‘ইউএসটি’ ও ‘পদক্ষেপ’ নামের দুটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের আবাসন ভাড়া নিতেন। সেখানে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার দুই দিন আগে এনে রাখা হতো।
জব্দ করা রেজিস্টার, মানি রিসিট, ব্যাংক স্লিপ এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, পরীক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া এবং গোপন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আবাসন ও খাবার বাবদ ৪ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য একটি ঘটনায় পাওয়া গেছে ৫০ হাজার টাকার লেনদেনের প্রমাণ।
বিসিএসসহ সব পরীক্ষায়ই ছিল একই কৌশল : তদন্তে উঠে এসেছে, সব পরীক্ষাতেই একই কৌশল অবলম্বন করত চক্রটি। চার্জশিটে বলা হয়েছে, ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগেও প্রার্থীদের আবাসনে এনে রাখা হয়েছিল। তাদের প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করা হয়েছিল বলে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে একাধিক পরীক্ষার্থীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছে সিআইডি। জব্দ করা রেজিস্টারে তাদের অবস্থানের তথ্যও মিলেছে। তদন্তকারীদের মতে, এ তথ্য প্রমাণ করে যে চক্রটি দীর্ঘদিন বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাকে লক্ষ্য করে কাজ করেছে।
চালক থেকে ‘নিয়োগ বাণিজ্যের সম্রাট’ আবেদ আলী : তদন্তে সরাসরি ৫৫ জনের নাম এলেও কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সৈয়দ আবেদ আলী জীবন। বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের সমন্বয়, প্রার্থী সংগ্রহ, অর্থ বণ্টন এবং প্রশ্ন সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। প্রশ্নফাঁস থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ও তার সহযোগীরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। প্রশ্নফাঁসচক্রের আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এখন আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বৈধ খাতে স্থানান্তর এবং সম্পদে রূপান্তরের অভিযোগে অন্তত ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান চলছে। সিআইডির আবেদনের পর এ বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, প্রশ্নফাঁস থেকে অর্জিত অর্থ কোথায় গেছে, কার নামে সম্পদ হয়েছে, ব্যাংক হিসাবে কী ধরনের লেনদেন হয়েছে এবং অর্থ বিদেশে পাচারের কোনো তথ্য রয়েছে কি না। তদন্তসূত্রের দাবি, প্রশ্নফাঁস মামলার চেয়েও বড় তথ্য আসতে পারে এ অনুসন্ধান থেকে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাধারণ আলোচনা শুরুর আগে সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বক্তব্য শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বাড়তি সময় চেয়ে তাকে বিব্রত না করার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেছেন, ‘মুদিদোকানে লেখা থাকে না, বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। সময় চাহিয়া লজ্জা দিবেন না।’ শনিবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনা শুরুর আগে স্পিকার বলেন, ‘হাতে সময় কম থাকায় আজ ও আগামীকাল—এই দুই দিন বাজেটের সাধারণ আলোচনা হবে। এরপর সংসদের অন্যান্য কার্যক্রম নেওয়া হবে।’ সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলের হুইপরা যে সময় নির্ধারণ করেছেন, সেই সময় তিনি সদস্যদের জানিয়ে দেবেন। এরপর আর সময় বাড়ানো হবে না। অসমাপ্ত বক্তব্য এড়াতে সংসদ সদস্যদের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে স্পিকার বলেন, ‘আপনারা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বক্তব্য রাখবেন এবং এমনভাবে কনক্লুড (শেষ) করবেন, যাতে অসমাপ্ত বক্তৃতা দিয়ে আপনাকে বসে যেতে না হয়।’ স্পিকার আরও বলেন, ‘বাজেট অধিবেশনের সাফল্যজনক সমাপ্তির জন্য বাধ্য হয়ে আপনাদের সময় স্টিক করতে হচ্ছে। সুতরাং আবারও বলছি, আপনারা অনুরোধ করে বিব্রত করবেন না। যে সময় দেওয়া হবে, ওই সময়ের মধ্যে দয়া করে বক্তব্য শেষ করবেন।’ এর আগে অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনাতেও সময়সীমা নির্ধারণ করে দেন স্পিকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে বক্তব্য শেষ করলে দ্রুত বাজেট আলোচনায় ফেরা সম্ভব হবে।’ ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর বাজেটের সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। প্রথম বক্তা ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমানকে ছয় মিনিট সময় দিয়ে স্পিকার বলেন, ‘আপনার সময় ছয় মিনিট। ছয় মিনিটে দয়া করে শেষ করবেন।’ নির্ধারিত সময় শেষ হলে বক্তব্য থামিয়ে দিয়ে পরবর্তী বক্তাকে আহ্বান জানান স্পিকার। এরপর গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনকে ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়। বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি অতিরিক্ত দুই মিনিট সময় চাইলে স্পিকার বলেন, ‘সময় নাই।’ পরে ফজলুল হক আবার সময়ের আবেদন করলে স্পিকার বলেন, ‘আমি তো বক্তব্যের প্রারম্ভে বলেছি, মুদিদোকানে লেখা থাকে না, বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। সময় চাহিয়া লজ্জা দিবেন না।’
সুন্দরবনে পরিচালিত বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের বিশেষ অভিযানে কুখ্যাত ‘দুলাভাই বাহিনী’র প্রধান রবিউল ইসলামকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে বাহিনীর সদস্য শওকত সরদার নিহত হন এবং আরও এক সদস্য ইসরাফিল হাওলাদারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও উদ্ধার করা হয়। শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। কোস্টগার্ড জানায়, সুন্দরবনে সক্রিয় বনদস্যুদের নির্মূল এবং বনজীবী, জেলে ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর আওতায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, খুলনার কয়রা উপজেলার বনপাড়া সংলগ্ন সুন্দরবনের গভীরে ‘দুলাভাই বাহিনী’র সদস্যরা অবস্থান করছে। এরপর গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে কোস্টগার্ড বেইস মোংলা, স্টেশন কয়রা ও নলিয়ান স্টেশনের সদস্যরা টানা দুই দিনের অভিযান শুরু করেন। অভিযান চলাকালে দস্যুদের বহনকারী দুটি নৌযান শনাক্ত করে থামার সংকেত দেওয়া হলে তারা কোস্টগার্ড সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে দস্যুদের একটি নৌযানে আগুন লাগে এবং অপরটি ডুবে যায়। এ অভিযানে কোস্টগার্ড ১ রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ ও ২১৬ রাউন্ড গুলি নিক্ষেপ করে। বন্দুকযুদ্ধ শেষে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম ও শওকত সরদারকে উদ্ধার করা হয়। তাদের কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক শওকতকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে রবিউল ইসলামকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এদিকে, পলাতক দস্যুদের ধরতে কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় মঠবাড়িয়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে থেকে ইসরাফিল হাওলাদারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয় এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিযানে আরশিবসা নদীর বেসুখাল এলাকা থেকে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, একটি দেশীয় অস্ত্র, একটি মোবাইল ফোন ও একটি হাতঘড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের এবং উদ্ধার করা আলামত কয়রা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির মরদেহও ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাহিনী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তুরাগ নদীতে ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ ভাসছে’ শিরোনামে প্রচারিত তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। শনিবার (২৭ জুন) এক বিবৃতিতে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য বা অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আসেনি। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চলছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানায় পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে বা গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো তৎপর রয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছে।